ভাষা দিবস ও সোনার কাঠি-রুপোর কাঠির দেশ

নৌকোটা দুলছে। সূর্যাস্তের আর বড় দেরি নেই। একেকটা গেরুয়ারঙা ঢেউ এসে নৌকোটাকে ছুঁয়ে দিয়ে যাচ্ছে, দুলিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। নদীর ওপারে বাংলাদেশ। সাতক্ষীরা জেলা। টাকি শহরে, ইচ্ছামতীর তীরে বসে থাকা, শহুরে পর্যটকেদের চোখে বাংলাদেশ। ২১শে ফেব্রুয়ারির কথা এলেই যার কথা মনে পড়ে – সেই বাংলাদেশ।

 

১৯৫২ থেকে ১৯৭১ হয়ে আজ ২০১৯ অবধি, কেটে গিয়েছে ৬৭টা বছর। ২০০০ সালে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি মিলেছে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা গিয়েছে তবুও সেই ভাটিয়ালিভাওয়াইয়ার সুর, আজ কেমনটা যেন মৃদু হয়ে আসে। অদৃশ্য কোনও হাওয়ার, একটি অচেনাঅজানা গহ্বরে, সে যেন নিঃশব্দে বিলীন হয়ে আসতে চায়। কেবল সেই গেরুয়া রঙে ছোপানো একতারাধারী খোদার বান্দাদের মনের মানুষের  সন্ধান, এই বিষয়ে তাদের যে খোঁজ – তা ফুরাতে পারে না রোদ পড়ে আসতে থাকে, তাদের চলা ফুরায় না

 

আচ্ছা বেশ, বাউলগানের কথা না হয় বাদই দিলাম। সেদিন একটা লেখায় পড়ছিলাম, (সমরেশ বসুর একটি উপন্যাসের পাতায়) যে ওপারে নাকি রূপকথাকে বলে পরাণকথা। ঠাকুমাদিদিমারা রাতের খাওয়া শেষ হলে পরে, নাতি নাতনিদেরকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে, পান চিবুতে চিবুতে গল্প শোনাতেন। স্যাঁতস্যাঁতে দেয়ালের গায়ে ভূত আর পেত্নীদের ছায়াগুলোকে লম্বা হয়ে পড়তে দেখতাম। লম্ফের শিখাটুকুও, দপ করেই যেন কেঁপে উঠতো হঠাৎ। গায়ের ভিতরে একটা শিরশিরে ভয় টের পেতুম। রূপকথা নয়, ওদেশে বলতো পরাণকথা, প্রাণের খবর। সোনার কাঠি, রুপোর কাঠির দেশ।

 

ভাষা আন্দোলন

 

কত লোক হয়েছিল সেদিনকার মিছিলে – এক লক্ষ, দুই লক্ষ – নাকি পঞ্চাশ হাজার ? ১৯৫২ সালের সেই সকাল বা দুপুরটাকে যাদের মনে আছে (আমি তখন ধরাধামে ছিলুম না) – কেউ কি মাথা গুণতি করেছিলেন ? পুলিশ যখন গুলি চালিয়েছিল – সেই মুহূর্তটাকে কারোর কি মনে আছে ? রাতভোর কাজ করে, ২৩শে ফেব্রুয়ারির সকালে যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ চত্বরে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটিকে স্থাপন করা গিয়েছিল, সেই মুহূর্তটিকে মনে আছে ? তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানের পুলিশ স্তম্ভটিকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। ঠিক যেমনভাবে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু কর্তৃক পরিকল্পিত আইএনএ স্মারকটিকে ডাইনামাইটবোমাতে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন সিঙ্গাপুরের বিজয়ী ব্রিটিশ সেনাধিপতিরা। আচ্ছা, গণআন্দোলনে শহীদদের জনমানস থেকে বিস্মৃত করাটা কি অতটাই সহজ কাজ ?

 

আশ্চর্য এই ভাষা আমাদের। স্রেফ একটি ভাষার জন্য আবেগে, সেই ১৯০৫ সাল থেকে আমাদের সংগ্রাম। দেশ ভাগ হলো, তবু সমস্যা গেল না। বরং বেদনার সেই চোরাস্রোতটুকুই থেকে গেল কোথাও। একভাষাদুইদেশ, মনে মনে গুমরোতে হতো তখন। ৫২ থেকে ৬২’র আন্দোলন, ৭১এর ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা – মহান মুক্তিযুদ্ধ, এই সবকিছুরই তলায় তলায় চোরাস্রোতের মতোই বয়ে যেতে পেরেছে একটাই আবেগ – ভাষার আবেগ, উচ্চারণের আবেগ। হয়তো বা পরাণকথার মতোই

 

ভাষা, জল, মাটি আর আকাশ

 

এই ঘটনা পরম্পরা থেকেই আমরা বুঝলাম – যে রাজনৈতিক কোনও মতাদর্শ নয়, স্রেফ মুখের ভাষা, মুখের কথাকে কেড়ে নেওয়াটাই একটি জাতির পক্ষে সবচেয়ে অবমাননাকর। সমস্ত দিক থেকেই তাদের পরাধীনতার পরিচায়ক। আজ সিডনি থেকে সন্দেশখালি অবধি, আমরা বাংলায় কথা বলি, বাংলায় গান গাই। পালন করি নজরুলজয়ন্তী, গণসঙ্গীতে মনে পড়াই সলিল চৌধুরী হেমাঙ্গ বিশ্বাস, কবিতায় পড়ি সুভাষ মুখোপাধ্যায় শক্তি চট্টোপাধ্যায়েদের লেখা একেকটি আশ্চর্য রূপদর্শকে; অথবা সিনেমায় দেখি মৃণাল সেন। হাত ঘুরুঘুরু নাচের বিভঙ্গেতেই পালন করি বসন্তউৎসব, রবিঠাকুরের জন্মদিন। উত্তেজিত হই শাহবাগের খবরে, রমনার বটমূল থেকে হয়তো বা প্রিন্সেপ ঘাট – পদ্মাতেগঙ্গাতে প্রেম আর আন্দোলন, মিলেমিশে ঢেউ হয়ে বয়ে যেতে থাকে। অবিরত কবিতার মতো – স্বস্তিতেঅনায়াসেই।

 

অংবংচং বন্ধ হোক

 

এপারেতে যদি রূপম ইসলাম থেকে থাকেন, তো ওপারেতে ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। বাংলাদেশের একটি টিভির অনুষ্ঠানে একটিবার দেখেছিলুম – এপার থেকে যাওয়া ‘দোহার’এর গানের দলকে ওপারের সঞ্চালক সম্বোধন করছেন, “ওপারের দোহারবন্ধুরা” বলেই। এপার আর ওপারের সেই দ্বন্দ্বমূলক বহুব্রীহি সমাস – বড্ডই কষ্ট দেয়। কাঁটাতারের ভাগ থাকুক, অথবা ধর্মবিশ্বাসের – কেবল পাশে থাকতে, আর ভালো থাকতে যে কিছুজনের সমস্যাটা ঠিক কোথায় – এতদিনেও তা বুঝে উঠতে পারিনি। জলেতে ভাগ, জমিতে ভাগ, এমনকি অন্তরীক্ষেও আকাশসীমার কড়াকড়ি, মনের ফাটল চওড়া হচ্ছে রোজ। গীটার তুলেই একেকটা দিন, রূপমেরা কি কখনও গান ধরবেন না, – লিরিকসেও কি লিখবেন না, যে – “(এই) অংবংচং বন্ধ হোক – মানুষ আবার মানুষ হোক …”

 

সম্প্রীতির ভাষাদিবস

 

এই আশ্চর্য ভাষাতেই লেখা হয়েছিলো সেই আশ্চর্য গান – “কি জাদু বাংলা গানে, গান গেয়ে দাঁড় মাঝি টানে – গেয়ে গান নাচে বাউল, গান গেয়ে ধান কাটে চাষা”। ভাগ থাকুক আইনের খাতায়, ধর্মগ্রন্থের পাতায় – বঙ্গভঙ্গ বা ২১শে ফেব্রুয়ারির আন্দোলন যেন আমাদের ভিতরকার মনুষ্যত্বটুকুকেই মনে পড়িয়ে দেয়। আমাদের একতা – আমাদের ভাষাতে, আমাদের নিকোনো উঠোনে, আমাদের তুলসীমন্ডপে, পীরের সিন্নিতে, মুসলমান বেকারিতে সেঁকে পরে তৈরি হয়ে আসা বড়দিনের ফুলোফুলো নরম কেকের কামড়ে – এখানে বিশ্বাস হারানো পাপ। এমন অনেককটি ভাষা এখনও টিকে আছে, নাইজেরিয়াতে – পাপুয়া নিউগিনিতে, বা আরও দূরেকার কোনও দেশে, যে ভাষাতে হয়তো বা আজ, আর একজন বা দুইজন মাত্র কথা বলেন। তাঁদের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই একেকটি করে এমন ভাষার অবলুপ্তি ঘটবে। বাংলার দশা তেমনটা নয় – তবু, ঠিক যে আশ্চর্য আবেগের সঙ্গে সেই একজন বা দুইজন বা একেকটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গোষ্ঠী তাদের সামান্য ভাষা আর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলটুকুকে বাঁচিয়ে রাখতে লড়াই করে চলেছে, সেই সংগ্রামকেও আমাদের কুর্নিশ করা উচিত। অবশ্য সংগ্রামই বা বলবো কেন ? এ কেবল একটা মনের মধ্যেকার ভালোবাসা, পাটভাঙ্গা কাপড়ে অঞ্জলি দেওয়ার সুখ। আমার মুখের সুস্পষ্ট উচ্চারণ – আমার সবথেকে বড় প্রেমের ধন।

 

একেকটা রঙের আঁচড়, একেকটা তুলির টান – একেকটা আলপনার নকশা, আমাদের জমিটাকে মনে পড়ায়। আমাদের ঐক্যটাকে মনে পড়ায়। কবিতা বা গানের উল্লেখ করে রাজনৈতিক বক্তাদের মতো গা গরম করবার কোনও বাসনা নেই। কেবল বলতে চাইব, ভাষার কাজ তো কেবল ভাব প্রকাশেই সীমাবদ্ধ নয় – তার কাজ ভাব বিনিময়ে। তার কাজ মালা গাঁথা – যোগাযোগের সেতুবন্ধন। ভাগ করাটা কোনও কঠিন কাজ নয়, বরং ভাব করাটাই শক্ত। ২১শের পুণ্যক্ষণে আমরা বরং মেলবার আর মিলিয়ে দেবার কথাটুকুকেই হাঁক পেড়ে ঘোষণা করি চলুন

 

সোনার কাঠি রূপোর কাঠির দেশ, পরাণকথার দেশ, এখানে বিচ্ছেদ হয় না – মানুষ মিলিত হয়, এখানে আমরা সবাই জাতিস্মর, আমাদের ঐক্যের ব্যারিকেড অক্ষয় থাকুক

অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়
জন্ম – ১৯৯২, কলকাতায়। ২০১৪-এ পশ্চিমবঙ্গ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রনিক্স এঞ্জিনিয়রিং-এ স্নাতক, পরে আইআইইএসটি, শিবপুর থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ ২০১৬-এ। বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষক। নেশা বলতে বই আর বেড়ানো। শখের তাগিদে নানারকম বিষয়ে লিখে থাকেন। পছন্দ বলতে পরিবেশ আর মানুষের গল্প বলা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here