ধর্ষণ আর রক্তস্নানে ‘গেরিলা’ যুদ্ধের ‘জয়যাত্রা’

‘জান আমি কখনো হিন্দু মেয়েকে ন্যাংটো দেখিনি |…আমাকে একটা কথা বল, হিন্দু কি প্রতিদিন গোসল করে?…হিন্দু মেয়েদের গায়ে নাকি কটু গন্ধ?…তাদের জায়গাটা পরিস্কার?…শুনেছি, মাদী কুকুরের মতো | সত্যি?…শুনেছি হয়ে যাবার পর সহজে বের করে নেওয়া যায় না?…আমাকে কতক্ষণ ওভাবে ধরে রাখতে পারবে?…তোমাকে এখন বাধ্য করতে ইচ্ছে করছে |’
-উপন্যাস ’নিষিদ্ধ লোবান’, রচয়িতা : সৈয়দ শামসুল হক (অনন্যা প্রকাশন, ৩৮/২ বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০)

বাংলাদেশের জনপ্রিয় কথাকার সৈয়দ শামসুল হক তাঁর বহু আলোচিত উপন্যাসে এভাবেই এঁকেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলোকে | অত্যাচারী পাকিস্তানি মিলিটারির হাতে বন্দী হয়েছিল তাঁর কাহিনির নায়িকা- তরুণী মুসলিম গৃহবধূ সঈদা বিলকিস বানু | কুখ্যাত পাকিস্তানি মেজর আবার ভুল করে তকে হিন্দু বলে ভেবে বসেছিল | সে সময় বাঙালি মেয়ে মাত্রেই ধর্ষণযোগ্য মেটিরিয়াল, তার ওপরে বাঙালি হিন্দু মেয়ে হলে তো আর কথাই নেই | কাম-লালসার সঙ্গে অত্যাচারের বাসনা মিলেমিশে গেলে সেটা কোন তুঙ্গস্পর্শ করতে পরে, সৈয়দ শামসুল হকের বিতর্কিত ওই লেখার ছত্রে ছত্রে তার জান্তব নির্মাণ |

সেই উপন্যাস আর মুক্তিযুদ্ধের তিক্ত কষায় আরো সব স্মৃতি অবলম্বনে বাংলাদেশে তৈরি হয়েছিল বহু আলোচিত ছবি ’গেরিলা’ (২০১১), পরিচালনা নাসির উদ্দিন ইউসুফ | মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ অদম্য সব স্মৃতি নিয়ে ছবি অবশ্য ওদেশে এই প্রথম হলো না | বছরের পর বছর ধরে এই বিষয়ে একটার পর একটা মর্মান্তিক সব ছবি তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে, লেখা হয়েছে আলোড়নকারী কথাসাহিত্য | সেসবের কোনো খোঁজ রাখার দায় অনুভব করি নি এপার বাংলার আমরা কেউ | বাংলা সাহিত্য বা বাংলা সিনেমা বললে আজো যে আমাদের সংকীর্ণ কূপমন্ডুক মন শুধু কলকাতার সিনেমা-সাহিত্যের খবর নেয় | সে মন নাগরিক বোধের অসাড় লক্ষণরেখা পেরিয়ে রাজনীতি-প্রসূত সীমান্তের ওপারে যাওয়ার ধক দেখায় না |

মৃত্যুঞ্জয় দেবব্রতর ছবি ’চিলড্রেন অফ ওয়ার’ ওপার বাংলার বহু-রক্তক্ষয়ী শোক-ইতিহাসকে এই প্রথম ভারতীয় সিনেমার জাদুঘরে ঠাঁই দেবার চেষ্টা করলো | এ ছবির জন্য রাগে-ঝাঁঝে তীব্র-তীক্ষ্ণ অন্য একটা নাম বেছেছিলেন পরিচালক | ’দ্য বাস্টার্ড চাইল্ড’ | ওই নমে এমনকি ছবির পোস্টার ডিজাইনও তৈরি হয়ে গেছিল (উপরে দেখুন)| (যার একটা হুল প্রতিশব্দ বাজারে চালু : সেন্সর বোর্ড) কখনো ছবিতে এমন অসভ্য নাম ব্যবহারের অনুমতি দিতে পরে নাকি, পাগল? তারা তাই আটকে দিলো ছবির নামটাকে | পরিচালক সে সময় সেই সুভদ্রজনদের বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন অনেকবার যে, এই ’বাস্টার্ড’ বা ’বেজন্মা’ শব্দটা শান্তির সময়ে নাগরিকেরা গালাগালি হিসেবে ব্যবহার করে বটে, কিন্তু যুদ্ধকালীন বাস্তবতায় অগণিত বাস্টার্ডের প্রজনন এক নিছক রিয়্যালিটি মাত্র | বিজিত, আপাত-দুর্বল প্রতিপক্ষের মেয়েদের ওপরে বিজয়ী কামতাড়িত যৌন-উপোসী সেনাকুল লোলুপ রাক্ষস হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে, আবহমান কাল ধরে এটাই মানবসভ্যতার চালু রেওয়াজ | এই ধর্ষণ-উৎসবের চোট সামলে বেঁচে থাকা-অবশিষ্ট উচ্ছিষ্ট মেয়েদের পেট ভরে ভরে বাচ্চা আসবে , তেমনটাই তো প্রকৃতির লীলা বটে |

এসব কোনো কথা কানে না তুলে সিবিএফসি ছবির নাম পলতে দেবার নির্দেশ দিয়েছিল মৃত্যুঞ্জয়কে | মৃত্যুঞ্জয় অবশ্য জানতেন না যে, যে সময় ছবির নাম নিয়ে তাঁর সঙ্গে ভারতীয় সিবিএফসি বোর্ডের এই দড়ি-টানাটানি খেলা চলছে, তার পাক্কা তিন বছর আগেই বাংলার আঞ্চলিক সিবিএফসি বোর্ড ’বেজন্মা’ নমে একটি ছবির অনুমতি দিয়ে বসে আছেন | নিছক বাণিজ্যিক সেই মশালা ছবি ’বেজন্মা’ রিলিজ করেছিল ১৭ ডিসেম্বর ২০১০ (পরিচালনা আশিস মিত্র, অভিনয়ে জ্যাকি শ্রফ, লোকেশ ঘোষ, শতাব্দী রায়)| তাহলেই ভাবুন, ভারতীয় সিনেমার স্বঘোষিত অভিভাবক এই সিবিএফসি-র মধ্যেই কেমন বহুস্তরে সাজানো ডাবল স্ট্যান্ডার্ড! ’বেজন্মা’ শব্দটা ছবির নাম হিসেবে অনুমতি পেয়ে গেল, আর তার ইংরেজি প্রতিশব্দ ’বাস্টার্ড’ পেল না? মগের মুলুক নাকি? েই সব তথ্য হাতের কাছে থাকলে, কে জানে, হয়তো তখন আরেকটু দম নিয়ে লড়তে পারতেন মৃত্যুঞ্জয়, এভাবে টপ করে ছবির নামটা পলটে ’চিলড্রেন অফ ওয়ার’ করে দিতে হতো না |

এবার অন্য কথায় আসি | দৈনিক পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে মৃত্যুঞ্জয় জানিয়েছেন যে, ছোটবেলায় বছর পাঁচেক বাংলাদেশে থাকার দৌলতে আর মুক্তিযুদ্ধের ওপের নানান বইপত্র পড়েই নাকি এই ছবি তৈরির অনুপ্রেরণা পেয়েছেন তিনি | আর শেখ মুজিবর রহমানের ’দি আনফিনিশড মেময়ার্স’-এর ওপর ভিত্তি করে নাকি লেখা হয়েছে এই ছবির চিত্রনাট্য | হাবেও বা | কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এত বেশি ’রিসার্চ’ করার কথা বারংবার বলছেন মৃত্যুঞ্জয়, অথচ বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অসাধারণ যে সমস্ত সিনেমা তৈরি হয়েছে, তার একটারও নাম একবারও মুখে নিচ্ছেন না, তাতেই কেমন খটকা লাগছে আমার | আপনি নিজেই একটু ভেবে বলুন তো, আজকের দুনিয়ায় এটা একটু অস্বাভাবিক না? বিশেষ করে যখন বাংলাদেশের এই সমস্ত ছবির ডিভিডিই আমাদের দেশে রসিকজনের কাছে দিব্যি সহজলভ্য |

বুঝতেই পারছেন, এহেন পরিস্থিতিতে, নাসির উদ্দিন ইউসুফের ‘গেরিলা’ (২০১১), তৌকির আহমেদের ‘জয়যাত্রা’ (২০০৪) মোরশেদুল ইসলামের ‘আমার বন্ধু রাশেদ’ (২০১১), রুবাইয়াত হোসেনের ‘মেহেরজান’ (২০১১)-এর মতো দুর্দান্ত সব ছবির একটারও তিনি কোনও খোঁজ পেলেন না, কিংবা এর একটা ছবিও তাঁর দেখার আগ্রহ জাগল না, এটা বিশ্বাস করা একটু মুশকিল বটে| বরং যেভাবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তৈরি এই সব ছবির নাম একেবারে চেপে যাচ্ছেন মৃত্যুঞ্জয়, তাতে সত্যি বলতে কি উল্টো সম্ভাবনাটাই মনে বেশি করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে | মনে হতে থাকে, এসব ছবি শুধু দেখেননি মৃত্যুঞ্জয়, বরং যাকে বলে রীতিমতো গুলে খেয়েছেন | আর তারপরেই মনে মনে রীতিমতো ঘাবড়ে গেছেন তিনি | টের পেয়েছেন যে, বাংলাদেশের ভূমিপুত্রের রক্ত-ঘাম্-কান্না দিয়ে তৈরি এসব ছবি দেখার অভ্যাস করে ফেললে ভারতীয় আম-দর্শকের চোখের ব্যাকরণটাই যাবে পালটে | মুক্তিযুদ্ধের আঁচ থেকে হাজার কিলোমিটার দূরের ভিনদেশি নাগরিক মৃত্যুঞ্জয় দেবব্রতের তৈরি ছবি তখন আর তাদের মুখে-চোখে-বোধে অতটা রুচবে না |

থিক আমার যে সমস্যাটা হলো | মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তৈরি বাংলাদেশের ওই ছবিগুলো এর আগে এতবার করে দেখে ফেলেছি, যে একেকসময় নিজেকে ওই যন্ত্রণার অংশ বলে মনে হতো এতদিন | এরপরে এই এখন সেই একই বিষয় নিয়ে তৈরি মৃত্যুঞ্জয় দেবব্রতের ছবি দেখতে বসে একটা সময় আমার মনে হতে লাগল, এ আর নতুন কথা কি? এই সব যন্ত্রণা আর চোখের জল আর কর্কশ অপমান আর হিংস্র নখের আঁচড় পেরিয়ে পেরিয়েই যে দিন কেটেছে বাংলাদেশের, সিনেমার কল্যাণে সে তো আমার ভালই জানা | এসব কথা আরও ভালভাবে জানতে হলে আমি বরং ওদেশের সিনেমার কাছেই ফিরে ফিরে যাব বারংবার | পড়ব ওদেশের কথাসাহিত্য| ওদেশের কান্না চেনার জন্যে এদেশের কার্যত ভিনগ্রহী ফিল্ম মেকারের কাছে হাত পাততে হবে কেন আমায়?

বাংলাদেশের মা-মাটি-মানুষের আবেগজর্জর কারনামা সিনেমার পর্দায় ছাপতে বসে মৃত্যুঞ্জয়ের প্রথম যেদিকে নজর দেওয়া উচিত ছিল, সেটা হল ছবির ভাষা | যে দেশে এতবড় একটা ভাষা আন্দোলন হয়ে গেল, যে দেশ পৃথিবীকে উপহার দিল মাতৃভাষা দিবসের মতো একটা রক্ত আর ভালবাসা-মাখা দিন, সেই দেশের মানুষের গল্প মৃত্যুঞ্জয় বলতে গেলেন হিন্দি ভাষায়! এও কি সম্ভব হয় নাকি কখনও? কেউ একবার পরিচালককে শুধরে দিয়ে বলল না, যে দেশে বলিউডের হিন্দি ছবি অফিসিয়ালি ঢুকতে অবধি পারে না, সেই দেশের মানুষ/জননেতা নিজের সব আবেগ নিয়ে একটানা হিন্দি বক্তৃতা দেবেন দীর্ঘ সময় ধরে, আর মাঝে মাঝে জাস্ট গুঁজে দেবেন জয় বাংলা ধ্বনি, এটা ভাবতে পারাটাই অ-বাস্তবের খেল | ভাষা নিয়ে ওপার বাংলার আবেগটাই আলাদা , অনেক অনেক বেশি জ্যান্ত | ভাষার নাম-অনুসারে তৈরি পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যে দেশে দৃশ্য-শ্রব্যের সবটুকু অধিকার করে রেখেছে একটিমাত্র ভাষা — বাংলা ভাষা | সেখানে কী না আর পাঁচটা হিন্দি ছবির বাংলাভাষী চরিত্রের মতো মৃত্যুঞ্জয়ের ছবির চরিত্ররাও বাংলা বলে অকেশনালি! সে সময় আবার টের পাওয়া যায় যাঁরা এভাবে বাংলা বলছেন, বাংলাটা তাঁরা আদৌ জানেন না, অনভ্যস্ত অবাঙালি জিভে জোর করে কোনওমতে উগরে দিচ্ছেন মাত্র | ছি-ছি | এইরকম সব মুহূর্তগুলোই তো একঝটকায় ছবিটাকে আমার থেকে সরিয়ে দেয় বেশ কিছুটা দূরে, আর আমি মনে মনে ভাষার ক্যাটেগরিতে এ ছবির পরিচালককে গোল্লা দিয়ে বসি |

এ তো গেল ভাষার বৃত্তান্ত | ছবি দেখতে দেখতে আরেকটা কূট সন্দেহ মাথার মধ্যে গেঁড়ে বসতে থাকে | মনে হতে থাকে, সত্যি এ ছবির গল্পটা মৃত্যুঞ্জয়ের নিজের লেখা তো? ক্রেডিট টাইটেলে যতই তাঁর নাম থাকুক না কাহিনিকার হিসেবে, আমার কেন জানি মনে হতে থাকে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তৈরি বাংলাদেশের বাকি সব সিনেমাগুলোর কাছে এই ছবির অপরিসীম ঋণ | কেমন জানেন? শুনুন তাহলে ‘গেরিলা’ আর এই ‘চিলড্রেন অফ ওয়ার, ছবির সাদৃশ্য-কাহিনী! দুটো ছবিই শুরু হচ্ছে প্রায় একই ভাবে | দুটো ছবির শুরুতেই নির্মম রাষ্ট্রনায়ক ইয়াহিয়া খানের হিংস্র বাণী | ‘চিলড্রেন অফ ওয়ার’-এ অবশ্য এর সঙ্গে উপরি পাওনা ইন্দিরা গান্ধীর দুর্লভ ফুটেজ — বাংলাদেশের গণহত্যা আর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভারতের চাঁচাছোলা স্ট্যান্ড |

আসুন ‘চিলড্রেন অফ ওয়ার’ ছবিতে এরপরের একটি দৃশ্যে | সাংবাদিক আমির (ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত) আর ফিদার (রাইমা সেন) সুখী সংসার | টাইপ রাইটার খটখটিয়ে দিনের রিপোর্ট লেখা শেষ করে বৌকে আদর করতে বিছানায় ওঠে আমির | তারিখ ২৬ মার্চ ১৯৭১, স্থান পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকা শহর (যদিও খবর নিয়ে জেনেছি ছবির এই অংশের শুটিং হয়েছে দিল্লিতে) | এবার এর সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন ‘গেরিলা’ | সেখানেও গল্প শুরু হচ্ছে প্রায় একই দিনে — ২৫ মার্চ ১৯৭১ | কাহিনির স্থান : পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকা | সেই ছবির শুরুটাও এক তরুণ সাংবাদিককে নিয়েই ! তার নাম হাসান (ফিরদৌস) | দফতের বেরনোর আগে সে তার যুবতী বৌ বিলকিস বানুর (জয়া আহসান) সঙ্গে দাম্পত্য খুনসুটিতে ব্যস্ত | মৃত্যুঞ্জয়ের ছবির ফিদা আর নাসির উদ্দিনের ছবির বিলকিস, এই দুই মুসলিম গৃহবধূকেই আমরা এই পর্বে তাদের স্বামীর আপদ-বিপদের কথা ভেবে প্রায় একইরকম উৎকন্ঠায় ডুবে যেতে দেখি|

‘চিলড্রেন অফ ওয়ার’ ছবিতে এর একটু পরেই আমির-ফিদার বাড়ির দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে পড়ে পাক হানাদার খানসেনা, আর তাদের সেনানায়ক মালিক (পবন মালহোত্রা) আমিরের চোখের সামনে তার বৌকে ধর্ষণ করে তুলে নিয়ে যায় | অত্যাচারে বিধ্বস্ত আমির জ্ঞান ফিরে পেয়ে শুরু করে তার হারিয়ে যাওয়া বৌয়ের খোঁজ | সারা ছবি জুড়ে জারি থাকে সেই মর্মন্তুদ সন্ধান | এবার এর সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন ‘গেরিলা’ | এই ছবির শুরুতে সেই যে বৌয়ের বারণ না শুনে জোর করে দফতরে বেরিয়ে গেল সাংবাদিক হাসান, এরপর তার আর হদিশ পাওয়া যায় না কোনও | আমরা জানতে পারি সেই রাতগুলোয় লাশের মিছিলে শহর ভরিয়ে দিয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী | এই ছবির বাকিটুকু জুড়ে চলতে থাকে নিজের হারিয়ে যাওয়া বরকে খুঁজে বের করার জন্যে স্ত্রী বিলকিসের মরিয়া সন্ধান | বিলকিস নিজের হারিয়ে যাওয়া বরকে খুঁজে পায় না কখনও | একসময় প্রাণ বাঁচাতে ঢাকা থেকে সুদূর গ্রামাঞ্চলে একলা পাড়ি দিতে হয় তাকে |

অন্যদিকে ‘চিলড্রেন অফ ওয়ার’ ছবিতে আমিরকেও ঢাকা ছেড়ে নিজের বৌয়ের খোঁজে দূর গ্রামে পাড়ি জমাতে হয় একসময় | সে সময় সে আর সাংবাদিক নয় | তার হাতে উঠে গেছে বন্দুক, সে যোগ দিয়েছে মুক্তিবাহিনীর দলে | এই অবধি পড়ার পর টের পাচ্ছেন তো, দুটো ছবির মূল কাহিনিসূত্রে কেমন চমকপ্রদ মিল? তফাতের মধ্যে শুধু এইটুকু যে ‘গেরিলা’ ছবি দেখতে বসে একেকসময় মনে হয় একদম কাঁচা মাটির গন্ধ নিয়ে থোকা থোকা বাংলাদেশ উঠে আসছে হাতে | আর ‘চিলড্রেন অফ ওয়ার’ সেই তুলনায় অনেক সাজানো, অনেক মেকি | তাই তো আমির মুক্তিযোদ্ধাদের দলে যোগ দেবার পরে প্রথম যে অপারেশনটা হয়, সেই অপারেশনটাতেই টপ করে নিজের হারিয়ে যাওয়া ধর্ষিতা বৌকে খুঁজে পেয়ে যায় আমির | হতবাক হয়ে ভাবতে থাকি, আরে ভাই, এই বিশাল বাংলাদেশে খানসেনাদের অগুন্তি কনসেনট্রশন ক্যাম্পের মধ্যে বেছে বেছে ফিদা যে ক্যাম্পে ছিল, অজান্তে সেটাকেই প্রথম আক্রমণ করল মুক্তিবাহিনী ? এতখানি কাকতালীয় ইচ্চাপূরণের গল্প তো সস্তা বাজারি হিন্দি সিনেমাগুলোতেও আজকাল দেখায় না!

তবে আর পাঁচটা হিন্দি ছবির বয়ানের সঙ্গে এই ছবির বয়ানের ফারাক বলতে শুধু এইটুকু যে এই ছবির নায়ক যখন তার নায়িকাকে ফিরে পায়, তখন সে পূর্ণ গর্ভবতী | ক্যাম্পে থাকাকালীন নিরবচ্ছিন্ন ধর্ষণে তার গর্ভে বীজের অঙ্কুরোদ্গম ঘটে গেছে | অজানা দস্যুর বীর্যে স্ফীত তার গর্ভের দিকে চেয়ে আমিরের নীরবতা যে তীব্রভাবে বাঙময় হয়ে ওঠে, তার কৃতিত্বটুকু অবশ্যই এ ছবির পরিচালকের প্রাপ্য |

আমির আর ফিদার এই মর্মস্পর্শী, কিছুটা ফরমায়েশি, ক্লিশে গল্পটার পাশাপাশি ছবি জুড়ে চলতে থাকে আরও দুই কিশোর-কিশোরী ভাই-বোনের গল্প | রফিক (ঋদ্ধি সেন) আর কৌসর (রুচা ইনামদার) | পাক হানাদারেরা তাদের গ্রামটাকে আস্ত জ্বালিয়ে দেওয়ার পরে তারা দুজনেই এখন বেঘর, অনাথ | দুজনে দুজনের হাত ধরে খুঁজছে সারভাইভালের পথ | দুজনে কোনওমতে পৌঁছতে চাইছে জীবনের দেশ — ইন্ডিয়ায় | কিন্তু কোথায় সেই ইন্ডিয়া, কত দূরে ? চলার পথে কখনও বা তাদের সঙ্গে দেখা হয়ে যাচ্ছে অন্য গ্রাম-গ্রামান্তর থেকে কোনও মতে পালিয়ে আসা শরণার্থী দলের — আবার কখনও বা সেই গোটা দলটাই ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে পাক খানসেনাদের গুলিতে | এখানেও কাহিনীকারের কলমে নির্নিমেষ পক্ষপাত — এত গুলিগোলার মধ্যেও তাই দিব্যি বেঁচে-বর্তে থাকে ওই দুই ভাই বোন | শেষ দৃশ্যের আগে পর্যন্ত কাউকে ছুঁতে পারে না খানসেনাদের বুলেট | সম্ভব হয় নাকি? একটা ছবির মধ্যে এতগুলো আপাত-অসম্ভাব্য কাহিনি-মোচড় পুরে দেওয়ার আগে আরেকবার ভেবে নিলে পারতেন মৃত্যুঞ্জয় | না হয়, আরও বারকয়েক দেখে নিতেন ‘জয়যাত্রা’ ছবিটা, যে ছবির অনুপ্রেরণা নিয়ে এই ছবির ভাই-বোন আর শরণার্থী দলের ট্র্যাক | ‘জয়যাত্রা’ থেকে এই কাহিনিসুট্রটুকু ধার করতে পারলেন, কিন্তু সেই ছবির নির্মোহ ম্যাচিওরিটিটা অ্যাডপ্ত করে নিতে পারলেন না, এটাই যা দুঃখের |

এই একই কথা ‘গেরিলা’ ছবিটা সম্পর্কেও খাটে| সেই ছবির কাহিনিসূত্রের কাছে এই ছবির ঋণ কতখানি, সেটা তো আগেই লিখেছি | কিন্তু সেই ছবির নায়িকার লুক আর এই ছবির নায়িকার লুকে আকাশ-পাতাল ফারাক রেখে দিলেন কেন মৃত্যুঞ্জয়? ‘গেরিলা’ ছবি যত এগিয়েছে, নায়িকা জয়া আহসানের শরীরে তত ফুটে উঠেছে যন্ত্রণার ম্লানিমা, পথের ধুলো-ময়লা | না, নায়িকা সেখানে একবারও রেপড হয়নি, শুধু মনে মনে দীর্ণ হয়েছে নিরুদ্দিষ্ট স্বামী আর স্বজন বন্ধুদের কথা ভেবে, তাতেই এতটা | আর ‘চিলড্রেন অফ ওয়ার’-এ বারংবার গণধর্ষিতা, কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের বন্দিনী রাইমা সেনের শরীর জুড়ে কিনা নিয়ত গ্ল্যামার-শাসন জারি ! একই ক্যাম্পের অন্য বন্দিনীরা তীব্র শরীরী লাঞ্চনা সহ্য করতে না পেরে যখন উন্মাদিনী হয়ে যাচ্ছে, কিংবা সব মেয়েকে লাইন বেঁধে দাঁড় করিয়ে দেখানো হচ্ছে ঘটনাচক্রে ধরা-পড়া গোপনে-অস্ত্রপাচরকারী বীথিকার (তিলোত্তমা সোম) গণধর্ষণ ও নির্মম হত্যা – এমন সব মর্মান্তিক মুহূর্তেও ফিদাবেশী রাইমাকে বেশ ফ্রেশ আর বাংলার শ্রীময়ী বধূ-টাইপ দেখতে লাগে | তাকে দেখে একবারও মনে হয় না, উপর্যপরি ধর্ষণে তার আত্মার কোনও ক্ষতি হয়েছে এই কদিনে | পাশের কালিমাখা অন্য বন্দিনী নিঃসীম গ্লানিতে যখন ‘ময়লা‚>-‘ময়লা’ বলে গা ঘষে ধর্ষণ-অপমানের ছোঁয়াচ তুলে ফেলতে চায় বারংবার, তখন একা ওই ফিদা যেন গোটা ক্যাম্পের সব বন্দিনীদের মধ্যে এক মূর্তিমান স্টাইল স্টেটমেন্টের মত দাঁড়িয়ে | এর উলটোদিকে প্রায় একই হালত আমির-ইন্দ্রনীলেরও | স্ত্রীকে চোখের সামনে ধর্ষিতা এবং অতঃপর লুণ্ঠিতা হতে দেখার পরেও তার অস্তিত্বে কোনও বেসুরো গ্রহণ লাগে না, সে কপিবুক স্বাধীনতা-সংগ্রামী হয়েই সিনেমা জুড়ে দাপিয়ে বেড়ায়!

এত অবদি পড়ার পরে, আপনার মনে হতে পারে, এই ছবি শুধুই বাংলাদেশের নামী বহু-নন্দিত ছবিগুলোর গল্প ধার করে করে তৈরি, আর পরিবেশনে ঈষৎ কাঁচাও বটে | সুতরাং এই ছবি না দেখলেও চলে | এই ভুলটা করবেন না প্লিজ | হতে পারে এই ছবির গল্পসূত্র অন্য আর পাঁচটা ছবি থেকে ধার করা, কিন্তু সেই অন্য আর পাঁচটা ছবি আপনার ইতিমধ্যেই দেখা না হয়ে থাকলে এই ছবি দেখে নির্মম ইতিহাসের কিছুটা অন্তত আঁচ নেওয়া আপনার অবশ্যকর্তব্য | তার ওপর ছবির আসল তুরুপের তাসটি পরিচালক জমিয়ে রাখেন একেবারে শেষ দৃশ্যের জন্যে — আর যতদূর মনে হয়, গল্পের সেই মোক্ষম মোচড়টুকু কিন্তু আর কোনও ছবি থেকে ধার করা নয়, এই পরিচালকের একেবারেই নিজস্ব | এ ছবি না দেখলে সেই মোচড়টুকু চাক্ষুষ করাটাও যে আপনার অধরাই রয়ে যাবে |

কী সেই মোচড়? সেটা হলো : আমাদের চমকে দিয়ে, এ ছবিতে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ একটা বিন্দুতে এসে মিলে যেতে থাকে সম্প্রতিকালের শাহবাগ আন্দোলনে | শাহবাগ আন্দোলনের এক অন্যতম নেতা হয়ে ওঠে সেই মুক্তিযুদ্ধ-জাত এক ‘বাস্টার্ড চাইল্ড’ (ছবিতে এই ভূমিকায় পরিচালকের ভাই শত্রুঞ্জয় দেবব্রত) | ভিনদেশি পাক হানাদারের বীর্যে জাত সেই তরুণটি নিজে যখন ওই ভিনদেশি হানাদারদের বিরুদ্ধে উগরে দিতে থাকে নিজের ঘৃণা, আর জোরগলায় যখন নিজের পরিচয়ে সে জুড়ে দেয় ‘বাংলাদেশি’ বা ‘বাঙালি’ শব্দগুলো, তখন নিয়তির এই আশ্চর্য খেলার সেলুলয়েড-রূপকার মৃত্যুঞ্জয়কে একদফা বাহবা না দিয়ে উপায় থাকে না |

ঠিক ধরেছেন, অনেকদিন আগে এই ছেলেটিই জাত হয়েছিল লুণ্ঠিতা-ধর্ষিতা সেই মা ফিদার গর্ভে | রূপকথার শর্ত মেনে নিজের জীবনে সেই ফিদাকে শুধু ফিরিয়েই নেয়নি আমির, ধর্ষণ-জাত সেই সন্তানটিকে বড়ও করেছে ভালবাসা আর স্বদেশপ্রেমের মন্ত্রে | ঘেন্না আর অপমানের জবাব ভালবাসা দিয়ে দেবার রেলাটাই তো আলাদা | গোটা একটা সিনেমা বানিয়ে আগ্রাসী লুঠেরা মানবসভ্যতাকে সেই নিঃশব্দ ভালবাসার দমটা যেন রেলায় চেনাতে চাইলেন মৃত্যুঞ্জয় দেবব্রত |

২ ঘণ্টা ৪৩ মিনিটের দীর্ঘ ছবিটা সবসময়েই যে খুব রোচক লেগেছে তা নয়, তবে মৃত্যুঞ্জয়ের পরের ছবিটার জন্যে কৌতূহল তৈরি করে দিল এই ছবির কাহিনি-অংশের এই কুশলী মোড়ড়টাই, সে কথা অস্বীকারের জায়গা নেই |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here