মুম্বইয়ের বিস্মৃতপ্রায় ছবিওয়ালা, যাঁর ঝুলিতে ছিল ছ’টি অস্কার ও ৩১টি অস্কার-মনোনীত সিনেমা

918
Merchant Ivory Productions

ভারতবর্ষ ও সারা বিশ্বের আপামর চলচ্চিত্র প্রেমীদের কাছে একটি বিশেষ নাম ‘মার্চেন্ট আইভরি প্রোডাকশনস’। প্রায় ৪৪ বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করছেন এই প্রযোজক-পরিচালক জুটি। প্রযোজক ইসমাইল মার্চেন্ট এবং পরিচালক জেমস আইভরি। ষাট থেকে সত্তর দশকে নির্মিত এইসব ছবিগুলির বাজেট ছিল অত্যন্ত কম। কিন্তু অতি উন্নত মানের স্বতন্ত্র এইসব ছবি স্বাবলম্বী সিনেমার দেওয়াল ভেঙে ফেলেছিল ভারতবর্ষে ও যুক্তরাষ্ট্রে। এই সিনেমাগুলির মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য ভারতবর্ষের পেক্ষাপটে তৈরি ইংরাজি ভাষার ছবি বানানো। প্রায় ৫০টির ওপর ছবি তৈরি করেছিল মার্চেন্ট আইভরি প্রোডাকশন। যার মধ্যে ৩১টি একাডেমী পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয় এবং ৬টি অস্কার জিতে নেয়।

ইসমাইল নুর মুহম্মদ আবদুল রহমান ওরফে মার্চেন্ট-এর জন্ম ১৯৩৬ সালের ২৫শ ডিসেম্বর। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান তিনি। তাঁর সময়ে অনেকের মতই বঙ্গভঙ্গের ঘটনা তাঁর মনে গভীর প্রভাব ফেলে। কলেজের পর এমবিএ পড়তে যান নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে। তখন থেকেই তিনি পারিবারিক নাম ত্যাগ করে মার্চেন্ট নামে পরিচিত হন। নিউইয়র্কে থাকাকালীন তিনি ভারতবর্ষের বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় এবং বিশ্বের অবিস্মরণীয় পরিচালক যেমন ইঙ্গমার বার্গম্যান, ফেলিনির ছবিগুলির সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করেন। ১৯৬০ সালে তিনি প্রথম শর্টফিল্ম বানান – ‘দ্য ক্রিয়শন অব উওম্যান’। ওই বছরই এটি অস্কারের জন্য মনোনীত হয় এবং কান ফিল্ম ফেস্টিভালেও যায়। কান ফিল্ম ফেস্টিভালে যাওয়ার সময়ে তিনি দেখেন জেমস আইভরির ডকুমেন্টারি ‘দ্য সোর্ড এন্ড দ্য ফ্লুট’। যেভাবে আইভরি ভারতবর্ষকে চিত্রায়িত করেছেন তাঁর ছবিতে তা দেখে মুগ্ধ হয়ে যান মার্চেন্ট। আমেরিকান কোনও ছবিতে তিনি এর আগে এমনটি খুঁজে পাননি । এরপরই মার্চেন্ট আইভরিকে প্রস্তাব দেন তাঁরা দু’জনে মিলে ছবি বানাবেন ভারতবর্ষের ওপরে, দেখবেন গোটা বিশ্বের দর্শক।

আইভরি পরিচালনা করবেন আর মার্চেন্ট টাকার বন্দোবস্ত করবেন, অভিনেতা জোগাড় করবেন, প্রোডাকশনের সবকিছু সামলাবেন, এমনই স্থির হয়। মার্চেন্ট আইভরি প্রোডাকশন তাদের ব্যবসা শুরু করে ১৯৬১ সাল থেকে। বাকিটা তো ইতিহাস। জার্মান জিউ রুথ জাভালার কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত ছবি ‘দ্য হাউসহোল্ডার’ দর্শক এবং সমালোচক উভয়ের কাছেই উচ্চ প্রশংসিত হয়েছিল। অভিনয় করেছিলেন শশী কাপুর এবং লীলা নাইডু। মাত্র এক লক্ষ পঁচিশ হাজার ডলারেই এই ছবিটি মুক্তি পায়। রুথ জাভালার অনেক গল্প নিয়েই কাজ করেছে মার্চেন্ট আইভরি প্রডাকশন। রুথ ছিলেন ভারতের বৌমা। ভারতীয়কে বিয়ে করেছিলেন বলেই হয়ত তাঁর গল্পে উঠে আসত ভারতবর্ষ। ‘শেক্সপিয়ার ওয়ালা’ ছবিটি নিয়ে মার্চেন্ট আইভরি প্রোডাকশন আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছয়। এই ছবিতেও অভিনয় করেন শশী কাপুর, মাধুর জাফ্রি। সঙ্গীত সৃষ্টি করেন সত্যজিৎ রায়। বম্বে টকি, হিট এন্ড ডাস্ট অসম্ভব জনপ্রিয় হয়। অবশেষে আইভরি পরিচালিত ‘আ রুম উইথ আ ফিউ’( ১৯৮৫) প্রথম অস্কার এনে দেয়। আট বছর পরে আর একটি ছবি ‘হাওয়ার্ডস এন্ড’ তিনখানি অস্কার জেতে। ভারতবর্ষের প্রতি গভীর আস্থা রেখেছিলেন মার্চেন্ট, ভারতও তাঁকে যোগ্য মর্যাদা দিয়ে ২০০২ সালে ‘পদ্মভূষণ’ পুরস্কারে সম্মানিত করে। আইভরি-মার্চেন্টের বন্ধুতা অটুট ছিল ২০০৫ সালে মার্চেন্টের মৃত্যুর শেষ দিন অবধি। ভারতবর্ষকে চলচ্চিত্রের বিষয় করে বিশ্বের দরবারে নিয়ে যাওয়ার সাহস দেখিয়েছিলেন যে দুই প্রবাদপ্রতিম তাঁদেরকেই ভুলতে বসেছে ভারতবাসী !

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.