নেই কোনও ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি‚ তবু এই মহিলার হাতেই আছে ট্রেনের যাত্রী সুরক্ষার গুরুভার

3148
প্রতীকী ছবি

কোনও ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি বা ডিপ্লোমা নেই প্রীতিলতা মণ্ডলের । কিন্তু আছে এক বিশেষ ক্ষমতা। ট্রেনের রেকের আন্ডারক্যারেজে কোনও যন্ত্রাংশ বিকল হয়ে পড়লে তাতে কী সমস্যা হয়েছে তা বলে দিতে পারেন অতি অনায়াসে। যখন ঊর্ধ্বতন অফিসাররাও ব্যর্থ হন কী কারণে যন্ত্র বিগড়েছে তা খুঁজে বের করতে, তাঁরা শরণাপন্ন হন প্রীতিলতার। প্রীতিলতা বলেন, তাঁরা শোনেন। না, তিনি কোনও অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী নন,একজন সাধারণ মেকানিক।

দক্ষিণ পূর্ব রেলের সাঁতরাগাছি নতুন কম্পোজিট গ্রিড কোচিং রক্ষণাবেক্ষণ ডিপোতে আছেন তিনি। হাওড়া চেন্নাই করমণ্ডল এক্সপ্রেস এবং হাওড়া ব্যাঙ্গালোর যশবন্তপুর এক্সপ্রেসের ভারপ্রাপ্ত মিস্ত্রি তিনি। তাঁর দৃষ্টি খুব তীক্ষ্ণ, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ত্রুটিগুলি আর কারও চোখে না পড়লেও তাঁর চোখে ঠিক পড়বেই। সিপিআরও, এসইআর সঞ্জয় ঘোষ জানান ‘রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা ভারপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে কথা বলেছি আমরা। তাঁরা জানিয়েছেন প্রীতিলতার ওপর তাঁদের অপার নির্ভরশীলতার কথা। প্রীতিলতা যদি ট্রেনের যন্ত্রাংশ সংক্রান্ত কোনও ত্রুটি বা সমস্যার কথা বলেন, তাহলে সবটা আবার দেখে নেওয়া হয়। বেশিরভাগ সময়ে সত্যিই কোনও না কোনও গলদ ধরা পড়ে। খুব সূক্ষ্ম ফাটল বা ছিদ্র যা মনুষ্য চোখে পড়বার মত না এমন কিছুর খোঁজ পাওয়া যায়। প্রীতিলতার পরামর্শ অনুসারে দূরগামী ট্রেনগুলোকে যথাযথ ভাবে পরীক্ষা করে তবেই ছাড়া হয়।

তাঁর ঊর্ধ্বতন অফিসারদের মতে প্রীতিলতা প্রায় অপরিহার্য হয়ে উঠেছেন, রেকের নীচে পিটলাইনে ঘন্টার পর ঘন্টা কাজ করে যাওয়া, স্ক্রু টাইট করা, ক্লিপ চেক করা, জায়গা মত হাতুরির ঘা মেরে সব ঠিকঠাক করা, এই সব কিছুতেই তাঁকে ছাড়া চলে না বললেই চলে। রেলে চাকরি করা বা আদৌ চাকরি করার কোনও ইচ্ছেই ছিল না প্রীতিলতার। তাঁর স্টেশন মাস্টার স্বামীর সঙ্গে তিনি সাঁতরাগাছিতে বসবাস করতেন। এক বছরের কন্যা নিয়ে এই দম্পতি বেশ সুখেই দিন কাটাচ্ছিলেন। কিন্তু স্বামীর অকালমৃত্যু পালটে দিল প্রীতিলতার জীবন। সাঁকরাইল স্টেশনে ডিউটি করার সময় হারনেসে মৃত্যু হয় তাঁর স্বামীর। চাকরিটা পেয়ে যান প্রীতিলতা। অফিসে অন্য কোথাও কোনও পদ ফাঁকা না থাকায় বাধ্য হয়ে ফিল্ড পোস্টিং-এই যেতে হয় তাঁকে। ইচ্ছে না থাকলেও সংসার চালানোর জন্য এইরকম কাজ করতে বাধ্য হন চাকরি টেঁকাতে। ‘গোড়ার দিকে তো একেবারেই অসহ্য লাগত। আমাকে কাজ করতে হত দম বন্ধ হয়ে আসে এমন ঘুটঘুটে অন্ধকার সরু, চাপা একটা জায়গায়। গোটা ক্রিউতে আমিই একমাত্র মহিলা। কিন্তু আমার তো উপায় ছিল না কোনও। মেয়েটা ছোট। ওকে মানুষ করতে হবে। আমি সুপারভাইসারকে অনুসরণ করতাম তিনি যখন নানা জিনিস, যন্ত্রাংশ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখেতেন। কেমন করে ভুল ত্রুটির জায়গাগুলোতে চক দিয়ে দাগিয়ে দিতেন, সবটাই খুব মন দিয়ে দেখতাম। আমার কাজ ছিল ত্রুটিগুলোকে সারাই করে চকের দাগ গুলো মুছে দেওয়া। আসতে আসতে আমি কাজ শিখে ফেলি। এখন এক ঝলক দেখা মাত্রই বুঝে যাই কোথাও কোনও গলদ আঁচে কিনা। আমি নিজেই চেষ্টা করি ঠিক করতে আর না পারলে বড় অফিসার কাউকে ডাকি। এসি কোচের দায়িত্বে রয়েছি আমি। ব্রেক ব্লকগুলিকে বদল করতে হয়, অ্যালার্ম চেইন পরীক্ষা করা ইত্যাদি আরও নানা দিক আমাকে দেখতে হয়। এখন কাজটা করতে ভালোই লাগে’। দক্ষিণ পূর্ব রেইলওয়ের উচ্চ কার্যনির্বাহী সমিতির পক্ষ থেকে নানা অনুষ্ঠানে প্রীতিলতার কাজের দক্ষতার জন্য তাঁকে একাধিকবার সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.