ভর দুক্কুরবেলা

(এ হল বাংলাদেশের হৃদয় হতে গজিয়ে ওঠা গল্প ,যার ভেতর মিশে আছে দজ্জাল  ছোট বৌয়ের ভাসন্ত চোখ !যার নাম চালভাজা তার নাম মুড়ি ,আর যার নাম পাকাচুল তারই নাম বুড়ি !আছে সংসারের জ্বলন পোড়নের হাত থেকে দুদন্ড ছুটি নিয়ে  পৃথিবীর নির্জনতম পুকুরঘাটের শানবাঁধানো রানারে বসে এবাড়ির মেজকী আর ও বাড়ির কাজন্তি ঝি-এর কানভাঙানির ফিসফিস !আছে বোষ্টমীর গান , পুরুতের চালকলা , নিমের তিতে, ফোড়নের ঝাঁঝ, গুড়ের মিঠাস , কাঁকড়ার ঠ্যাং , গুজবের পাখা  আরো কত কি ! আর আছে অনেক অনেকখানি খোলা মাঠ ! )

 

মোটা কাঠের ভারী দরজা ! ভুসোকালির কালো মাখানো ! ওপরে খিলানে চুনখড়ি দিয়ে লেখা ‘জয়তু বর্গীদমন’! দরজার বাইরের দিকের বাঁকা পথটি সুড়কিলাল !সে পথ ওই দূরে কুনুর নদীর পার থেকে শুরু হয়ে গ্রাম পেরিয়ে বাঁশিয়া সায়েরের দিকে চলে গেছে ! এখন নিঝ্ঝুম দুপুর ! তিনপ্রহর বেলা হল ! ঘুঘু ডোকার দিচ্ছে ! একপাল  হাঁস-হাঁসি পথ কাটল ! তাদের পিছুপিছু বোষ্টম-বোষ্টমী ! তারা এসে দাঁড়াল দরজার সামনে ! বোষ্টমীর গানের  সঙ্গে কর্ত্তাল বাজায় বোষ্টম

গান (ধামাল)

ওলো ও ললিতে চাঁপাকলিকে একটা কথা শুইনছে
আমার রাইয়ের ঘরে চোর ঢুইকেছে চূড়োবাঁধা মিনসে….!
দুটি সেবা দাও গো মা…….

 

খুলে গেল নাচদোর !এসে দাঁড়ালেন যেন স্বয়ং বিষ্ণুপ্রিয়া !একহাত ঘোমটা সরিয়ে বউ বলল- “তোমরা আজ ফিরে যাওগো বোষ্টম- বোষ্টমী !আজ হেঁশেলে শালো চাল বাড়ন্ত !” তারপর এদিক ওদিক ভালো করে দৃষ্টি মেপে গলা নামিয়ে ছড়া কাটল –

    নিতে পারি খেতে পারি‚ দিতে পারি না
বলতে পারি‚ কইতে পারি সইতে  পারি না
যার নাম চালভাজা তার নাম মুড়ি
যার মাথায় সাদা চুল‚ তারই নাম বুড়ি!

 

শুনে বোষ্টম বোষ্টমী বড়ই দুঃখ পেল !মাধুকরী  জুটলনা বলে ততটা নয় , যতটা শ্বশুরঘরে বিষ্ণুপ্রিয়া বউটির দুর্দশা কল্পনা করে , বোষ্টমীর মুখটা কালো হয়ে গেল –

হায় হায় গো! সোনার লতা বউটি হল ভাল
বৌ কাঁটকি‚ নোলা দেগো শাশুড়ি দজ্জাল
তবে আর কী করি
পোড়ার মাথা খিদেয় মরি

 

বোষ্টম বোষ্টমী সরে পড়ার তাল করছে , এমন সময়  কাঁচাপাকা চুলে এসে পড়ল শাশুড়ি – “দাঁড়াও তো বাপু বোষ্টম বোষ্টমী ! সরে পড়ছ যে বড় !”

“যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধে হয় ! ওই এলেন …” – এই বলে লক্ষীপ্রতিমা বউটি এক হাত ঘোমটা টেনে শাশুড়িকে পাছ দেখিয়ে ভিতর বাড়ির দিকে হাঁটা দিল !

বুড়ি মুখ ভিরকুটে বলল – “মরন !”,তারপর বাঁ গালে হাত দিয়ে বাপান্ত করতে লাগল   – “হায় হায় হায় ! দেইজি-ঘাঁটা  হাড়-হাবাতে বউ জুটেছে গো , আমি এখন কোথায় যাই ! ভর দুক্কুরবেলা পাটাবুকী গুমোর দেখিয়ে ভিখিরিকে হাঁকিয়ে দিলে ! আমায় একবার শুধোবার প্রয়োজনটি ভাবল না’ক !দেখ গো তোমরা বোষ্টম বোষ্টমী আমার পোড়া কপালখানা একবার দেখ !” বিলাপ করতে থাকল বুড়ি শাশুড়ি !

বোষ্টম আর বোষ্টমী অভিভূত !চোখের জলে  বোষ্টম বলল – “তাইতো বলি মা , তুমি সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা ! তোমার হেঁশেলে চাল বাড়ন্ত তাই কখনো হয় !”

শাশুড়ির বিলাপ তখনো চলছে , তাই দেখে স্বান্তনা দিয়ে বোষ্টমী বলল –

“ মনে পাষান বেঁধে রেখো না গো মা ! আজকালকার বৌ ঝি সব এমনি আলবড্ডে ! তোমার পাকা চুলে সিঁদুর অক্ষয় হোক ! আমার গোরাচাঁদের প্রসাদে তোমার হেঁশেলে ভরভরন্ত হোক ! বৈষ্ণবকে দুমুঠো সেবা দাও গো মা হাত উথলে !”

বুড়ি চোখের জল নাকের জল আঁচলে মুছতে মুছতে  বলল – “ মাফ কর গো ঠাকুর ঠাকরণ , আজ কিছুমিছু দিতে পারবনা ! হাত জোড় !”

বোষ্টমী অবাক হয়ে বলল – “ সে কি কথা গো, এই না তুমি আপন পুত সোহাগীকে মুখ করলে , আমাদের সেবা না দিয়ে হাঁকিয়ে দেবার জন্য ! আর এখন বলছ কিছুমিছু দিতে পারবনা !”

শাশুড়ি ঝাঁঝিয়ে উঠল – “ এ বাড়ি কার ? আমার ! হেঁশেল কার ? গেহ যার ! তবে ভিখিরিকে  বিদেয় করবার অধিকারটি কার ? সেও আমার ! তোমাদের মুখের ওপর দোর দিতে হয় আমি দেব ! ওই ছার কপালী ঘর জ্বালানী ধিঙ্গিটা  সাউখুড়ি করতে আসে  কোন অধিকারে !” এই বলে সশব্দে মোটা কাঠের ভারী দরজা বন্ধ করে দেয় !

 

——————————————————————————-

অতিরিক্ত

১. – বর্গীদমন ! ঈশ্বরের জন্ম হয় ভক্তের প্রয়োজনে ! তিনি যে বিপত্তারণ , দুর্গতিনাশ ,তিনি অরিহন্তারক !বিশেষত রাঢ‌‍়বাংলার গ্রামে এখনো খোঁজ মিলবে এমন সব শতাব্দী প্রাচীন পুরনো ভাঙা দেউল , যাতে খোদাই করা আছে মারাঠা দস্যুর (বর্গী) হাত থেকে রক্ষাকারী ইষ্টদেবতার জয়ধ্বনি – “জয়তু বর্গীদমন” !

 

২. – এ নির্ঘাৎ রাঢ‌‍়বঙ্গের গল্প ! কেননা এ গল্পের একপ্রান্ত দিয়ে বয়ে গেছে মেঠো আটপৌরে কুনুর নদী ! আরেকদিকে বাঁশিয়ার সায়ের বা সায়র ! দক্ষিণবাংলার নদী মানচিত্রে খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে কুনুর নদীর ! অজয়ের উপনদী ! শহর দুর্গাপুর থেকে  বিশ কিলোমিটার টাক দূরে কয়লাখনি অধ্যুষিত ঝাঁঝরা গ্রাম , সেখানে আছে        ‘মিত্র সরোবর’ ও ‘গড়’ নাম্নী দুটি ভূগর্ভস্থ ঝরনা ! সেই দুই ঝরনার জল সঙ্কলিত হয়েই জন্ম নিয়েছে কুনুর ! উৎস থেকে প্রায় ১১২ কিলোমিটার দূরে গিয়ে কুনুর  মিলিত হয়েছে অজয় নদের সঙ্গে ! কুনুরের আবার দুটি উপনদী আছে , পঞ্চগঙ্গা ও গুসকরা ! পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ জানাচ্ছে , বর্ধমান জেলার আউসগ্রামের কাছে কুনুরের অববাহিকায়  মাটি খুঁড়ে তাম্রযুগের প্রাচীন সভ্যতার খোঁজ পাওয়া গেছে  যার বয়স কমপক্ষে সাড়ে তিনহাজার বছর ! উৎসাহীদের জন্য এটুকু তথ্য বলা থাকল এখানে !

 

৩. – বাঁশিয়া সায়ের ! সায়ের (সায়র) হল চারদিকে মাটির পাড় দিয়ে ঘেরা মানুষের খোঁড়া বিরাট জলাশয় ! আর দুর্গাপুর আসানসোল শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত সুপ্রাচীন গ্রাম বাঁশিয়া ! বর্ধমানের মহারাজা বিজয়চাঁদ মহতাবের আমলে গ্রাম বাঁশিয়ায় খোঁড়া হয়েছিল যে মস্ত জলাশয় – তারই নাম বাঁশিযার সায়ের ! বর্ষাকালে বুক ছমছম করা তার অগাধ জলরাশি ! বাকি সারাবছর সেখানে  পদ্মপাতা , পদ্মফুল আর উলুকঝুলুক শালুক বনের  ভিতর ডুবডুব পানকৌড়ি আর উদাসীন হাস বক কাদাখোঁচার দল !এই জলাশয়কে ঘিরে গত শতাব্দী জুড়ে  কত না লোককথার জন্ম হয়েছে  !

 

৪. – নাচদোর মানে বড় বা মূল ফটক , সদর দরজা ! রথ্যা< ‘লচ্ছা’< ‘নাচ’ !   আসলে  রথ এসে দাঁড়াতে পারে এমন দরজা !

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

Please share your feedback

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কফি হাউসের আড্ডায় গানের চর্চা discussing music over coffee at coffee house

যদি বলো গান

ডোভার লেন মিউজিক কনফারেন্স-এ সারা রাত ক্লাসিক্যাল বাজনা বা গান শোনা ছিল শিক্ষিত ও রুচিমানের অভিজ্ঞান। বাড়িতে আনকোরা কেউ এলে দু-চার জন ওস্তাদজির নাম করে ফেলতে পারলে, অন্য পক্ষের চোখে অপার সম্ভ্রম। শিক্ষিত হওয়ার একটা লক্ষণ ছিল ক্লাসিক্যাল সংগীতের সঙ্গে একটা বন্ধুতা পাতানো।