অম্লানকুসুম চক্রবর্তী
অম্লানকুসুমের জন্ম‚কর্ম‚ধর্ম সবই এই শহরে|বাংলা ছোটগল্পের পোকা|একেবারেই উচ্চাকাঙ্খী নয়‚অল্প লইয়া সুখী|

দমদম থেকে বাবুঘাট যাওয়ার সময় একবার এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। বাসে। উনিই আলাপ করেছিলেন গায়ে পড়ে। বাসে উঠে ওনার পাশে বসা ইস্তক দেখেছিলাম, প্রতি দশ সেকেন্ড অন্তর অন্তর ওনার ডানহাতটি কপিকলের মতো একবার কপালের দিকে উঠছে। কপালে ঠেকিয়েই সেখান থেকে চিবুক পর্যন্ত ওই হাত উপর নিচ করছে ঝপাঝপ, ফড়িংয়ের ডানার মতন। হাত শান্ত হতে না হতেই আবার। রাস্তার দিকে তাকিয়ে বুঝেছিলাম, হাতের এই চলনের কারণটা আর কিছু না, মন্দির। শনি, কালী, শিব, শীতলা, রাধাকৃষ্ণ, বজরংবলী মায় হনুমান—কোনও মন্দিরই বাদ যাচ্ছিল না। ওদিকে ওনার চোখ ঢুলুঢুলু। আমার গায়ে ঢলে পড়ার আগে বলেছিলেন, ‘ভাই কিছু যদি মনে না কর, তাহলে মন্দির দেখলে আমায় আলতো করে একটু খোঁচা মেরো। ঠাকুর মিস করে গেলে মুস্কিল। আমি বরং একটু ঘুমিয়ে নিই।’ আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘মিস করলে কি হবে?’ উনি উপরের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলেছিলেন, ‘ঠাকুর রাগ করে।’ এরপর প্রায় আধঘণ্টা ধরে আমার খোঁচা আর ওনার প্রণাম চলেছিল। মাঝে কয়েক বার মৃদু নাক ডাকার আওয়াজও পেয়েছিলাম। কিন্তু ওই অবস্থাতেও প্রণাম মিস যায়নি।

Banglalive

স্কুলজীবনের এক বন্ধুর কথা মনে পড়ে। দেবমাল্য দে। বছরের অন্য সময়ে ঠাকুরদেবতারা ওর কাছ থেকে একটি মালাও পেতেন না। কিন্তু পরীক্ষা এলেই ওর ভক্তিভাব প্রবল হত। স্কুলের পাশেই এক মন্দির ছিল। পরীক্ষা শুরুর আগে আমরা যখন গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে এক ঢোকে একটা আপেল গেলার মতো খাবি খেতে খেতে পড়া ঠুসতাম মাথায়, দেবমাল্য তখন পাশের মন্দিরে প্রায় ধ্যানমগ্ন। করবদ্ধ হাতের মধ্যে যেন কেউ লাগিয়ে রাখত হাতিও আলাদা করতে না পারা সেই আঠা। শেষ বেল পড়ার পরে হন্তদন্ত হয়ে পরীক্ষার হলে ঢুকত ও। এদিকে টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশানস অ্যাপ্লায়েড ভক্তিভাবে চ্যাম্পিয়ন দেবমাল্য ছিল টোকাটুকিতেও এক নম্বর। চোতায় থাকত পুরো সিলেবাস। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মশাই হায়ারোগ্লিফিক উদ্ধার করতে পেরেছিলেন, কিন্তু দেবমাল্যের চোতা উদ্ধার করতে পারতেন না। জীবাণুর মতো অক্ষরপুঞ্জ চোতাগুলো থেকে গুণগুণিয়ে উঠে আসত দেবমাল্যর খাতায়। পরিদর্শকের মাইক্রোস্কপিক চোখ তা টের পেত না। দেবমাল্যকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, চুপিচুপি। ‘পরীক্ষার আগে হাত জোড় করে ঠাকুরকে অত কি বলিস ভাই?’ ও বলেছিল, ‘আমি শুধু বলি ঠাকুর যেন কমন পাই। মানে চোতায় যা আছে আর কি।’ একবার পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে দেখেছিলাম ওর মুখে টুথপেস্ট বিজ্ঞাপনের হাসি। শুধিয়েছিলাম, ‘কেমন হল পরীক্ষা?’ দেবমাল্য বুকপকেটে রাখা চোতা অমনিবাসের দিকে হাত দেখিয়ে বলেছিল, ‘আমার যা আছে তার সকলি তোমারে দিতে পারিনি নাথ!’

আরও পড়ুন:  সাগর আই লাভ ইউ‌ (পর্ব ২৬)

মানুষের ভক্তির গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। পাড়ার শনিমন্দিরগুলোতে শনিবারের ভিড় দেখলেই তা মালুম হয়। ভিড় ক্রমশ বেড়েই চলেছে। শনিঠাকুরের চোখের দিকে নাকি তাকাতে নেই, তাকাতে হয় পায়ের দিকে। প্রতি শনিবার মন্দিরগুলোতে কিছু ভিড় চোখে পড়ে। সবারই মাথা হেঁট। শিশুদের সাদা মনে কাদা নেই। দেখেছিলাম, একটি বাচ্চা ছেলে শনি মন্দিরে গিয়ে যত বার মাথা উপরে তুলছে, মা প্রবল বিক্রমে সেই মাথা নামিয়ে দিচ্ছেন। শনিঠাকুরের পায়ের দিকে তাকানো নাকি অশনি। বেশ কয়েক বার মায়ের এমন ‘অত্যাচার’ সহ্য করার পরে শিশুটি বলে উঠেছিল, ‘মাম্মি! তুমিই তো বলো মাথা উঁচু করে চলতে। দেন?’ মা বলেছিলেন, ‘এসব কথা বলতে নেই। ঠাকুর কিন্তু পাপ দেবে।’ অন্য দিকে দেখেছি, হনুমান মন্দিরের সামনে দেদার বিকোচ্ছে নারকেল। এসব মন্দিরে এখন অবাঙালিদের থেকে বাঙালিদের ভিড়ই বেশি। শটপুটের মতো বাঙালি সেই নারকেল ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফাটায়। আর প্রতি নারকেলে উথলে ওঠে পুণ্যের পয়েন্ট।

এই পুণ্য ব্যাপারটা কিন্তু খুব গোলমেলে। ছোটবেলায় গুরুজনরা বলতেন, ভাল কাজ করলে নাকি পুণ্য হয়। তখন ভাল কাজ মানে জানতাম পড়াশুনো। লেখাপড়া করে যে, গাড়িঘোড়া চড়ে সে। ভাল করে লেখাপড়া করলে হয়তো ভাল দেখে একটা চাকরি হয়। মাসের শেষে মোটা মাইনে আসে। জামার কলার উঁচিয়ে বলা যায়, অ্যাডভান্স ট্যাক্সটা দিয়ে দিলাম আজ। ফ্যাট পে স্লিপের সঙ্গে পুণ্যের সম্পর্কটা সমানুপাতিক না ব্যস্তানুপাতিক তা আজও বুঝে উঠতে পারলাম না। ওদিকে নামজাদা মন্দিরে গিয়ে দেখি, স্পেশাল দর্শনের জন্য স্পেশাল লাইন। আর স্পেশাল লাইনে দাঁড়ানোর জন্য গাঁটের কড়ি খরচা করতে হয় ভালই। ফ্রি লাইনে ঠাকুর দেখা হয়, স্পেশাল লাইনে বিগ্রহ দর্শন। দেখার থেকে দর্শনে কি পুণ্যের পয়েন্ট বেশি জমে ভাঁড়ারে? উত্তর মেলে না। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে গিয়ে দেখেছি, প্রভু জগন্নাথের থেকে অনেক বেশি তেজিয়ান ওই মন্দিরের পান্ডারা। পান্ডাদের প্রত্যেকের গলাতেই সোনার মোটা চেন। হাতে সোনার ব্রেসলেট। চুম্বকের পিছনে আলপিন যেমন করে ধেয়ে চলে, ঠিক তেমন ভাবে মন্দিরে আসা লোকদের রীতিমতো ধাওয়া করেন ওই পান্ডারা। নিজের মতো করে মন্দির দেখার সত্যিই কোনও উপায় নেই। জগন্নাথ মন্দিরে এহেন এক পান্ডা আমায় পাকড়েছিলেন সম্প্রতি। হাজার এক টাকার পুজো আমাকে দিয়ে দেওয়ালে যেন ওনার মোক্ষলাভ। মুক্তি পেতে শেষ পর্যন্ত ওনার পা ধরতে হয়েছিল। সুবিধা করতে না পেরে মাছি তাড়ানোর মতো উনি আমায় বলেছিলেন, ‘প্রভু তুমাকু ক্ষমা করিব নি।’ আসল প্রভু যে কে, আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে বুঝিনি।

আরও পড়ুন:  বাঘ-টাঘ

পরমেশ্বরের কাছে বোধ হয় কোনও চেকলিস্ট আছে। উনি মনে রাখেন, মেলান এবং লিস্টে টিক্ দেন। তাঁর ভক্তকুল কিন্তু বেশ ডিপ্লোম্যাটিক। আমার এক পরিচিত কাকীমা আছেন। কোনও এক রবিবার দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরে যাবেন বলে
ঠিক করেছিলেন। লোকজনদের বলেওছিলেন। কিন্তু যে কারণেই হোক, ওই দিন আর গিয়ে উঠতে পারেননি। তাঁর ধারণা হয়, যাব কি যাব না ভেবে ভেবে হায় যাওয়া তো হল না-র কারণে মা ভবতারিনী হয়ত তাঁর উপর রাগ করেছেন। ওই কেলেঙ্কারির পর থেকে তিনি আর মন্দিরে ‘যাব’ বলা ছেড়ে দিয়েছেন। বলেন ‘যাওয়ার ইচ্ছে আছে।‘ একূল ওকূল দুটোই রইল। উনি আবার শুদ্ধ আচারে বিজয়িনী । মন্দিরে যখন যান, সঙ্গে এক লিটারের গঙ্গাজল ভরা বোতল নিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর পরই নিজের গায়ে ছেটান। পথচলতি ম্লেচ্ছ লোকদের গায়ের স্পর্শ লাগলে যদি শুদ্ধভাব কমে এই ভেবে। একবার ট্যাক্সি চালকের গায়েও পিছনের সিট থেকে গঙ্গাজলের ছিটে মারার জন্য পঞ্চাশ টাকা বেশি গচ্চা দিয়েছিলেন শুনেছি। ওনার যুক্তিটা পরিস্কার ছিল। যে বাহন দেবালয়ে চলেছে, সেটি এবং তার সারথিকেও শুদ্ধ হতে হবে বৈকি। কিছু এক টাকার কয়েন গঙ্গাজলে চুবিয়ে শোধন করে নেন প্রথমে। তার পরে সেগুলো শিবলিঙ্গের মাথায় রাখেন। পুণ্যে ত্রুটি থাকে না।

আমার অফিসের এক সহকর্মীর কথা বলি। সহকর্মী বটে, কিন্তু আমি তাঁকে রিপোর্ট করতাম। বস্ আর কি। বিহারী মানুষ। মধুবনী জেলায় বাড়ি। গত আট বছর ধরে প্রমোশন না মেলায় বেজায় মুষড়ে থাকতেন। ওদিকে ওনার পুণ্যার্থে মধুবনীর গ্রামে ওনার মা-বাবা পুজো দেন। দেশের বাড়ি থেকে ফিরে এসে উনি আমায় লাঞ্চব্রেকে বললেন, ‘চলো মেরে সাথ’। আমি বললাম, ‘কোথায় স্যার?’ উনি বললেন, ‘পুছো মত্। চলো।’ ডালহৌসি চত্বরে অফিস। মিনিট তিনেক হেঁটে পৌঁছলাম ফেয়ারলি ঘাটে। উনি বললেন, ‘জয় গঙ্গা মাইয়া। সাত রুপিয়া দো। কয়েন।’ পার্স খুলে গুণে গুণে সাতটি কয়েন বের করলাম। ওনার হাতে দিলাম। আর কি আশ্চর্য। উনি টপাটপ কয়েনগুলো ফেলে দিলেন নদীতে। হাত জোড় করে ফের বললেন, ‘গঙ্গা মাইয়া কি জয়।’ জানলাম, মধুবনীর পুরোহিত বাতলেছেন, মাইয়াকে রোজ সাত টাকা করে দিলে প্রমোশন অনিবার্য। বসের পুণ্যে আমার পুণ্য। প্রথম দিন কিছু বলিনি। এমন করে দিন সাতেক চলার পর, ঊনপঞ্চাশ টাকা গচ্চা যাওয়ার পর, মুখ খুলেছিলাম। বস লাল চোখে বলেছিলেন, ‘মাইয়া তুমকো ছোড়েঙ্গে নেহি’।

আরও পড়ুন:  প্রেম, ভূত ও চুমু

ভগবান যেন রাগ না করেন, দেবতার রোষ যেন না হয়, তার জন্য আম-আদমির কর্তব্যের ত্রুটি নেই। তবে উল্টোটাও দেখেছি। পরিচিত এক ভদ্রমহিলা আছেন। নাড়ুগোপালের শ্রেষ্ঠ ভক্তদের তালিকায় প্রথম সারিতে ছিলেন এত কাল। হাত জোড় করে সারাদিন নাড়ুগোপালের কাছে এটা দাও ওটা দাও করেই জীবনের পঁয়তাল্লিশটি বছর কাটিয়ে দিলেন। সম্প্রতি ছেলের অঙ্কে একশো প্রার্থনা করেছিলেন। ফচকে ছেলের ক্লাস নাইন। মিলেছিল তেতাল্লিশ। দুতিন দিন আগে ওনাদের বাড়ি গিয়েছিলাম। দেখলাম, যে নাড়ুগোপালের গায়ে শীতকালে জামার উপর পরানো হত জরির কাজ করা জমকালো সোয়েটার, সেই গোপালের জামাটা কোনওমতে আলগোছে বাঁধা। সোয়াটার দূর অস্ত্। বাঁশি নেই। নেই সোনার ছোট্ট মুকুটটাও। সিংহাসনের কোলবালিশগুলোও হাওয়া হয়ে গিয়েছে। ঠাকুরঘরের পাশের জানালাটা হাট করে খোলা। শীতের হাওয়ায় নাচন লাগছে গোপালের এলোমেলো বসনে।

আর সেই মহিলা বলে চলেছেন, ‘লাগুক ঠান্ডা, লাগুক। তেতাল্লিশ? লাগুক ঠান্ডা, লাগুক…।’ বলেই চলেছেন।

NO COMMENTS

এমন আরো নিবন্ধ