মা ষষ্ঠীর কৃপায়

অসহ্য গরমকাল। প্রখর দাবদাহ। যেমন তাপমাত্রা, তেমনি আপেক্ষিক আর্দ্রতা। এ বলে আমায় দেখ, ও বলে আমায়। বাজারে এখন এসে গেছে নতুন শব্দ, অস্বস্তিসূচক। কী এর মানে? ওই তাপমাত্রার সঙ্গে আপেক্ষিক আর্দ্রতা নিয়ে আঁকজোক কষে বলা, মানুষ গরমে কতটা হাঁসফাঁস করবে বা করেছে।

এহেন ভীষণ গরমে জমজমিয়ে আসে জামাইষষ্ঠীর তিথি। আইটি বা সমতুল কিছু কাঁপানো নতুন জামাই ভাইটি এদিন খুব নধর বনে যান কোন জাদুতে। কান এঁটো করা হেঁহেঁ এক্সপ্রেশন ছাড়া সেদিন সে জানেই না বিল্লি কীভাবে মারতে হয়। আধুনিকা ললনাটিও ড্যাশিং অবতার পালটে সেদিন শাড়িতে-গয়নায় আর আ-কনুই ব্লাউজে কচিটি হয়ে যান। আদিম রীতি মেনে জামাইষষ্ঠীর প্রাতে আমাদের বর-বাবাজি বউ-বগলে উপস্থিত শ্বশুরবাড়ির দরজায়, ডিংডং।

এবার শুরু হয়ে যায় কত বেশি কত ভালো সব পরিবেশন করা যায় তার প্রতিযোগিতা। এ প্রতিযোগিতা গোপন, নিজের আত্মার সঙ্গে নিজের একান্ত আত্মজন জামাই বাবাজির। নকুড়ের সন্দেশ থেকে বাঞ্ছারামের দই। বাজার চষা গাছপাকা হিমসাগর, ল্যাংড়া আম, আঙুর মুসুম্বি ইত্যাকার ফলমূলাদি, ফ্রুটজুস। দুপুরের খ্যাঁটে বাধ্যতামূলক ইলিশ ও চিংড়ির সহাবস্থান। পোলাও আর পাঁঠার মাংস ছাড়া বাঙালি মূলপদ কিছু হয় নাকি! বিকেলে আরেক প্রস্ত চায়ের সঙ্গে টা হিসেবে নোনতা এটাসেটা। রাত্তিরে চাইনিজ। ওটা মেয়ের আবদারে। চায়না টাউন স্পেশ্যাল।

অন্য রকমও চোখে পড়ে। যখন একাধিক জামাই এসে মেশে, তখন শ্বশুরমশাই আড়ালে মুচকি হাসে। এক জামাই মহার্ঘ্য শাড়ি আনে শাশুড়ি-মায়ের, তো আরেকজন দুকাঠি এগিয়ে, শ্বশুর-বাবার জন্য ট্যাব এনে ড্যাবড্যাবায়।

বাংলা টিভি সিরিয়ালে আবার সাক্ষাৎ স্বর্গ নেমে আসে। সেখানে প্রৌঢ় দুই কি তিন ভাই এখনো এক হাঁড়িতে আবদ্ধ, দায়বদ্ধ। একটিই বাড়ি তাদের, প্রাসাদোপম। তাদের প্রত্যেকের আবার একটি করে জামাই এসে জামাইষষ্ঠী একেবারে মাতোয়ারা করে তোলে। হরিবোল!

একটা সময় ছিল, এই জামাইষষ্ঠী উপলক্ষে বাংলা সিনেমা রিলিজ করত। আজও করে কখনো। তবে শ্যালিকাদের আবদার মেনে তাদেরকে আতুপুতু করে জামাইবাবু আর হলে নিয়ে গিয়ে বাংলা সিনেমা দেখেন না তেমন। বাঙালি জামাইবাবুর একটা বড় অংশই এখন ‘জিজু’-তে আরামপ্রদভাবে কনভার্টেড। স্মার্ট শ্যালিকাদের জন্য সেদিন তার বা তাদের জিজু নিয়ে আসে সদ্যমুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমার লিঙ্ক। শ্যালিকা ও জিজুর মোবাইল সেট দুটি টেবিলে পাশাপাশি বসে ফাইল ট্রান্সফার অ্যাপসের মধ্যে দিয়ে আপসে মিটিয়ে নেয় নিজেদের যতেক আবদার, মিঠে খুনসুটি। যত নতুন সিনেমা যত ভালো প্রিন্টে ডাউনলোডেড, তার তত দর এখানে।

জামাইষষ্ঠী এবং ভাইফোঁটায় নাকি কলকাতা তথা ভারতে বাণিজ্য করতে আসা বিলিতি সওদাগরি সংস্থাগুলো, ওই স্বাধীনতার পরে পরেও, যতদিন নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে পেরেছিল, ‘ফার্স্ট হাফ রিল্যাক্সেশন’ রাখত। অর্থাৎ এই দিনদুটিতে একটু দেরি করে এলে লেট মার্ক পড়বে না। বদলে, যতক্ষণ লেট হল, সেই সময়টুকু বিনা ওভারটাইমে কাজ করে দিতে হবে কেরাণিদের, অন্য কোনওদিন। সে দিনকাল আর নেই। তবে আজও, রাস্তাঘাট ট্রেনবাস বেশ ফাঁকাফাঁকা থাকে দিনটিতে।

শাশুড়ির জন্য দিনটি কিন্তু উপোস আর নিরামিষে ভরা। পরিবার অনুযায়ী প্রথার রকমফের থাকলেও এটা মোটের ওপরে একই থাকে যে, জামাইকে কিছু খাইয়ে তবেই শাশুড়ি দাঁতে কিছু কাটতে পারবেন এই দিন। আবার ঘরের মেয়েরও উপোস, যদি তার কোল আলো করে একটি ছেলে এসে যায়। কী কনট্রাস্ট ভাবুন, জামাই বাবাজি খাচ্ছেন কবজি ডুবিয়ে, সঙ্গে শ্বশুর বা শালারাও, কিন্তু নেপথ্যের কারবারিরা রসে বঞ্চিত রয়ে যাচ্ছেন!

ক্রমে চালু হল দিনের দিন ছেড়ে কাছাকাছি এক ছুটির দিনে সব হোক জমিয়ে। এতে কর্পোরেট জামাই বা কর্মরতা মেয়েকে অফিসে ‘অকওয়ার্ড’ জামাইষষ্ঠীর ছুটি নিতে হয় না। নতুন বিয়ের প্রথম বছর জামাইষষ্ঠী ঠিক আছে। তারপর যেন একটু কেমন কেমন, গাঁইয়া। আর এই অন্য ছুটির দিনে নেপথ্যে থেকে যেতে হয় না শাশুড়ি-মা বা ছেলের মাকে।

হ্যাপা কমাতে ক্যাটারিং তো আগেই ছিল, এখন ট্রেন্ড অন্য। দিকে দিকে অনেক বাঙালি রেস্তোরাঁ। তারা ছাড়ছে জামাইষষ্ঠী ইস্পেশ্যাল মেনুসম্ভার। ফলে গায়েগতরে খেটে ঘেমে অস্বস্তিসূচক আরও না বাড়িয়ে টুক করে অর্ডার করে দিলেই হল। টেবল বুক করে গিয়ে খেয়ে আর খাইয়ে এসো। ছিমছাম শীতাতপহীন ফিনিশিং। বা পার্সেল করিয়ে নিলেও হয়। ক্রস কালচারের গিঁট এতে আরও পোক্ত হয়। ঘটি পরিবার বাঙাল জামাইকে কচুর লতি, কষা শুঁটকি বা বোয়ালের কালিয়া অনায়াসে খাইয়ে দেন। উলটোটাও, বাঙাল পরিবার ঘটি জামাইকে এঁচোড়ের কোপ্তা, পটলের দোলমা বা পেঁয়াজ রসুন ছাড়া মাছের সর্ষে ঝাল সাজিয়ে দেন পাতে। জামাই মারোয়াড়ি বা জামাইয়ের শ্বশুরবাড়ি পঞ্জাবি হলেও রেস্তোরাঁরা রেডি টু সার্ভ।

অনেক পরিবারেই সেদিন জামাইয়ের সঙ্গে রাতের খাবারের আগে শ্বশুরমশাই কিঞ্চিৎ ঢুকুঢুকু করেন। এটারও স্তর আছে। কোথাও সিঙ্গল মল্ট, কোথাও বা ওয়াইন। কোথাও সকলে মিলেই গেলাসে গেলাসে উদযাপন, কোথাও আবার আজও মেয়েরা এসব কেন করবে, এমাঃ!

বাজারের কাছে বাঙালির জামাইষষ্ঠী কিন্তু এক ইভেন্ট। উশুল করতে সে দিন দশ আগে থেকেই শুরু করে দেয় প্রচার, বিজ্ঞাপন, ধামাকা অফার। আর সুযোগ খোঁজে আরও এমন ইভেন্টের, অপশনের।

পেয়েও গেছে সে। বউমা ষষ্ঠী। এখন সময় এসেছে এই প্রবণতায় আরও হাওয়া দেওয়ার। এটাকে ট্রেন্ডি করে তোলার। আর যদি এতে দু’ফোঁটা ঐতিহ্যের মিশেল এনে ফেলা যায় কোনও পুরাণ ইত্যাদি ঘেঁটে, তো জমে ক্ষীর। বউমা ষষ্ঠী তখন হয়ে যাবে ‘ইন’।

শহুরে জীবন থেকে একটু যদি বেরোন যায়? সেখানে আজও অনেক কিছুই পালটায়নি। ইন্দ্রলুপ্ত ইন্দ্রনাথ আজও আপিস ছুটি নেয় জামাইষষ্ঠীতে। এই তেতাল্লিশেও বত্রিশের বউ, তেরো বছরের ছেলে আর সাত বছরের মেয়েকে নিয়ে সে পাড়ি দেয় শ্বশুরবাড়ি। আর ইন্দ্রনাথের শ্বশুরমশাই? তিনি এই তেষট্টিতেও ফেলতে পারেন না তাঁর বিধবা শাশুড়ির আমন্ত্রণ। বড় জামাই ইন্দ্রনাথ আর ছোট জয়দেবের জন্য নিজে হাতে সব ব্যবস্থা বাজার সেরে নিজে গুটিগুটি রওনা দেন।

আবার আছেন হোমিও গাবু ডাক্তার। ভালো নাম অমরজ্যোতি মহাপাত্র। কিন্তু ডাকনামেই সে চেনা রয়ে গেল এ জীবনে। ভদ্রলোকের বাবা চাকরির কারণে কলকাতা শহরতলিতে পরিবার নিয়ে এসেছিলেন তমলুক থেকে। সংসার, ছেলেমেয়ের জন্ম। এখানেই সবার বড় হওয়া। গাবু আর ওর বাকি ভাইয়েরা স্বীয় ক্ষেত্রে নিজস্ব ছাপ রাখতে শুরু করে, বোন বড় হয়। বিয়ে হয় সকলের। সবকটি সম্বন্ধ শেষমেশ তমলুকেই। যেভাবে পারিবারিক কৌলীন্য বজায় রাখা হয় আরকী! আর এখন, বেশ পসার জমানো ডাক্তারবাবু, পঞ্চাশ পেরনো বয়সেও, প্রতি বছর নিয়ম করে নোটিশ সাঁটিয়ে দেন বাড়ির সামনের চেম্বারের দরজায় – জামাইষষ্ঠীর জন্য আগামী অমুক থেকে তমুক তারিখ ডাক্তারখানা বন্ধ থাকিবে।

শহর থেকে মফস্‌সল দেখা হল। এবার যদি আমরা আন্তর্জালে পা রাখি। জামাই বড় অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে বিদেশে, মেয়েও। ওদের বাচ্চাও ওখানেই হল। এখুনি দেশে আসার প্ল্যান নেই। শাশুড়ি জামাইষষ্ঠীর আগের সন্ধেয় স্বামীকে ফর্দ ধরিয়ে রিকশা ডাকিয়ে বাজারে পাঠিয়েছে। পরের দিন সকাল সকাল তৈরি করেছে জামাইয়ের পছন্দের মাংসটা চাটনিটা। খাবার টেবিলে আম-মিষ্টি-মাংস-চাটনি সাজিয়ে খচাক খচাক ফোটো তুলে ফেসবুকে জামাই আর মেয়েকে ট্যাগ করে আপলোড করে দিয়েছে – হ্যাপি জামাইষষ্ঠী বাবাজীবন। ফেসবুক করাটা মেয়ে শেষ যেবার এসেছিল দেশে, হাতে ধরে শিখিয়ে দিয়েছিল যে!

কলেজবেলার বান্ধবী ছবিতে ঈষৎ ট্যারা কমেন্ট করে সঙ্গে সঙ্গেই, ফালতু খাটতে গেলি, ছবিগুলো নেট থেকে ডাউনলোড করেও পোস্টাতে পারতিস। হুঁ, গা পিত্তি জ্বলে যায়। মেজাজ এক লাফে পদ্মাদেবী থেকে ছায়াদেবী হয়ে যায় আমাদের শাশুড়ি ঠাকরুনের। সাইন আউট করে ও। সংসারের হাজার কাজ বাকি পড়ে।

দুপুরে বিছানায় গা-টা এলিয়ে আবার অন করে ল্যাপটপ। দেখে সেই ছবিওয়ালা পোস্ট মা ষষ্ঠীর কৃপায় লাইকে কমেন্টে শেয়ারে ভরভরতি তরঙ্গে তরঙ্গায়িত এখন, আকাশে বাতাসে। আহ্‌।

Advertisements

3 COMMENTS

  1. খুব ভালা হযেছে… তবে আরও একটু নিঙড়োলে আরও একটু বেশি রস পাওয়া যেত .. আপনি যদি পান তো “বিরুপাক্ষের ” র লেখা কিছু পড়তে পারেন.. এতে আপনা স্টাইল তা আরও খুলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.