ভালোবাসার ফুলছাপ

চুন্নি দরজার আগলটা দিয়ে দে। হাঁড়ি উপুড় দিয়ে দিয়েছি। আলু-কুমড়ো সিদ্ধ আছে। ওই দিয়ে ভাইকে ভাত দিস। আর শোন্, গায়ে জল ঢেলে বাপকে ওঠা। রাতে ধেনো গিলে এসেছে।

মেয়ের উদ্দেশে কথাগুলো ছুঁড়ে দিয়ে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে যায় পার্বতী। মা বেরিয়ে যেতে কাঁথাটা সরিয়ে চৌকি থেকে ঘুম চোখ ওঠে চুন্নি। ভাইটা এখনও অঘোরে ঘুমোচ্ছে। মেঝের মাদুরে বাপের নাক ডাকছে। তার পাশ কাটিয়ে দরজায় গিয়ে দাঁড়াতেই চোখে পড়ে , উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসছে লাল্টু।নির্ঘাত্ তক্কে তক্কে ছিল। জানে পার্বতী ঘর থেকে বেরোলেই চুন্নি উঠবে দরজা লাগাতে।

সক্কাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই হিড়িক দিতে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছে….

মনে মনে কথাগুলো বলে খ্যাড়াস করে টিনের দরজাটা টেনে দেয় চুন্নি।

চু্ন্নিদের গলিটা পেরিয়ে আর একটু এগোলে যে বাঁহাতের রাস্তাটা সেখানেই লাল্টুদের ঘর।চু্ন্নি ওদের গুষ্টিবগ্গ চেনে। গোলপার্কের মোড়ে চুন্নির বাবার ফুলের দোকানের পাশেই লাল্টুর বাবারও দোকান। দোকান মানে অবশ্য দুজনেরই একটা করে চৌকি আর মাথার ওপর প্লাস্টিকের ছাউনি । চৌকিটাতে ফুল, মালা, বাস্কেট সব সাজানো থাকে। দোকানে আগে লাল্টুর বাবা একাই বসত। লাল্টুর ইস্কুলে যাওয়ার পাট চুকেছে অনেককাল। কিন্তু সারাদিন পাড়ার মোড়ে চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিলেও দোকানের ধারপাশ মাড়াত না মোটেই। ইদানীং যে লাল্টু নিয়মিত দোকানে আসছে সেটা অনেকটাই তার টানে, বুঝতে অসুবিধা হয় না চুন্নির। ব্যাপারটা যে চুন্নির খুব খারাপ লাগে তা নয়, তবে লাল্টুকে সে পাত্তা দেয়না তেমন।

আসলে চুন্নি খুব ভাল করে জানে বস্তির অন্য মেয়েদের থেকে কিংবা ওদের স্কুলের ওই রুবি, চায়না, মালতী, প্রতিমা এদের সবার থেকে তাকে দেখতে অনেক ভাল। তাছাড়া চুন্নির মা অনেক বছর ধরে এক বাড়িতে কাজ করছে। তাদের দেওয়া-থোয়ার হাত ভাল। মালকিনের মেয়ের ছোট হয়ে যাওয়া কিংবা একটু পুরোন জামা-কাপড় মা প্রায়ই নিয়ে আসে। সেসব জামা পরে চুন্নি যখন বাইরে বেরোয়, তখন তাকে দেখলে বস্তির মেয়ে বলে বোঝা কঠিন।

তবে লাল্টুটা ইদানীং একটু বাড়াবাড়ি শুরু করেছে। একে তো সারাদিনই দোকানে বসে আছে, একেবারে চুন্নির নাকের ডগায়। ড্যাবডেবে চোখ মেলে যেন গিলছে। কাজ যে করে না তা অবশ্য বলা যাবে না। ভোরবেলা কোলাঘাট থেকে ফুল আনতে আগে বাবাকে যেতে হত। আজকাল লাল্টুই যায়। দামী ফুলের ওটাই পাইকারি বাজার। টাকা-পয়সারও দিকেও ছেলে হুঁশিয়ার। কোনও গণ্ডগোল করে না। চুন্নির বাপ জাতে মাতাল হলেও তালে ঠিক। লাল্টু হিসেবে গোঁজামিল দিলে এতদিনে ঠিক ধরে ফেলত। ফুলও ঠিকঠাক বেছে আনে। আগে বাস্কেট সাজাতে গিয়ে চুন্নিকে অনেকসময়ই অসুবিধায় পড়তে হত। যেখানে যে রঙের ফুলটি দরকার ঠিক দেখবে সেই ফুলটিই নেই। তার বাবা এতদিন ধরে ফুলের ব্যবসা করলেও এসব শৌখিন রঙ মেলানোর ব্যাপার কিছুই বোঝে না। লাল্টু কিন্তু বুঝতে পারে। এমনকী চুন্নি যে হলুদ গোলাপ একটু বেশি পছন্দ করে, সেটাও সে দিব্যি বুঝে নিয়েছে। আজকাল তাই স্পঞ্জের গায়ে রঙ মিলিয়ে ফুল গোঁজার সময় চুন্নিকে হাতড়ে বেড়াতে হয় না মোটেই।

চুন্নিদের দোকানে আগে বাস্কেট সাজানোর ব্যাপারটাই ছিল না। বাবা কোনও কালেই ওসব পারে না। তাই ঝুরো কিংবা সিঙ্গল ফুল, মালা, রিং আর স্টিকই বিক্রি হত। বড়জোর কোনও খদ্দের চাইলে দেবদারু পাতা দিয়ে আষ্টেপৃষ্টে কতগুলো ফুলকে বেঁধে দিয়ে দিত বাবা। চুন্নি তখন দোকানে বসত না। কিন্তু অন্য একটা কাজ ছিল তার। পূর্নদাস রোডে মায়ের কাজের বাড়ি। বাড়ির মালকিনকে চুন্নি মামী ডাকে। । মামী ভারি শৌখিন মানুষ। প্রতিদিন তাজা ফুল দিয়ে ঘর সাজানো অভ্যাস। তাই চু্ন্নি একটু বড় হওয়ার পরই তার কাজ ছিল, সকালে একটা প্লাস্টিকের বাড়িতে লম্বা ডাঁটির বেশ কিছু ফুল, পাতা নিয়ে মামীর বাড়ি হাজিরা দেওয়া।

চুন্নিরা যাকে বাস্কেট বলে সেটার যে আসল নাম বোকে, সেটা মামীর কাছেই শুনেছে চুন্নি। চুন্নিকে জলখাবার দিয়ে, একটা বড় কাঁচি আর গোটা চার-পাঁচ ফুলদানি নিয়ে বসে মামী ফুল সাজাতেন। খাবার খেতে খেতে সেটা দেখত চুন্নি। মাস কাবারে টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। তারপর ক্লাস নাইনে উঠে যখন পরপর দুবার ফেল করল, তখন মা বলল

আর ইস্কুলে গিয়ে কাজ নেই। তার চেয়ে বাবার সঙ্গে দোকানে গিয়ে বোস। মালা-টালাগুলো গেঁথে দিবি। হাতে হাতে সাহায্য করবি।

আপত্তি করেনি চুন্নি। সারাদিন ঘরে বসে থাকতে কারই বা ভাল লাগে। তাই দোকানে আসত রোজ। তাকে দেখে দোকানে আসা ধরল লাল্টুও। সেই সময় একদিন দুপুরবেলায় এল সেই ছেলেটা । প্রথমদিনটা স্পষ্ট মনে আছে চুন্নির, একটা হলুদ রঙের কলার দেওয়া গেঞ্জি পরেছিল আর কালো প্যান্ট। দোকানের সামনে এসে কেমন যেন নরম অথচ গম্ভীর গলায় জানতে চাইল বোকে হবে কীনা। চু্ন্নির বাবা তো প্রথমে কথাটা বুঝতেই পারেনি। তাই এককথায় না বলে দিয়েছিল। ছেলেটা তখন ভারি অনুনয়ের সুরে বলল,

দেখুন না যদি বানিয়ে দিতে পারেন। ফুল তো আপনাদের আছে। বড্ড দরকার ছিল…..

চুন্নির বাপ বোধহয় কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই চু্ন্নি বাপকে সরিয়ে দিয়ে এগিয়ে এসে বলেছিল,

বাস্কেট লাগবে তো। আচ্ছা দাঁড়ান একটু। দেখি যদি বানিয়ে দিতে পারি…….

বাপকে অবাক করে দিয়ে চু্ন্নি তাড়াতাড়ি বিশুকাকার দোকান থেকে একটা স্পঞ্জ আর ফুল সাজানোর ঝুড়ি নিয়ে এসেছিল। তারপর ঠিক যেমন করে মামী সাজায় সেটা ভেবে ভেবে চমত্কার একটা বাস্কেট বানিয়ে ফেলেছিল বেশ তাড়াতাড়িই ।

বাঃ, আপনি তো দারুণ বোকে বানান ! ইউনিক দেখতে হয়েছে। কী সুন্দর রঙের সেন্স !

কথাগুলো বলতে বলতে পাঁচশ টাকার একটা নোট বাড়িয়ে দিয়েছিল ছেলেটা। চুন্নি হাত বাড়াতে পারেনি। তার মনে হচ্ছিল ভীষণ একটা ভাললাগায় তার শরীরের হাড়গোড়গুলো কেমন যেন নরম হয়ে গেছে। চুন্নির বাপ অব্শ্য একটুও দেরি করেনি। চট্ করে টাকাটা নিয়ে দুটো দুশোর নোট ফেরত দিয়েছিল। মনে মনে একটু রাগ হয়েছিল চুন্নির। গোটা পাঁচেক জেরেনিয়াম আর গোলাপ দিয়ে সাজানো বাস্কেটটার দাম দেড়শোও হবে না। অথচ বাপ দিব্যি তিনশো নিয়ে নিল।

গজগজ করতে করতেই গুণ ছুঁচে ক্রচেট সুতো পরিয়ে রজনীগন্ধার ঝুড়িটা নিয়ে বসেছিল মালা গাঁথতে। এমন সময় বাবা এল হাতে দু-গ্লাস চা নিয়ে। মুখে চওড়া হাসি,

নে নে চা-টা খেয়ে লম্বা ডাঁটির ফুল নিয়ে বসে যা। আমি পল্টুদাকে বলে এসেছি। গোটা দশেক স্পঞ্জ আর ঝুড়ি দিয়ে যাবে একটু পরেই। মালাগুলো আমিই গেঁথে নেব।

স্পঞ্জ আর ঝুড়ি নিয়ে আমি কী করব ?

চুন্নি তো অবাক।

বাস্কেট বানাবি। তোর হাতের বাস্কেট বিক্রি হবে।

একটা বানানো দেখেই বুঝে গেলে !

মেয়ের বাঁকা কথা শুনেও সেদিন রাগ করেনি চুন্নির বাপ। বরং একটু হেসে বলেছিল,

আজ দশ-বারো বচ্ছর হয়ে গেল এই ব্যবসায় আছি। ও হল বড়বাড়ির ছেলে। ফুল কেনা অভ্যাস আছে। ওর চোখে লেগেছে মানে তোর হাতের গুণ আছে।

বাপ কিন্তু ভুল বলেনি। সপ্তাহখানেকের মধ্যেই বোঝা গেল চুন্নির হাতে তৈরি বাস্কেট খদ্দেরদের পছন্দ হচ্ছে। চারটে দোকান ঘুরে আবার ফিরে আসছে তাদের দোকানে। দু-পাঁচ টাকা বেশি দাম দিয়েও খুশি হয়ে কিনে নিয়ে যাচ্ছে। তাতে রাগ হচ্ছিল আশপাশের দোকানদারদের। লাল্টুর বাবা তো একদিন শুনিয়ে শুনিয়েই বলল,

ঘরে উঠতি বয়সের মেয়ে থাকলে যে এমন লাভের ব্যবসা হয় সেসব তো আগে জানা ছিল না । আমরা চিরকাল ভেবেছি দোকান-বাজার থেকে মেয়েছেলেদের দূরে রাখাই ভাল। এখন তো দেখছি সবই উল্টো চাল।

কথাগুলো শুনে গা জ্বলে গেছিল চুন্নির। অথচ বাপ এমন চিপটেন দেওয়া কথা বললেও লাল্টুর কিন্তু কোনও বিকার নেই।রোজ সকালবেলা ঠিক ফুলের বান্ডিলটি নিয়ে চুন্নির সামনে এসে দাঁত কেলিয়ে দাঁড়াবে। বাবাও মজা পেয়ে গেছে। ভূতের বেগার যে খাটতে চায় তাকে আর কে আটকাবে। লাল্টুর বোকামি দেখে আজকাল হাসি পায় চুন্নির। সে তো জানে লাল্টু এতকিছু করছে শুধু তার মন পেতে। কিন্তু তার মন যে কোথায় বাঁধা পড়েছে সে কি আর লাল্টু জানে !

সত্যি কথা বলতে কী চুন্নি নিজেও বোধহয় সঠিক জানে না। তার জীবনটা এখন একটা অদ্ভূত স্বপ্নের মধ্যে আটকে গেছে। সেই প্রথম বাস্কেট তৈরি করার দু-চারদিন পর একদিন সকালে সে গেছিল মামীর বাড়ি ফুল দিতে। মামী ফুল সাজাচ্ছে আর চু্ন্নি প্লেট নিয়ে বসে আছে সামনে। উল্টো দিকের দেওয়ালে একটা মস্ত টিভি। টিভিতে খবর চলছিল বলে চুন্নির সেদিকে কোনও মন ছিল না। কিন্তু হঠাত্ একটা বিজ্ঞাপনে তার চোখ আটকে গেল। রাস্তার ধারে একটা ফুলের দোকান। একটা মেয়ে ফুল বিক্রি করছে। একটা সুন্দর দেখতে ছেলে এল ফুল কিনতে। বোঝা গেল যে ছেলেটা প্রায়ই ওখান থেকে ফুল কেনে। মেয়েটা ফুলের তোড়াটা বানাতে বানাতে বলল যে আজ তার জন্মদিন, তাই সে একটু তাড়াতাড়ি দোকান বন্ধ করে চলে যাবে। ছেলেটা ফুল কিনল। পয়সা দিল। তারপর সেই বিশাল ফুলের তোড়াটা মেয়েটার হাতে দিয়ে বলল যে এটা তার জন্মদিনের গিফট।

চুন্নি যতক্ষণ ওখানে ছিল, তারমধ্যে দুবার দেখিয়েছিল বিজ্ঞাপনটা। আর তারপর থেকেই চুন্নি কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেল। বিজ্ঞাপনের ছেলে-মেয়ে দুটোই সাহেব। জায়গাটাও তাদের পঞ্চানন তলার বস্তি নয় মোটেই এমনকী কলকাতা শহরও নয়। তাও চুন্নির কেন জানি কেবলই মনে হতে লাগল, ওটা হল সেই ছেলেটা আর ফুলওয়ালী মেয়েটা সে নিজে।

দু-চারদিন পরে একটু একটু করে ঘোরটা কাটা শুরু হয়েছিল। কিন্তু তখনই হঠাত্ একদিন সেই ছেলেটা আবার এসে হাজির। সেদিন ছিল শুক্রবার । একটু আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে ঝকঝকে রোদ উঠেছে। চৌকিতে হেলান দিয়ে পিছন ফিরে বসে ফার্নের পাতা কাটছিল চুন্নি। উল্টোদিকে লাল্টু বসে বিড়ি টানতে টানতে আলফাল বকছে। হঠাত্ লাল্টু বলে উঠল,

এই চুন্নি ওঠ, তোর খদ্দের এসেছে।

তাড়াতাড়ি পিছন ফিরে তাকিয়েই চমকে উঠেছিল চুন্নি। আজকে একটা নীল পাঞ্জাবী পরেছে। সেও সঙ্গে সঙ্গে চিনেছে চুন্নিকে। হেসে বলল,

আজ তো বোকে তৈরি আছে। দিন একটা…..

কোনটা নেবেন বলুন ?

কমলা রঙের লিলির একটা বোকে পছন্দ করে তিনটে একশ টাকার নোট বার করে দিয়েছিল ছেলেটা। চুন্নি একটা ফেরত দিচ্ছে দেখে একটু আশ্চর্য হয়ে তাকাতে বলেছিল,

এটার দুশো টাকাই দাম।

বোকে হাতে নিয়ে নীল পাঞ্জাবি চলে যেতে পোড়া বিড়িটা ছুঁড়ে দিয়ে লাল্টুর কী খ্যাঁকখ্যাঁক করে হাসি,

আচ্ছা গাধা মেয়ে তো তুই। লোকটা তিনশ টাকা দিচ্ছিল আর তুই আবার তাকে একশ টাকা ফেরত দিলি। বড়লোকের ছেলে, গাড়ি চড়ে এসেছে গার্লফ্রেন্ডের জন্য ফুল কিনতে….কোথায় পয়সা পিটে নিবি, তা না….তোর দ্বারা ব্যবসা হবে না দেখছি।

লাল্টুর কথার কোনোও উত্তর দেয়নি চুন্নি। কিন্তু চোখে জল এসে গেছিল তার। সত্যিই কি গার্লফ্রেন্ডের জন্য ফুল কেনে ছেলেটা ? হতেই পারে। হলেই বা চুন্নির কী আসে যায়। না হলেও কি কিছু আসে যায় ? সারারাত নিজের মনের সঙ্গে তর্ক চালিয়েও কোনও লাভ হয়নি। কিন্তু সমাধান হল খুব সহজভাবে। পরের শুক্রবার আবার এল ছেলেটা। হালকা গোলাপি আর সাদা কারনেশিয়ানে সাজানো একটা বাস্কেট বেছে নিয়ে বলল,

আমি প্রত্যেক শুক্রবার আমার দিদিমার সঙ্গে দেখা করতে যাই। দিদিমার অনেক বয়স। চলা-ফেরা করতে পারেন না। কিন্তু খুব ফুল ভালোবাসেন। আপনার বানানো বোকে দিদিমার খুব পছন্দ হয়েছে। এবার থেকে শুক্রবার আপনি আমার জন্য একটা বোকে বানিয়ে রাখবেন। আপনার পছন্দমতই বানাবেন। আমি এসে নিয়ে যাব।

চুন্নির বাবা সেদিন দোকানে ছিল। সঙ্গে সঙ্গে হেঁ হেঁ করে হেসে বলল,

নিশ্চয় স্যার। কিন্তু আলাদা করে বানাতে হলে তো টাকাটা একটু……

ও নিয়ে ভাববেন না। ভাল ফুল দিয়ে সুন্দর করে বানাবেন শুধু।

তারপর থেকে সারাটা সপ্তাহ চুন্নির কাটে শুক্রবারের অপেক্ষায়। শুধু ভাবে, কীভাবে তৈরি করবে এবারের বাস্কেট। কেমন করে চমকে দেবে ছেলেটাকে। উল্টেপাল্টে দেখে নিজের মত করে ফুল সাজায় চুন্নি। পুরস্কারও মেলে। টাকার সঙ্গে একটা ভারি মুগ্ধ চাউনি। সঙ্গে দু-একটা অস্ফুট প্রশংসাও। সেটা কতটা ফুলের আর কতটা ফুলওয়ালীর জন্য তা বোঝা কঠিন। যদিও চুন্নির মনে হয় দ্বিতীয়টার দিকেই পাল্লা ভারি। কারণ শুধু বাস্কেট সাজানো নয়, শুক্রবার দোকানে যাওয়ার সময় একটু বিশেষভাবে সাজগোজও করে যায় চুন্নি।

বাবার এসব দিকে কোনও খেয়াল নেই। কিন্তু লাল্টু বোধহয়, ছেলেটা এলেই যে চুন্নির মুখখানা আলো আলো হয়ে যায় সেটা খেয়াল করেছে। আজকাল তাই শুক্রবারে চুন্নি বিশেষ কোনও ফুল আনতে বললে সহজে আনে না। ছেলেটা আজকাল ফুল কেনার সময় বেশিরভাগ দিনই মিনিটখানেক দাঁড়িয়ে কথাও বলে। এমনি সাধারণ কথাই। কিন্তু তবু চোখে ঘোর লাগে চুন্নির, বুকের ভিতরটা দুরদুর করে। বেশ বুঝতে পারে পাশের দোকান থেকে মুখখানা কালো করে লাল্টু ওদের দুজনকে লক্ষ্য করছে।

এমনি চলতে চলতেই যেদিন বাস্কেট দিতে গিয়ে ছেলেটার আঙুলের সঙ্গে আঙুল ঠেকে গেল চুন্নির আর মনে হল ছেলেটা যেন ইচ্ছে করেই একটু বেশিক্ষণ আঙুলটা ঠেকিয়ে রইল সেদিন রাতেই বিছানায় শুয়ে মন ঠিক করে নিয়েছিল সে। ওই বিজ্ঞাপনের মত সেও ছেলেটাকে নিজের জন্মদিনের কথাটা বলবে। টিভিতে অবশ্য দেখিয়েছিল তোড়াটা দিয়ে ছেলেটা চলে গেল। তবে চুন্নির মনে হয় আসলে সেরকমটা হবে না। কী হবে সেটা অবশ্য পুরোটা ভেবে উঠতে পারে না । হয়তো ছেলেটা ওকে নিয়ে সাউথ সিটিতে বেড়াতে যাবে। কিংবা হয়তো দুজনে মিলে চাউমিন খাবে। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থার্মোকলের প্লেটে, শিশি ঝাঁকিয়ে বার করা শস্ মাখানো চাউমিন নয়, এসি দোকানের চাউমিন। তারপর গাড়িতে করে………. নাঃ আর ভাবতে পারে না চুন্নি। আরও অনেক কিছুই হবে হয়তো। গায়ে কাঁটা দেয় তার। মনে মনে হিসেব করে চমকে ওঠে, এবছর তার জন্মদিনও তো শুক্রবারেই পড়েছে।

হলুদ রঙের চুড়িদারটা পুজোর সময় মামী দিয়েছিল। অষ্টমীর দিন যখন পরে বেরোল চায়না বলেছিল,

তোকে মাইরি আজ পুরো আলিয়া ভাটের মত দেকাচ্চে……

চায়নার কথায় হাসি পেয়েছিল চুন্নির। কিন্তু আজ চায়নার কথাটা মনে পড়ায় ওটাই বার করে পরল। দু-পাশের চুল তুলে ক্লিপ দিয়ে আটকে খোঁপা বাঁধল আলগা করে। তারপর বেশ বেলা করে দোকানে হাজির হতে, লাল্টুর তো চোখ কপালে। ঘুরছে-ফিরছে আর লুকিয়ে লুকিয়ে তাকাচ্ছে। দু-চারজন খদ্দের এসেও চোখ দিয়ে বুক-পাছা চেটে গেল। চু্ন্নি কিন্তু আজ কোনও কিছুতেই ভ্রুক্ষেপ করছিল না। তার মন শুধু একজনের অপেক্ষায় আকুল। গোলাপি জারবেরা আর হলুদ গোলাপ দিয়ে একটা সুন্দর বাস্কেট তৈরি করল যত্ন করে। জারবেরাগুলো অনেকটা সূর্যের ছটার মত করে বসিয়ে নিচে গোলাপ দিল। মাঝে মাঝে ফার্ন আর সাদা জিপসি। বাস্কেটটা যখন বানাচ্ছে, তখন লাল্টু যে তীক্ষ্ণ চোখে তাকে লক্ষ্য করছে বুঝতে পারছিল চুন্নি।

লাল গাড়িটা আজ এল একটু দেরি করে। গাড়িটাকে গলির মোড়ে বাঁক নিতে দেখেই বুকের মধ্যে ধুকপুক শুরু হয়ে গেছিল চুন্নির। গাড়ি থেকে নেমে সে এসে দাঁড়াল দোকানের সামনে। চুন্নির সাজগোজ যে লক্ষ্য করেছে বোঝা যাচ্ছে চোখ দেখেই,

কী ব্যাপার আজ কোনও স্পেশাল ডে মনে হচ্ছে…..

আজ আমার জন্মদিন…..

কোনওরকমে কথাগুলো বলেই চোখের পাতা নেমে গেল চুন্নির। গালের লাল আভা লুকোতে পিছন ফিরে বাস্কেটটা নিতে গিয়েই দেখল লাল্টু দাঁড়িয়ে আছে। শুনেছে নিশ্চয় কথাটা। পাত্তা দিল না চুন্নি। ঠিক সেই সময় মোবাইলটা বেজে উঠল। চুন্নির দিকে তাকিয়েই ফোন ধরে কিছু শুনল ছেলেটা। তারপর হেসে বলল,

বেশ তো। তুমি নিজেই পছন্দ করে নাও। দিদারও তোমার টেস্ট কেমন সেটা জানা দরকার।

চু্ন্নি দেখল লাল গাড়িটা থেকে নেমে এদিকেই আসছে একটি মেয়ে। লং স্কার্টের সঙ্গে টাইট টপ। সোজা চুলগুলো ঝর্নার মত পিঠে খোলা। মেয়েটা এসে ছেলেটার হাতের মধ্যে হাত জড়িয়ে দাঁড়াল। তারপর সাজিয়ে রাখা বোকেগুলো থেকে একটা সাদা গ্ল্যাডিউলি আর গোলাপি লিলির বাস্কেটের দিকে আঙুল তুলে বলল,

এইটা নিই। বয়স্ক মানুষ তো। সাদা ভাল লাগবে।

এটার কিন্তু দাম একটু বেশি।

বাবা কখন এসে পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেনি চুন্নি।

ঠিক আছে, কত বলুন…..

ঠিক প্রথম দিনের মতই একটা পাঁচশ টাকার নোট বাড়িয়ে দিয়ে বোকেটা তুলে নিয়ে চলে গেল দুজনে।

সন্ধে নেমে গেছে অনেকক্ষণ। বেশ ঠাণ্ডাও পড়েছে আজ। কিন্তু কোনও গরমজামা গায়ে দেয়নি চুন্নি। শীতবোধই হচ্ছে না তার। বরং মনে হচ্ছে সমস্ত শরীর যেন জ্বলে যাচ্ছে। মাথার ভিতর আগুন জ্বলছে। দোকান থেকে বেরিয়ে খানিক এলোমেলো ঘুরে বস্তিতে ঢোকার সময় দেখল মণিদার ফুচকার দোকানের পাশেই লাল্টু দাঁড়িয়ে। চু্ন্নিকে দেখেই এগিয়ে এসে বলল,

ফুচকা খাবি ? আয় না…..

এক ঝটকা মেরে লাল্টুর দিকে খর চোখে তাকিয়ে এগিয়ে চলে এল চুন্নি। কিন্তু বাড়ির কাছে পৌঁছে মনে হল, খুব ঝাল দিয়ে অনেকগুলো ফুচকা খেলে বোধহয় জ্বালাটা একটু কমবে । মণিদার দোকানে দুটো মেয়ে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাচ্ছে। ধারপাশে লাল্টু নেই দেখে নিশ্চিন্তে এগিয়ে এল চুন্নি। গুঁড়ো লঙ্কা দিয়ে লাল করে মাখা ফুচকাগুলো গলা দিয়ে নামছিল যেন জ্বলতে জ্বলতে। শেষকালে বাটিতে একটু বাড়তি তেঁতুল জল নিয়ে মুখে ঢেলে, দোনাটা ময়লার বালতিতে ফেলতে গিয়ে চমকে উঠল চুন্নি। আধো অন্ধকারে বালতি ভরা শালপাতার ওপর চুপটি করে শুয়ে আছে দুটো হলুদ রঙের আধফোটা গোলাপ ।

দীপান্বিতা রায়
বাংলা সংবাদ চ্যানেলের দায়িত্বপূর্ণ চাকরি সামলে নিয়মিত কলম ধরেন শিশু-কিশোর পাঠকদের জন্য | বঞ্চিত হন না সাবালক পাঠকমহলও | উল্লেখযোগ্য বই ‘রূপকথার অরূপরতন’, ‘গুপীবাঘার পোলাপান’, ‘বাহনের বায়নাক্কা’ এবং ‘স্বপ্নে বাঁচা’ |

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here