শূন্য রথ – দশঘরার রথযাত্রার বিচিত্র কাহিনী

দশঘরায় রথযাত্রার আগে রথে দড়ি বাঁধা হচ্ছে

গতবছর রথযাত্রার কয়েকদিন আগে কণাদ সান্যাল ফোন করে বললেন “ওহে, এবার রথের দিন কলকাতার কাছাকাছি কোথাও রথযাত্রা দেখতে গেলে কেমন হয়? একটু গ্রামের দিকে হলে ভালো হত| কণাদ সান্যালের কলকাতা তথা পশ্চিম বাংলার পুরোনো বাড়ি মন্দির নিয়ে বেশ আগ্রহ আছে| ওনার ছবি তোলার হাতও খাসা| মাঝে মাঝেই উইক এন্ডে আমরা গাড়ি দিয়ে কলকাতার বাইরে পুরোনো রাজবাড়ির সন্ধানে বেড়িয়ে পড়ি| কখনো কখনো আমাদের আরেক বন্ধু সাগর সেনও আমাদের সঙ্গে বেড়িয়ে পড়েন|

কণাদদার ফোন পেয়ে আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম “গ্রামের রথযাত্রার আমেজ পেতে দশঘরা চলুন| ওখানে বিশ্বাসদের বাড়ির রথযাত্রা বেশ ভালো হয়| মেলাটাও বেশ জমকালো হয়| বাড়ির লোকের সাথে তো আপনার ভালো পরিচয়ও আছে|

দশঘরা? সেটা মন্দ প্রস্তাব নয়” কণাদদার গলা শুনে বুঝেছিলাম উনি বেশ আগ্রহী| তাহলে চলো তাই হোক| একবার সাগরকে বলে দেখো সে যাবে কিনা|

সাগর সেন কে বলাতে সে বলেছিল “আমার যেতে কোন আপত্তি নেই| কিন্তু একটা শর্ত আছে| রথযাত্রা তো বিকেলে হয়| আমরা তো দুপুরবেলা বেরোবো| লাঞ্চ কিন্তু এখান থেকে নিয়ে যাব|রুটি আর মাংস থাকা চাই| আর মাংসটা কণাদদাকে রান্না করে নিয়ে যেতে হবে| কণাদ সান্যাল প্রস্তাব শুনে সহাস্যে বলেছিলেন “আমার কোনো আপত্তি নেই|

রথের দিন দুপুর একটা নাগাদ সাগর সেনের গাড়িতে চেপে আমরা বেরিয়ে পড়েছিলাম| দশঘরা হুগলী জেলায় অবস্থিত, কলকাতা থেকে মাত্র সত্তর কিলোমিটার| বালি ব্রিজ পেরিয়ে ডানকুনি আর সিঙ্গুর হয়ে দুর্গাপুর এক্সপ্রেস থেকে বাঁদিকে ধনিয়াখালি কানেক্টার ধরে সোজা গেলেই দশঘরা পৌছনো যায়|

ডানকুনি পেরিয়েই আমরা একটা ছোট হোটেল দেখে থেমেছিলাম| মাংসের ঝোল আর স্যালাডের উপকরণ সঙ্গে ছিল| হোটেল থেকে শুধু রুটি আর কোল্ড ড্রিঙ্কস কিনে গাড়িতে বসে কাগজের প্লেটে লাঞ্চ সেরে নিয়েছিলাম| সাগর সেন খেয়ে দেয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে বলেছিল “র্রান্নাটা বেড়ে হয়েছে| আপনি রিটায়ার করার পর হোটেলের ব্যবসা করুন| ভালো কাটতি হবে|

দশঘরায় গোপীসাগরের চারপাশে বিশ্বাস পরিবারের নানা স্থাপত্য

দশঘরার বিশ্বাস পরিবার বেশ নামকরা| এঁরা আদতে উড়িষ্যার লোক| এঁদের বংশের জগমোহন বিশ্বাস দশঘরায় এসে বসবাস শুরু করেন| এখনকার পুরোনো বাসিন্দারা ছিলেন বারদুয়ারী রাজবংশের লোক| এই বারদুয়ারী রাজবংশের রামনারায়ণ পালচৌধুরীর বদান্যতায় জগমোহন বিশ্বাস এখানে বসতি স্থাপন করেন| এই বংশের সদানন্দ বিশ্বাস ১৭২৯ খ্রিস্টাব্দে এঁদের কুলদেবতা গোপীনাথ জিউর জন্য পঞ্চরত্ন গোপীনাথ মন্দির নির্মাণ করেন যার দেওয়ালের টেরাকোটার কাজ দেখবার মতো|

গোপীনাথ মন্দিরে টেরাকোটার কাজ

এছাড়া আঠারশ শতাব্দীর শেষের দিকে বিশ্বাস পরিবার দশঘরায় দুর্গাদালান, কাছারিবাড়ি, বৈঠকখানা, নহবতখানা, দোলমঞ্চ একটি অক্টোগোনাল রাসমঞ্চ স্থাপন করেন| বিশ্বাসপাড়ায় গোপীসাগর নামের একটি পুকুর রয়েছে| তার চারিদিকে এই স্থাপত্যগুলি রয়েছে| মন্দির আর দুর্গাদালান অবশ্য একটু পিছন দিকে অবস্থিত| মন্দিরের পাশেই রয়েছে বিশ্বাস পরিবারের বিশাল বসতবাড়ি|

বিশ্বাসপাড়ায় ঢোকার দুটো রাস্তাই সরু| গ্রামের লোক কখনো সখনো একটু বেআক্কেল ভাবে রাস্তার উপর বাইক রাখলেই সে রাস্তা দিয়ে এগোনো দুস্কর হয়ে ওঠে| গত বছরেও একই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলাম| সাগর সেন কয়েকবার হর্ন দেওয়ার পর একজন হাকুচ কালো লোক বত্রিশ পাটি দাঁত দেখিয়ে বাইকটা সরিয়ে নিয়েছিল| সাগর সেন দাঁতে দাঁত চেপে বলেছিল “দাঁত ক্যালানে বাঞ্ছারাম|

গোপীসাগরের সামনে এসে দাঁড়ালে আচমকা এসে দাঁড়ালে মনে হয় টাইম ট্রাভেল করে পুরানো দিনে ফিরে গেছি| বড় বড় থামওয়ালা কাছারিবাড়ি, পাশে বৈঠকখানা, তার একটু দুরে নহবতখানা, পুকুরের সামনে সাদা ধবধবে রাসমঞ্চ, পুকুরঘাটে কিছু মানুষজন কাপড় কাচছে, একজন বুড়ো লোক সাইকেল চালিয়ে সামনে থেকে চলে গেল সব মিলিয়ে একটা পরিবেশ যেটা কিনা পুরানো বাংলা সিনেমায় দেখা যায়|

গোপীসাগরের সামনে একটা মাঠ আছে| গাড়িটাকে ওখানেই পার্ক করে আমরা তিনজনে এগিয়ে গেছিলাম| কাছারিবাড়ি পেরিয়ে মন্দিরের উল্টোদিকে বিশ্বাস বাড়িতে ঢুকলাম| আমি দশঘরা এর আগে অনেকবার এসেছি কিন্তু রথের সময় এই প্রথম| কণাদ সান্যালের এই বাড়ির সদস্যদের সঙ্গে বিশেষ পরিচয় আছে| আমরা যে আসব সে কথা তিনি আগেই বলে রেখেছিলেন| তাই আমরা ভিতরে যেতেই বেশ খাতির করে বসানো হল| অচিরেই চা আর কিছু জলখাবার এসে হাজির হলো|

আমরা একটু তাড়াহুড়ো করেই চা জলখাবার খাচ্ছিলাম| তার কারণ চারটে বাজে, একটু পরেই আলো পড়তে থাকবে, তার আগেই ক্যামেরা নিয়ে কাছারিবাড়িতে গিয়ে রেডি হতে হবে| বিশ্বাস বাড়ির যে বয়োজ্যেষ্ঠ ভদ্রলোক আমাদের সঙ্গে কথা বলছিলেন তিনি আমাদের গোগ্রাসে খাওয়া দেখে বললেন “আরে এত তাড়া কিসের? আমি না নামলে তো রথ বেরোবেই না|

গোপীনাথ মন্দিরে সামনে কচি কাঁচার দল

এতক্ষনে আমার খেয়াল হল যে আগে এঁদের রথ দশঘরা বাজারের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি| তার মানে এদের কুলদেবতা গোপীনাথকে নিশ্চই ডুলিতে শোভাযাত্রা করে রথের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়|আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম পড়ন্ত বিকেলের রোদ্দুর ঝলমল করছে| ছবিটা ভালই হবে বলে মনে হল|

গোপীনাথ মন্দিরের টেরাকোটার কাজ যতবারই দেখি ততবারই মুগ্ধ হয়েছি| এবার কিছু কিশোরী বাচ্চারা মন্দির প্রাঙ্গনে হুটোপুটি করছিল| আমরা ক্যামেরা বার করতেই তারা পোজ দিয়ে বসে পড়ল| এর মধ্যে পুরোহিত গোপীনাথ জিউ আর শ্রীরাধিকাকে নিয়ে কাছারী বাড়িতে চলে গেলেন| সেখানে একটি ঠাকুর ঘরে সিংহাসনে বিগ্রহ দুটিকে বসানো হল| বারান্দায় একদল লোক খঞ্জনি, ঢোলক, ইত্যাদি বাজিয়ে গান শুরু করল|

কাছারি বাড়িতে গোপীনাথের মূর্তির সামনে গান বাজনা

ইতিমধ্যে কিছু স্থানীয় ফটোগ্রাফার এসে ছবি তুলছিল|গানটা শেষ হতে হতেই আমি চট করে বাইরে চলে গেলাম| আমি ডুলি নিয়ে গোপীনাথকে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটা ভালো করে তুলব বলে বাইরে দাঁড়িয়ে পজিশন নিয়ে নিলাম| ইতিমধ্যে কাছারীবাড়ির ফটকের সামনে ডুলি এসে গিয়েছে| সঙ্গে একটি বিশাল ছাতা|

কাছারি বাড়ির সামনে ডুলি সাজাতে ব্যস্ত সকলে

পনেরো মিনিট ধরে ডুলি সাজানোর পর হঠাৎ নজরে এলো একজন বয়স্ক লোকের সঙ্গে কিছু লোকের কথাবার্তা চলছে| বয়স্ক লোকটি বোধহয় বিশ্বাস বাড়ির| তিনি খুব উত্তেজিত, বাকি লোকেরা তাঁকে শান্ত করার চেষ্টা করছে| কি নিয়ে কথা হচ্ছিল সেটা বুঝতে পারলাম না| ডুলিটা আমার যেদিকে ছিল সেদিকে একটা পর্দা দেওয়া ছিল| তাই আমি বুঝতে পারছিলাম না গোপীনাথকে বসানো হল কি না| এর মধ্যেই আচমকা ডুলিটাকে চারজন তুলে নিয়ে হাঁটা শুরু করল| সঙ্গে আরও লোক হাঁটতে লাগল| একদম সামনে বিশ্বাস বাড়ির এক দীর্ঘকায় ভদ্রলোক| তার পাশে বিশাল ছাতা ধরে আরেকজন হাঁটতে লাগল|

ডুলি নিয়ে শোভাযাত্রা, দেখে মনে হয় ডুলিটা ফাঁকা

আমি নহবতখানাটা ফ্রেমে রেখে পটাপট শোভাযাত্রার কয়েকটা ছবি তুলে ফেললাম| ডুলিটার পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ একটা জিনিস চোখে পড়তে প্রায় হার্টবিট বন্ধ হওয়ার যোগাড়| ডুলিটা ফাঁকা! তাতে গোপীনাথের বিগ্রহ বা অন্য কোন কিছুই নেই! সবাই সেটা দেখতে পাচ্ছে না এমনটা হতেই পারেনা| কিন্তু দেখেও কেউ কিছু বলছে না কেন ? আমি অবাক চোখে একটুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম| তারপর আবার হাঁটা দিলাম| মেঠো রাস্তা ধরে শোভাযাত্রা এগিয়ে চলল| রাস্তার পাশে নারী পুরুষের দল দলে দলে দাঁড়িয়ে আছে আর ডুলিটা দেখে করজোরে নমস্কার করছে| কিন্তু একজনও বিস্ময় প্রকাশ করছে না যে একটা ফাঁকা ডুলি নিয়ে কেন শোভাযাত্রা হচ্ছে?

ডুলি নিয়ে শোভাযাত্রা বড় রাস্তায় পড়ল

শোভাযাত্রা বিশ্বাসপাড়া ছেড়ে বড় রাস্তায় পড়ল| তারপর আস্তে আস্তে এগিয়ে চলল বাজারের দিকে| রাস্তায় অনেক লোক এবার শোভাযাত্রার সাথে এগোতে থাকল| কিন্তু অবাক ব্যাপার কেউ ফাঁকা ডুলি নিয়ে কথা বলছে না| এটা কি এঁদের কোনো প্রথা ? সেটা হয়ে থাকলে এটা খুবই অদ্ভুত প্রথা|
কণাদদাকে এটা নিয়ে প্রশ্ন করব ভাবছিলাম, কিন্তু উনি আর সাগর সেন অনেকটা এগিয়ে গেছিলেন|

দশঘরায় রথকে ঘিরে মানুষের ভিড়

বাজারের একদিকে রথের মেলা বসেছে| তার পাশেই সুবিশাল রথ| রথের চারপাশে প্রচুর মানুষের সমাগম| ডুলি নিয়ে সমস্ত লোকজন ওই ভিড়ের মধ্যে ঢুকে রথের পিছন দিকে চলে গেল| আমি ভিড়ের মধ্যে আর না ঢুকে পাশ কাটিয়ে মেলার মধ্যে দিয়ে রথের সামনে চলে গেলাম| এদিকটা নানা রকমের অস্থায়ী দোকান তাদের পসরা সাজিয়ে বসেছে| ছবি তোলার আদর্শ পরিবেশ|

রথের রাস্তায় পসরা সাজিয়ে দোকানদার| রথ কাছে আসলেই সরে যাবে

রথের সামনে গিয়ে দেখলাম ওই ভিড়ের মধ্যে দিয়ে কণাদ সান্যাল আর সাগর সেন বেরিয়ে এলেন|
আমি ওদের সামনে গিয়ে একটু উত্তেজিত গলায় বললাম “কণাদদা, আপনি দেখলেন ডুলিটা ফাঁকা? ওটায় গোপীনাথ নেই|

কণাদ সান্যাল আমার দিকে তাকিয়ে বললেন এই জন্যে তো একদম রথের সামনে গিয়েছিলাম| ডুলিতে গোপীনাথ নেই এটা সত্যি| কিন্তু ওটা ফাঁকা ছিল না| ছোট্ট একটা ডিবে বা কৌটা ছিল| সেটাই রথে তোলা হল| অবশ্য ওটার গুরুত্ব কি জানি না| অত ভিড়ে কাউকে প্রশ্ন করা চলে না| একটু থেমে উনি বললেন এদের রথের একটা ইতিহাস ছিল| সেটা ঠিক মনে নেই| এইটুকু বলতে পারি রথ আরও বড় ছিল, তাতে অনেককাল আগে আগুন লাগে| আর এখন মনে পড়ছে এই রথে গোপীনাথের ওঠা নিয়ে বোধহয় কোনও বিধি নিষেধ আছে|

আমার মনটা রহস্যাবৃত হয়ে রইল| রথের কিছু ছবি তুললাম| বাজারটাও বেশ ফটোজিনিক| কিছুক্ষণ পরে রথ টানা শুরু হল| মজার ব্যাপার হলো রথের রাস্তার উপরই কয়েকটা দোকানী পসরা সাজিয়ে বসে ছিল| রথ যেই এগোয়, দোকানদারেরা ঝটপট তাদের পসরা তুলে রাস্তা থেকে সরে যায়|

এর পরে যেটা শুরু হল সেটা প্রথমে একটা গুঞ্জন দিয়ে শুরু হয়েহিল, তারপর সেটা কোলাহলে পরিণত হল, এবং সবশেষে একটা সমবেত আর্তনাদে রুপান্তরিত হল| ব্যাপারটা আর কিছুই নয়, রথের দড়ি ধরে যাঁরা টানছিলেন তারা তারস্বরে “গোবিন্দ নাই, গোবিন্দ নাই” বলে চেঁচিয়ে যাচ্ছিলেন| যদি ‘গোবিন্দ নাই’ না বলে ‘গোপীনাথ নাই’ বলতেন, তাহলে তার একটা মানে দাঁড়ায়| এই ব্যাপারটাও মাথায় ঢুকলো না|

রথ যে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল, তার বাঁ পাশে একটা সুন্দর ক্লক টাওয়ার যুক্ত গেট আছে| আমার লক্ষ্য ছিল ওই গেট সুদ্ধু রথের একটা ছবি তুলব| তাই জন্যে একটু পা চালিয়ে গেটের দিকে এগিয়ে চললাম| দশঘরা মত ছোট গ্রামে এই সুবিশাল গেটটা একটু বেমানান লাগে| এটা তৈরী করিয়েছিলেন স্টিভেডর বিপিনকৃষ্ণ রায় (১৮৫১১৯১১)| তাঁর এই গ্রামে প্রাসাদোপম অট্টালিকা ও বিশাল বাগান ছিল| বাড়িটির এখন জীর্ণদশা প্রাপ্ত হয়েছে| বাগানের অবস্থাও তথৈবচ|

দেখতে দেখতে রথের শোভাযাত্রা গেটের সামনে চলে এল| একটু উঁচু জায়গা পেলে ছবিটা আরও ভাল হত| যাই হোক গ্রাউন্ড লেভেল থেকে শটটা মন্দ হলো না| গেট পেরিয়েই একটা মন্দির আছে| রথযাত্রা সেইখানেই শেষ হল| এ মন্দিরও বিপিনকৃষ্ণর তৈরী| রথ যাত্রা শেষ হল, কিন্তু আমার মনটা খুঁত খুঁত করছিল আমার প্রশ্নের উত্তর পেলাম না বলে |

ক্লক টাওয়ার সংযুক্ত গেটের সামনে নিয়ে রথ যাচ্ছে

তিনজনে যখন বিশ্বাস পাড়ার দিকে ফিরে আসছি তখন বিশ্বাস বাড়ির সেই বয়স্ক ভদ্রলোকের সাথে দেখা হয়ে গেল| উনি জানতে চাইলেন যে আমাদের ছবি তোলা কেমন হল| ছবিগুলো ভালই এসেছিল| সে কথা ওনাকে জানাতে উনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন “কি আর দেখলেন| আমাদের আগে যে রথযাত্রা হত এ তার কাছে কিছুই নয়| আর যাঁর রথে চড়ার কথা তিনিই তো নেই| এতকালের পুরানো প্রথা এই বছরে শেষ হয়ে গেল|”

তার মানে? ঘটনাটা একটু খুলে বলবেন কি?” আমি আর কৌতূহল চাপতে না পেরে বলে ফেললাম|

তখন উনি যে গল্প বললেন তা বেশ চিত্তাকর্ষক| সে প্রায় ১৫০ ২০০ বছর আগের কথা| প্রথমে বিশ্বাস বাড়ির তিনটি রথ ছিল| এই বাড়ির তিন ভাই তিনটি রথ তৈরী করেছিলেন জগ্গনাথ, বলরাম ও সুভদ্রার| জগ্গনাথের রথ ছিল একুশ চুড়োর, বলরামের রথ ছিল তের চুড়োর আর সুভদ্রার রথ ছিল নয় চুড়োর রথ| এই তিনটি রথ তিনজনের নাম উসর্গীকৃত ছিল| আদতে এই রথ টানা হত বেলিপোতার মাঠ বলে একটি জায়গায়| বিশ্বাস পরিবারের পূর্বপুরুষেরা বৃন্দাবন থেকে তিনটি বিগ্রহ সংগ্রহ করেছিলেন| একটি গোপীনাথের, একটি গোবিন্দর ও অন্যটি মদনমোহন| সেকালে অব্রাহ্মণদের নারায়ণ পুজোর অনেক বিধিনিষেধ ছিল| তাঁদের ব্রাহ্মণদের অনেক দান ধ্যান করতে হত| তাই বৃন্দাবনেই এক ব্রাহ্মণকে অনেক জমিজমা দান করে তাঁকে গোবিন্দ প্রদান করে আসেন| দশঘরা নিকটবর্তী মহিষগাড়িয়া বা মোষগেড়েতে আরেক ব্রাহ্মণকে অনেক জমিজমা সমেত মদনমোহন দান করা হয়| গোপীনাথকে অবশ্য ধুমধাম করে বিশ্বাস বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করা হয়|

রথযাত্রার দিন বৃন্দাবন থেকে নিয়ে আসা হত গোবিন্দকে আর মদনমোহনকে নিয়ে আসা হত মোষগেড়ে থেকে| গোপীনাথ উঠতেন জগ্গনাথের রথে, গোবিন্দ উঠতেন বলরামের রথে আর মদনমোহন সুভদ্রার রথে| তিনটি রথ যখন একসাথে চলত তখন সেটা একটা দেখার জিনিস ছিল| মাহেশের রথের পরে এত জাঁকজমকপূর্ণ রথ বাংলায় আর দুটি ছিল না|

এতটা বলার পর ভদ্রলোক একটু থামলেন| তারপর একটু উদাস নয়নে বললেন “কিন্তু এত সুখ কপালে ছিলনা| বিশাল এক অগ্নিকান্ডে তিনটি রথে আগুন লাগে| দুটি রথ সম্পূর্ণ ভাবে পুড়ে যায়| একমাত্র বলরামের রথটি আংশিক ভাবে পোড়ে| স্বাভাবিক ভাবে এরপরে বৃন্দাবন থেকে গোবিন্দর আসা বন্ধ হয়ে যায় আর মোষগেড়ে থেকে মদনমোহনও আসা বন্ধ করেন|”

তাহলে সবাই গোবিন্দ নাই বলছে কেন? বৃন্দাবন থেকে গোবিন্দ আসেন না বলে?” জানতে চাইলাম|

ভদ্রলোক মাথা নাড়লেন|না, সে গল্পটা অন্য| তারপর একটু দম নিয়ে শুরু করলেন “এই বংশের যুগল কিশোর বিশ্বাস ঠিক করেন গোবিন্দর রথকে সারিয়ে নিয়ে তাতেই গোপীনাথকে রথের দিন তোলা হবে| কিন্তু এতে বাধ সাধেন স্বয়ং গোপীনাথ| স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেন যে ওই রথ বলরামকে উৎসর্গ করা হয়েছে| তাছাড়া ওতে গোবিন্দ উঠতেন| তাই রথের দিন গোপীনাথকে ওই রথে ওঠালে পরিবারের অকল্যাণ হবে| যুগল কিশোর খুব বাস্তববাদী লোক ছিলেন| তিনি এসব স্বপ্নে বিশ্বাস করতেন না| তিনি রথের দিন গোপীনাথকে বলরামের রথে ওঠালেন| তাতে ফল হোল মারাত্মক| ওঁর ছোট ছেলে সেদিনই রথের চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা গেল আর বড় ছেলে সেইদিনই কলেরায় শেষ হয়ে গেল| অন্য লোক হলে কি করত জানি না, যুগল কিশোর এ ঘটনাকে অলৌকিক মানতে চাইলেন না| উনি একটাকে নিছক কাকতালীয় বলে ঘোষনা করলেন এবং নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন| তখন সেই রাতে গোপীনাথ আবার স্বপ্নে দেখা দিয়ে বললেন যে যুগল কিশোরের যদি রথ চালানোর এতই সখ থাকে তাহলে প্রতিবেশী ঘোষ পরিবারের গোবিন্দকে এনে রথের দিন বলরামের এই রথে এনে বসাতে| এটা বলরামের রথ, গোবিন্দ যেহেতু বলরামের প্রতিভূ হয়ে এই রথে চড়তেন তাই এই রথে গোবিন্দই উঠবেন| তাই সেই দেড়শ বছর থেকে ঘোষ পরিবারের গোবিন্দ এই রথে চড়েন| অবশ্য ঘোষ পরিবারকে রাজি করাতে অনেক জমিজমা আর টাকা পয়সা দেওয়া হয়েছিল|”

আমার মনের ধোয়াঁশা কিছুটা কাটলেও পুরোটা কাটেনি| তবুও কিছু না বলে ওনার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম|

এর পরের ঘটনা সাম্প্রতিক কালের|” একটু দু;খিত ভাবে মাথা নাড়তে নাড়তে আবার বলা শুরু করলেন ভদ্রলোক| “এই ঘোষ পরিবারের বর্তমানে আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ| বংশের বিশেষ কেউ বেঁচে নেই| কথা বলার মত একজনই আছেন| তিনি আবার অকৃতদার| কাজকর্ম বিশেষ কিছু করেন না| তাই কয়েক বছর ওবাড়িতে গোবিন্দর নিত্য পুজো বন্ধ| শুধু রথের সময় গোবিন্দকে এবাড়িতে নিয়ে আসা হয়| রথের দিন ওনাকেই ডুলিতে করে রথে তোলা হয়| সঙ্গে শালগ্রামশিলা থাকে একটা ছোট কৌটার মধ্যে| এই যে রথের মেলা দেখছেন, এটা আমাদের পরিবারের মেলা| এর থেকে যা টাকা ওঠে তাই দিয়েই গোপীনাথের নিত্যপুজা, মন্দির, কাছারী বাড়ি, নহবত খানা সংরক্ষন করা হয়| কিন্তু এই বছর ঘোষ বাড়ি থেকে বলে দেওয়া হয়েছে যে তারা তাঁদের ঠাকুর রথে আর পাঠাবে না| যদি আমরা চাই যে গোবিন্দ আমাদের রথে উঠুন, তাহলে ওনাদের এই রথের মেলা থেকে আয়ের একটা মোটা অংশ দিতে হবে| আমরা তাতে রাজি হইনি| কারণ আমরা টাকা দিয়ে গোবিন্দকে আনার মত ঘৃণ্য কাজ করতে চাইনা| তার থেকে শুধু শালগ্রামশিলা রথে উঠবে| মোট কথা বিশ্বাস বাড়ির রথ যাত্রা বন্ধ থাকবে না| ”

তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন “এই জন্যে বাইরে থেকে যাঁরা এসেছেন তাঁদের অনেকের মনে হয়েছে যে ডুলিটা ফাঁকা| কিন্তু এখনকার লোক সব জানে| তাই তাঁরা ‘গোবিন্দ নাই, গোবিন্দ নাই” বলে বিলাপ করছিলেন|”

আমরা তিনজন স্থাণুর মত দাঁড়িয়ে ওঁর কথা শুনছিলাম| এবার আমি বললাম “এটা খুবই দুঃখের ব্যাপার যে এত বছরের পুরানো প্রথা একজনের জেদের জন্য বন্ধ হয়ে গেল| তবে আশা ছাড়বেন না, হয়ত পরে ওনার শুভ বুদ্ধির উদয় হবে| আবার গোবিন্দ আপনাদের রথে উঠবে|”

ভদ্রলোক কিছু বললেন না| চুপ করে রইলেন| আমরা একটু ভারাক্রান্ত মনেই দশঘরা থেকে বিদায় লিলাম

পরিশিষ্ট

আমার কথা কিছুটা ফলেছিল| সে বছর অনেক বোঝানোর পর উল্টোরথে ঘোষ বাড়ি থেকে গোবিন্দকে বিশ্বাস বাড়ির রথে ওঠাতে দেওয়া হয়েছিল| কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানলাম এ বছর সেই একই গল্প| ঘোষ বাড়ি তাদের আগের সিদ্ধান্ত বজায় রেখেছেরথের দিন এবারও তারা গোবিন্দকে বিশ্বাসদের রথে ওঠাতে দেয়নি| এবারও দশঘরার রথে শুধু শালগ্রাম শিলা অধিষ্ঠিত ছিলেন| তবে তাঁকে এবার একটি ছোট সিংহাসনে বসিয়ে রথে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যাতে লোকের এটা না মনে হয় যে ডুলি বা রথ ফাঁকা যাছে|

অমিতাভ গুপ্ত
ছিলেন নামী কোম্পানির দামী ব্র্যান্ড ম্যানেজার | নিশ্চিত চাকরির নিরাপত্তা ছেড়ে পথের টানেই একদিন বেরিয়ে পড়া | এখন ফুলটাইম ট্র্যাভেল ফোটোগ্রাফার ও ট্র্যাভেল রাইটার আর পার্টটাইম ব্র্য্যান্ড কনসাল্টেন্ট | পেশার সঙ্গে মিশিয়ে নিয়েছেন নেশাকেও | নিয়মিত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ হয় বেড়ানোর ছবি এবং রাইট আপ |

2 COMMENTS

  1. দারুণ লেখা। গল্প ও সরল হাস্যরসের মাধ্যমে তথ্য পরিবেশন। মানসভ্রমনের সাথে সাথে “পরের বার দশঘরায় রথ দেখতে যাওয়ার অঙ্গীকার”টিও পাঠকদের করিয়ে নিলেন লেখক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here