অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়
জন্ম – ১৯৯২, কলকাতায়। ২০১৪-এ পশ্চিমবঙ্গ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রনিক্স এঞ্জিনিয়রিং-এ স্নাতক, পরে আইআইইএসটি, শিবপুর থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ ২০১৬-এ। বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষক। নেশা বলতে বই আর বেড়ানো। শখের তাগিদে নানারকম বিষয়ে লিখে থাকেন। পছন্দ বলতে পরিবেশ আর মানুষের গল্প বলা।

Banglalive

‘বাজার-দোকানগুলিতে স্মার্টফোন নামক বস্তুটির আবির্ভাব হওয়ামাত্রই স্বর্গীয় হুতোম ও কঁমলাকান্তের যারপরনাই বিপদ উপস্থিত হইয়াছে – ইহাদের ভাষা একেই কথ্য ভাষার সহজতম প্রতিনিধি, তদুপরি তাহা ফোনেটিক্স-ধর্মী, তাহার উপরে রোমান হরফ আসিয়া পড়ায় এক ভয়ানক ক্যাচাল বাধিয়া উঠিতেছে’ – এ্যাদ্দূর অবধি লিখে পরে গুরু অল্প হাসলেন। পাশে রাখা বিলিতি কাচের বোতল আর গেলাসের দিকে একটু চেয়ে নিয়ে গুনগুন করলেন, ‘মোদের গরব মোদের আশা, ওহ – মাই ডিয়ার বঙ্গভাষা …” – শিষ্যেরা জয়ধ্বনি দিলে। 

মাপ করবেন, আমি রম্যরচনা লিখিনে, তবু মাঝে মধ্যে গুরুর প্রসাদ পাই বলেই কিনা জানিনে – আশেপাশের মানুষজনকে এট্টু-আধটু খোঁচা দিতে বড় ইচ্ছে হয়। বইমেলার গোলমাল চুকেছে, বাঙালী বই কিনেচে প্রচুর, ফেসবুকে ছবি দিয়েচে তার চেয়েও প্রচুর [যদিচ, শুনেছি বটে যে – এবারের বইমেলাতেও বিক্রিবাটা ভালোই, প্রকাশকদের মঙ্গলে আমাদের মঙ্গল – ক্রেতা-ও-বিক্রেতাদিগের বাড়বাড়ন্ত হউক।] তবু একআধটি ঘটনার কথা বলা যেতে পারে। এক বন্ধুর (নাম বলতে সাহস হয় না, বন্ধুবিচ্ছেদের চেয়ে বড় দুঃখ নেই) তার ফেসবুকের দেয়ালে বইমেলা থেকে তার সংগ্রহ করা বইগুলির ছবি জাহির করেছে। দেখে বড় ভালো লাগছিলো, মোটা মোটা রঙিন মলাটের জ্বলজ্বলে বইগুলি – বেশ ভার বোধ হয়। খুঁটিয়ে দেখতে গিয়েই গোল বাধলো তখন। দেখলুম, সে কিনেছে শংকরের চৌরঙ্গী – সমরেশ মজুমদারের উত্তরাধিকার, সত্যজিত রায়ের ফেলুদা এবং আরও দুয়েকটি ইংরেজী গল্পের বই – যেগুলির নাম এমূহুর্তে মনে পড়ছে না। আশ্চর্যের কথা এই যে, সে ব্যাটা খাস বাঙালীর সুপুত্তুর হয়েও – বাংলা বইগুলিও সবকটিই কিনেছে ইংরেজী ভাষায়, ইংরেজী অনুবাদে। নাট্যকার শ্রী শম্ভু মিত্র রবিঠাকুরের রক্তকরবী নাটকটির মহলা-প্রসঙ্গে এক জায়গায় বলেছিলেন, “রক্তকরবীর সংলাপ লিখেছেন পৃথিবীর একজন শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক – এবং আমরা অতি ভাগ্যবান যে এমন একজন দুর্লভ শিল্পীর লেখা তাঁর ভাষাতেই পড়তে পারছি। সেই ভাষার প্রখরতা ও গভীরতাকে জরিপ করতে করতে আমরা সেই ভাষার কাছেই যেন বিকিয়ে গেলুম” [ঋণস্বীকারঃ অয়দিপাউস ও পুতুল খেলা, শম্ভু মিত্র, এম সি সরকার এন্ড সন্স]। বিশ্ববিখ্যাত কবি রবার্ট ফ্রস্ট এককালে বলেছিলেন, “কবিতাকে অনুবাদ করলে ঠিক যতটুকু হারিয়ে যায়, ঠিক ততটুকুই কবিতা”। তা বলে কি আমরা অনুবাদের বিরোধিতা করবো ? নিশ্চয় নয়, সে ক্ষেত্রে নাজিম হিকমতের কবিতা পড়বার কিংবা দস্তয়ভস্কিকে উলটিয়ে দেখবার আমাদের সৌভাগ্য হতো না। তবু, বিদেশী ভাষার অনুবাদ পড়তে গেলেও – যেকোনও ভাষার প্রতিই যে সম্মান দেখাতে পারা প্রয়োজন, নিজের মাতৃভাষায় যথেষ্ট ব্যুৎপত্তি থাকাটা ঠিক সে কারণেই বড় দরকার বলে বোধ হয়। বাংলা ভাষার প্রতি শিক্ষিত বাঙালীদের অবজ্ঞার বিষয়টিও একেবারেই নতুন নয়। বহুকাল ধরেই তা চলে আসছে – ব্যঙ্গরসিকদের তাই নিয়ে রসিকতারও অন্ত নেই। এবারের বইমেলার ঠিক আগে আগেই একটি সাহিত্য উৎসবের আঙিনাতেও এমন একটি ঘটনা ঘটে গিয়েছে যা নিয়ে বঙ্গের বুদ্ধিজীবী মহলেও বেশ একটা আলোড়ন পড়েছে। 

একটি বিখ্যাত বাংলা প্রকাশনী সংস্থা, আর একটি ইংরেজী প্রকাশনী সংস্থার সঙ্গে যৌথ ভাবে তিনটি বিখ্যাত বাংলা বইকে নতুন ভাবে বাজারে আনতে চেয়েছেন। বইগুলি হলো, রবিঠাকুরের ‘সহজ পাঠ’ (প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ), যোগীন্দ্রনাথ সরকারের ‘হাসিখুশি’ এবং সুকুমার রায়ের ‘আবোল তাবোল’। তাঁরা বইগুলির নাম দিয়েছেন, ‘বেংলিশ বুকস’। কারণ, এ বইগুলির ভাষা বাংলা হলেও, তা ছাপা হয়েছে রোমান হরফে – অর্থাৎ বলা যেতে পারে, আজকের এসএমএসের ভাষায়। বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই এমন উদ্যোগের বিরোধিতায় সরব হয়েছেন। আবার এমনও কাউকে কাউকে বলতে শুনেছি, “ভালোই তো হলো, আমার অমুকের ছেলেটা বা মেয়েটা তো সেই অমুক দেশেই বড় হচ্চে, একবর্ণ বাংলা জানেনা – তারা অন্তত এটা পড়ে বাংলার স্বাদটুকু পাবে – এতে আপত্তি কোথায়”। গুরু স্বগতোক্তিতে বললেন, “তা তো পাবেই, পিটুলি গোলাতেই যদি দুধের স্বাদ মেটে – সঙ্গে দু ভরি আফিং ফেলে দিলেও তো হয়”। আমার অনেক নিকটাত্মীয়কে জানি যাঁরা অনুবাদে ফেলুদা পড়েছেন, এবারে যদি রোমান হরফে তাঁদের পুত্রাদিকন্যারা ‘অ-এ অজগর’ শেখেন – সে ভাষার মরণও ভালো। এর সঙ্গে সঙ্গেই অবশ্য এটিও উল্লেখ করা উচিত যে, ভাষাচার্য শ্রী সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর একটি প্রবন্ধে শিক্ষামূলক প্রয়োজনে দেশীয় ভাষায় রোমান হরফ ব্যবহারের সপক্ষে কিছু যুক্তি দেখিয়েছিলেন [সূত্রঃ এ রোমান অ্যালফাবেট ফর ইন্ডিয়া, সুনীতি কুমার চ্যাটার্জী, জার্নাল অব দ্য ডিপার্টমেন্ট অব লেটার্স, ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৩৫]। তদসত্তেও এ ভুললে চলবে না যে – শিশু শিক্ষা ও সাহিত্য এক জিনিস নয়, তদুপরি ভাষার পবিত্রতা বা সরাসরি বলতে গেলে তার বিশুদ্ধতাকে বজায় রাখাটা শিক্ষা ও সাহিত্য উভয় ক্ষেত্রেই অত্যন্ত জরুরী বলে গণ্য হওয়া উচিত অনুবাদের অক্ষমতা যে কালজয়ী সাহিত্যকেও কোন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে পারে – সে বিষয়টি কেউ যদি বুদ্ধদেব বসু বিরচিত ‘ইংরেজীতে রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধটি পাঠ করেন – তাহলেই তাঁর কাছে দিনের আলোর চেয়েও তা স্পষ্ট হয়ে যেতে পারবে। এর উপরে যদি এবার, ধ্বনিটুকুকে রেখে কেবল – হরফটিকেও বিসর্জনের চেষ্টা হয় – দুঃখের সঙ্গেই বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, রুগীর তখন শেষসময় ঘনাতে আর এতটুকুও দেরী হবে না বোধহয়।

তবুও আজ গুরুর কথাতেই বলি, এমন কোনও কোথাওই যে আশার কথা না বলে শেষ করতে নেই। তাই আজও বোধহয় দরজার নেপথ্যে হলেও, আমাদের সেই মনে মনেই একেকজনের গান শুনতে ইচ্ছে হয়। স্পষ্ট উচ্চারণ আর দরাজ গায়কীতে ভরা কোনও গলায় হঠাৎ যেন শুনতে পাই – “… মোদের গরব মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা – কি জাদু বাংলা গানে, গান গেয়ে দাঁড় মাঝি টানে… গেয়ে গান নাচে বাউল, গান গেয়ে ধান কাটে চাষা, আ মরি বাংলা ভাষা …” গুরুদিগের জয় হউক।

[ভাষা-দিবসের শুভেচ্ছা জানবেন, সেই ভাষার মুখ চেয়েই হয়তো কিছু কড়া কথা, অপ্রিয় তথ্যকে বড্ড বেশীরকম ব্যাঙ্গাত্মক ভাবেই বলে ফেল্লুম, অপরাধ নিলে – জানাবেন। এছাড়া সত্যিই উপায় ছিলোনা। ব্যবহৃত কিছু বানান, লেখার মেজাজের স্বার্থেই বিকৃতরূপে লেখা হলো – গোস্তাকি মাফ করবেন — গুরু কৃপাহি কেবলম, নমস্কার।]

আরও পড়ুন:  দুষ্টু-বৃষ্টি-নায়িকা

1 COMMENT

  1. Banrujje-r po,

    Bhasha jodi mara-r hoi to se morbei. Dukkho korey banchate parbey na. Taubey tomar jibat kaleo tini morben na – ei kathata money rekho.