ছেড়ে গেছেন তিন স্বামী‚ গাছের নিচে এক চিলতে ঘরে একাকী জীবনে সঙ্গী ছিল শুধুই পাণ্ডবনী

দাদুর মুখে মহাভারত পাঠ তাঁকে টানত চুম্বকের মতো | কিছু বোধগম্য হোক বা না হোক‚ শিশু বয়স থেকেই মনের মাঝে গেঁথে যেত শব্দগুলো | বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাণ্ডবনী হয়ে উঠল তীজনের বেঁচে থাকার উপজীব্য |

কিন্তু তিনি যে মেয়ে ! নেচে গেয়ে মহাভারতের আখ্যান শোনানোর অধিকার আছে শুধু পুরুষদের | হোক না ছত্তীসগড়ের প্রাচীন লোকজ শিল্প | কিন্তু মেয়েরা শুধুই পাণ্ডবনীর অন্তরাল শ্রোতা-দর্শক | পরিবেশক নন | 

নিজের সমাজ‚ ছত্তীসগড়ের পারধি তফশিলী সম্প্রদায় ত্যাগ করল তীজনকে | কিন্তু তীজন ছাড়লেন না পাণ্ডবনীকে | গাছের নিচে আক্ষরিক অর্থেই একঘরে হয়ে দিন কাটাতে লাগলেন | সবাই তাঁকে ছেড়ে গিয়েছিল | শুধু রয়ে গিয়েছিল পাণ্ডবনী |

এক হাতে একতারা বা তম্বুরা,অন্য হাতে করতাল সহকারে গান গাওয়া । অর্জুনের গদা, ধনুক,রথ, বা দ্রৌপদীর চুল ব্যবহার করে ফুটিয়ে তুলতেন এক একটি ভিন্ন চরিত্র । তাঁর অভিনীত পালাগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ প্রশংসিত দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ,দুঃশাসন বধ,ও অর্জুন-ভীষ্মের যুদ্ধ। 

জন্ম ১৯৫৬ সালে‚ ছত্তীসগড়ের প্রত্যন্ত গনিয়ারি গ্রামে | মাত্র বারো বছর বয়সেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয় নাবালিকা তীজনের । মাত্র তেরো বছর বয়সে তিনি প্রথম জনসমক্ষে অনুষ্ঠান করেন । মেয়েদের এর আগে প্রধানত বসে বসে বেদমতির গান গাওয়াই রীতি হিসেবে প্রচলিত ছিল । তীজনই প্রথম পারহি মহিলা যিনি পুরুষ পরিমণ্ডলীর মাঝে দাঁড়িয়ে উদাত্ত কন্ঠে গান পরিবেশন করেন । 

বিরল প্রতিভা প্রথমবার প্রচারের আলোয় আসে হাবিব তনভীরের  হাত ধরে । প্রবাদপ্রতিম থিয়েটার ব্যক্তিত্ব তীজনকে দেখে বিস্মিত হন। প্রথমবার তাকে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সামনে অভিনয় ও গান গাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। ভূষিত হয়েছেন পদ্মশ্রী,সংগীত নাটক একাডেমি পুরস্কার এবং পদ্মভূষণ পুরস্কারে ।

ভারতীয় সংস্কৃতির দূত হিসেবে সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, তুরস্ক, তিউনিসিয়া, মাল্টা, সাইপ্রাস, রোমানিয়া এবং মরিশাসে অনুষ্ঠান প্রদর্শন করেন । জওহরলাল নেহরুর বইয়ের উপর ভিত্তিতে তৈরি শ্যাম বেনগলের বহু প্রশংসিত দূরদর্শন টিভি সিরিজ ভারত এক খোঁজ-এ তিনি অনুষ্ঠান করার সুযোগ পান।

বাড়ি থেকে দেওয়া বিয়ে ভেঙে গেছে কবেই | সম্প্রদায় থেকেই বহিষ্কৃত তীজন | তারুণ্যে এসে আবার দুবার নিজে বিয়ে করেন এই লোকশিল্পী | কোনওটাই বেশিদূর গড়ায়নি | পরে বিয়ে করেন হারমোনিয়াম বাদক তুক্কারামকে |

বর্তমানে স্বামী তুক্কারাম,ও নাতি নাতনির সঙ্গে তিনি মধ্যপ্রদেশের ভিলাইতেই বসবাস করেন । লোকগীতি চর্চার পাশাপাশি ভিলাই স্টিল প্ল্যান্টে চাকরিও করেন তিনি । এই অনন্য লোকগায়িকা তাঁর অনবদ্য কন্ঠ ও অভিনয়-গুণে আজ গোটাবিশ্বে সমাদৃত । তার লোকগানের ধারায় সিক্ত তরুণ প্রজন্মও।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here