দারোয়ানের প্রেমে মশগুল নির্বাসিত রাজকন্যা বিয়ের আগেই মেয়ের মা

ছাব্বিশ বছর বয়সী ফায়া গিরি দীর্ঘদিন তাঁর প্রণয় লুকিয়ে রেখেছিলেন | তাঁর কন্যা টুটুর জন্মের পরে জানাজানি হয় তরুণ মরাঠা গোপাল সওয়ান্তের সঙ্গে ফায়ার গভীর প্রেমের কথা | সেইসঙ্গে বিনা মেঘে বজ্রপাত ফায়ার বাবা মায়ের মাথায় | রাজকন্যা ফায়া কিনা সামান্য দারোয়ান-ড্রাইভার গোপালের সন্তানের মা ! পরাধীনতা‚ সিংহাসন হরণ‚ নির্বাসন সবই মেনে নিয়েছিলেন বর্মার প্রাক্তন রাজা-রানি | কিন্তু মেয়ের এই পদস্খলন নিতে পারেননি | সহ্য করতে পারেননি |

ফায়া ছিলেন বিশুদ্ধ রাজরক্তের অধিকারিণী | কিন্তু মনে সুখ ছিল না | তিনি ছিলেন বর্মার রাজা থিবোর চার মেয়ের মধ্যে সবথেকে বড় | তাঁর মা থিবো-র সৎ বোন এবং পরে প্রথম স্ত্রী | তিনি রানি সুপলয়ত | দুই রানি‚ তিন মেয়ে এবং বেশ কয়েকজন রক্ষিতা সমেত রাজা থিবো-কে মহারাষ্ট্রের রত্নগিরিতে নির্বাসনে পাঠিয়েছিল ব্রিটিশ শাসকরা | তখন রানি সুপলয়ত গর্ভবতী চিলেন | যাত্রাপথে মাদ্রাজে জন্ম হয় রাজারানির চতুর্থ কন্যার | এরপর কয়েক দিন তৎকালীন মাদ্রাজে কাটিয়ে রত্নগিরিতে পৌঁছন সপরিবারে‚ রাজা থিবো | ত্রিশ বছর সেখানে নির্বাসিত জীবন কাটানোর পরে প্রয়াত হন রাজা থিবো | তাঁর সমাধির পাশে কিছুদিন পর জায়গা হয় তাঁর ছোট রানি সুপায়াগালায়ের  | যে সময় তাঁরা ওখানে ছিলেন সে সময় রত্নগিরি ছিল সত্যি নির্বাসনযোগ্য | অত্যন্ত দুর্গম ও জনবিরল | বাস ছিল প্রধানত জেলেদের |

রাজা থিবোর প্রয়াণের তিন বছর পরে‚ ১৯১৯ সালে রানি সুপলয়ত মেয়েদের নিয়ে বর্মা ফিরে যান | তার কয়েক বছর বর্মা থেকে রত্নগিরিতে ফিরে আসেন ফায়া ও তাঁর কন্যা টুটু | এই শিশুকে পূর্ণ রাজসম্মান ও পরিচয় দিতে সম্মত ছিল না বর্মার রাজ পরিবার | সেই পরিবারে ফেরারও ইচ্ছে ছিল না ফায়ার | তাঁকে জোর করে ইচ্ছের বিরুদ্ধে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল | অনেক চেষ্টায় তিনি ফিরে এসেছিলেন রত্নগিরিতে |

তাঁর বংশধর বা উত্তরসুরিরা এখনও থাকেন রত্নগিরিতেই | নিতান্ত সাধারণ মানুষ | কয়েক বছর আগেও কেউ তাঁদের চিনত না | ছবিটা কিছুটা হলেও পাল্টায় সুধা শাহ-র বই ‘The King in Exile: The Fall of the Royal Family of Burma’ প্রকাশিত হওয়ার পরে | সুধা বিশদ গবেষণা করেছেন বর্মার নির্বাসিত রাজপরিবার নিয়ে | তাঁর লেখা থেকে জানা যায় রাজকুমারি ফায়ার মেয়ে টুটুর মোট এগারো জন সন্তান ছিল | তাঁদের মধ্যে একজন চাঁদু গাড়ির মেকানিক | জানিয়েছেন‚ তাঁর মা টুটু অতীতের কথা প্রায় বলতেনই না | 

টুটুর জীবনে রাজপরিবারের কোনও চিহ্নই ছিল না | ড্রাইভার কাম দারোয়ানকে ভালবাসায় টুটুর মা ফায়া ব্রাত্য হয়ে গিয়েছিলেন বর্মার প্রাক্তন রাজারানির কাছে | কোনওদিন তাঁর প্রেম স্বীকৃতি পায়নি | ফায়া জীবনের অর্ধেক সংগ্রাম করেছেন দারিদ্রের সঙ্গে | তাঁর বিয়ের আগেই জন্মানো মেয়ে টুটু প্রথম থেকেই দেখছে
জীবনে অভাব আর অনটন আর অশিক্ষা |

ফায়ার প্রেমিক গোপাল ছিলেন বিবাহিত | সব জেনেই তাঁকে ভালবেসেছিলেন ফায়া | জানতেন কোনওদিন তাঁর স্ত্রী হতে পারবেন না | কিন্তু তারপরেও থেকেছিলেন রত্নগিরিতেই | গোপাল তাঁকে একটা বাড়ি বানিয়ে দিয়েছিল | তবে সংসার চলত ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া মাসোহারায় | ফায়ার মাসোহারা ছিল বাকি বোনদের তুলনায় অনেক কম | কারণ যেহেতু তিনি বিবাহিত ছিলেন | 

দুটো খাবার জোগাড় করতে টুটু বাধ্য হয়েছিলেন কাগজের ফুল বানিয়ে বিক্রি করতে | নিজের ভাগ্য বিড়ম্বনার জন্য কোনওদিন ক্ষমা করতে পারেননি মাকে | তাই ফায়া-টুটু সম্পর্ক কোনওদিন সহজ স্বাভাবিক ছিল না | শত কষ্টেও টুটু একটা পরোপকারী মন বাঁচিয়ে রেখেছিলেন | আশ্রয় দিতেন অবহেলিত শিশুদের | কিন্তু তাতে তাঁর ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়নি | একদিন টুটুকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল তাঁর বাড়িওয়ালা | দু রাত খোলা আকাশের নিচেও কাটাতে হয়েছিল তাঁকে | তবে শত কষ্টেও টুটু রত্নগিরি ছেড়ে যাননি‚ তাঁর মায়ের মতো | বিয়ে করেছিলেন স্থানীয় যুবক শঙ্কর পওয়ারকে |

আজ তাঁর বংশধররা দ্বিধাবিভক্ত | কেউ বর্মা গিয়ে আলাপ করতে চান বংশের অন্য শাখা প্রশাখার সঙ্গে | কেউ আবার বলছেন‚ এই বেশ ভাল আছি রত্নগিরিতে | যদিও এই রত্নগিরিতে যে ভবনে নির্বাসিত ছিলেন রাজ থিবো নির্বাসিত ছিলেন তা আজ সরকারি কার্যালয় | রাজা থিবো-র সমাধি তাও আছে | কিন্তু রাজকুমারি ফায়ার কোনও চিহ্ন নেই | থিবোকে সমাধিস্থ করা হলেও মৃত্যুর পরে ফায়াকে দাহ করা হয়েছিল | তাঁর চিতাভস্ম রক্ষিত হয়েছিল | আজ আর তার সন্ধান পাওয়া যায় না | তবু রত্নগিরির জনমানসে তাঁর প্রভাব রাজা থিবো-র থেকে অনেক বেশি | কারণ থিবো-র কাছে রত্নগিরি ছিল নির্বাসন | আর ফায়ার কাছে তা ছিল নিজের জায়গা |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here