মাধুরী দীক্ষিত থেকে দীপিকা পাড়ুকোন | পর্দায় বলিউড সুন্দরীদের লাস্যময় দ্রুত লয়ে কত্থক মুগ্ধ করেছে বারবার | কিন্তু অনেকের কাছে হয়তো এখনো অজানা পর্দার নেপথ্যে থাকা মানুষটির কথা । তিনি বিরজু মহারাজ । 

Banglalive

১৯৩৮ সালে ৪ ফেব্রুয়ারি বারাণসীর বিখ্যাত এক কত্থক নৃত্যশিল্পী পরিবারে জন্ম নেন বিরজু মোহন মিশ্র ।  সঙ্গীত ও নৃত্যকলার জগতে বিরজু মোহন মিশ্রই পণ্ডিত বিরজু মহারাজ নামে পরিচিত হন । পিতা জগন্নাথ মহারাজ, জনপ্রিয় লক্ষ্ণৌ ঘরানায় অচ্ছন মহারাজ নামে পরিচিত ছিলেন ।বাবার তালিমে প্রথম সাত বছর বয়সে জনসমক্ষে নাচ পরিবেশনা করেন বিরজু মহারাজ । অতীতে প্রায় ৪০০ বছর ধরে পারিবারিক বংশ পরম্পরায় রায়গড় দেশীয় রাজন্য স্টেটের রাজ নর্তক ছিলেন তাঁরা |

মাত্র নয় বছর বয়সেই বাবাকে হারালেন,হারালেন জীবনের প্রথম শিক্ষাগুরুকে । ভেঙে পড়লেন,অভাবের তাড়নায় নিরুপায় হয়ে ভিটেবাড়িও বিক্রি হয়ে যায় তাঁদের । তবে  সংগীত আর নৃত্যসাধনা থেকে একচুল বিচ্যুত হননি বিরজু মহারাজ । এমনই ছিল কিংবদন্তির কাটানো শৈশব । পরবর্তীতে তিনি দুই দিকপাল আত্মীয় শম্ভু এবং লাচ্ছু মহারাজের কাছে প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করেন ।

শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পী হিসেবে মাত্র ১৩ বছর বয়সে , নয়াদিল্লির সঙ্গীত ভারতীতে নাচ শেখাতে শুরু করেন ।কয়েক বছর পর, তিনি সঙ্গীত নাটক আকাদেমির কত্থক কেন্দ্রের (সঙ্গীত নাটক আকাদেমি একটি একক) পরিচালক হিসেবে কাজ করেন । ১৯৯৮ সালে তিনি কত্থক কেন্দ্র থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং তিনি নিজের কলাশ্রম নামে একটি নাচের স্কুল খুললেন ।

যদিও নৃত্যই তার প্রথম শিল্প-শৈলী, কিন্তু ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তার বিশেষ জ্ঞান, কন্ঠশিল্পী হিসেবেও তিনি প্রভূত সুনামের অধিকারী । ঠুমরি, দাদরা, ভজন, গজল গায়ক হিসেবে কুড়িয়েছেন খ্যাতি । আবার সেতার, সরোদ, বেহালা, সারেঙ্গি, তবলাসহ একাধিক যন্ত্রবাদনে তিনি পারদর্শী । ভারতীয় শিল্পকলায় তাঁর অবদান অনস্বীকার্য ।একাধারে নৃত্যবিদ, সংগীতকার, কোরিওগ্রাফার, যন্ত্রশিল্পী, নির্দেশক, শিল্পস্রষ্টা ও কবি তিনি ।

তিনি মনে করেন শাস্ত্রীয় নৃত্য ঈশ্বরের সাথে সংযুক্ত হওয়ার অন্যতম একটি মাধ্যম । একটি একপ্রকার সাধনা । নাচকে তিনি বলেন আত্মার স্বচ্ছন্দ আন্দোলন । কত্থক নাচকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিরজু মহারাজের অবদান সবচেয়ে বেশি । শাস্ত্রীয় নৃত্য তাঁদের পরিবারের প্রায় ৪০০ বছরের সঙ্গী ।

একজন প্রখ্যাত কোরিওগ্রাফার হিসেবে তিনি বলিউডের বহু সিনেমায় কাজ করেছেন । ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ী’, ‘উমরাও জান’, ‘বাজিরাও মাস্তানি’, ‘দেবদাস’ ছবিতে কত্থক নাচে তিনি কোরিওগ্রাফি করেছেন ।‘শতরঞ্জ কি খিলাড়ী’ ছবির নৃত্য পরিচালনা করেন মাত্র ২৬ বছর বয়সে । এছাড়া ‘দিল তো পাগল হ্যায়’ বা ‘দেড় ইশকিয়া’ সিনেমাতেও তিনি নৃত্য নির্দেশনা করেন ।

এমন প্রবাদপ্রতিম নৃত্য নির্দেশকের ঝুলিতে কেবলমাত্র এই কয়েকটি সিনেমা ।একটু আশ্চর্যজনক হলেও এটাই সত্যি । নৃত্য নির্দেশনা সঙ্গে ফিল্মি আন্দাজের আপস করার ক্ষেত্রে রাজী ছিলেন না বিরজু মহারাজ ।চলচ্চিত্রের জন্য যখন নৃত্য নির্দেশনা করে তখন অবশ্যই কিছু বাণিজ্যিক চাহিদা থাকে । কিন্তু পোশাক বা শৈলী বিসর্জন দিয়ে নাচ শুধুমাত্র বাণিজ্যিক কারণেই ব্যবহার করা হয়েছে এমন বহু সিনেমার নির্দেশনা থেকে সরে গেছেন তিনি । গানের কথা ভাল না হওয়ার জন্যও ফিরিয়েছেন বহু সিনেমা ।

১৯৮৬ সালে তিনি পদ্মবিভূষণে সম্মানিত হন । সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার এবং কালিদাস সম্মান লাভ করেছেন | পেয়েছেন ভরত মুনি সম্মান, ও নৃত্য নির্দেশনায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার । এছাড়াও তিনি বেনারস বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন ।

শাস্ত্রীয় নৃত্যের জগতে একজন পুরুষ হিসেবে জায়গা করে নেওয়া মোটেই সহজ ছিল না । তবে প্রথা ভেঙে নতুন ভাবে চলার রাস্তা দেখাতে তো কিংবদন্তিরাই পারেন । এই নৃত্যগুরু নিজস্ব শিল্পরীতিতে শাস্ত্রীয় নৃত্যের মূল ধারায় নিজেকে অনন‌্য অবস্থানে নিয়ে গিয়ে কত্থকের একাধিক বিন্যাসপর্ব নির্মাণ করেছেন ।

আরও পড়ুন:  যাত্রীর গন্তব্য মুসলিম এলাকা‚ শুনেই গাড়ি থেকে যাত্রীকে নামিয়ে দিলেন ওলা ড্রাইভার!?

NO COMMENTS