পৃথিবীর প্রকৃতির ঝুলিতে মুঠো মুঠো রহস্য | তেমনই এক রহস্য নিহিত আছে আমাজন অরণ্যের বয়েলিং রিভারে‚ যে নদীর জল ফুটন্ত | এই নদীর জলের তাপমাত্রা এতটাই বেশি যে কোনও জীবজন্তু যদি কোনওভাবে এই নদীর জলে পড়ে যায় তাহলে জীবন্তই সেদ্ধ হয়ে যায় | কিন্তু এমন কোন রহস্য বয়ে নিয়ে চলেছে আমাজনের বয়েলিং রিভার যা তাকে করে তুলেছে এমন অদ্ভুত ও আলাদা?

পেরুর বয়স্ক মানুষদের মুখে মুখে ফেরা কিংবদন্তি থেকে শিশুদের গল্পশোনার আসরে কান পাতলেই শোনা যাবে বয়েলিং রিভারের নানা কাহিনি | সেখানকার মায়ানতুয়াকু নামের এক আমাজনের বিশেষ প্রজাতি রয়েছে | তাঁদেরই কিছু বিশেষ প্রতিনিধিরা দীর্ঘকাল এই বয়েলিং রিভারের রহস্য বিশ্বের মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিলেন | কারণ বয়েলিং রিভারের জল বিশেষ ওষধিগুণসম্পন্ন বলে এই জল বিক্রি করে রোজগার করেন স্থানীয় মানুষজন  | তাই নদীর ধারেকাছেও ঘেঁষতে দেওয়া হয় না বহিরাগতদের  |



মায়ানতুয়াকু শব্দটি এসেছে মায়ানতু ও ইয়াকু‘- এই দুটি শব্দের মিলনে | মায়ানতু হল এক বন্য বিশেষ শক্তি যার মাথাটি দেখতে ব্যাঙের মত‚ দেহটি টিকটিকির‚ এবং হাত ও পাগুলি কচ্ছপের | ইয়াকু শব্দের অর্থ হল জল | আঞ্চলিক মানুষদের বিশ্বাস ‘ইয়াকুমামা নামে এক বিশেষ বন্য শক্তি মানুষের কল্যাণ করার জন্য এই বয়েলিং রিভার ও এরই সংলগ্ন ঠান্ডা জলের নদীর সৃষ্টি করেছেন |

বয়েলিং রিভার নিয়ে গবেষণায় নিয়োজিত হন আন্দ্রেজ রুশো | পেরুর জিওথার্মাল ম্যাপ তৈরির কাজে নিযুক্ত হন তিনি | স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তৈরি করা এই জিওথার্মাল ম্যাপে পেরুর সবথেকে উষ্ণতম স্থানগুলোকে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছিল | তখনই দেখা যায় চার মাইল দীর্ঘ এক বক্ররেখা যার উষ্ণতা অনেকটাই বেশি | কোনও আগ্নেয়গিরির বিস্তার এতখানি হতে পারে না | তবে কী এই দীর্ঘ উষ্ণ স্থানটি ? এটিই সেই বয়েলিং রিভার |

বয়েলিং রিভার নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আন্দ্রেজ রুজোকে কম সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়নি | স্থানীয় সদস্যরা বাণিজ্যিক ও আঞ্চলিক বিশ্বাসগত কারণে কোনও ভাবেই তাঁকে নদীর জলের কাছাকাছি যাওয়ার অনুমতি দিতে রাজি ছিল না | অনেক অনুনয় বিনয়ের পর গাঁটের কড়ি খরচ করে বয়েলিং রিভার নিয়ে গবেষণা করার সুযোগ পান আন্দ্রেজ | 

সেন্ট্রাল পেরুভিয়ান আমাজন জঙ্গলের নিম্নাংশে অবস্থিত এই ফুটন্ত নদী | পুকাল্লপা শহর থেকে প্যাচিটিয়া নদী ধরে প্রায় দুঘন্টার সফরের পর পেকেপেকে নৌকায় করে বয়েলিং রিভারের দিক যাত্রা করেন আন্দ্রেজ | ঠান্ডা জল ধীরে ধীরে গরম হয়ে উঠতে থাকে | জলের উপরে দেখা যেতে থাকে ধোঁয়ার কুন্ডলী | গবেষণা চালনা করার জন্য তীরবর্তী অঞ্চলে বসবাস শুরু করেন তিনি | মেপে দেখেন জলের তাপমাত্রা প্রায় ২০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট | দুদিকের জঙ্গল প্রায় ৬০ ফুট উঁচু | নদীর জলের গভীরতা ১৬ থেকে ২৫ ফুটের মত | নদীটি প্রায় ৮২ ফুট চওড়া | নদীর মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বড় বড় সাদা পাথর | পাখি থেকে বাঁদর‚ মরা পশুপাখির সেদ্ধ হয়ে যাওয়া দেহ ভেসে বেড়াচ্ছে জলে | ফুটন্ত জলে উঠছে বুদ্বুদ |

আন্দ্রেজ পরীক্ষা করে খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন যে বয়েলিং রিভারের জল গরম হওয়ার আসল কারণ কী | কারণ সম্ভাব্য সমস্ত কারণগুলিই এক্ষেত্রে নাকচ হয়ে গিয়েছিল | অনেকসময় নদীর নিকটবর্তী অঞ্চলের কোনও আগ্নেয়গিরির লাভা চুঁইয়ে এসে জল গরম হয়ে যায় | কিন্তু বয়েলিং রিভারের নিকটবর্তী আগ্নেয়গিরির অবস্থান নদী থেকে প্রায় চারশো মাইল দূরে | তবে আসল কারণ কী ?

আন্দ্রেজের মতে বয়েলিং রিভারের জলের তাপমাত্রা এত বেশি হওয়ার কারণ ফল্ট লেড হাইড্রোথার্মাল ফিচার | নদীর জল চুঁইয়ে মাটির ভিতরে প্রবেশ করে অত্যন্ত গরম হয়ে আবার মাটির উপরে উঠে আসছে এবং এই প্রক্রিয়াটি ক্রমাগত চলতে থাকায় নদীর জলের তাপমাত্রা এত বেশি হয়ে যাচ্ছে | তবে এই যুক্তির যথার্থতা প্রমাণ করার মত তথ্যপ্রমাণ এখনও সঞ্চয় করা যায়নি | এছাড়াও আন্দ্রেজের মতে চিন্তার একটি বড় কারণ হতে পারে আঞ্চলিক বেআইনি তৈলক্ষেত্রগুলির প্রকোপ | বহু বড় বড় সংস্থা বেআইনিভাবে এই অঞ্চলের তৈলক্ষেত্রগুলি ব্যবহার করছে ও গাছপালা কাটছে যার ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণ আরও বেশি বেড়ে যাচ্ছে | আন্দ্রেজ তাঁর সহকর্মী বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মিলিত গবেষণা চালাচ্ছেন এবং চেষ্টা করছেন এই বিশেষ জায়গাটির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য যাতে বজায় থাকে সহায়তা করা যেতে পারে | কিন্তু বৃক্ষনিধনের মাত্রা অপরিবর্তিত থাকলে বয়েলিং রিভার অঞ্চলের স্বাভাবিক প্রাকৃতিক অবস্থার আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি |

আরও পড়ুন:  ভারতীয় বায়ুসেনার সাফল্যে বিনামূল্যে যাত্রীদের পরিষেবা দিলেন অটো চালক

NO COMMENTS