আক্রান্ত

বাইরে হল্লা ক্রমশ বাড়ছে। ছোট্ট গুহার মধ্যে কীসের যেন ঝাঁঝালো গন্ধ। পড়িমড়ি করে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়ে এসে ঢুকে পড়ার সময় বুঝতে পারিনি কোথায় সেধুঁচ্ছি। তীব্র আতঙ্কে তখন একটাই ভাবনা কাজ করছিল, এক্ষুনি আড়াল চাই। তাড়াহুড়োয় দিক গুলিয়ে গেল। কোন দিক থেকে এসেছি কিচ্ছু মনে পড়ল না। চারপাশের দৃশ্যগুলো এত অচেনা! ঠান্ডা মাথায় ভাবতে পারলে হয়ত চিহ্ণ মিলিয়ে মিলিয়ে ঠিক চেনা জায়গায় ফেরত চলে যেতে পারতাম।

    দৌড়ে এসে ঢুকে পড়েছিলাম। কিন্তু অবাক কান্ড বেরোনার পথ খুঁজে পাচ্ছিনা। সবদিকে দেওয়াল। এটা কী করে হলো কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না। ভাল করে খুঁটিয়ে চারপাশ দেখলাম। একটু উঁচুতে সরু লম্বা একফালি ফাঁকা জায়গা। আবছা আলো আসছে। ওইখান দিয়ে ঢুকেছি? কী জানি, মনে পড়ছে না। যাকগে মরুকগে যাক। বাইরের হল্লা কমলে ওই ফোকর গলে পালাতে হবে।

    তেষ্টায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে। গুহার মধ্যে ভেজা ভাব। জলের গন্ধ পাচ্ছি। খুব সাবধানে নাক বাড়িয়ে ডান দিকে তাকাতে জল নজরে এল। এইটুকু জায়গায় নড়াচড়া করার উপায় নেই। এতবড় শরীর ঘোরানো মুশকিল। অতিকষ্টে শরীর ডান দিকে মুচড়ে জলের নাগাল পাওয়া গেল। কেমন ঠান্ডা বিস্বাদ জল। তাই সই। জিভ দিয়ে টেনে টেনে অনেকটা জল খাওয়ার পর তেষ্টা কমল। সঙ্গে সঙ্গে খিদেয় সারা শরীর যেন ঝিম ঝিম করে উঠল। দশ রাত আগে পাহাড়ের জঙ্গলে একটা শূয়োর মেরে চার রাত ধরে খেয়েছিলাম। আবার খিদে লাগতে গত তিন রাত খাবারের খোঁজে গোটা পাহাড় জঙ্গল চষে ফেলেছি। কিচ্ছু মেলেনি। খাবার খুঁজতে খুঁজতে তিন পাহাড় পেরিয়ে অল্প চেনা এই জায়গায় এসে পড়েছিলাম। এর আগে কয়েকবার ঘুরতে ঘুরতে এদিকে এসেছি। জানি এটা আমাদের এলাকার সীমানা। শেষ যেবার এসেছিলাম রাতে জঙ্গলের আড়ালে উঁচু জায়গায় শুয়ে সীমানার বাইরে ঘুরে বেড়ানো আজব জীবগুলো দেখেছি।  ছোট বড় নানা অদ্ভুত আকার। খুব জ্বলজ্বলে চোখ। কারো দুটো কারো একটা। জন্তুগুলো সব সময় দৌড়য়। এই ব্যাপারটা  ঠিক বুঝতে পারিনা। সেবার রাতে দৌড়ে চলা একটা আজব জীব একলা দাঁড়িয়ে আছে দেখে কাছে গেছিলাম। তা সে নড়েও না। চড়েও না। শব্দও করেনা। ভাবলাম মরে গেছে। পেট ভরা ছিল। তবু কৌতুহল বশে কামড় দিতে গিয়ে দেখলাম দাঁত ফোটানো যাচ্ছে না। আর দেখেছি দুপেয়ে জন্তু গুলো। আমি দুপেয়েগুলোকে এড়িয়ে চলি। কেন চলি তা জানিনা।

   একপেট খিদে নিয়ে পাহাড়ের ঢালে দু-পেয়েদের সীমানায় একটা গাছের আড়ালে ওঁৎ পেতে বসেছিলাম। একটু নিচ দিয়ে কখনো সখনো একটা দুটো দুপেয়ে ধীর গতিতে চলে যাচ্ছিল। দু-একবার মনে হল লাফিয়ে পড়ে একটাকে ধরি। মনস্থির করতে পারছিলাম না। আগে কখনো দুপেয়ে শিকার করিনি। খিদে ক্রমশ বাড়ছিল। ওই আবার একটা দুপেয়ে আসছে। পেছনে বড় সড় চেহারার লোমে ঢাকা লোভনীয় একটা পাহাড়ি কুকুর দুলকি চালে আসছিল।

   ছোট্ট একটা লাফের মামলা। সামনের দুপেয়েটা কিছু বোঝার আগেই শিকার আমার কব্জায়। তারপরই সব গোলমাল হয়ে গেল। কোথা থেকে যেন তীব্র চোখ ধাঁধানো আলো এসে পড়ল। মুখ তুলে দেখি সামনে সেই মস্ত বড় দৌড়ে চলা জন্তু। জলন্ত চোখ নিয়ে বিকট গোঁ গোঁ আওয়াজ করতে করতে এগিয়ে আসছে। ও বাবা! পেছন থেকে আর একটা। কান ফাটানো আওয়াজ আর চোখ ধাঁধানো আলোর চোটে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে কুকুরটার ঘাড় কামড়ে ধরে লাফ মারলাম নিচের দিকে। সাতদিন পর শিকার ধরেছি কিছুতে হাত ছাড়া করা যাবে না। কীসের ওপর পড়লাম কি জানি। বিকট আওয়াজ উঠল। ঢালু জায়গা। পা রাখতে পারছি না। হড়কে নেমে যাচ্ছিলাম।

   এটা দুপেয়েদের এলাকা। চারপাশ থেকে আলোর ঝলকানি আর হট্টগোল ক্রমশ বাড়ছিল। হড়কে নামতে নামতে একটা শক্ত সমতল জায়গায় আছড়ে পড়লাম। একদল দুপেয়ে হই হই করে উঠল। সবাই মিলে দৌড়ে এল আমার দিকে। আবার লাফ। দুপেয়ে গুলো চারদিকে ছিটকে গেল। তখনো শিকারের ঘাড় ছাড়িনি। কোনদিকে ছুটছি জানিনা। একটা আড়াল চাই। এক্ষুনি একটা আড়াল চাই। হঠাৎ  পেছনের পায়ে তীব্র যন্ত্রনা। কিছু একটা যেন শরীর ফুঁড়ে ঢুকে গেল। অজানা আতঙ্কে কেঁপে উঠলাম। আর শিকারের মায়া করে লাভ নেই। সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে বুঝতে পারছি এখন আমার প্রাণ সংশয়।

   লাফের পর লাফ। আবছা বুঝতে পারছিলাম ক্রমশ দুপেয়েদের এলাকার আরো ভেতরে ঢুকে পড়ছি। হঠাৎ হঠাৎ শরীর ফুঁড়ে কী একটা  ঢুকে যাচ্ছে। সঙ্গে তীব্র ব্যথা। আচমকা সামনে গুহাটা পেলাম। ঢুকে পড়েছি। অবশেষে একটু আড়াল। ব্যথার জায়গাগুলো চাটতে পারলে একটু আরাম হত। কিন্তু শরীর ঘোরাতে পারছি না।

   [বাথরুমের বাইরে একফালি গোল উঠোনে জড়ো হওয়া মানুষগুলোর মধ্যে তখন প্রবল উত্তেজনা। থেকে থেকে ঢেউয়ের মত আওয়াজ উঠছে হো- হো- হো-। কে যেন চিৎকার করে বলল, সাবধান! সাবধান! চিতাবাঘটা এই বাথরুমে আটকা পড়েছে।                  

   অত্যুৎসাহী কয়েকজন সিলিঙের নিচের ফাঁক দিয়ে দেখার চেষ্টা করছে। ঐ তো দেখা যাচ্ছে! গুড়ি মেরে বসে আছে।  আওয়াজ উঠল হো- হো- হো-। ]

   হট্টগোল খুব কাছে চলে এসেছে। একি!! কিছু একটা ওপরের ফাঁকা জায়গাটা দিয়ে উঁকি মারছে। ওরা টের পেয়ে গেছে আমি এখানে! প্রচন্ড আতঙ্ক আমাকে অবশ করে দিল। ভয়টা কাটিয়ে ওঠার জন্যে উন্মত্তের মত গর্জে উঠে ওপরের ফাঁকা জায়গাটা লক্ষ্য করে লাফ মারলাম। কিন্তু গর্তটা বড্ড সরু। বেরোতে পারব না। কেমন যেন পাগল পাগল লাগছে। আবার গর্জন। আবার লাফ। আবার গর্জন। আবার লাফ। কতক্ষন এরকম করলাম মনে নেই। অবসন্ন হয়ে নেতিয়ে পড়েছিলাম।

   চটকা ভাঙল প্রচন্ড জ্বালার অনুভুতি নিয়ে। সারা শরীর জ্বলে যাচ্ছে। ওই আবার। ফোকর দিয়ে কী যেন ঢেলে দিচ্ছে ওরা।

   [ বাইরে সমবেত উল্লাস। ঢাল ফুটন্ত জল ব্যাটার গায়ে। বুঝুক মজা। কিছুক্ষন যথেচ্ছ ফুটন্ত জল ঢালার পর সকলের মনে হল এই মজাটা আর তেমন জমছে না। কে যেন প্রস্তাব দিল চকোলেট বোমায় আগুন দিয়ে ভেতরে ছুঁড়ে দেওয়া হোক। তৎক্ষণাৎ তৎপরতার সঙ্গে যোগাড় হয়ে গেল গাদাখানেক বোম। পলতেয় আগুন দিয়ে ফোকর গলিয়ে বোমা ফেলা শুরু হল। ছোট্ট ঘরের মধ্যে বিকট শব্দ করে ফাটতে লাগল বোমা।]

   ও কীসের শব্দ? খুব দুর থেকে অস্পষ্ট ক্ষীন কানে আসছে। অতিকষ্টে মাথাটা একটু নাড়াতে পারলাম। আঃ, কতদিন পরে একটা নধরকান্তি পাহাড়ী কুকুর শিকার করেছি। ওটা কোথায় যে লুকিয়ে রাখলাম! খুঁজে পাচ্ছিনা। নরম নরম একতাল মাংস। উঃ, বড্ড খিদে পেয়েছে। আমি এখন খাব। বড্ড খিদে …।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

Please share your feedback

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nayak 1

মুখোমুখি বসিবার

মুখোমুখি— এই শব্দটা শুনলেই একটাই ছবি মনে ঝিকিয়ে ওঠে বারবার। সারা জীবন চেয়েছি মুখোমুখি কখনও বসলে যেন সেই কাঙ্ক্ষিতকেই পাই