কালিম্পং – দু’দশক পেরিয়ে

পুণ্য ভবন

প্রথমবার কালিম্পং বেড়াতে গিয়ে জায়গাটাকে বেশ মিষ্টি লেগেছিল – তখন সবে আর্ট কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে উঠেছি, সহপাঠী কর্ণ এসে বলল – “চল তোকে আমার মামার বাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে আসি কালিম্পঙে |” কর্ণর বাবা পাঞ্জাবি আর মা নেপালি – ও কালিম্পং-এই জন্মেছে, বড় হয়েছে – দাদু ছিলেন শহরের নামী ডাক্তার ড: দীক্ষিত | বাড়ির রাস্তাটা ওঁর নামেই | একে তো বাবা-মাকে ছাড়া প্রথমবার কলকাতার বাইরে যাচ্ছি তায় বন্ধুর সঙ্গে পাহাড়ে, ফলে মন খুশিতে ডগমগ হয়ে উঠলো | তবে আমার বাড়ির লোক সহজে ছেড়ে দেবার পাত্র নয়, নেহাত কর্ণর বাবাকে আমার পিতৃদেব যথেষ্ট পছন্দ করতেন বলে রক্ষে – তাও যাওয়ার আগে হাজারটা প্রশ্নাদি করতে বাকি রাখেননি |

তখন পুরোদমে গরমের ছুটি চলছে – ট্রেনে রিজার্ভেশন পাওয়া গেল না – তবে কর্ণ ঘাঁতঘোঁত জানত | কুলিকে দু’পয়সা খাইয়ে জেনারেল কামরায় দুটো আপার বার্থ ম্যানেজ হয়ে গেল |দিব্যি পা ছড়িয়ে শুয়ে নিচে ভিড়ে ঠাসাঠাসি করতে থাকা দুর্ভাগা লোকগুলোকে দেখতে দেখতে সারা রাস্তা গেলাম | সেটা ১৯৭৫ সাল… মে মাসের কালিম্পং-এ তখন যথেষ্ট ঠান্ডা থাকত | শহরের বাজার অঞ্চল থেকে কিছুটা ওপরে উঠে পাহাড়ের ধার ঘেঁষে কর্ণর দাদুর তৈরি ছবির মতো সুন্দর বাংলো – ‘পূণ্য ভবন’ | চারধারে চওড়া ঘাস জমি আর নানারকম ফলের গাছ – একটা দিক পুরো খোলা…চমত্কার কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায় |

পাহাড়ের ধারে ছবির মতো সুন্দর ‘ফ্লাওয়ার প্যাচ’ লজ

কর্ণর দিদিমা আমাদের ওয়েলকাম জানালেন – ওই বয়সেও দিব্যি ছোটাছুটি করে গোটা বাড়ি সামলাচ্ছেন | আমার মনে হচ্ছিল যেন এক স্বর্গরাজ্যে চলে এসেছি – ঘর থেকে শুয়ে বসে পাহাড় দেখো – বাগানে গিয়ে গাছ থেকে কালচে লাল রঙের টুসটুসে প্লাম ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাও …নাহলে ইচ্ছে মতো ঘুরে বেড়াও আর স্কেচ করো | মনে আছে কালিম্পঙে গিয়ে সেবার জীবনে প্রথম ‘মোমো’ খেয়েছিলাম | ঠান্ডায় হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে রাস্তার ধারে ছোট ছোট ঝুপড়িতে বসে যেতাম ধোঁয়া ওঠা গরম স্যুপ সহযোগে ফ্রায়েড মোমো নিয়ে…অনেকটা সিঙাড়ার মতো লাগত…এর স্টিমড ভার্সনটা খাবার অভ্যেস তখনও তৈরি হয়নি | বাড়িতে দিদিমাও রান্নাবান্না করতেন প্রচুর – ওরই মধ্যে একদিন শুঁটকি মাছ হয়েছিল – আমি কস্মিনকালেও খাইনি – না জেনেই মুখে দিয়েছিলাম – মনে হলো আচার গোছের কিছু একটা – কর্ণ অবশ্য বলে দিল…সযত্নে বাকিটা সরিয়ে রাখলুম…টাটকা মাছকে খামোখা শুকনো করে খাওয়ার মতো অতটা সৌখিনতা আমার নেই | পূণ্য ভবনের আরও দুই বাসিন্দা ছিলেন কর্ণর প্রায় সমবয়সী মামা ‘দেও’ আর ‘বিনোদ’ | সাহেবী স্কুলে পড়া বেশ কেতাদুরস্ত হাবভাব দুজনের – সারাদিন ড্রেসিং গাউন পরে বসে বসে নভেল পড়ে আর সন্ধে নামলেই সুন্দরী সব বান্ধবীদের নিয়ে এসে হইহুল্লোড় করে মাঝরাত অবধি | আমি ত্রিসীমানায় ঘেঁষতাম না – অত ফটর ফটর ইংরাজি বলার হিম্মৎ কোথায়?

জনমুক্তি পার্ক

তবে ওরই ফাঁকে-ফোকরে কর্ণ গিয়ে দু’চার বোতল উত্কৃষ্ট ওয়াইন হাতিয়ে আনত, নিজেদের ঘর অন্ধকার করে চাঁদের আলোয় বসে চুক চুক করে দুজনে বিমলানন্দ অনুভব করতাম | কিছুটা এই অলস সুখের জন্যই সেবার কর্ণর হাজার বলা সত্ত্বেও গ্যাংটক যাইনি | সিকিম তখন একেবারে সদ্য ভারতের অংশ হয়ে উঠেছে – গেলে জায়গাটার একটা ভার্জিন চেহারা অন্তত দেখে আসা যেত | পূণ্য ভবনের একটা বড় স্কেচ সমেত সে যাত্রায় যা আঁকাআঁকি হয়েছিল সবই পরে নষ্ট হয়ে যায় – ফেরার পথে জলপাইগুড়িতে এক দিদির বাড়িতে কয়েকদিন থাকাকালীন সরকারি ইঞ্জিনিয়ার জামাইবাবুটি আমাদের গাড়ি করে চা-বাগানগুলোতে চক্কর দিয়ে ভূটানের ‘ফুন্টশোলিং’ অবধি নিয়ে গিয়েছিলেন |ওখানে বসে করা করোনেশন গেট আর গুম্ফার স্কেচদুটোকেও যত্ন করে রেখে দেওয়া হয়নি |

ব্যস্ত পথের মোড়ে ডম্বর চক

২০১৩ সালে সেলেরিগাঁও থেকে ফেরার পথে একদিনের জন্য থেকে গেলাম কালিম্পঙে | ইচ্ছে ছিল ৩৮ বছর আগে এসে কাটিয়ে যাওয়া সেই বাড়িটাকে একবার দেখার | কর্ণ বহুকাল দেরাদুনবাসী – যোগাযোগ খুবই সামান্য – দিদিমাও বেঁচে নেই – বাড়িটায় এখন যে কারা থাকেন তাও জানি না | জিপ স্ট্যান্ডের কাছে ‘মুনাল লজ’-এ বড় ঝোলাটা রেখে বেরোলাম পুণ্য ভবনের খোঁজে | পথঘাট চিনি না কিছুই – রাস্তার নাম ড: দীক্ষিত দিয়ে এটুকুই কেবল মনে আছে – আশেপাশের কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করাতে যেদিকে দেখিয়ে দিল সেটা পাহাড়ের অনেক নিচের দিকে | কী আর করি নামতে শুরু করলাম, সবাই বলছে আরও এগিয়ে যেতে…ক্রমে দেখলাম শহরের এক প্রান্তে চলে এসেছি – কেমন খাপছাড়া সব ঘরবাড়ি – ভাবলাম এতদিন পর জায়গাটা হয়তো পাল্টে গেছে – কটেজ টাইপের বাড়ি দেখলেই ঢুকে জানতে চাইছি এটা দীক্ষিত সাহেবের বাড়ি কিনা – শেষে রহস্য ভেদ হলো – কালিম্পং শহরে দীক্ষিত নামের দুটো রাস্তা আছে – কর্ণর দাদু হলেন বি.এল.দীক্ষিত – এটা অন্য দীক্ষিত – আবার চড়ো ওপরে –

মুনাল লজের বারান্দা থেকে আঁকা কালিম্পং শহর

কী ভাগ্যি অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর একটা শেয়ার জিপ আমাকে আবার সেই বাজার অবধি তুলে দিল – ওখান থেকে মাত্র মিনিট পাঁচেকের হাঁটা – পৌছে গেলাম পুণ্য ভবনের সামনে – দেখেই চিনে ফেললাম – আশপাশটা একটু ঘিঞ্জি হয়ে গেলেও সেই ঘাসজমি আর পাহাড়ের খোলা দিকটা একইরকম রয়েছে | মার্চের শুরু ফলে এখনও দুপুরের রোদ বেশ মিঠে…মনে হলো বাড়ির লাগোয়া একটা শেডের তলায় অনেকে বসে গল্পগুজব করছে | সন্তর্পনে কাঠের গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই একটা সাদা পুঁচকে পাহাড়ি কুকুর খাঁউ খাঁউ ওরে তেড়ে এল | পিছনে এক লম্বা চওড়া মাঝ বয়সী মহিলা…ঝপ করে বলে ফেললাম…আমি কর্ণর বন্ধু হই…কলকাতা থেকে এসেছি…| মহিলাটি একগাল হেসে বললেন “ও রিয়েলি-দেখো আমাদের এখন লাঞ্চ চলছে…তুমি কি জয়েন করবে?”

কালিম্পং বৃত্তান্ত এখানেই শেষ নয়…’পুণ্য ভবন’ থেকে নিয়ে ‘মরগ্যান হাউস’ – আরও অনেক কথা বাকি রাখলাম আগামী পর্বে বলব বলে |

দেবাশীষ দেব
স্বনামধন্য এই অঙ্কনশিল্পী নিজেই এক সম্পূর্ন প্রতিষ্ঠান | তাঁর হাত ধরে নতুন করে প্রাণ পেয়েছে বাংলার কার্টুন শিল্প | সিগনেচার বেড়াল আর স্ব-নেচারটি কোমল, আত্মবিশ্বাসী, রসিক | বেড়ানো তাঁর নেশা | তাই ঝুলিতে রয়েছে বহু গল্প, সঙ্গে অসাধারণ সব স্কেচ | সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর নিরলস সাধনার অমর ফসল ‘রঙ তুলির সত্যজিৎ’ |

3 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here