বিশ্বাসঘাতকতার প্রবাদপুরুষ নাকি নিছকই এক ঈর্ষান্বিত উচ্চাকাঙ্খী? মির জাফর আসলে কে?

বিশ্বাসঘাতকতার প্রবাদপুরুষ নাকি নিছকই এক ঈর্ষান্বিত উচ্চাকাঙ্খী? মির জাফর আসলে কে?

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

পৃথিবীর ইতিহাসের জঘন্যতম বিশ্বাসঘাতকতার সাক্ষী হয়ে আছে পলাশির যুদ্ধ। আর এই যুদ্ধের খলনায়ক ছিলেন মির জাফর। ‘মির জাফর’ বেইমানের প্রতিশব্দ। বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক। যার নামে এই প্রবাদ তাঁর পুরো নাম ছিল মির  জাফর আলি খান, জন্মেছিল ১৬৯১ সালে। এই মির জাফর ছিলেন ইরানি বংশোদ্ভূত। পিতার নাম সৈয়দ আহমেদ নজাফি। তিনি ছিলেন তাঁর বাবা-মায়ের দ্বিতীয় সন্তান।

১৭৪১ সালের দিকে যখন মারাঠারা বারবার বাংলায় আক্রমণ করে, ধন-সম্পদ লুট করা শুরু করে তখন এদের দমনের জন্য নবাব আলিবর্দী খানকে বিরামহীন যুদ্ধে লিপ্ত হতে হয়েছিল। সেই সময় মির জাফর, সেসব যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং সেনানায়ক হিসেবে বিশেষ কৃতিত্ব দেখান।

নবাব আলিবর্দী খানের কোনও পুত্র সন্তান না থাকায় তিনি তাঁর নাতি সিরাজউদ্দৌলার প্রতি শৈশবকাল থেকেই বিশেষ মনোযোগী ছিলেন। সবেমাত্র কৈশরের গণ্ডি পেরোন সিরাজ-এর উপর দায়িত্ব আসে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা-র। স্বভাবগত দিক থেকে ছিলেন প্রচন্ড বদমেজাজী ও মদের নেশা ছিল তাঁর অন্যতম সঙ্গী। সমসাময়িক কালের লেখকদের ভাষায় তিনি ছিলেন একাধারে দুশ্চরিত্র, লম্পট ও নিষ্ঠুর। তখন তাঁর প্রধান সেনাপতি পদে নিযুক্ত হন মির জাফর। সমস্যার শুরু হয় সেখান থেকেই।

তত্কালীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রধান জিন ল, তাঁর স্মৃতিতে সিরাজ সম্বন্ধে এক বিবৃতিতে এই ঘটনা লিখেছিলেন, সেই সময়ে হিন্দু নারীরা গঙ্গার তীরে স্নান করতে অভ্যস্ত ছিলেন। সিরাজ তাঁর গুপ্তচরবৃন্দদের সেই সময় পাঠাতেন, তাদের মধ্যে কে বেশি সুন্দরী তা সনাক্ত করতে। আর সেই মহিলাদের জোর করে নিয়ে যাওয়া হত গঙ্গার উপরে ভাসমান ছোট নৌকাগুলিতে, সেখানে তিনি নিষ্ঠুর আনন্দে মেতে উঠতেন।

সিরাজের সঙ্গে ইংরেজদের আলিনগর সন্ধির পরে নবাবী শাসনের প্রভাব প্রতিপত্তি কমে গিয়েছিল। কিন্তু ক্লাইভ নবাবের বিরুদ্ধে শিক্ষা দেওয়ার মানসিকতা ব্যক্ত করলেন। তিনি ফরাসীদের বাংলা থেকে তাড়িয়ে দিলেন যাতে তাঁরা নবাবের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করতে না পারেন। কিন্তু ফরাসীদের মুর্শিদাবাদে আশ্রয়, সিরাজের দাক্ষিণাত্যের বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগের পরে বুঝতে পারলেন মুর্শিদাবাদের শাসনক্ষমতায় ইংরেজদের প্রতি সহানুভূতিশীল কেউ অধিষ্ঠিত না হলে তাদের বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে অসুবিধা হবে। তখনই ইংরেজরা ব্যবহার করা শুরু করলেন মির জাফর কে।

কারণ, প্রধান সেনাপতি হলেও মির জাফর সিরাজউদ্দৌলাকে নবাব হিসেবে মেনে নিতে পারেননি। তাঁর আশা ছিল আলিবর্দী খানের পর তিনিই হবেন বাংলার উপযুক্ত নবাব। নিজের নবাব হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ায়, ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লর্ড ক্লাইভের সঙ্গে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে সিংহাসনচ্যুত করতে এক গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। আর সেই ষড়যন্ত্রে ইয়ার লতিফ, জগত শেঠ, রায় দুর্লভ, উর্মি চাঁদ প্রমুখকে যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

এই ষড়যন্ত্রের কারণেই সিরাজউদ্দৌলা পলাশির যুদ্ধে ইংরেজদের কাছে পরাজিত হন এবং বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা-স্বাধীনতা হারিয়ে দুশো বছরের পরাধীনতার অন্ধকারে প্রবেশ করে। যুদ্ধে জয়লাভের পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মির জাফরকে নবাবের মনসদে বসায়। কিন্তু ইংরেজদের সঙ্গে হওয়া চুক্তি অনুযায়ী অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করতে ব্যর্থ হলে তাঁকে সরিয়ে ইংরেজরা তাঁর জামাতা মির কাশিমকে নবাব বানায়।

মির কাশিম এই পরাধীনতা মেনে না নিয়ে মাথা চাড়া দিয়ে উঠলে, বক্সারের যুদ্ধে তাকে পরাজিত করে ইংরেজরা আবারও মির জাফরকে মনসদে বসায়। কিন্তু ততদিনে মির জাফর বুঝে গিয়েছিলেন ইংরেজদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার এক চুল নড়ারও ক্ষমতা নেই। তিনি পুরোপুরিই পরিণত হয়েছেন ইংরেজদের হাতের পুতুলে।

এসব কিছুর পরেও প্রশ্নটি হচ্ছে, পলাশির পরাজয়ে মির জাফরের চক্রান্ত দায়ী থাকলেও, দেশের স্বাধীনতা বিকিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁকেই একমাত্র দায়ী করা যায় কি? এটা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, পলাশির যুদ্ধে সিরাজের পরাজয়ের মাধ্যমেই বাংলায় ইংরেজ বণিকরা তাদের পরবর্তী রাজনৈতিক সাম্রাজ্য গড়ে নিয়েছিল, কিন্তু সার্বভৌমত্ব তখনও বিদ্যমান ছিল নবাবদের হাতেই। কিন্তু বারংবার সামরিক সহায়তার জন্য ইংরেজদের নিকট হাত পাতার প্রবণতা দেখেই ক্লাইভ তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ঠিক করে নিয়েছিলেন।

মির জাফর এককভাবে বাংলার স্বাধীনতা বিকিয়ে দেওয়ার জন্যে দায়ী! একথা হয়তো সার্বিকভাবে সত্য নয়। কেবলমাত্র মির জাফর-এর জন্যই বাংলার দখল নিল ব্রিটিশরা, এটাও কতটা বিশ্বাসযোগ্য! সার্বিক দিক লক্ষ্য করলে দেখা যায়, মির জাফর প্রকৃতার্থেই দাবার ঘুটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিলেন। কিছু স্থানীয় সামাজিক, রাজনৈতিক কৌশল ও ক্ষমতার কেন্দ্রে যাওয়ার লোভ কাজ করেছে। সিরাজউদ্দৌলার পূর্বসূরি আলিবর্দী খান যদি তাঁর বাহুবলে তাঁরই শিক্ষক সরফরাজ খানকে হত্যা করে মনসদে বসতে পারেন, সেক্ষেত্রে উপযুক্ত মির জাফর মনসদে বসার ইচ্ছা প্রকাশে দোষ কোথায়? বাংলার মনসদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য তিনিও বহু যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেখানে কি না তাঁর বদলে অভিষেক হল দুশ্চরিত্র, লম্পট ও নিষ্ঠুর সিরাজের। তুলনামূলক ভাবে দেখতে গেলে মির জাফর-কে দোষারোপ করতে করতে আসল ষড়যন্ত্রকারীদের নাম জগৎ শেঠ, রানি ভবানী ও রায়দুর্লভ-কে ভুলে গিয়েছেন সকলেই, শুধু মির জাফরের নামের সঙ্গেই রয়ে গিয়েছে বিশ্বাসঘাতকতার কলঙ্ক। সেই কলঙ্ক অভিশাপের মত আটকে গিয়েছে তাঁর নামের সঙ্গে।

১৭ জানুয়ারি, ১৭৬৫ সালে ৭৪ বছর বয়সে মির জাফরের জাগতিক মৃত্যু ঘটলেও আসলেই কি মৃত্যু হয়েছে মির জাফর-এর? এর উত্তর জানা যায় মুর্শিদাবাদের মির জাফরের ধ্বংসপ্রায় প্রাসাদের সামনে গেলে। মির জাফরের প্রাসাদে ঢোকার প্রধান ফটকটি ইতিহাসে, সরকারি দলিলে এবং ট্যুরিস্ট গাইড বইয়ে ‘নেমক হারাম দেউর’ বা ‘বিশ্বাসঘাতকের গেট’ নামে পরিচিত পেয়েছে। আর যে কোনও বেইমান বা বিশ্বাসঘাতককে কুকথা বলতে ব্যবহৃত হয় ‘মির জাফর’ শব্দটি। তাই বলা হয় মরেও বেঁচে আছেন মির জাফর মানুষের মুখে মুখে। এই ঘৃণ্য শব্দের তকমা নামছাড়া করা সম্ভব হয়নি কোনমতেই। বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক হিসেবেই রয়ে গিয়েছে তাঁর নামটি। নিমকহারামের চিরকলঙ্ক মাথায় নিয়ে মুর্শিদাবাদে তাঁর বসবাসের বাড়িটিকে এখনও মানুষ ‘নিমকহারাম দেউড়ি’ নামেই চেনেন।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

Leave a Reply

pandit ravishankar

বিশ্বজন মোহিছে

রবিশঙ্কর আজীবন ভারতীয় মার্গসঙ্গীতের প্রতি থেকেছেন শ্রদ্ধাশীল। আর বারে বারে পাশ্চাত্যের উপযোগী করে তাকে পরিবেশন করেছেন। আবার জাপানি সঙ্গীতের সঙ্গে তাকে মিলিয়েও, দুই দেশের বাদ্যযন্ত্রের সম্মিলিত ব্যবহার করে নিরীক্ষা করেছেন। সারাক্ষণ, সব শুচিবায়ু ভেঙে, তিনি মেলানোর, মেশানোর, চেষ্টার, কৌতূহলের রাজ্যের বাসিন্দা হতে চেয়েছেন। এই প্রাণশক্তি আর প্রতিভার মিশ্রণেই, তিনি বিদেশের কাছে ভারতীয় মার্গসঙ্গীতের মুখ। আর ভারতের কাছে, পাশ্চাত্যের জৌলুসযুক্ত তারকা।