১৮৩ বছর আগে শবদেহে ছুরি চালালেন প্রথম বাঙালি তথা প্রথম ভারতীয় ! সম্মানসূচক তোপধ্বনি ফোর্ট উইলিয়ামে

5231

তখনও সিপাহি বিদ্রোহ হতে ২১ বছর বাকি | ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তখন ১৬ বছরের কিশোর | বিধবা বিবাহ আইন ভবিষ্যতের গর্ভে‚ পাশ হবে আরও ৫৬ বছর পরে | মাত্র ৭ বছর হল পাশ হয়েছে সতীদাহ প্রথা | এমন একটা সময়ে দাঁড়িয়ে সব প্রতিবন্ধকতাকে দূরে সরিয়ে হিন্দুশাস্ত্রের নিষিদ্ধতম কাজটি করে বসলেন এক উচ্চবর্ণের হিন্দু | ব্যবচ্ছেদ করলেন শব | নিজের সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে থাকা সেই বঙ্গসন্তানের নাম মধুসূদন গুপ্ত |

জন্ম খাস বদ্যি পরিবারে | পৈতৃক বাড়ি হুগলির বৈদ্যবাটিতে | পরিবারে ছিল আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার ধারা | সেই ধারা মেনে মধুসূদনও এগিয়েছিলেন | জন্ম হয়েছিল ১৮০০ সালে | কোনদিনে‚ সেটা জানা যায় না |

স্কুলপাঠ শেষ করে মধুসূদন এলেন কলকাতায় | ভর্তি হলেন সংস্কৃত কলেজে | বৈদ্যক শাখায় | পলাশির যুদ্ধের অর্ধশতক কেটে যাওয়ার পরেও তখনও ওটাই ছিল ব্রিটিশ কলকাতার ডাক্তারি পাঠ্যক্রম | মধুসূদন পাঠ নিচ্ছিলেন আয়ুর্বেদ চিকিৎসক হওয়ার | ১৮৩০ সালে মধুসূদন উন্নীত হয়েছিলেন সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক হিসেবে |

এই সময়ে ১৮৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হল ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজ | সংস্কৃত কলেজে বন্ধ হয়ে গেল বৈদ্যক পাঠ | মধুসূদন চলে এলেন মেডিক্যাল কলেজে | সহকারী শিক্ষক হয়ে | কিন্তু হিন্দুস্তানি বিদ্যা জানা থাকলে কী হবে ! মধুসূদন চাইলেন পাশ্চাত্য চিকিৎসাশাস্ত্র শিখতে | তিনি একইসঙ্গে তখন মেডিক্যাল কলেজের আয়ুর্বেদিক শিক্ষক আবার পাশ্চাত্য ধারার ছাত্র |

১৮৪০ সনে পাশ করলেন মধুসূদন | ১৮৪৫-এ তিনি হলেন কলেজের হিন্দুস্তানি মাধ্যমের সুপারিন্টেন্ডেন্ট | তার তিন বছরের মধ্যে মধুসূদন হলেন সহকারী সার্জেন | ১৮৫২ সালে শুরু হল বাংলা মাধ্যমে ডাক্তারি পাঠ | মধুসূদন হলেন সেই বিভাগের সুপার |

কিন্তু তখন মেডিক্যাল কলেজ নিয়ে বাঙালি সমাজে প্রবল ছুঁৎমার্গ | শব ব্যবচ্ছেদ বা মড়া কাটার ঘেন্নায় কেউ যেতে চায় না ও পথে | অ্যালোপ্যাথির তুলনায় বাজারে জনপ্রিয় হোমিওপ্যাথি কবিরাজি আর আয়ুর্বেদিক অথবা ইউনানি | কলেজ নিয়ে অস্পৃশ্যতা কাটাতে মধুসূদনকে বেছে নিলেন ব্রিটিশ শিক্ষকরা |

রাজি হলেন মধুসূদন | তাঁর পরিবার ছিল বৈষ্ণব মনোভাবাপন্ন | তাঁর বাবার নাম বলরাম‚ তিনি নিজে মধুসূদন এবং পুত্র ছিলেন গোপাল | এহেন পরিবারের সন্তান হয়ে সবরকম অস্পৃশ্যতা দ্বিধা সরিয়ে তিনি সম্মত হলেন শবদেহে ছুরি কাঁচি চালাতে | যা নাকি তৎকালীন সমাজে ঘোরতর নিষিদ্ধ | অন্য ধর্মের মতো হিন্দু ধর্মেও মৃতদেহ নিয়ে ছিল হাজারো সংস্কার | এদিকে খ্রিস্টপূর্ব বৈদিক যুগে ঋষি সুশ্রুত কিন্তু বলে গিয়েছিলেন শব ব্যবচ্ছেদের কথা | সুশ্রুত সংহিতায় বলেছিলেন এই উপায়েই জানা যাবে মানবদেহের সুলুকসন্ধান | কিন্তু নিজের হাতে তা করেছিলেন কিনা তার কোনও প্রমাণ নেই |

কেউ বলেন সামাজিক চাপে তিনি করতে পারেননি | আবার কারও মতে তিনি করেছিলেন | কিন্তু গোপনে | যাই হোক‚ বৈদিক যুগের তুলনায় উনিশ শতকের কলকাতা ছিল ঢের ঢের আলাদা | সেই সমাজে দাঁড়িয়ে অচলায়তন ভাঙলেন মধুসূদন |  

১৮৩৬-এর ১০ জানুয়ারি ( বা মতান্তরে ২৮ অক্টোবর ) প্রথম বাঙালি তথা প্রথম ভারতীয় তথা প্রথম এশিয়ান হিসেবে শব ব্যবচ্ছেদ করলেন মধুসূদন গুপ্ত | তাঁকে সাহায্য করেছিলেন রাজকৃষ্ণ দে‚ উমাচরণ শেঠ‚ দ্বারকানাথ গুপ্ত‚ নবীন চন্দ্র মিত্রর মতো মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররা | তাঁদের এই কৃতিত্বকে কুর্নিশ জানাতে ফোর্ট উইলিয়াম থেকে ৫০ বার তোপধ্বনি করা হয়েছিল |

যদিও পরে মধুসূদনকে নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল | বলা হয়েছিল তিনি মেডিক্যাল কলেজে পাশ্চাত্য শিক্ষায় প্রশিক্ষণ নিয়েছিলন | তবে স্নাতক হননি | প্রথম এশিয়ান শব ব্যবচ্ছেদকারীর তকমাও কেড়ে নিতে চেয়েছেন কোনও কোনও ব্রিটিশ সাহেব | তাতে এই বঙ্গসন্তানের কৃতিত্ব কোনওমতে খাটো হয় না | তৎকালীন সমাজে তিনি মান্য হতেন পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসক রূপেই |

কিন্তু নবজাগরণের এই ফসল তথা পথিকৃৎ দেখে যেতে পারেননি বাঙালি মনন-উন্মেষের অনেকটাই | ১৮৫৬ সালে ডায়াবেটিক সেপ্টেসেমিয়ার কারণে মাত্র ৫৬ বছর বয়সে প্রয়াত হন তিনি |

Advertisements

1 COMMENT

  1. আপনাদের এই প্রচেষ্টা কে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু আগেও অনুরোধ করেছি,আবারো করছি, দয়া করে বাবু রায় রাজচন্দ্র দাস ও রানী রাসমণি সম্পর্কে যদি একদিন একটু কিছু লেখেন তাহলে বাধিত হই। আমরা রানী মায়ের ব্যাপারে জানলেও, বাবু রাজচন্দ্র দাস ব্যাপারে কিছুই জানি না, কিন্তু শোনা যায়, উনি অনেক অনেক কাজ করেছিলেন ও সমাজ সংস্কারেও তার অবদান ছিল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.