দু দুবার বিয়ে হয়েছিল | কিন্তু স্ত্রী বিয়োগে সংসার ফাঁকা | পৈতৃক সম্পত্তি বিষয় আশয়ে মন বসে না রাজচন্দ্রের | থাকেন উদাসী হয়ে | একদিন নৌকায় যাচ্ছিলেন হালিশহর দিয়ে | গঙ্গার ঘাটে তখন স্নানের ভিড় | চোখ আটকে গেল তরুণ রাজচন্দ্রের | বন্ধুদের সঙ্গে স্নান করছে‚ খেলছে এক বালিকা | রূপ যেন আলো করে আছে | তাকে দেখে নৌকায় মন উচাটন |

Banglalive

আবার ঘর বসাতে ইচ্ছে হল | কিন্তু ঘর বংশ কিছুই জানা হয়নি বালিকার | লোক পাঠিয়ে খবর এল‚ বালিকার বাড়ি হালিশহরের কোণা গ্রামে | বাবা হরেকৃষ্ণ দাস সামান্য চাষি | জাতে মাহিষ্য | সামাজিক পরিচয়ে অবস্থানে বহু পিছিয়ে | কিন্তু তরুণ রাজচন্দ্র অনড় | বিয়ে করলে ওই মেয়েকেই করবেন | তখন কলকাতায় বইছে ব্রাহ্ম আন্দোলনের উদার বাতাস | স্বাদ পেয়েছেন রাজচন্দ্রও | জাতপাত নিয়ে ভাবতেই চাইলেন না | 

আদরের ছেলের আব্দার ফেলতে পারলেন না বাবা মাও | প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে কলকাতার বিশাল বাড়িতে বৌ হয়ে এল মাহিষ্য বালিকা | আলতা পরা পা শুধু দাসবাড়িতেই পড়ল না | পড়ল কলকাতার পুরুষশাসিত সমাজেও | শাড়ি গয়নার পুঁটুলি ওই একরত্তির মধ্যে লুকিয়ে বসেছিলেন ভবিষ্যতের রানি রাসমণি | 

# ১৭৯৩ সালে ২৮ সেপ্টেম্বর রাসমণির জন্ম | বাবা ছিলেন পরম বৈষ্ণব | নাম সঙ্কীর্তন শুনে বড় হওয়া মেয়ের উদ্যোগে পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন দক্ষিণেশ্বরের মা ভবতারিণী | বাবার কাছে বাংলা লিখতে পড়তেও শিখেছিলেন রাসমণি |

# মাত্র ১১ বছর বয়সে রাসমণির বিয়ে হয় ২১ বছরের রাজচন্দ্র দাসের সঙ্গে | রাজচন্দ্রের বাবা ব্রিটিশদের সঙ্গে ব্যবসা করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছিলেন | ছিল জানবাজারের অট্টালিকা সম বসতবাড়ি |

# বাবার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারী হন রাজচন্দ্র দাস | সামাজিক পরিচয়ে তখন তিনি বাবু রাজচন্দ্র দাস | স্ত্রী ব্যস্ত থাকতেন অন্দরমহল নিয়েই | বাবু রাজচন্দ্র দাস অত্যন্ত প্রজাদরদী দয়ালু জমিদার ছিলেন | বহু উন্নয়নমূলক কাজের অংশীদার |

# একে একে চার কন্যার জননী হন রাসমণি | পদ্মামণি‚ কুমারী‚ করুণাময়ী ও জগদম্বা | বিয়ের দু বছর পরেই মারা যান করুণাময়ী | তাঁর স্বামী মথুরামোহন বিশ্বাসের সঙ্গে বিয়ে হয় জগদম্বার | এখনও জানবাজারে রানি রাসমণির বাড়ির তিন অংশে থাকেন তাঁর তিন কন্যার উত্তরসূরীরা |

# মাত্র ৪৩ বছর বয়সে মৃত্যু হয় বাবু রাজচন্দ্রের | তারপরে জমিদারির হাল ধরেন রাসমণি | হয়ে ওঠেন রানি রাসমণি | তাঁর দোর্দণ্ডপ্রতাপের সামনে নতজানু ছিল ব্রিটিশরাও | সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি রোড ও রানি রাসমণি রোড-এর সংযোগস্থলে আছে বিশাল রাসমণি ভবন |

# ইম্পেরিয়াল বা ন্যাশনাল লাইব্রেরি‚ হিন্দু কলেজ বা প্রেসিডেন্সি কলেজের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরিতে প্রচুর অর্থ দান করেছিলেন তিনি |

# গঙ্গার জলপথ আটকে রানি রাসমণি বন্ধ করে দিয়েছিলেন জাহাজ চলাচল | ব্রিটিশদের বাধ্য করেছিলেন গরিব জেলেদের উপর বসানো পানিদারি কর প্রত্যাহার করতে | ব্রিটিশরা রীতিমতো সমীহ করত তাঁকে | 

# সতীদাহ প্রথার বিরোধিতা করেছিলেন বাবু রাজচন্দ্র ও রানি রাসমণি | স্ত্রীর কথায় বৃদ্ধাবাস ও অন্নসংস্থান তৈরি করেছিলেন রাজচন্দ্র | কলকাতায় প্রথম ব্যাঙ্কও তাঁর কীর্তি | বানিয়েছিলেন বাবু রোড | যা এখন রানি রাসমণি রোড |

# বাল্যবিবাহ রোধে ভূমিকা নিয়েছিলেন দুজনে | রাসমণি বলেছিলেন‚ বিয়ের সময় স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বয়সের ফারাক কম থাকুক | সমর্থক ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নারীকল্যাণকর কাজের | সমর্থন জানিয়েছিলেন বিধবা বিবাহ আন্দোলনে | ব্রিটিশদের কাছে দরবার করেছিলেন যাতে আইন করে বন্ধ হয় পুরুষদের একাধিক বিয়ে |

# দক্ষিণ ২৪ পরগণায় ( এখনকার সন্তোষপুর ) বিশাল জমিদারি ছিল দ্বারকানাথ ঠাকুরের | তখন সে জায়গা সুন্দরবনের অংশ | বাস কয়েকঘর ঠগীর | সেই জমিদারি রানি রাসমণির কাছে বন্ধক রেখে বিলেত গিয়েছিলেন দ্বারকানাথ | পরে সেই জায়গার প্রভূত উন্নতিসাধন করেছিলেন রাসমণি |  

# প্রয়াত স্বামীর স্মৃতিতে ১৮৩০ সালে রানি রাসমণি বানিয়েছিলেন বাবু রাজচন্দ্র দাস ঘাট | নিত্য স্নানার্থীদের সুবিধার্থে | ডোরিক গ্রীক স্থাপত্যে তৈরি সেই ঘাট এখন মুখে মুখে হয়ে গেছে বাবুঘাট |

# তাঁর বাড়িতে জাঁকজমক করে দুর্গাপুজো হতো | একবার বিসর্জনের শোভাযাত্রা আটকে দিয়েছিল ব্রিটিশরা | তিনি পরের দিন আরও বড় শোভাযাত্রা বের করলেন | এ বার তাঁকে জরিমানা করে আদালতে নিয়ে গেল ব্রিটিশরা | তিনি জরিমানা দিলেন | মামলা লড়লেন | তাতে জিতলেন | ব্রিটিশদের থেকে ফেরত পেলেন জরিমানার টাকা |

# একবার কাশীতে তীর্থযাত্রার পথে স্বপ্নাদেশ পেলেন রাসমণি | মা কালী দিব্যাদেশ দিয়ে বললেন‚ রাসমণির জমিদারিতেই হোক তাঁর মন্দির |

# বিস্তর সন্ধান করে দক্ষিণেশ্বর গ্রামে এক ব্রিটিশ সাহেবের কাছ থেকে ২০ একর জায়গা কেনেন রানি রাসমণি | আট বছর ধরে তৈরি হয় মন্দির | ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে জ্যৈষ্ঠ মাসে জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রার দিন স্থাপিত হয় বিগ্রহ | 

# কিন্তু রানি রাসমণি তো নমশূদ্র | কোনও ব্রাহ্মণ তাঁর মন্দিরের পুজারী হবেন না | শূদ্রযাচনা করবেন না তাঁরা | শেষে পণ্ডিতদের থেকে বিধান নিলেন রানি | তাঁদের কথামতো মন্দির-সহ বিশাল সম্পত্তি দেবত্র করে দিলেন নিজের গুরুর নামে | এ বার পাওয়া গেল ব্রাহ্মণ পুজারী |

# হুগলি কামারপুকুরের রামকুমার চট্টোপাধ্যায় হলেন দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের পুজারী | তাঁর মৃত্যুর পরে সেই দায়িত্ব নেন ভাই গদাধর | বাকিটা ইতিহাস |

# গদাধর চট্টোপাধ্যায়ের শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব হয়ে ওঠার আঁতুড়ঘর এই মন্দির ও পুণ্যভূমি | একবার মা কালীর সামনে বসে বিষয়চিন্তা করছিলেন রানি রাসমণি | আচমকা পিঠে এসে পড়ল পাগলা ঠাকুরের কিল | মায়ের সামনে পুজোয় বসেও অর্থচিন্তা !

# স্বয়ং জমিদারের গায়ে হাত ! সবাই বলেছিল ওই ঠাকুরকে সরিয়ে দিতে | কিন্তু রানি রাসমণি বুঝেছিলেন ইনি কেবল পুজারী নন | সাক্ষাৎ দিব্যসাধক | লোকের কথায় কান না দিয়ে জামাই মথুর বাবুকে রাসমণি নির্দেশ দিয়েছিলেন মন্দিরের পুজারী গদাধর ঠাকুরের যেন কোনও অসুবিধে না হয় |

# দিনাজপুরের ( এখন বাংলাদেশে ) বিশাল সম্পত্তি কেনেন রাসমণি | যেখান থেকে বহন করা হবে এই মন্দিরের ব্যয়ভার | ১৮৬১-র ১৮ ফেরুয়ারি শেষ হয় সেই সংক্রান্ত কাজ | পরের দিন‚ ১৯ ফেব্রুয়ারি ইহজীবন ছেড়ে মায়ের পায়ে আশ্রয় নেন রানি রাসমণি | ৬৮ বছর বয়সে |

আরও পড়ুন:  পাত্রী পরিচিত‚ শীঘ্রই বিয়ে করতে চলেছেন মহম্মদ সামি‚ বিস্ফোরক অভিযোগ হাসিন জাহানের

3 COMMENTS