অম্লানকুসুম চক্রবর্তী
অম্লানকুসুমের জন্ম‚কর্ম‚ধর্ম সবই এই শহরে|বাংলা ছোটগল্পের পোকা|একেবারেই উচ্চাকাঙ্খী নয়‚অল্প লইয়া সুখী|

কোর্মা কালিয়া পোলাও জলদি লাও জলদি লাও বলতে বলতে কি অখাদ্য কুখাদ্য আম বাঙালি খেয়ে ফেলল তা স্বয়ং ব্রহ্মাই জানেন। হার মানা হাড় পর্বে আপাতত একটা জিনিস হাড়ে হাড়ে বোঝা গেল। এত দিন রেস্তোরাঁয় গিয়ে মেনু কার্ড দেখে অনেক ভেবে চিন্তে যা অর্ডার দিয়েছি, ওয়েটাররা প্লিজ ওয়েট বলে কুড়ি-পঁচিশ মিনিট পরে প্লেটের উপরে যা হাজির করেছেন, অর্ডারের সঙ্গে তার হয়ত কোনও মিলই নেই। আমার দিদা বলতেন, সরিষার তেলে ভাজলে দুব্বোঘাষও উপাদেয়এক্ষেত্রে কর্নফ্লাওয়ারের আহ্লাদ মাখানো চিকেন ভেবে বাঘের মাসিকেই জব্দ করে ফেললাম কি না কে জানে। পাড়ার ভুলু রে, কালু রে, আমায় ক্ষমা করিস। যাহা চাই তাহা পাই না।

Banglalive

পঞ্চায়েত নির্বাচন নিয়ে হই হল্লা বাদ দিলে সম্প্রতি আপাত নিরীহ যে বস্তুটি খলনায়কের তকমা পেয়েছে তা হল ফ্রিজার। এক দিকে এই ফ্রিজারেই তিন বছর আগে ইহলোক ত্যাগ করা মাকে বাঁচিয়ে রেখে হয়ত পেনশন তুলে গিয়েছেন কোনও এক চালাক ছেলে। তিনি আবার স্বঘোষিত বিজ্ঞানীও। বিজ্ঞান পথ বাতলালে মা হয়তো জেগে উঠবেন আবার বছর কুড়ি পর। ততদিন পেনশনটাই হোক। আবার শহরের অন্য প্রান্তে এই ফ্রিজারের হিমেই ভাগাড়ের বিবিধের মিলন মহান হয়েছে। পচা গলা মানুষ বেওয়ারিশ জানতামকিন্তু আজ জানলাম, পচা মুরগি, পচা কুকুর নয়। ভাগাড়ে সোনার ফসল ফলাচ্ছেন যাঁরা, তাঁদের বিলক্ষণ বোধি লাভ হয়েছেনোলার কাছে ফর্মালিন দুয়ো পায় বছরভর।

ত্রিফলা বাতি বাদ দিলে গত কয়েক বছরে শহর কলকাতায় আর এর লতায় পাতায় যে জিনিসের সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি হয়েছে তা হল বিরিয়ানির দোকান। আমার চৌহদ্দির মধ্যেই দম বিরিয়ানি, সুপারদম বিরিয়ানি, লখনউ বিরিয়ানি, ঢাকাই, হায়দরাবাদিএমন বিরিয়ানির দোকানের সংখ্যা ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। এখন কম্পিটিশনের বাজার। ক্রেতা ধরার আঁকশি দোকানগুলোর লিফলেট। চিকেন বিরিয়ানি তিরিশ টাকা অবধি নামতে দেখেছি এমনই এক দোকানের হলুদ লিফলেটে। চিকেনের পাশে আবার ব্র্যাকেটে লেখা লেগপিস। ভিড় ঠেকায় সাধ্য কার! মাংসে কয়েক লক্ষ কামড়ের পর এখন হঠাৎ চোঁয়া ঢেকুর। মুরগির নামে যা খেয়েছি তা আসলে মুরগিই ছিল তো? নাকি বিড়াল। নাকি, এ বাবা, গা গুলোচ্ছে।

কেউ কেউ বলছেন, এত কিছুর মূলে শহরে শকুনের অভাব। শকুন পাততাড়ি গুটিয়েছে বলেই ওদের খাদ্য চলে আসছে আমাদের প্লেটে। এ এক মোক্ষম যুক্তি। বেজিদের বলি, বেঁচে থাক্। আমাদের স্বার্থেই বেঁচে থাক্একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে দেখেছিলাম, ফ্রেশ অ্যান্ড হেলদি স্নেকসবাই টু গেট ওয়ান ফ্রি। পিছনে ছিল কম তেলে ভাজা জিরো ট্র্যানস্ ফ্যাট পটেটো চিপস। ওটা হয়তো ছিল কোনও ফাজিল প্রিন্টারের গর্ভের সন্তান। কিন্তু কেন যেন মনে হয়, সেই দিনও আর বেশি দূরে নেই। বেজিরাও বাড়ন্ত।

ওই ভাগাড় কেলেঙ্কারির কঙ্কাল বেরিয়ে আসছে যত, আমাদের অবিশ্বাসের, অবাক হওয়ার বৃত্তটারও পরিধি বাড়ছে তত, হোয়াটসঅ্যাপের ইমোজির মতোরাস্তার দোকানগুলোকে আপাতত ছেড়েই দিলাম। সে তো কবে থেকেই শুনে আসছি চিকেন মোমোতে নাকি থাকে মুরগির নাড়িভুড়ি। ওদের কথা থাক। জানা গেল, নামজাদা রেস্তোরাঁতেও নাকি সাপ্লাই হত ভাগাড়ের মাংস। আর আমরা মাইনের পয়সা বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে ইটিং আউট করতাম। চোদ্দ মেগাপিক্সেলের ঠ্যাং-চিত্র ফেসবুকে দিতাম। লাইক গুণতাম। নামী রেস্তোরাঁর দামি রেটিং দিতাম ফুড ডেলিভারির অ্যাপে। বিখ্যাত কোম্পানির ফ্রোজেন সালামি, সসেজের মাংসের মধ্যেও নাকি মেশানো হয়ে থাকতে পারে কুকুর-বিড়ালের মাংস। মেশানো যে হয়েছেই তার কোনও প্রমাণ নেই এখনও। মেশানো হয়নি, সেটাই বা জোর গলায় বলছে কে? ঠোঁটকাটারা বলছেন, তোমারে বধিবে যে, ল্যাবেতে বাড়িছে সে। রিপোর্টগুলো আসুক!’ শুনেছি, অফিসপাড়ার দোকানগুলোতে নাকি দিনেরটা দিনেই শেষ হয়। তিরিশ-চল্লিশ টাকা দিয়ে আমরা চিকেন বিরিয়ানি খাই লাইন দিয়ে। হাড়ে কামড় দেওয়ার আগে অতশত ভাবে কে? ভাবলে মালুম হবে, দেড়শো গ্রাম ওজনের যে লেগপিসটাতে ঠোঁটের আদর বসাই, দেড়শ টাকা চিকেনের কেজি ধরলেও ওই মাংসের দাম হয় সাড়ে বাইশ টাকা। সঙ্গে পাঁচ টাকার ডিম। সাড়ে সাতাশ টাকা তো এখানেই খরচা হয়ে যায়। এর সঙ্গে চাল, মশলা, গ্যাস, কর্মচারীর মাইনে, পুলিশের তোলা, পার্টির দাদার চমকানি ট্যাক্স, সবশেষে দোকানদারের লাভ মিলিয়ে কি করে ওই বিরিয়ানি তিরিশ-চল্লিশ টাকায় প্লেটবন্দি হয়, তা আমাদের ভাবার সময় কোথায়? ফলে পচা গলা মুরগিরও সদগতি হতে সমস্যা হয় না। কটুগন্ধ ঢেকে যায় পেঁয়াজ-রসুনের চাদরে। আর বিকেলবেলার ভাঙা হাটে, নাগরিক ক্লান্তিতে তা বিকোয় কুড়ি টাকা দরে। এই বিরিয়ানিকে অনেকে আবার বলেন কৌয়া বিরিয়ানি। এখন মনে হয়, বিড়াল-কুকুরের থেকে হয়ত কাকই ভাল ছিল!

ওই দেখা যায় মরা নদীর সোঁতার মতো আমাদের সচেতনতাবোধ। একটা ছোট্ট উদাহরন দিই। বছরখানেক আগে দমদমের এক নাম করা রেস্তোরাঁয় একজনের ফেলে যাওয়া, না খাওয়া এঁটো লেগপিস অন্যজনের প্লেটে সাজিয়ে দেওয়া আর ফ্রিজ থেকে ছাতাপড়া কাঁচা মাংসের উদ্ধার হওয়া নিয়ে অনেক হইচই হয়। রেস্তোরাঁয় তালা পড়ে। শুনেছিলাম, মালিককে নাকি হন্যে হয়ে খুঁজছে পুলিশ। লাইসেন্স বাতিল হওয়া নাকি কেউ আটকাতে পারবে না। ইন্টারভালের পরে ওই কান্ডের দ্বিতীয় পর্ব অবশ্য আর দেখা যায়নি। তবে ঘটনা হল, ওই রেস্তোরাঁ আবার খুলেছে। এবং বহাল তবিয়তে লিফলেট ছাপিয়ে সম্প্রতি পয়লা বৈশাখের স্পেশাল মেনুকার্ড বিলি করেছে রাস্তায় ধুর মশাই, বাঙালির অত মনে থাকে নাকি?

অদ্ভুত কয়েকটা অসুখের নাম শোনা যাচ্ছে হাওয়ায়। জটিল জটিল নাম। চিকিৎসকরা বলছেন, এমন অসুখ নাকি দক্ষিণরায়ের মামাবাড়ি থেকেই আসে। রোগ ইতিমধ্যেই থাবা বসিয়েছে শহরের নানা প্রান্তে। অনেকে বলছেন, এ নাকি হিমশৈলের চূড়া। কারও কারও মত, কার্পেটের তলা থেকে এখনও পর্যন্ত দেখা গিয়েছে বেড়ালের লেজটুকুই। ভাগাড়ে কত কিছুই না আসে। প্রভু, পচা মুরগি, গলা বিড়াল সহ্য করেছি তবুও। তিনটে বাঁদড়ের মতো এখন চেপে রয়েছি চোখ-কান-মুখ। আর বলবেন না, প্লিজ।

প্রভু হয়ত হাসছেন। আর আড়চোখে দেখছেন। হাসছেন খিচুড়িওয়ালাও। আজকের বালিঘড়িতে ভেজ জিন্দাবাদ।

তবে কার হাসিতে কর্পূরগন্ধ, বোঝা যাচ্ছে না।  

 

আরও পড়ুন:  কেতজেল পাখি (দ্রোহজ ২) পর্ব ৪

3 COMMENTS

  1. চরম চাবুক

এমন আরো নিবন্ধ