অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়
জন্ম – ১৯৯২, কলকাতায়। ২০১৪-এ পশ্চিমবঙ্গ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রনিক্স এঞ্জিনিয়রিং-এ স্নাতক, পরে আইআইইএসটি, শিবপুর থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ ২০১৬-এ। বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষক। নেশা বলতে বই আর বেড়ানো। শখের তাগিদে নানারকম বিষয়ে লিখে থাকেন। পছন্দ বলতে পরিবেশ আর মানুষের গল্প বলা।

Banglalive

আমাকে যাঁরা ব্যক্তিগত ভাবে চেনেন, তাঁদের অনেকেই শিরোনাম দেখলে আমার মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা সম্পর্কে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারেন। কারণ, প্রকাশ্যে ও বন্ধুমহলে আমি একাধিকবার একথা বলে বেড়িয়েছি যে, বইমেলা শুরু হওয়াটা আমার কাছে যেন সুদীর্ঘ এক বছরের অপেক্ষার পর আমার বহুপরিচিত বহুপ্রিয় বান্ধবীর ঘরে ফেরবার মতো ঘটনা। বইমেলা আমার কাছে জীবন্ত একটা সত্ত্বার মতোই, তাকে ভালবাসা যায়, তার সঙ্গে প্রেম করা চলে। তবু সেই প্রেমিকার রূপ ও স্বাস্থ্যের দিকটাও খেয়াল রেখে চলাটা প্রতিটি দায়িত্ববান প্রেমিকের অবশ্য কর্তব্য বলে মনে করিসেই পরিপ্রেক্ষিতেই এমন একটি প্রবন্ধের সূত্রপাত। 

১১ বছর হয়ে গেলো, ময়দান থেকে কলকাতা বইমেলা সরে এসেছে। আমার আজও মনে পড়ে ২০০৭ সালে যখন মহামান্য আদালতের নির্দেশে ময়দান থেকে কলকাতা বইমেলা সরে আসতে বাধ্য হয়েছিলো, পরিবেশকর্মী শ্রী সুভাষ দত্ত মশাইকে আমবাঙালীর সঙ্গে সঙ্গেই আমিও যথেচ্ছ ভাবে গালমন্দ করেছিলাম। তখন বুঝিনি যে, আমজনতার কাছে চরম ধিক্কৃত হয়েও – তখনকার সেই অনামী স্বল্পপরিচিত পরিবেশকর্মী ভদ্রলোকটি ময়দান তথা তিলোত্তমা কলকাতার কী উপকারটাই না করলেন। পরিবেশ যখন পালটায়, দূষণ যখন চরমে পৌঁছায় – তখন আবেগকে চেপে রেখে কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়াটা দরকার হয়ে পড়ে।

অনেকে হয়তো বলবেন যে, কলকাতা ময়দানে বচ্ছরভর প্রতিটি রাজনৈতিক সমাবেশের দিনগুলিতে বইমেলার চেয়েও অনেক বেশি দূষণ সৃষ্টি হয়ে থাকে – তার বেলা দত্তমশাই কী করেছেন? জবাবে দুটি কথা বলতে পারি, ১) দত্তমশাই প্রায় গোটা পূর্বভারতের পরিবেশরক্ষার্থে কাজ করে চলেছেন [আমার পূর্বের একাধিক প্রবন্ধে শ্রী দত্ত-কৃত একাধিক মামলার উল্লেখ রয়েছে] এবং ২) রাজনৈতিক দলেরা দূষণ তো চিরকাল-চিরসময়ে-চিরক্ষেত্রে করে থাকেন, “তেনারা অধম বলিয়া আমরাই বা উত্তম না হইবো কেন ?” 

ইতিহাসকে দূরে সরিয়ে রাখি, আজ ১১ বছর পরেও কিন্তু দূষণ-বিতর্ক কলকাতা বইমেলার পিছু ছাড়তে পারেনি। মিলনমেলায় ধুলোর সমস্যা নিয়ে জর্জরিত হতে হতো, তা কিছুটা মিটতেও শুরু করেছিলো – আবার ফের স্থান পরিবর্তন করে কলকাতা বইমেলা এবারের জন্য সল্টলেক সেন্ট্রাল পার্কে অনুষ্ঠিত হচ্ছে – ফের আরো একটিবার দূষণের প্রশ্নে জেরবার হতে চলেছে বাঙালীর এই গর্বের প্রতিষ্ঠান।

বইমেলার প্রধান দূষণের উৎসই হলো, মানুষের পায়ে ওড়া ধুলো আর খাবারের দোকানের খোলা উনুনের রান্না। খোলা উনুন বা কাঠকয়লার ধোঁয়া আর ধুলো যে কী ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে – তা কিছুদিন আগেকার দিল্লী-দূষণের খবর পড়লেই যে কারুরই মালুম হতে পারবে। আপনি প্রশ্ন করতে পারেন, “আচ্ছা মুশকিল তো মশাই, ২৫লাখ মানুষ যে মেলায় আসেন – তাঁদের পায়ে ধুলো উড়বে না – কেমনধারা চিন্তা বলুন তো আপনাদের?” আমি জবাব দিতে চাইবো, ধুলো উড়বে তো নিশ্চয়ই, তবু একটি স্থায়ী ও পরিকল্পিত মেলার মাঠ যদি নকশা মেনে তৈরী করা যায় – তবে সেই ধুলোর উপদ্রবকে অন্তত কমানো সম্ভব। অন্ততপক্ষে মিলনমেলায় সেই উপদ্রব কিন্তু বিগত কয়েকটি বছরে যথেষ্টই কমিয়ে আনা গিয়েছিলো। আপনি প্রশ্ন করবেন, “সেই মিলনমেলার মাঠকে আরও সুন্দর ও বৈজ্ঞানিক ভাবে সাজিয়ে তুলবার প্রচেষ্টাতেই তো কেবল এইবারটির জন্য বইমেলার এই স্থান-পরিবর্তন”। নিশ্চয়ই তাই, তবু এই সাজিয়ে তোলাটা কী বছরের অন্যান্য সময়েতে করে নেওয়া যেতো না? আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলার যে কৌলীন্য তাতে করে কিন্তু, কিছু বছর পরে পরেই এমন একেকটি স্থান-পরিবর্তনের নজির মোটেই গৌরবজনক নয়। আন্তর্জাতিক মাপকাঠি মেনেই একটি নির্দিষ্ট মেলাপ্রাঙ্গণ তৈরী হওয়া প্রয়োজন। 

এবারে সেই খাবারের দোকানগুলির কথায় আসি। আমার স্পষ্টই মনে পড়ে, স্নাতক পড়বার সময়ে তখন পকেটে হাতখরচা জমতো অল্প, বই কেনবার জন্য টাকা বাঁচিয়ে রাখবার উপায়ই ছিলো কলেজের বাইরের কোনো সাধারণ দোকান থেকে কিনে নেওয়া পাঁচ কী দশ টাকার বানরুটির ভরসায় কলেজফেরত বইমেলা ঘুরতে যাওয়াসস্তায় পুষ্টিকর। যদিও ব্যবসায়িক কিংবা বিনোদনের দিকটিকে খেয়াল রাখতে গেলে পরে, উদ্যোক্তাদের তরফেও খাবারের স্টলগুলিকে একেবারে বাদ দিয়ে চলাটা সম্ভব হয় না ঠিকই, তবু কোথাও একটা নজরদারি প্রয়োজন। কারণ কাগজে দেখলাম, বনদপ্তরের কর্তাব্যক্তিরা ইতিমধ্যেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, সেন্ট্রাল পার্কের বইমেলার কারণে পাশ্ববর্তী বনবিতানের প্রাকৃতিক পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং সেখানকার প্রাণীরাও যথেষ্ট পরিমাণেই দূষণের শিকার হতে পারবে। ইতিমধ্যেই সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী সেন্ট্রাল পার্কের জলাশয়ে দূষণের চিত্র ধরা পড়েছে, শৌচালয় তো কেবল বানালেই সমস্যা মেটে না – “শোচ” আনাটাই অনেক বেশী শক্ত কাজ। 

আরও কয়েকটি বিষয় নিয়েও বোধহয় কিছু বলা প্রয়োজন আজ। এতদিন, এতকিছুর পরেও যদি সেন্ট্রাল পার্কেই বইমেলা করাটা নিশ্চিত ছিলো, তাহলেও – মাঠটিকে যদি অন্ততপক্ষে বেশ কিছুটা সময় আগেই গিল্ডের কর্তারা নিজেদের হাতে পেতে পারতেন – সেক্ষেত্রেও হয়তো একটি দূষণ-নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করবার সময় পাওয়া যেতো। প্রতিবারেই দেখি একেবারে শেষ মুহূর্তের সময়েই গিল্ড কর্তারা মাঠ হাতে পেয়ে থাকেন। কোনো কিছুর গৌরবে কেবল গৌরবান্বিত হলেই চলে না, সকলের দায়িত্বে সেটিকে আরও সুষ্ঠু, আরও সুন্দরভাবে আয়োজন করা গেলেই কেবল সেটির গৌরববৃদ্ধি সম্ভব মাঠে আগত বইপিপাসুদের সাহায্যার্থে, মিলনমেলায় বইমেলা শুরুর সময় থেকেই সরকার নিখরচায় তাদের প্রত্যেকের জন্য জলের পাউচ বিলি করেন। অত্যন্ত সাধু উদ্যোগ। তবু এর ফলে যে প্লাস্টিকের জঞ্জালস্তুপ তৈরী হয়, তা নিঃসন্দেহে বইমেলার পরে পরেই সরকারী উদ্যোগে সরিয়েও নেওয়া হয়, তবুও সেও তো কোথাও না কোথাও গিয়ে জমা পড়ে – সে অবিনশ্বর বর্জ্যের বিনাশ সাধবে কে? অন্য কোনো সমাধান ভাববার সময় এসেছে আজ। 

এতদসত্ত্বেও, এ সবকিছুকেই কেবল অনুযোগ হিসাবেই তুলে ধরতে চাইবো – প্রিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনতে চাইলে ঘর ভাঙবার সম্ভাবনা। প্রিয়ার রূপ-স্বাস্থ্য-চরিত্র লাবণ্যে ভরে উঠুক, দিকে দিকে তার সৌরভ ছড়াক – আর সমালোচক সমস্ত খিলজীর দলবলেরা ঈর্ষায় জ্বলুক এমনটাই তো চাইতে হয়। সেন্ট্রাল পার্কের বইমেলাও সুষ্ঠু ভাবেই উতরোক, শত্তুরের মুখে ছাই দিয়ে ৪২এর বইমেলা ৪০০০ পার করুক, এমনটাই আশা করতে চাইবো, কেবল সেই দীর্ঘায়ুর প্রয়োজনেই কিছু ব্যক্তিগত মতামতকে শুভকামনা হিসাবে তুলে ধরতে চাইলাম।

আরও পড়ুন:  হৃদয়ের গহিন গাঙের কোন অভিমানে আত্মঘাতী হয়েছিলেন গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় ?

1 COMMENT

  1. খুবই উপযুক্ত লেখা … লেখককে ধন্যবাদ জানাই ..দষণ নিয়ন্ত্রণে কিছু ব্যবস্থা অবশ্যই এবং এখনই‌ নেওয়া উচিত