নিজের সঠিক পরিচয় না জেনেও দিব্যি আছে আগুনের পরশমণি

ককেশীয় অঞ্চল‚ যেখানে ইউরোপ শেষ হয়ে এশিয়া শুরু হয়‚ সেখানেই আছে আজারবাইজানের আবশেরোন পেনিনসুলা | তিনদিকে কাস্পিয়ান সাগর দিয়ে ঘেরা অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্যপূর্ণ এই স্থান এখন ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়েস্টল্যান্ড | সোভিয়েত যুগের তৈল ও গ্যাস শিল্পের চিহ্ন ছড়িয়ে সর্বত্র | একসময় যার মূল ঘাঁটি ছিল এই এলাকা | চারদিকে ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন মন্দির | অগ্নিদেবতার মন্দির | এই মন্দিরে প্রার্থনা করতে আসতেন জরথ্রুস্টিয়ান বা পার্সি এবং হিন্দু‚ দুই সম্প্রদায়ের মানুষই | এর প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ৭৩০ খ্রিস্টাব্দের রচনায় | সেখানে একে বলা হয়েছে সুরখনির অতেশগড় | প্রাচীন ঐতিহ্যের সঙ্গে এই অগ্নিমন্দির তুলে ধরে ভারতের সঙ্গে প্রাচীন পারস্যের সুসম্পর্কের ধারা |

কয়েকশো বছর ধরে‚ এমনকী সোভিয়েত যুগেরও আগে আজারবাইজান প্রসিদ্ধ ছিল এর খনিজ তৈল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের অফুরন্ত ভাণ্ডারের জন্য | এবং সত্যি সত্যি এই সম্পদ মাটির ভিতর মুখ গুঁজে থাকতে চাইত না | নানা ভাবে তা বেরিয়ে আসত বাইরে | ফলে জায়্গাটার নাম লোকমুখে হয়ে গেল ওডলার ইয়ুর্দু | আজরাবাইজানের স্থানীয় ভাষায় এর অর্থ আগুনের দেশ |

সেই আগুনের দেশ সুরখানির কাছেই এখন আজারবাইজানের রাজধানী বাকু | শহরতলি সুরখানিতে সেই প্রাসাদের মতো মন্দির দেখলে মনে হবে যেন টাইম মেশিনে করে পিছিয়ে এসেছেন | পার্সি বা জরথ্রুস্টিয়ানরা মনে করেন এই উপাসনাস্থল প্রাচীন অতেশগড় বা অগ্নিমন্দির | এখানেই ছিল পবিত্র অগ্নি | যার শিখা কয়েকশো বছর ধরে জ্বলছিল | ওই অগ্নিশিখাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল অগ্নিদেবতার মন্দির | প্রকৃতপক্ষে এই আগুনের উৎস ভূগর্ভস্থ প্রাকৃতিক গ্যাস | ওই অতেশগড়ের নিচেই আছে বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাণ্ডার | সেটাই পবিত্র অগ্নিশিখার উৎস | ঐতিহাসিকদের মতে‚ এখন যে কাঠামো আছে তা পরে তৈরি করা হয়েছে | অগ্নিমন্দিরের আদি রূপ আগেই ধ্বংস হয়েছে মুসলিম অভিযানকারীদের হামলায় |

প্রাচীন স্থাপত্যটি আবার পাদপ্রদীপের আলোয় আসে অষ্টাদশ শতাব্দীতে | তখন ইউরোপীয়ানরা আজারবাইজান ঘুরতে এসে এই মন্দিরে আসতেন | কিন্তু নির্দিষ্ট করতে পারতেন না‚ এটা পারসিকদের অগ্নিমন্দির ? নাকি হিন্দুদের মন্দির ? তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে তখন এই দেশে বড় সংখ্যার ভারতীয়র বসবাস ছিল | তারও দুশ বছর আগে ষোড়শ থেকে সপ্তদশ শতাব্দী অবধি আজারবাইজানের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করত ভারতীয়রা | এই পথেই যেত তাদের ক্যারাভান | মূলত পাঞ্জাবি ব্যবসায়ীরা এই মন্দিরে পুজো করতেন জ্বলাজি বা জ্বালা দেবীর | শিব‚ গণেশ ও হনুমান স্তোত্র আছে মন্দিরে খোদাই করা শিলালিপিতে | অবিরত আগুন থেকেই সম্ভবত জ্বালাজির নাম | যা দুর্গার এক রূপ বলে পূজিত হয় | হিমাচলের কাংড়া জ্বালামুখী যেমন | 

এদিকে ভারতে বেশ কিছু পারসিক পরিবার বসবাস করছিলেন বহুদিন ধরেই | পাঞ্জাবি ব্যবসায়ীদের কাছে এই মন্দিরের কথা শুনে তাদের মধ্যে স্বভাবতই চাঞ্চল্য দেখা দেয় | ফলে এ বার ওই মন্দিরে পা পড়ল পুণ্যার্থীদেরও | তৎকালীন বম্বে ও গুজরাতের বিভিন্ন অংশ থেকে পার্সিরা গেলেন সেখানে | উনিশ শতাব্দীরে শেষ দিকে তাঁদের উদ্যোগে ওই মন্দিরে নিযুক্ত হলেন একজন জরথ্রুস্টিয়ান পুরোহিতও | কিন্তু এত আয়োজনের মধ্যে সুর কেটে গেল | সোভিয়েতের অতিরিক্ত খনিজ তৈল উত্তোলনের ফলে প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাণ্ডার নিভু নিভু হয়ে পড়ল | ১৯৬৩ সাল নাগাদ নিভেই গেল ওই অগ্নিশিখা |   

আজ ওই স্থাপত্য দাঁড়িয়ে আছে  অতেশগড় টেম্পল স্টেট হিস্টোরিক্যাল আর্কিটেকচারাল রিজার্ভ-এর অংশ হয়ে | অনির্বাণ অগ্নিশিখা হয়তো আর নেই | কিন্তু আছে শাশ্বত সৌভ্রাতৃত্ব | যা মানুষকে ভালবাসতে শেখায় | একই স্থানে দুই ধর্মের মানুষকে উপাসনা করতে শেখায় | মনে রাখতে হবে‚ সাধারণত পার্সি বা জরথ্রুস্টিয়ানদের টেম্পল অফ ফায়ারে অন্য ধর্মের মানুষের প্রবেশ ও প্রার্থনা নিষিদ্ধ | এমনকী পার্সি মেয়েরা অন্য ধর্মে বিয়ে করলেও তাদের আর অগ্নির উপাসক বা সাগ্নিক বলে ধরা হয় না | ফলে তারাও অগ্নিমন্দিরে প্রবেশ করতে পারে না | আবার অন্য ধর্মের মেয়ে পার্সি পরিবারে বিয়ে করলেও অনেক সময় জরথ্রুস্টিয়ান বলে মান্যতা পায় না | সেদিক দিয়ে এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম আজারবাইজানের এই মন্দির | সে তার নিজের পরিচয় না জেনেই দিব্যি আছে | আগুনের পরশমণি সবার প্রাণে ছুঁইয়ে |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here