মাচায় নাচ-গান, টাকা অফুরান…আমার শৈশব কিনছ তুমি…!?

1553

চোখ ভর্তি জল| ফুলো ফুলো ঠোঁট কাঁপছে তির তির করে| ঘরের মধ্যে গাঁক—গাঁক করে বাজছে লোপামুদ্রা মিত্রের গান…‘ডাকছে আকাশ ডাকছে বাতাস ডাকছে মাঠের সবুজ ঘাস/ও ছেলেরা খেলা ভুলে শুধুই কেন পড়তে চাস?’ এই গানটা যে করেই হোক আজ সুরে সুরে তুলতে হবে| না হলে মামমাম রাতে খেতে দেবে না| বাবাই অবশ্য এত কড়া নয়| বড় জোর চোখ বড় করে বলবে, কি রে, এত চেষ্টা করেও পারলি না!

কী করে পারবে পাবলো? কাল যখন বৃদ্ধাশ্রমে ঠাম্মির সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল, ফোকলা মুখে ঠাম্মি ভারী মজার একটা ছড়া কেটেছেন, ‘এই ছেলেটা, ভেলভেলেটা আমাদের বাড়ি যাবি/খই-মুড়কি ছড়িয়ে দেব কুড়িয়ে কুড়িয়ে খাবি…!’ শোনার পর থেকেই ছয় বছরের পাবলো কেমন যেন ঘোরের মধ্যে রয়েছে| ঠাম্মির ছড়ার মত এরকম ভেলভেলে ছেলে হয় নাকি? কাকে বলে ভেলভেলে? মামমামকে জিজ্ঞেস করতে গিয়ে ধমক খেয়েছে| মা শুধু এটাই বলেছেন, রিকু, পিকু, তাতার তো মোটেই ভেলভেলে না| ওরা কত্ত স্মার্ট | চোখে-মুখে কথা বলে | বড় হয়ে সাইন করবে | পাবলোকে ওদের মত হতে হবে| পাবলো অতশত কিছুই বোঝে না| আপাতত বাংলার একটা রিয়ালিটি শো-তে অডিশন-এ সুযোগ পাওয়ার পর থেকে রোজের রুটিনটাই বদলে গেছে তার| সারাদিন হা-হা করে গলা সাধা| বাকিটুকু পড়া | তার মধ্যে আচমকা ঠাম্মির ছড়া ঢুকে পাবলোর বারো দু’গুনে চব্বিশটা বাজিয়ে ছেড়েছে| এবার কী করে বেচারা?

পাবলোর এই নিদারুণ অবস্থা আজকের অনেক ঘরেই| ছোট্ট ঘর| তার থেকেও ছোট্ট পরিবার | দাদাই-ঠাম্মি বৃদ্ধাশ্রমে| পাবলো কিংবা পিংকিকে তাই হাঁটি-হাঁটি, পা-পা করার পর থেকেই মা-বাবা জুড়ে দেন প্রি-স্কুল-এ | বুলি ফুটুক চাই না ফুটুক, হাত-পা ঠিকঠাক নাড়তে পারুক চাই না পারুক, এর পরেই হয় গান নয় নাচ শেখার পালা| আজকাল এই দুটোরই হেব্বি ডিমান্ড| দুটোর মধ্যে একটার সাহায্যে যদি রিয়ালিটি শো-তে জায়গা করে ফেলতে পারে তাহলে তো লাইফ বন গ্যয়া! এখানে আদ্দিকালের বদ্যিবুড়োদের ছড়ার জায়গা কই?

পাবলোর কথা বলতে বলতেই মনে পড়ে গেল এযুগের আরেক ‘অবতার’-এর কথা| নামটা গোপন থাক| বাচ্চাটির পরিবার যথেষ্ট স্বচ্ছল | তারপরেও ছোট্ট থেকে মা-বাবা-দাদু মিলে মাচায় গান করায় | ছেলেটি এখন ক্লাস সেভেনে পড়ে | বয়:সন্ধিতে পৌঁছে গলার স্বর বারে বারে ভাঙ্গছে | সেই ভাঙ্গা, বেসুরো গলায় ছেলে মাচা মাতাচ্ছে | পড়াশোনা করে বটে | তার থেকেও বড় দায় গান প্র্যাকটিস | ছেলের চমক-ঠমক দেখলে এক-এক সময় অবাক মানতে হয়! চুলের কায়দা, পোশাকের বাহার—সেলেবদের থেকে এক ইঞ্চিও কম নয় | পোজ দিয়ে সেলফি তলে | সেটা ফেসবুক-এ পোস্ট করে | তারপর গুনতে বসে ক’টা লাইক পেল | একবার মজা করে ওর দাদু ওকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘দু’হাত ভরে তো টাকা কামাচ্ছিস| এত টাকা নিয়ে কি করবি?’ নাতি উবাচ, ‘তোমার কি হবে আমি টাকা নিয়ে কি করব জেনে? আমি আর বাবা চুটিয়ে মদ খাব, এনজয় করব…খুশি?’ নাতির উত্তর শুনে দাদুর হাসি মুখে সেদিন ছায়া নেমেছিল| বাকিরা শুনে আড়ালে মুখ মচকে বলেছিল, ‘যেমন বিষবৃক্ষ পুঁতেছে বাড়ির লোক| এবার বিষ ফল খাও| ছেলে যেদিন গোল্লায় যাবে বুঝবে বাড়ির লোক|’

এই যে পাবলো বা অ-নামী ছেলেটাকে নিয়ে এত কথা খরচ হলো, সে কি এমনি এমনি? নাকি জাস্ট টাইম পাস করতেই এই হাবিজাবি বকা? দুটোর একটাও না| আসলে আজকের প্রজন্মের জন্মইস্তক সেলেব হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা আর ওদের এই চেষ্টার পিছনে আমাদের ইন্ধন—শৈশবকে কীভাবে বিক্রি করে দিচ্ছে সেটা আরো একবার মনে করিয়ে দিতেই এত বাণী, এত বুকনি|

ব্রিটিশ সাহিত্যিক টিম লট শৈশব নিয়ে বড় ভালো কথা বলেছিলেন, ‘বাচ্চা মানে একতাল মাটি| তাদের যেমন খুশি গড়| তারা সেই আদল নেবে| কচি কচি মুখগুলো আদর কাড়তে ওস্তাদ| তবে এসমস্ত ছাপিয়ে যায় ওদের সারল্য| যাকে ছুয়ে দেখা যায় না| মুঠোবন্দি করা যায় না| এমনকি কোটি টাকা দিয়ে কেনাও যায় না| শুধু দু’চোখ ভরে দেখা যায়| দু’চোখ ভরে উপভোগ করা যায়| এর দৌলতেই শৈশব অমূল্য| এটা হারিয়ে যাওয়া মানেই দুর্মূল্য রত্ন চুরি যাওয়া|’

সাহিত্যিক যাকে এত সাবধানে লালন করতে বলেছেন, আমাদের দেশে সেই অমূল্য ধন কীভাবে অ-মূল্যে বিক্রি হচ্ছে রোজের দিনে, চ্যানেলের টেলিভিশন রেটিং পয়েন্ট বা টিআরপি বাড়াতে, দেখলে নিশ্চয় কপাল চাপড়াতেন ভদ্রলোক| কেন এভাবে শৈশব বিক্রি হচ্ছে জানার আগে অনুভব করুন, কীভাবে শৈশব চুরি যাচ্ছে|

ব্যাখার আগে আরো দু’টি গল্প বলব—১) বছর সাতেকের এক প্রতিযোগী একদিন অনুষ্ঠানে ভালো করে পারফর্ম করতে পারেনি| বিচারক খুব নরম গলায় ভালো না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেলেছিল বাচ্চাটি, ‘আজ থেকে আমার মা-বাবা আলাদা থাকবে| আমি আর ওদের সঙ্গে একসঙ্গে থাকতে পারব না| আমার মনটা ভীষণ খারাপ করছে মা-বাবার জন্য| আচ্ছা, তুমিই বল, আমার জন্য-ও কি ওরা একসঙ্গে থাকতে পারত না? ওরা আমাকে একটুও ভালবাসে না| ভালোবাসলে নিশ্চয়ই এরকম করত না| আমি কী করে ভালো গান গাই বলত?’ বাচ্চার কান্না ক্যামেরায় ক্যান-বন্দি| বিচারকের গাল গড়িয়ে দু’ফোটা চোখের জল শৈল্পিকভাবে গড়িয়ে পড়ছে| সেটাও বন্দি হলো ক্যামেরায়| বাকি, দর্শকের রি-অ্যাকশন| সবার ছলছল চোখের ছবি দেখিয়ে সেদিনের শো সুপারহিট|

২) এই খুদেটি পাঁচ বছরের ছেলে| সেদিনের বিচারক রুপোলি পর্দার সেলেব| গান গাওয়ার পর সঞ্চালক তাকে জামা খুলে দেখানোর অনুরোধ করলেন| বাচ্চাটি খুব সপ্রতিভভাবে বুকের ক’টা বোতাম খুলতেই উঁকি মারলো সেই সুন্দরী নায়িকার আরো সুন্দর একটা ছবি| তারপর হাতে গোলাপ নিয়ে একদম বড়দের ঢঙে নায়িকার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বলল, ‘ডার্লিং, আই লভ ইউ|’ ক্যামেরা বাচ্চার মুখ হয়ে প্যান করে মায়ের মুখে| তিনি তখন গর্বের ভারে প্রায় পড়েই যাবেন সিট্ থেকে| বাকিরা অবস্থা দেখে হেসে কুটিপাটি| পর্দার এপারের বুদ্ধিমান দর্শক নির্ঘাত ছেলের ইহকাল এবং পরকালের ঝরঝরে দশা দেখে মনে মনে হা-হুতাশ করে কপাল চাপড়াচ্ছিলেন!

এভাবে, বিশ্বাস করুন এভাবেই কচি মুখের হাসি-কান্না-রাগ-অভিমান-মজা লক্ষ টাকায় বিক্রি হচ্ছে| ক্যামেরা ফেস করার আগে ডিরেক্টর কাকুরা শিখিয়ে দিচ্ছেন কতোটা হাসতে হবে, কতটা কাঁদতে হবে| কতটা নিজের ঘরকে ভরা হাটের মাঝে মুচমুচে করে মেলে ধরতে হবে| এভাবেই বাচ্চা তার সারল্য হারিয়ে মাত্র ৫-৬ বছরেই ‘লিটল লতা’ বা ‘খুদে কিশোর’ হয়ে যাচ্ছে| এদের ডাক পড়ে| পড়াশুনো, ভালো রেজাল্ট চুলোর দোরে| তার চেয়ে মাচায় গাইলে দেদার পয়সা, প্রচুর নাম| এবং ভবিষ্যত পোক্ত| এভাবেই বিয়েবাড়িতেও এদের ডাক পড়ে নেচে-কুদে ‘সঙ্গীত’এর আসর জমানোর জন্য| সেখানে এরা কী গায় জানেন? ‘দু ঘুঁট মুঝে ভি পিলাদে শরাবী/ দেখ ফির হোতা হ্যায় কয়া…!!’ অনুষ্ঠানের জন্যে তখন কচি মুখে কড়া মেকআপ| সঙ্গে কুত্সিত অঙ্গভঙ্গি করে নাচানাচি| এরপরেও সারল্য এদের ঘিরে থাকবে?

এই বাচ্চাদের করুণ মুখ চেয়ে ইদানিং অনুরাগ বসু, সুজিত সরকার, অমল গুপ্তের মত সেলেবরা টিভিতে কিড শো বন্ধের আর্জি জানাচ্ছেন| তাদের কথায়, ‘পেটের তাগিদে এই ধরনের শো-টে অংশ নিতে হয়| কিন্তু ওদের কচি মুখগুলো দেখে বড্ড মায়া হয়| আমরা ওদের কিভাবে ঠকাই তাই না? আজ তুমি সেরা কিংবা কাল তুমি—কি ভীষণ মিথ্যে| রেওয়াজ না করে সেরা হওয়া যায় নাকি?’এভাবে যদি সত্যি তাঁরা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেন তাহলে বেঁচে যাবে শৈশব| মাঠের কচি ঘাস আবার তাদের নরম পায়ে আদর করবে| ঠাম্মির ভেলভেলে ছেলেটা ওদের সঙ্গী হবে| খই-মুড়কি নাই বা কুড়িয়ে খেল, একসঙ্গে দস্যিপনা তো চলতেই পারে! সঙ্গে ভালোবেসে পড়াশুনো| একটু নিয়ম, অনেকটা মুক্তি—শৈশব তো এভাবেই লালিত হয়, পালিত হয়?

এই সময় একজনের মুখ, কথা ভীষনভাবে মনে উঁকি দিচ্ছে| তিনি কৈলাশ সত্যার্থী| যিনি ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে শিশুশ্রম বন্ধ করে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন| আজ তাঁর চোখে যদি এই ছবি ধরা পড়ত নিশ্চয়ই তিনি কিছু না কিছু করে সুস্থ শৈশব ফিরিয়ে আনতেন|

বাকি রইলাম আমরা| কচিদের বড় অভিভাবকের দল| সত্যি করে বলুন তো, আগামী পৃথিবীকে শিশুদের বাসযোগ্য করে যেতে আমাদের কি কিছুই করার নেই? আমরা যদি আমাদের বাড়ির খুদেগুলোর হাত ধরে রিয়ালিটি শো-এর লাইনে না দাঁড়ায় তাহলেই তো মিটে গেল| এভাবেই তো শৈশব কেনাবেচা বন্ধ হবে|

এবছরের সারেগামাপা লিল চ্যাম্প সেরা শ্রেয়ান ভট্টাচার্য কী বলেছেন জানেন তো? ১২ বছরের শ্রেয়ানের এখন দুটো শখ, ১) অমিতাভ বচ্চন, রণবীর কপূরের লিপে প্লে ব্যাক করার| আর দ্বিতীয় ইচ্ছে? অনেক বাড়ি আর রোল রয়েস গাড়ি কেনার….! এভাবেই সেরার সেরা হয়ে উঠতে গিয়ে, আপোস করতে করতে ফুরিয়ে যাবে না তো ব্রিটিশ কলমচির বড় সাধের ‘শৈশব’?    

Advertisements

1 COMMENT

  1. Proti 6 month e 999 ta channel e 3 te kore celeb uthche…..odike bongso poromporai sadhona korte thaka chelemeyegulo royeche….bolly tolly r slender bachchara royeche ..bt sesporjonto kotojon tike thak he seleb hoye??saisab bikri kore reality shower sei selebra kothai jachchen?? Dekhchinato….matro 1ta Sreya.. .subidha.. sonu nigom….bs…r etodiner reality sei chelemeyegulo kothai gelo??

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.