একা থাকা উপভোগ করুন, একাকিত্ব নয়

 

এই তো সেদিনকে এস বি এস টি সি র টিকিট কাউন্টার এ টিকিট কাটতে গিয়ে এক বিচ্ছিরি অবস্থা! সবার প্রথমে দাঁড়িয়ে, বিকেল ৪।৩০ এর বাস এর টিকিট দেবে, পেছনে লম্বা লাইন, গঙ্গাসাগরের জন্য বাস কম তাই ভিড় বেশি, কাউন্টার এর সামনে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর উপায় নেই। পেছনে এক ভদ্রমহিলা প্রায় হুমড়ি খেয়ে গায়ের সাথে সেঁটে লেগে আছেন। হাত বাড়িয়ে। তখনো টিকিট দেওয়াই শুরু হয়নি কিন্তু ওনার ধারণা উনি ওভাবে সেঁটে না দাঁড়ালে আর হাত বাড়িয়ে টাকাটা না ধরলে কিছুতেই সিট পাবেন না। পেছনের মানুষগুলিও তথৈবচ। মাছি গলার জায়গা নেই।

আমাদের দেশে এই ধরনের সিচুয়েশন দেখতে আমরা সবাই অভ্যস্ত। সবারই এরকম অভিজ্ঞতা কম বেশি এক আধ বার তো হয়েইছে। বাস বা রেল এর টিকিট বলুন বা রেশনের লাইন, এ টি এম এ লাইন থেকে আই ফোন এর লাইন, সবেতেই এক অবস্থা। খেয়াল করে দেখবেন, পেছনের জন আপনার গায়ে লেগে থাকবেন। পুরুষ হলে আর সামনে মহিলা থাকলে দুরত্ব রাখেন খুব অল্প হলেও, কিন্তু পেছনে যদি মহিলা থাকেন তাহলে সামনে পুরুষ আছে না মহিলা তাতে তাঁদের কিছু আসে যায় না। এমন ভাবে সেঁটে থাকবেন এবং গায়ে পড়বেন যেন একটু সরে দাঁড়ালে আর টিকিট বা টাকা পাবেন না।

আমাদের দেশের জন সংখ্যা এত বিপুল যে আমাদের অবচেতন মনে এক ইঞ্চি জায়গা ছাড়ার প্রবণতাটা নেই। “পার্সোনাল স্পেস” এখনো বিদেশী কনসেপ্ট। দুটো মানুষ দাঁড়িয়ে থাকলে তাদের মধ্যে অন্ততঃ ৪-৬ ইঞ্চি গ্যাপ থাকাটা বাঞ্ছনীয়। কারোরই ভাল লাগে না পেছন থেকে ধাক্কা খেতে বা গায়ে কোনো অচেনা মানুষ সেঁটে আছেন। অথচ, জায়গা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই ঠিক এটাই করেন। এই স্পেসটা, সে পাবলিকলি হোক কি প্রাইভেট লাইফ-এ,বেশির ভাগ মানুষই দিতে চান না। অনেকে জানেনই না বা বোঝেনই না, এই পার্সোনাল স্পেস ব্যাপারটা ঠিক কী। তবে এই কন্সেপ্টটা আমাদের দেশে নতুন কারণ বিদেশের মতন আমাদের ইন্ডিভিজুওয়ালিস্টিক সোসাইটি নয়। আমাদের ভারতীয় সংস্কৃতিতে আগে যৌথ পরিবার এর প্রচলন ছিল। এখনো কিছু জায়গাতে রয়ে গেছে। শহরে জায়গার অভাবে অণু পরিবার হয়ে গেলেও গ্রামের দিকে বনেদি পরিবার বা উচ্চবিত্ত পরিবারে এখনো যৌথভাবে বসবাস করা হয়। যৌথ পরিবারের সুবিধা অনেক থাকলেও অসুবিধা হলো, নিজের একার বলে কিছু থাকে না। নিজের সময় বা নিজের স্পেস, সেখানে বিসর্জন দিতে হয়। একে অপরের সাহায্য নিতে গেলে পরিবারে এই টুকু আত্মত্যাগ করতেই হয়। এখনো এদেশে বিয়ে হয়ে গেলে আশা করা হয় মেয়েরা তাদের শ্বশুর শাশুড়ির সাথে থাকবেন। বিদেশে কিন্তু সেখানে শুধু যে অণু পরিবার-এর চল বহুদিনের, সেটাই নয়, সেখানের ছেলে মেয়েরা অনেক কম বয়েস থেকেই,মানে প্রাপ্তবয়ষ্ক হওয়ার আগেই আলাদা থাকতে শুরু করে এবং নিজের খরচা নিজেরাই চালায়, নানা ধরনের কাজ করে। আমাদের দেশে এটা এখনো অভাবনীয়। এই আলাদা থাকার প্রয়োজনটা আসে পার্সোনাল স্পেস এর থেকে। বিদেশে মনে করা হয় একটা মানুষ তার নিজস্ব জগত তৈরী করে আলাদা থাকতে পারেন, তাকে জবাবদিহি করতে হয় না, কেন সে তার বাবা মা থাকতেও আলাদা থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন। ওখানে ওটাই স্বাভাবিক। সেখানে আমাদের দেশে একই শহরে বাবা মা থাকলে প্রাপ্তবয়ষ্ক ছেলে বা মেয়েরা আলাদা থাকার সিদ্ধান্ত নিতে গেলে অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় আজও। তাঁরা প্রাপ্তবয়ষ্ক বা উপার্জন করতে সক্ষম হলেও তাঁদের সেই স্বাধীন ভাবে থাকতে চাওয়ার মধ্যে অনেকেই নিজের বাবা মার প্রতি দায়িত্ব বা কর্তব্যকে অবহেলা করার অভিযোগ ওঠে। অনেকেরই বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড থাকে, তাঁদের সাথে একান্তে সময় কাটানোর প্রয়োজনটা খুব স্বাভাবিক, সেখানে বাবা মার সাথে থাকলে অনেকেই অস্বস্তিতে থাকেন, অনেকের বাবা-মা’রা এটা আপ্রুভও করেন না, ফলে সম্পর্ক থাকলেও লুকিয়ে রাখতে হয় অনেক সময়, এরকম আকছার দেখা যায়। আলাদা শহর হলে তবেই আলাদা ভাবে থাকার স্বাধীনতাটা পাওয়া যায়। একটা প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের এই যে পার্সোনাল স্পেস এর প্রয়োজনীয়তা, এটা বহু বাবা মা বা আত্মীয়স্বজনই মেনে নিতে পারেন না, বা ভাল চোখে দেখেন না। অনেকেই বলেন, আমাদের তো কই আলাদা থাকার দরকার পড়েনি কোনোদিন, আমরা কি প্রেম করিনি বা বিয়ে করিনি? মুশকিলটা হলো, যুগ বদলায়, সাথে সাথে বদলায় মানুষ আর তার চাহিদা।এখন ছেলে মেয়েদের আর্থিক স্বাধীনতা বলুন বা চাকরির পরিধি, অনেকটাই বেশি। আগে বিদেশে যাওয়াটা একটা স্বপ্নের মতন ছিল। এখন কাজের বা পড়াশুনার সূত্রে বহু লোকে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন। আগেকার দিনে চাকরি বলতে লোকে সরকারী বুঝতো। এখন লোকে প্রাইভেট চাকরির দিকে বেশি ঝোঁকেন। পয়সা এবং বেড়ানোর সুযোগ, দুটোই বেশি বলে। মানুষ যত আন্তর্জাতিক হচ্ছে, ততই আন্তর্জাতিক হয়ে উঠছে তার চাহিদা বা জানার পরিধি। এবং সেই জানার হাত ধরেই কখন টুক করে ঢুকে পড়েছে এই পার্সোনাল স্পেস এর কনসেপ্টটা। নিজস্ব জায়গা, নিজস্ব জগত। নিজের জন্য সময়। তবে সেটা হাতে গোনা মানুষের মধ্যেই এখনো সীমাবদ্ধ। দেশের বেশির ভাগ মানুষের কাছে এই নিজের জায়গা নিজের সময় এই ব্যাপারটা এখনো এলিয়েন। তাই তারা বাস বা ট্রেন এর লাইন বলুন বা রেশনের দোকানের লাইন, কোনো জায়গাতেই এক ইঞ্চি ছাড় দিতে চান না সামনের জনকে। সরে দাঁড়ানোর জায়গা থাকলেও তারা সেটি করবেন না। বাইরে গেলে এই লাইন এই দেখবেন পেছনের মানুষটি সামনের জনের থেকে একটি ভদ্রচিত দুরত্ব বা ব্যবধান বজায় রেখে চলেন। যতই তাড়া থাক। তার জন্য তাঁরা নিজেদের শিষ্টাচার ত্যাগ করেন না।

এখন বেশির ভাগ টিকিট কাটা বা বিল পেমেন্ট করা অনলাইন হয়ে যাওয়াতে প্রচুর মানুষকে লাইন এ দাঁড়াতে হয়না, তাতে ভিড় কিছুটা হলেও কমেছে। তবে এখনো বেশিরভাগ মানুষের কাছে এই উপায় জানা নেই, বা তাঁরা অভ্যস্ত নন, ফলে লাইন এ দাঁড়ানোর লোকের সংখ্যা প্রচুর।  গ্রাম গঞ্জ থেকে আসা মানুষের কাছে লাইন এ দাঁড়ানো ছাড়া আর অন্য উপায় জানা নেই।

ভাবতে অবাক লাগে, যে দেশে ব্যক্তিপুজো এত সাধারণ একটি ব্যাপার, সেখানে একজন ব্যক্তির নিজস্ব জায়গা বা সময় এখনো গ্রহণযোগ্য নয়। এই পার্সোনাল স্পেস মানুষের একন্তই প্রয়োজন, সে দিনে ১০ মিনিটই হোক না কেন। নানা ধরনের কাজের মধ্যে থেকে, নানা দায়িত্ব পালন করে, সবার সব কিছু যোগান দিয়ে দিনের শেষে শ্রান্ত ক্লান্ত হয়ে দুটো মুখে দিয়েই ক্লান্তিতে শুয়ে পড়াটাই জীবন নয়। এর বাইরে দরকার আছে নিজেকে চেনার, জানার,এবং নিজের ভাল লাগাগুলিকে সযত্নে লালন পালন করার। এই ব্যক্তিগত সময় টুকুর প্রয়োজন কোনো কিছু সৃষ্টিশীল কাজের জন্য। যারা সেটি করেন না, তাঁদের ও প্রয়োজন দিনের শেষে একটু নিজের সাথে নিজেকে নিয়ে বসার,সামনা সামনি দাঁড়ানোর, আর কেউ না থাকুক, নিজের সাথেই সুখ দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার।

 অনেকেই, একা থাকার আর একাকিত্বর মধ্যে তফাত বোঝেন না। মানুষ সমাজবদ্ধ জীব, একা থাকতে ভয় পায়। একা মানেই নিঃসঙ্গতা গ্রাস করা, ডিপ্রেশানের মুখোমুখি, বেঁচে থাকার লড়াই আরো কঠিন হয়ে যাওয়া। কিন্তু একা থাকার আনন্দ তারাই বোঝেন যারা নিজের সাথে নিজের সময়টুকু উপভোগ করেন, যাদের সব সময় পাশে কাউকে দরকার হয়না। তাই একা থাকতে চাওয়া আর একাকিত্ব দুটোর মধ্যে বিশাল ফারাক।

এদেশেও হয়তো কোনোদিন এই পার্সোনাল স্পেস এর প্রয়োজনীয়তা ছড়িয়ে পড়বে,দাবানলের মতন। আর তখন, হয়তো বা পেছনের মানুষটি আপনার ঘাড়ে হুমড়ি খেয়ে পড়বেন না, একটু হলেও ব্যবধান রেখে দাঁড়াবেন, বাবা মা’দের হয়তো নিজের সন্তানের একই শহরে থেকেও আলাদা বাসস্থান খোঁজার কথা শুনে ভ্রুকুটি করবেন না, কেউ “ আমি একটু একা থাকতে ভালবাসি” শুনলে তাকে পাগল বা অস্বাভাবিক ভাববে না। একা থাকতে চাওয়া একাকিত্ব না,সেই সাবালকত্বটুকু অর্জন করে ফেলবে আজকের এই প্রজন্ম, তার খুব বেশি দেরী নেই।একা থাকা উপভোগ করুন, একাকিত্ব নয়। 

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

One Response

Please share your feedback

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nayak 1

মুখোমুখি বসিবার

মুখোমুখি— এই শব্দটা শুনলেই একটাই ছবি মনে ঝিকিয়ে ওঠে বারবার। সারা জীবন চেয়েছি মুখোমুখি কখনও বসলে যেন সেই কাঙ্ক্ষিতকেই পাই

Ayantika Chatterjee illustration

ডেট