এভাবে ক্রমশ গভীরতম খননে কি মানুষের যাত্রা সত্যি শেষ হবে পৃথিবীর কেন্দ্রে ?

2432

পৃথিবীতে বিস্ময়ের শেষ নেই। এর অনেক বস্তু আছে যা আজও আমাদের আজানা। কিন্তু এসব প্রাকৃতিক রহস্যময় সৃষ্টির বাইরে এমনকিছু আশ্চর্যজনক স্থান রয়েছে যা মানুষের সৃষ্টি। এমনই কয়েকটি মানব সৃষ্ট আশ্চর্যজনক জায়গা হল কৃত্রিম গভীরতম কয়েকটি গর্ত। মনুষ্য নির্মিত গভীরতম গর্তগুলো আসলে ঠিক কতটুকু গভীর! বা কত গভীর অবধি গর্ত খোঁড়া মানুষের পক্ষে সম্ভব হয়েছে জেনে নেওয়া যাক।

প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ মাটিতে গর্ত খুঁড়ছে, এমনকি ভূগর্ভস্থ শহরও নির্মাণ করছে। সে তুলনায় মানুষের মহাশূন্যে যাওয়ার প্রচেষ্টা একেবারেই সাম্প্রতিক। কিন্তু তারপরেও আকাশে মানুষ যতদূর অবধি যেতে পেরেছে, ভূ-অভ্যন্তরে ততটুকু কিন্তু পৌঁছনো সম্ভব এখনও হয়নি। ‌তবে ভূ-অভ্যন্তরের রহস্য উন্মোচনের প্রচেষ্টা এখনও অব্যাহত আছে। এমনই একটি প্রচেষ্টা হল ইংল্যান্ডের ব্রাইটনের উডিংডিন ওয়াটার ওয়েল। কোনও আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়া খালি হাতে তৈরি সবচেয়ে গভীর গর্ত হচ্ছে ইংল্যান্ডের ব্রাইটনের উডিংডিন এই ওয়াটার ওয়েল। ১৮৫৮ সাল থেকে ১৮৬২ সালের মধ্যে নির্মিত এই কূপটির ব্যাস এক মিটারের চেয়ে সামান্য একটু বেশি। এটি নির্মিত হয়েছিল স্থানীয় একটি কর্মশালার জন্য জল সরবরাহের উদ্দেশ্যে। এর গভীরতা ৩৯২ মিটার, যা সত্তরের দশক অবধি বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন হিসেবে রেকর্ড ধরে রাখা এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের উচ্চতার প্রায় সমান ছিল।

এরপরেই হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিংহ্যাম ক্যানিয়ন মাইন। মানুষের তৈরি সবচেয়ে বড় আয়তনের গর্ত। ১৯০৬ সাল থেকে কাজ শুরু হওয়া এই উন্মুক্ত খনির কাজ, যার ব্যাস প্রায় চার কিলোমিটার এবং তলদেশের গভীরতা ৯৭০ মিটার। এটি এতই গভীর যে, বর্তমান বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবন বুর্জ খলিফাকে এর তলদেশে স্থাপন করলেও তার চূড়া পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে প্রায় একশো মিটার গভীরে অবস্থান করবে বলে জানান গবেষকরা।

এরকমই আরও একটি খনন প্রকল্প হল, কোলা সুপারডিপ বোরহোল রাশিয়ার পেচেংস্কি জেলার কোলা উপদ্বীপে অবস্থিত একটি বৈজ্ঞানিক খনন প্রকল্প। এই প্রকল্পর উদ্দেশ্য হল কৃত্রিমভাবে যতদূর সম্ভব পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে খনন করা। ১৯৭০ সালের চব্বিশে মে এই খনন প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়। এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল ১৫,০০০ মিটার (৪৯,০০০ ফুট) খননের। ১৯৭৯ সালের ছয়ই জুন এই প্রকল্প গভীরতার বিশ্বরেকর্ডটি ভেঙে দেয়। এর আগে অবধি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশহিতা কাউন্টির বের্থা রোজার হোল ছিল শীর্ষ স্থানে। যা ছিল ৯,৫৮৩ মিটার (৩১,৪৪০ ফুট)। ১৯৮৩ সাল অবধি কোলা সুপারডিপ বোরহোলের খনন কাজ ১২,০০০ মিটার অবধি করা হয় এবং এক বছরের জন্য এটি উদযাপনের জন্য এর খনন কার্য বন্ধ রাখা হয়।

১৯৮৯ সাল নাগাদ গর্তটি ১২,২৬২ মিটার (৪০,২৩০ ফুট) পর্যন্ত খনন করা হয়। ধারণা করা হয়েছিল ১৯৯০ সাল নাগাদ ১৩,৫০০ মিটার (৪৪,৩০০ ফুট) এবং ১৯৯৩ সাল নাগাদ ১৫,০০০ মিটার (৪৯,০০০ ফুট) খনন করার লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে। কিন্তু পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে ক্রমশ তাপমাত্রা বাড়তে থাকে যার ফলে ১২,২৬২ মিটার (৪০,২৩০ ফুট) এর গভীরে খনন করা সম্ভব হয়নি। কারণ ১৫,০০০ মিটার (৪৯,০০০ ফুট) অবধি খনন করতে প্রায় ৩০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা মোকাবিলা করতে গিয়ে ড্রিলিং বিট অচল হয়ে পড়ছিল। অবশেষে ১৯৯২ সালে খনন কাজটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এখন অবধি মানুষের খোঁড়া গভীরতম গর্ত হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকার ম্পোনেং স্বর্ণ খনি। এর গভীরতা ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় চার কিলোমিটার। এর প্রবেশপথ থেকে গভীরতম স্থান পর্যন্ত পৌঁছতে সময় লাগে প্রায় এক ঘন্টা। খনির অভ্যন্তরে সর্বনিন্ম স্থানের তাপমাত্রা প্রায় ষেষট্টি ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ভূপৃষ্ঠের যে কোনও উত্তপ্ত স্থানের চেয়েও বেশি।

সুড়ঙ্গের পথের বদলে যদি খাড়া গর্তের কথা বলা হয় তবে মানুষের তৈরি গভীরতম খনি হল দক্ষিণ আফ্রিকার অন্য একটি স্বর্ণ ও ইউরেনিয়াম খনি। মোব খোটসং মাইন নামের এই খনিটিতে রয়েছে বিশ্বের গভীরতম খাড়া সুড়ঙ্গ। এর গভীরতা প্রায় তিন কিলোমিটার। এলিভেটরে চড়ে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত পৌঁছতেই এখানে সময় লাগে সাড়ে চার মিনিট। ছাড়াও গভীরতম স্থান হচ্ছে সুইজারল্যান্ডের গটহার্ড বেজ টানেল। এটি মূলত একটি রেললাইন, যা বিস্তৃত হয়েছে পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে দুই হাজার ৪৫০ মিটার নিচ দিয়ে।

যদিও কোলা সুপারডীপ বোরহোল ভূ-পৃষ্ঠ থেকে সবচেয়ে গভীর গর্ত, কিন্তু পৃথিবীর ক্রাস্টের পুরুত্বের বিবেচনায় এর অগ্রগতি তুলনামূলকভাবে কম। সমুদ্রের তলদেশে ক্রাস্টের পুরুত্ব অনেক কম হওয়ায় গভীর সমুদ্রে খননকার্যে নিয়োজিত প্রকল্পগুলো কম খনন করেও বাস্তবে ম্যান্টলের বেশি কাছাকাছি পৌঁছতে সক্ষম হয়েছে। এরকম একটি প্রকল্প হলো বিপি অয়েল কোম্পানীর ডীপওয়াটার হরাইজন প্রজেক্ট। ২০০৯ সালে এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনের নিকটবর্তী গভীর সমুদ্রের তেলক্ষেত্রে দশ হাজার ৬৮৩ মিটার খননের মাধ্যমে বিশ্বরেকর্ড তৈরি করেছে।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.