আজব এই গ্রামে ঘরে ঘরে জন্ম নেয় যমজ শিশু

এই পৃথিবীর বুকে এমন কিছু আশ্চর্য বিষয় রয়েছে, যা দেখলে বা জানলে রীতিমতো চমক লাগে। আরও আশ্চর্য লুকিয়ে রয়েছে ভারতবর্ষের এক প্রত্যন্ত গ্রামে। কেরালার প্রত্যন্ত এই গ্রামের রাস্তাঘাট, খেলার মাঠ, স্কুল বা অফিস- সব জায়গাতেই একইরকম দেখতে দুজন মানুষের আনাগোনা চোখে পড়ে। সবথেকে মজার বিষয় হল, খেলার মাঠে যমজ খেলোয়াড়দের দেখেও বিভ্রান্ত হন দর্শকরা। বিষয়টি যেমম মজার, তেমনই আশ্চর্যের। কোচি বন্দর থেকে মাত্র ১৫০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত কেরালার মাল্লাপুরম জেলার কোদিনহি গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই যমজ। আর ঠিক এই কারণেই কেবল ভারত নয়, সারা বিশ্বের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছে এই গ্রাম। কারণ এই গ্রামেই বিশ্বের সবথেকে বেশি যমজ মানুষের বাস। এই কারণে গ্রামটি সকলের কাছে ‘টুইন গ্রাম’ নামেও পরিচিত।

আশ্চর্যের বিষয়, এই গ্রামে প্রতি ১০০০ জনের মধ্যে ৪৫ জনই যমজ। আর এই সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। কোনও এক মহিলার দুই সন্তান জন্ম নিলে তাদের চেহারায় যেমন অবিকল মিল দেখা যায়, তেমনি তিন সন্তান জন্মালে তাদের মধ্যেও দেখা গিয়েছে সাদৃশ্য। বিজ্ঞানীরা বলেন, মুখের আদলে আমাদের জিনের প্রভাব সুস্পষ্ট থাকে। আইডেন্টিক্যাল টুইনদের তো আপাতভাবে আলাদা করাই যায় না। তবে জিনের পরিবর্তনের ফলেই এমনটা হচ্ছে কি না তা এখনই স্পষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না। তার অন্যতম কারণ হল, ওই গ্রামের মহিলারা বিয়ের পর অন্য গ্রামে গিয়েও যমজ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন, এমন নজিরও রয়েছে।

২০০৮ সালের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যাবে, এই গ্রামে জন্ম নিয়েছিল ২৬৪ যমজ শিশু, সংখ্যাটা বেড়ে বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ৪৫০-এ৷ সারা বিশ্বে যমজ সন্তান প্রসবের যে হার, কেরালার এই গ্রামে তা প্রায় ছয় গুণ বেশি৷ গ্রামের ৮৫ শতাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী হলেও হিন্দুদের মধ্যেও যমজ সন্তান জন্মের হার একইরকম৷ তবে যমজের জন্মের এই আশ্চর্য ঘটনা বিশ্বে কেবল কেরালার কোদিনহিতেই নয়, ঘটেছে আরও দু’টি গ্রামেও৷ সেগুলি হল, নাইজেরিয়ার ইগবো ওরা এবং ব্রাজিলের ক্যানডিডো গডোই নামক গ্রামে৷ এই দু’টি গ্রামের যমজ সন্তান জন্মের ব্যাখা পাওয়া গেলেও আজকের যুগে এসেও বিজ্ঞানীরা সঠিকভাবে কোদিনহির ব্যাখ্যা দিতে পারছেন না৷

গ্রামটিতে যমজ শিশু জন্মের এই ধারা শুরু হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ৬০-৭০ বছর আগে৷ তারপর থেকে যমজের সংখ্যা এরপর ক্রমাগত বেড়েই চলেছে৷ দেখা গেছে, বিয়ের পর কোনও মহিলা অন্য কোনও গ্রাম থেকে এই গ্রামে এলে তিনিও যমজ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন৷ এখানকার স্থানীয় চিকিৎসকদের কথায়, এই গ্রামে সন্তান জন্মের জন্য কোনো কৃত্রিম পদ্ধতি অবলম্বন করা হয় না৷ সাধারণত কমবয়সি মহিলারাই প্রথমবারের মাতৃত্বে এমন যমজ সন্তানের অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন৷ আর গ্রামবাসীরা তো যমজ জন্মের এই ব্যাপারটিকে ঐশ্বরিক আশীর্বাদ বলেই ধরে নিয়েছেন৷ গ্রামে ঢোকার মুখেই চোখে পড়বে রাস্তার পাশের একটি সাইনবোর্ড যেখানে লেখা আছে, ‘ঈশ্বরের নিজের যমজদের গ্রামে স্বাগত।’ সেখান থেকে রাস্তাটা সোজা চলে গিয়েছে কোদিনহিতে। পাশাপাশি একাধিক ঘিঞ্জি ঘরবাড়ি সম্বলিত একটা ছোট্ট গ্রাম। অভাবের ছাপ স্পষ্ট বাড়িগুলির দেওয়ালে, উঠোনে, ঘরের আনাচ কানাচে।

গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক যমজরা এখনও বেঁচে আছেন৷ সেখানকার সত্তর বছরের দুই বোনের দাবি, সবটাই ঈশ্বরের আশীর্বাদ৷ বিজ্ঞান এখানে কিছুই করে উঠতে পারবে না৷ তাঁরা তো যমজ পেরিয়ে এখন একসঙ্গে তিনটি এমনকী চারটি সন্তানও যমজ জন্মাতে দেখছেন৷ তবে বিজ্ঞানীরা হাল ছেড়ে দেননি৷ যমজ জন্মের নেপথ্যে জেনেটিক, অর্থাৎ জিনগত নাকি আবহাওয়ার কারণ দায়ী, তা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে৷ বিভিন্ন দেশ থেকে বিজ্ঞানীরা ভগবানের এই আপন দেশে এসে যমজদের বিভিন্ন জৈবিক নমুনা সংগ্রহ করে চলেছেন৷ এতদিন পর্যন্ত সেখানকার প্রশাসন চুপ থাকলেও ২০০৬ সাল থেকে আরও বেশ কয়েকটি পরিবারে যমজ সন্তান জন্ম নেওয়ার পর থেকেই নড়েচড়ে বসেছে তাঁরা। এর কারণ অনুসন্ধানে তৎপর হয়ে উঠেছেন চিকিৎসকরা। শুধু তাই নয়, এই যমজদের সুরক্ষার জন্য সমিতিও গড়ে উঠেছে৷ দুঃস্থ যমজদের পরিবারকে সাহায্যের জন্য এই সমিতি গড়ে তোলা হয়েছে৷ ভারতবর্ষে এমন সমিতি আর নেই৷

তবে চিকিৎসকদের পাশাপাশি বিজ্ঞানীরাও এর কারণ অনুসন্ধানে নেমেছেন। ২০১৬ সালের হায়্দ্রাবাদের সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজি, কেরল ইউনিভার্সিটি অব ফিশারিজ অ্যান্ড ওসেন স্টাডিজ কোদিনহিতে এসে গবেষণার কাজ শুরু করেছে। এমনকী লন্ডন এবং জার্মানি এসেছেন বেশকিছু গবেষক। তাঁরা ইতিমধ্যেই যমজ ছেলেমেয়েদের চুল, নখ, থুতুর নমুনা সংগ্রহ করেছে।  গবেষকদের অনেকের কথায় ‘এই ঘটনা একেবারেই কাকতালীয়, তা নয়। এর পিছনে অন্য কোনও কারণ রয়েছে। তবে শুধু শারীরিক গঠন নয়, এর জন্য অন্যান্য নানা বিষয় দায়ী হতে পারে। যার সঠিক কারণগুলি খুঁজে বের করার চেষ্টায় রয়েছেন তাঁরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.