আন্দোলন ও কিছু ‘সস্তা’ প্যানিক বোতাম

বছরখানেক আগের কথা। দমদমের এক প্রসিদ্ধ বেসরকারি হাসপাতাল। ইওরোলোজিকাল এক সমস্যার জন্য ডাক্তার দেখাতে গিয়েছিলাম। বছর চল্লিশের ডাক্তারবাবু। ঠিক তিন মিনিট দেখার পর পার্কার পেন দিয়ে প্রেসক্রিপশন লিখলেন। রাস্তায় থাকার জন্য আমাকে দেখা শুরু হওয়ার মিনিট আড়াই পর আমার পিতৃদেব চেম্বারে ঢোকেন। জিজ্ঞাসা করেন, ‘কি হয়েছে ডাক্তারবাবু?’ উনি হাতের ঘড়ির দিকে তাকালেন। তারপরে বেশ রুক্ষভাবে বললেন, ‘রিপিট করাবেন না। পেশেন্টকে যা বলার বলে দিয়েছি। জেনে নেবেন।’ বাবা ফের বললেন, ‘তাও একবার বলুন না প্লিজ। চিন্তার কিছু নেই তো?’ এবারে আরও একবার ঘড়ি দেখা হল এবং শোনা গেল, ‘প্লিজ ভ্যাকেট দ্য রুম। টাইম ওয়েস্ট করবেন না। বাইরে অনেক পেশেন্ট আছে।’ প্রসঙ্গত, সাকুল্যে তিন সাড়ে তিন মিনিট সময়ের জন্য ডাক্তারবাবুকে ফি দিতে হয়েছিল আটশো টাকা।

সাগর দত্ত হাসপাতালের বাইরে যে পুত্রহারা বাবা তাঁর তিন দিনের সদ্যোজাত ছেলেকে, মৃত ছেলেকে, সাদা কাপড়ে জড়িয়ে হাউহাউ করে কাঁদছিলেন, তাঁর দুঃখকথার সঙ্গে আমার এই উপেক্ষাপর্বের কোনও তুলনা করা চলে না। কিন্তু বছর ঘুরে গেলেও এই অপমানটা আমার মাথায় রয়ে গিয়েছে। অপমানিত হওয়ার, কষ্ট পাওয়ার যদি ঐকিক নিয়মের অঙ্ক হয় কোনও, তাহলে ওই সন্তানহারার দুঃখ তাঁর জন্মজন্মান্তরে থেকে যাবে। গত কয়েকদিন ধরে আমরা শুধু শুনে আসছি সরকারি হাসপাতালের অচলাবস্থার কথা। জুনিয়র চিকিৎসক এবং শাসকের চাপানউতোর। শেষে জননেত্রীর মুখে ‘লক্ষ্মী ছেলে’ এবং কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি শুনে নবান্নের বাইরে জয়োল্লাস। ইঁট দিয়ে ভেঙে ফেলা নীলরতন সরকার হাসপাতালের তালা। আন্দোলনরত জুনিয়র ডাক্তারবাবুদের প্ল্যাকার্ডের ভাষা ধার করে বলা যায়, ‘মানবতার মেরামতি’ শেষ হওয়ার ফলে অচলাবস্থা কাটল। হাসপাতাল খুলল।

এর মধ্যে অবশ্য যে কটা প্রাণ যাওয়ার তা গিয়েছে। বারো পাতার, ষোল পাতার খবরের কাগজে যে কটা ছবি আঁটানো হয়েছে, তার থেকে জানতে পেরেছি কয়েকটা খন্ডচিত্র। না-চিকিৎসার কাহন। চোপ্, আন্দোলন চলছে। যে অশীতিপর বৃদ্ধা মা রিক্সা চেপে ছেলেকে সহায় করে পাঁজাকোলা হয়ে এসেছিলেন হাসপাতাল চত্বরে, কিংবা দগ্ধ হয়ে যে গৃহবধূ শুয়ে ছিলেন হাসপাতালের মেঝেতে বিনা চিকিৎসায়, বুক থেকে পেসমেকার বের হয়ে আসা যে বৃদ্ধ গোঙাচ্ছিলেন অ্যাম্বুলেন্সে, যে বৃদ্ধ অনেক দূর থেকে কেমো নিতে এসেছিলেন অবস্থার ক্রমশ অবণতি হচ্ছে দেখে, স্ট্রেচারে করে এর মধ্যে হাসপাতালমুখো হয়েছিলেন যে রোগে ভোগা উটকো, ভুল সময়ে মুমূর্ষু আম-আদমি, তাঁদের মধ্যে সবাই আজ বেঁচে আছেন কি না আমরা জানিনা। জানার দরকারও নেই। কাগজে আর কটাই বা খবর ধরে। আন্দোলনপর্বে মানুষের অসহায়তার কথা ধরার থেকে অধরাই হয়তো থেকে গেল অনেক বেশি। সেটাই স্বাভাবিক। স্বজন হারানোর পরে ‘এক্সক্লুসিভ’ লেখা ক্রন্দনধ্বনি পাওয়ার জন্য টেলি-মিডিয়া যথাসাধ্য করেছে। সন্ধেবালার মুড়ি সিঙাড়ার সময়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা চিকিৎসকের সঙ্গে লেন্সের সামনে দাড়িপাল্লায় বসিয়েছে প্রিয়জন হারানো কোনও মানুষকে। ব্রেকের মাঝে মাঝে জানতে চাওয়া হয়েছে, আসলে দুঃখ বেশি কার। আমরা গিলেছি। সপ্তাহজোড়া এপিসোড খতম। এখন বিরাট বিশ্বকাপ ও নুসরতের বিয়ে।

আশ্চর্যের বিষয় হল, হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা দেওয়া নিয়ে যা কথা হল, রোগীদের নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে তার সিকিভাগও হল না। অথচ ডাক্তার এবং রোগী—এঁরা কিন্তু একে অন্যের পরিপূরক। ডাক্তাররা ধর্নায় বসলে নবান্ন থেকে ডাক আসে। কিন্তু চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাওয়া একশ রোগীর পরিবার যদি কাল থেকে একই মঞ্চে আন্দোলনের ডাক দেন, প্রসাশন তাঁদেরকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবে। লাঠিচার্জ করবে। তফাৎটা সেখানেই। সরকারি হাসপাতালগুলোর পরিকাঠামো এমনই যে চিকিৎসার গাফিলতি প্রমাণ করতে জুতোর শুকতলা ক্ষয়ে যাবে, বছরের পর বছর ঘুরে যাবে, তাও কোনও সিদ্ধান্তে আসা যাবে না। ‘মানবতার মেরামতি চলছে’ লিখে যে চিকিৎসকরা তুমুল আন্দোলন করলেন সম্প্রতি, তাঁরা এর মানবিক দায় এড়াতে পারবেন তো ভবিষ্যতে? আন্দোলন চলার সময়ে সরকারি হাসপাতালের এক সিনিয়র চিকিৎসক এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, ‘এত রোগীও দেখব অথচ ভাল ব্যবহার করব, এমনটা আশা করেন কি করে?’ যুক্তিটা মানা যায় না। তাঁরা ভুলে যান, পরিষেবা ক্ষেত্রে প্রেসক্রিপশনের থেকে তাঁদের একটা আত্মবিশ্বাস জোগানো হাসির দাম কিন্তু কোনও অংশে কম নয়। একটু অভিনয়ই বা করলেন। গরীবগুর্বো রোগীর দল তাই হামলে পড়ে মেশাবে নিজেদের রক্তে।

আন্দোলনের জন্য সরকারি হাসপাতালগুলোর উপরে একটা বড় মাপের আতসকাঁচ পড়ল সম্প্রতি। ভাগশেষ হিসেবে পড়ে রইল কিছু অচলাবস্থার চিত্র। এই ছবি যে নতুন নয়, তা আমরা জানি বিলক্ষণ। আপনার আজকের রাশিফল কিংবা আবহাওয়ার খবরের মতোই হাসপাতালের পঙ্গু ছবি কাগজের কোনায় স্থান পায় রোজ, কোনও না কোনওভাবে। সাতটা হাসপাতালে রেফার হওয়া, আগুনে পুড়ে যাওয়া দিয়া দাসের মৃত্যুর খবর আমরা ভুলে গিয়েছি। অথচ ঘটনাটা মাসকয়েকের বেশি পুরনো নয়। প্রতিদিন অজস্র রোগী রেফার হন সরকারি হাসপাতালগুলোতে, কারণের থেকে বেশি অকারণে। অ্যাম্বুলেন্সে ব্যডমিন্টনের শাটল কর্কের মতো ঘুরতে ঘুরতে এঁদের মধ্যে অনেকেরই চিকিৎসার প্রয়োজন ফুরোয়। ক’জন অভিযোগ জানান? ক’জন জানেন, অভিযোগ জানানো যায়? কালেভদ্রে খাতায় অভিযোগ জমা পড়লে এবং খবরটা মিডিয়া মারফৎ হাসপাতালের সুপারের কাছে দৈবাৎ পৌঁছলে তাঁরা জানান, ‘খতিয়ে দেখছি’। সত্যি কথা বলতে কি, এ যাবৎ যাবতীয় কেসে এই দুটো শব্দের বেশি আর কিছু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মুখ থেকে শোনা যায়নি। দুঃখের কথা হল, দিনের পর দিন এই যে লজ্জামাখা ক্ষতি, তা খতিয়ে দেখার কোনও খতিয়ান নেই। মনে হয়, খবরের কাগজের কোনও একটা পাতায় একদম শেষের একটা কলামে কি খতিয়ে দেখার হিসেব নিকেষ চাওয়া যায় না? মানে, গত এক সপ্তাহে কারা কোন বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দেখার কথা বলেছিলেন এবং সাত দিন পরে খতিয়ে দেখে তাঁরা আদৌ কি বললেন—এর একটা হিসেব তো চাওয়াই যায়। তা হয়নি, হয়তো হবেও না কোনওদিন।

এমারজেন্সি বিভাগে কোলাপসিবল গেট হতে পারে এ বারে। ট্রেনে পা কাটা পড়া রোগীর সঙ্গেও দুজনের বেশি ঢুকতে পারবেন না ইমারজেন্সি চত্বরে। সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার কিংবা একডালিয়া এভারগ্রিনের পুজোর সময় লাইন আটকানোর জন্য যে ফিতে থাকে, তেমন কোনও লোহার ফিতের কাজ করবে এই এমারজেন্সি কোলাপসিবল গেট, হয়তো। গেট টানা ও খোলার জন্য হয়তো নিয়োগ করা হবে ‘বখাটে’ ছেলেদের মধ্যে কয়েকজনকে। হাসপাতালে পুলিশ পিকেট আরও জোরদার করা হবে। প্যানিক বোতামগুলোর আঁকশি আটকানো হবে আরও অনেক দৃঢ়ভাবে। নিরাপত্তা মজবুত যে হচ্ছে, এই নিয়ে তো আর কোনও ধন্দ রইল না। পরিবহের ঘটনা সমাজের মুখে একটা আলকাতরার পোচের মতো। এমন ঘটনা ফের ঘটুক, আমরা কেউই সেটা চাই না।

একই সঙ্গে যেটা চাই না, তা হল চিকিৎসকদের ঔদ্ধত্ত্য। জনপ্রতিনিধি বলেছেন, ডাক্তাররা রোগীর কাছে ‘ভগবানের মতো’। ভগবান আশীর্বাদের হাত মাথায় রাখেন, ঔদ্ধত্ত্যের কাঁটা লাগানো টুপি নয়। যেটা চাই না, তা হল উপেক্ষা। সরকারি হাসপাতালে বিনা পয়সায় কিংবা নামমাত্র মূল্যে রোগী দেখার বন্দোবস্ত থাকলেও একজন অসুস্থ মানুষের, তাঁর পরিজনের সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে কি হয়েছে সেটা জানার। একটা ওষুধ কেন দেওয়া হল, একটা টেস্ট করাতে কেন বলা হল, তা সম্বন্ধে সম্যক ধারণা না হলেও ভাসা ভাসা কিছু শোনার আশা তো করা যায়। সেটা ডাক্তারবাবুদের করতে হবে। বেসরকারিক্ষেত্রে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের উপরে এই দায়িত্ব আরও বেশি করে বর্তায়। পরিষেবা দেওয়ার সিলেবাসের মধ্যে রোগীর প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটাও পড়ে। বহু চিকিৎসক আছেন, যাঁদের রোগ সম্পর্কিত কোনও প্রশ্ন করা হলে বন্দুকের গুলির মতো যে জবাবটা আসে, তা হল, ‘আপনি কি ডাক্তার?’ এই ছোট ছোট ঘটনাগুলোই চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে কাঙ্খিত সুসম্পর্ক গড়ে ওঠার পথে কাদা হয়ে দাঁড়ায়। আর এই কাদা জমে পাথর হয় যখন, কোনও মরণাপন্ন একটার পর একটা হাসপাতালে রেফার হয়ে যান। কয়েকজনের অকর্ম্যন্যতা বহু মানুষের আয়ুরেখা রবার দিয়ে মুছে দেয়। এর কোনও তদন্ত হয় না।

আন্দোলনে আপনাদের তো প্রাপ্তি হল। জিতলেন। নিরাপত্তার গিফট হ্যাম্পারে অনেক কিছু পাওয়ার মধ্যে যোগ হল কয়েক ডজন সিসি ক্যামেরাও। কোনও রোগীর আত্মীয় ঝুট-ঝামেলা করলেই এবার ধরা যাবে হাতে নাতে। আরও তাড়াতাড়ি। যে অ্যাম্বুলেন্সগুলো আপনাদের ‘অসময়ে’ এসে বিরক্ত করবে, সেগুলো যেন দীর্ঘশ্বাসের সাইরেন বাজাতে বাজাতে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে না যায়, আশা করি ক্যামেরার চোখ তা এড়াবে না। আন্দোলনের জেরে সরকারি হাসপাতালগুলোর জন্য চব্বিশ ঘণ্টার টোল ফ্রি নম্বর চালু করে দেওয়া হল। ডাক্তার এবং হাসপাতালের নিরাপত্তা সংক্রান্ত যে কোনও অভিযোগ করা যাবে এই নম্বরে। আশ্বাস, তৎক্ষণাৎ পরিস্থিতির সুরাহা করবে প্রশাসন। ভগবানদের ব্যবস্থা তো হল। ভালোয় ভালোয় ভালই হল। অবলা রোগীদের মনের মধ্যে যে সস্তার প্যানিক বোতামটা আছে, তার সাইলেন্সারটা এবার একটু হলেও খোলার চেষ্টা আমরা করব তো, সবাই মিলে?

চিকিৎসা না পেয়ে পচে যাওয়া কাটা আঙুলগুলো জানে।

One Response

  1. অম্লানকুসুমের লেখার প্রাসঙ্গিকতা যে কোন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ মেনে নেবেন। প্রশ্ন হলো, এই নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির চর্চা আজ আর নেই বললেই চলে। ভাবটা এমন যে নয় এদলে কিংবা ওদলে। নইলে কোন দলেই নেই। অর্থাৎ দলাদলির বাইরে কোন মতামত নেই। ফলে সুষ্ঠু মীমাংসা বলতে যা বোঝায় তা উধাও । বদলে লাঠালাঠি একমাত্র পথ। বটেই তো, লক্ষীছেলে কে না? ডাক্তার যদি সাধ্যমতো চিকিৎসা এবং ভালো ব্যবহার করেন কার দায় পড়েছে মারামারি করে সময় নষ্ট করার। অবশ্যই যদি কেউ দলাদলির শিকার না হন। সুতরাং আপামর বাঙালিকে ভাবতে হবে, যাতে অনন্ত কিছু জায়গাকে এই ঘৃণ্য রাজনীতির বাইরে রাখা যায় ।
    নিরপেক্ষতার চর্চা শুরু হোক নিজেদের স্বার্থকে ঘিরে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

কফি হাউসের আড্ডায় গানের চর্চা discussing music over coffee at coffee house

যদি বলো গান

ডোভার লেন মিউজিক কনফারেন্স-এ সারা রাত ক্লাসিক্যাল বাজনা বা গান শোনা ছিল শিক্ষিত ও রুচিমানের অভিজ্ঞান। বাড়িতে আনকোরা কেউ এলে দু-চার জন ওস্তাদজির নাম করে ফেলতে পারলে, অন্য পক্ষের চোখে অপার সম্ভ্রম। শিক্ষিত হওয়ার একটা লক্ষণ ছিল ক্লাসিক্যাল সংগীতের সঙ্গে একটা বন্ধুতা পাতানো।