পতাকার পাতায় পাতায়

1409
 “তোমার পতাকা যারে দাও 
তারে বহিবারে দাও শকতি”
      
                                
১৯০৬ সালের কথা। দাম্ভিক, দুর্মুখ, দুরাচারী ভাইসরয় কার্জনের বঙ্গভঙ্গের ভূতের নাচনে তখন দেশজুড়ে প্রতিরোধ আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছে। 
কলকাতার মেছুয়াবাজারে ব্রাক্ষ্ম বালিকা বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষাব্রতী বিনয়েন্দ্রনাথ সেনের বাড়িতে একটি  প্রার্থনাসভা বসে। ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, হেরম্ভচন্দ্র মৈত্রসহ অনেকের উপস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথ সেদিন দুটি নতুন গান করেছিলেন, তার একটি…
“তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি”॥
কবি যে কেন এমন গান করেছিলেন বা লিখেছিলেন তা আজ আর জানার উপায় নেই। তবে সে সময়টি যে স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি বৈপ্লবিক সময় এই নিয়ে কোনো সংশয় নেই। স্বভাবতই দেশের অস্থিরতার প্রভাবে তিনি তখন এক নাগাড়ে স্বদেশ পর্যায়ের অনেক গানই রচনা করেন। তাছাড়া ঠিক তার আগে ১৯০৪ সালে,বিশ শতকের এই প্রারম্ভে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার কবল থেকে মুক্তিলাভে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের গুরুত্ব অর্জন করতে একটি জাতীয় পতাকা গড়া হল। ভগিনী নিবেদিতা সেই প্রথম জাতীয় পতাকাটির রূপদান করেন। লাল রঙের চতুষ্কোণের আকারের পতাকাটির কেন্দ্রে হলুদের উপর ছিল বজ্র এবং শ্বেতপদ্ম। পতাকায় ‘বন্দেমাতরম’ কথাটি লেখা ছিল। লাল হল স্বাধীনতা সংগ্রামের,হলুদ বিজয়ের এবং শ্বেতপদ্ম পবিত্রতার প্রতীক।
 
এরপর ১৯০৬ সালের ৭ আগস্ট কলকাতার পার্সিবাগান স্কোয়ারে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী এক সভায় প্রথম ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা উত্তোলন করেন শচীন্দ্রপ্রসাদ বসু। পতাকায় উপর থেকে নিচে যথাক্রমে কমলা, হলুদ এবং সবুজ আনুমানিক সমান্তরাল অনুভূমিক ডোরা ছিল। উপরে কমলা রঙের উপর আটটি অর্ধ- প্রস্ফুটিত পদ্ম এবং নিচের সবুজ ডোরায় সূর্য ও অর্ধচন্দ্র আঁকা ছিল। মাঝে দেবনাগরী হরফে লেখা “বন্দেমাতরম”। সেই শুরু…
 
এর বছরখানেক পর অর্থাৎ ১৯০৭ সালের ২২ আগস্ট  মাদাম কামা নামে সর্বজনপরিচিত ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের পুরোধা নারী জার্মানির স্টুটগার্ট শহরে একআন্তর্জাতিক সমাজবাদী  সম্মেলনে ভারতের হয়ে একটি ত্রিবর্ণ পতাকা উড়িয়ে সকলের নজরে আসেন। এবং সেই পতাকার নিচে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের এবং শোষনের তীব্র নিন্দা করেন শ্রীমতী ভিখাজি রুস্তম কামা। সেদিন তিনি বিদেশের মাটিতে ভারতীয়দের প্রতিনিধিত্ব করে যে পতাকাটি উত্তোলন করেছিলেন, সেটির উপরে ছিল সবুজ রঙ, যা কিনা এদেশের মুসলমান জনসাধারণের ইসলামি প্রতীক। মধ্যে ছিল গেরুয়া, যা এদেশের হিন্দু এবং বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের চিহ্নিত করে। সবুজ রঙের ডোরাতে তৎকালীন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার আটটি প্রদেশের প্রতীক হিসেবে আটটি পদ্মের সারি ছিল। আর ছিল দেবনাগরী হরফে ‘বন্দেমাতরম্’ কথাটি। নিচের লাল অংশে বাঁদিকে পতাকাদন্ডের কাছে অর্ধচন্দ্র এবং ডানদিকে একটি সূর্য। মাদাম কামাসহ বীর সাভারকর এবং শ্যামজি কৃষ্ণ বর্মা এই পতাকার নকশাটি তৈরি করেন। ইতিহাস বলছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে বার্লিন কমিটিতে ভারতীয় প্রতিনিধিরা এই পতাকাটিকে সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করেছিলেন। এই পতাকাটিকে তাই সেসময়ে সকলে ‘বার্লিন কমিটি পতাকা’ নামেই চিনত। 
 
এর প্রায় দশবছর পর, হোমরুল আন্দোলনের কালে কংগ্রেসের নেতারা মনে করলেন ভারতের জন্য একটি জাতীয় পতাকা গড়া উচিত। মরাঠা নেতা বাল গঙ্গাধর তিলক এবং অ্যানি বেসান্তের নেতৃত্বে একটি নতুন পতাকা তৈরি করা হল। যদিও পতাকাটি জনজীবনে তেমন জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি। পতাকাটিতে পাঁচটা লাল এবং চারটে সবুজ আনুভূমিক ডোরা ছিল। ওপরের বাঁদিকে ব্রিটিশ ইউনিয়ন পতাকাটি রাখা হয়েছিল এই ভেবে যে হোমরুল আন্দোলনটি যদি ব্রিটিশদের কাছে ডোমেনিয়ন মর্যাদা পায়। এছাড়া  উপরের ডোরায় ছিল সাদা অর্ধচন্দ্র ও তারা। হিন্দুদের পবিত্র সপ্তর্ষি মন্ডলের প্রতীকরূপী সাতটি সাদা তারা পতাকায় শোভা পেত। 
 
যেহেতু এই পতাকাটি তেমনভাবে জনজীবনে সাড়া ফেলতে পারেনি, তাই জাতীয় পতাকা নির্মাণের ব্যাপারে এবারে নানাবিধ তোড়জোড় শুরু হল। বেশ কয়েকটি নকশা তৈরি হল এবং কংগ্রেসের নেতাদের মধ্যে অনুমোদনের জন্য এলে নানাকারনে তা বাতিল হতে থাকে। মহাত্মা গান্ধির ইচ্ছানুসারে এই সময়ে একটি নতুন পতাকার নকশা তৈরি হল। সাদা, মাঝে সবুজ ও নিচে নীল বর্ণের পতাকাটির তিনটি বর্ণ জুড়েই চরকার ছবি রাখা হল। জাতীয় কংগ্রেসের আমেদাবাদ অধিবেশনে এটি উত্তোলিত হল। যদিও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস কিন্তু এটিকে সরকারি পতাকা হিসেবে গ্রহণ করেনি। আসলে পতাকায় সাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্মীয় প্রতীকবা রঙের ব্যবহারকে অনেকেই অপচ্ছন্দ করেছিলেন। ১৯৩১ সালের ২ এপ্রিল কংগ্রেসের কর্মসমিতিতে সাত সদস্যের একটি নতুন পতাকা সমিতি গঠন করা হল। ‘পতাকায় ব্যবহৃত রঙ তিনটি নিয়ে আপত্তি আছে, কারণ এই রঙগুলি সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে চিহ্নিত’ এই মর্মে একটি প্রস্তাবও সেখানে পাস করা হল। 
 
সেই বছরই কংগ্রেসের করাচি অধিবেশনে পতাকা সংক্রান্ত সর্বশেষ সিদ্ধান্তটি গৃহীত হয়। অন্ধ্রপ্রদেশের মছলিপত্তনম শহরের নিকটবর্তী ভাটলাপেনামারু গ্রামের বাসিন্দা পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়া অঙ্কিত একটি ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা স্বীকৃতি পায়। আয়তকার পতাকায় আনুভূমিক গেরুয়া, সাদা ও সবুজের মাঝে একটি চরকা শোভিত হল। বলা হল গেরুয়া ত্যাগের, সাদা সত্য ও শান্তির এবং সবুজ বিশ্বাস ও প্রগতির প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হল। এবং চরকা ভারতের অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন ও দেশবাসীর শ্রমশীলতার প্রতীক। 
 
পতাকা নিয়ে নানাবিধ পরীক্ষানিরীক্ষা চলতে চলতে অবশেষে ১৯৪৭ সালের ২৩ জুন জাতীয় গণপরিষদে একটি পতাকা কমিটি গড়া হল। রাজেন্দ্রপ্রসাদের নেতৃত্বে সেই কমিটিতে আর যাঁরা ছিলেন তাঁদের মধ্যে, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, সরোজিনী নাইডু, চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী, কে এম মুন্সি এবং বি আর আম্বেদকর উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘ আলোচনার পর ঐ বছরের ১৪ জুলাই পতাকার একটি উপযুক্ত সংস্করণ দরকার এবং দলমতধর্মনির্বিশেষে তা যেন গ্রহণীয় হয়। সেই মর্মে ১৯৪৭ সালের ২২ জুলাই ভারতের তৎকালীন প্রধান রাজনৈতিক দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস গেরুয়া, সাদা এবং সবুজ রঙের তেরঙা পতাকাটিকেই ভারতের স্বাধীন সরকারের জন্য নির্দিষ্ট করল। এবং উৎসর্গ করল এদেশের জনসাধারণকে। পতাকার উপরের কমলা বা গেরুয়া ত্যাগের ও শৌর্যের প্রতীকী রঙ। মাঝের সাদা হল শান্তি এবং সত্যের রঙ। নিচের সবুজ বিশ্বাস এবং পুরুষকারের রঙ। সাদার মাঝে নীল রঙের চক্র, যা কিনা উদার আকাশ এবং গভীর মহাসমুদ্রের প্রতীকী রঙ। চক্রটি সম্রাট অশোকের তৈরি তৃতীয় খৃষ্টপূর্বাব্দে গড়া সারনাথ নামক স্থানের স্তম্ভের থেকে নেওয়া। চক্রে ২৪ টি স্পোক আছে যা কিনা দিনের প্রতি ২৪ টি ঘন্টার প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত। যদিও এই ধর্মচক্রটি কিন্তু সর্বোপরি প্রগতির স্মারক।
এ হল আমার দেশের জাতীয় পতাকার একটা ছোট্ট ইতিহাস, যা কিনা গত প্রায় আশি বছর ধরে ভারতবাসী সগর্বে বহন করে আসছেন। অথচ এই পতাকা কেন মানবসমাজে এতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার আসনে স্থান পেল সেটা জানা দরকার। কেন কবি বলেছেন, ‘তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি”। 
 
ইতিহাস বলে আজ থেকে হাজার পাঁচেক বছর আগে চীনদেশের মানুষ প্রথম পতাকার প্রচলন করেছিল। সেই সময়ে যুদ্ধ বা জলপথে পাড়ি দেবার কালে মানুষ তাঁর পরিচয় বহন করে নিয়ে গেছে নানা ধরনের নানা রঙের নানা আকৃতির পতাকার মাধ্যমে। একেবারে আদিতে পতাকা ছিল ধাতুর তৈরি। ধাতব সেই পতাকাগুলিতে পশু পাখি বা অন্য কোনো বিমূর্ত নকশার প্রতীক ব্যবহার হত। যুদ্ধের সময় এ সমস্ত পতাকা যোদ্ধাদের প্রেরণা দিত। জানা যায় রোমান যোদ্ধারা ঈগলের প্রতিকৃতি নিয়ে পতাকা তৈরি করে যুদ্ধে যেতেন। পাশ্চাত্যে রোমানরাই প্রথম কাপড়ের পতাকা চালু করেন। বারো এবং তেরো শতকে ব্যবহার ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়। 
 
ক্রশ চিহ্নের পতাকা ব্যবহার সম্ভবত ইয়োরোপের ভূখন্ডে বারো শতকেই চালু হয়েছিল। এই ক্রশ চিহ্নের বা প্রতীকের মাধ্যমে ইয়োরোপীয়রা ধর্মের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করে সংঘবদ্ধ হত। তখন পতাকার আকার ছিল শিল্ডের মতো অর্থাৎ অনেকটা ঢাল আকৃতির। 
 
আয়তকার পতাকা আসতে এরপর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। তবে আয়তকার পতাকা আসার সঙ্গে সঙ্গেই খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কারণ, এক একটি পতাকা এক একটি উল্লম্ব দন্ডের মাথায় উড়ত এবং তা বহন করত এক একজন মানুষ। আগের ঢাল আকৃতির পতাকাগুলি ব্যবহৃত হত আনুভূমিক দন্ডে ঝুলিয়ে। দন্ডটিকে দুই প্রান্তে দুজন মানুষ ধরত। ব্যবহারের দিক থেকে সুবিধা হওয়ায় আয়তাকার পতাকাই পরবর্তীকালে জনপ্রিয় হয় এবং শেষ পর্যন্ত টিকেও যায়। এরপর মধ্যযুগের পতাকার ব্যবহারে ভাগ হতে লাগল। রাজা, রাজপরিবার, নগর, এইভাবে পতাকা তাঁর নিজ নিজ পরিচয় পেতে শুরু করল। সতেরো শতকের আগে পর্যন্ত জাতীয় পতাকার কোনো নিজস্ব পরিচয় ছিল না বললেই চলে। সতেরো শতকের গোড়ায় অর্থাৎ ১৬০৩ সালে ষষ্ঠ এবং প্রথম জেমসের আমলে গ্রেট ব্রিটেন গড়ে ওঠার পর ১৬০৬ সালে সরকারিভাবে প্রথম জাতীয় পতাকা তৈরি করে গ্রেট ব্রিটেন। তবে এর প্রভাব তখন গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েনি। বরং বিশ্বব্যাপী জাতীয় পতাকা তৈরির ধূম লাগে আঠারো এবং উনিশ শতকে। গোটা বিশ্বজুড়ে তখন উপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের ঢেউ বইছে। সেই ঢেউয়ের আবেগেই তৈরি হতে থাকে একটার পর একটা নতুন স্বাধীন দেশ এবং সেই দেশের জাতীয় পতাকা। 
 
পতাকা সংক্রান্ত বিবিধ বিষয়ের পড়াশোনাকে মূলত ‘ভেক্সিলোলজি’ বলা হয়। লাতিন শব্দ ‘ভেক্সিলাম’ শব্দটির অর্থ পতাকা। সম্ভবত সেই শব্দটি থেকেই এসেছে ‘ভেক্সিলোলজি’। মানব ইতিহাস বলে বিভিন্ন রাজনৈতিক এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতেই এক একটি রাষ্ট্রের জন্ম, তাই প্রতিটি স্বাধীন রাষ্ট্রের পতাকার ইতিহাসেও সেই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ভূমিকা প্রধান হয়ে দেখা দিয়েছে। কখনও সেই দেশের বা জনজীবনের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক প্রভাব, কখনও বা অন্য দেশের রাজনীতির প্রভাবেও তা প্রভাবিত। 
 
তা এবারে দেখা যেতে পারে পৃথিবীর নানা দেশের জাতীয় পতাকার কিছু কিছু বিশেষত্ব, বাকি সবই প্রায় এক ধরনের। এই যেমন ডেনমার্ক। ইয়োরোপের এই দেশটির পতাকার কাপড়টির নাম হল, ‘ড্যানেবর্গ’। পৃথিবীর মধ্যে প্রাচীনতম জাতীয় পতাকা এটি। কিংবদন্তী হল, ১২১৯ সালে এস্তোনিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের সময় ডেনমার্কের তৎকালীন রাজা লাল বর্ণের মধ্যে সাদা ক্রশ চিহ্নিত পতাকাটি ডেনমার্কবাসীদের জয়ের গৌরব হিসেবে স্বর্গ থেকে এই ‘ড্যানেবর্গ’ কাপড়টি নিয়ে আসেন। এখানকার পতাকা ব্যবহারে একটি ঐতিহাসিক নিয়ম আছে, যা কিনা অন্য কোনো দেশে নেই। ডেনমার্কে পৃথিবীর অন্যান্য সমস্ত দেশের পতাকার এতটাই সম্মান যে নিজের দেশের পতাকা তাঁরা পুড়িয়ে ফেললেও অন্য দেশের পতাকার প্রতি তাঁরা  বিন্দুমাত্র অসম্মান করতে পারবেন না, যা কিনা আইনত দন্ডনীয় বলে বিবেচিত হয়। 
 
জাতীয় পতাকা হিসেবে নেপালের পতাকাটি একেবারে স্বতন্ত্র। তাঁর জুড়ি মেলা ভার। পৃথিবীর সব রাষ্ট্রের পতাকা যেখানে বর্গাকার বা আয়তকার, সেখানে একমাত্র নেপালের জাতীয় পতাকাই ত্রিভুজাকৃতির। মূলত, দুটি ত্রিভুজাকৃতির পতাকাকে একে অপরের উপর রেখে পতাকাটি তৈরি করা হয়েছে। পতাকার রঙ লাল রাখা হয়েছে নেপালে হিমালয়ের বুকে শাখে শাখে ফোঁটা লাল রডোডেনড্রন ফুলের জন্য। নেপালের জাতীয় ফুল এটি। লালের চারপাশে যে নীল রঙের সীমারেখা, সেটির দেশব্যাপী শান্তির প্রতীক। পতাকার উপরের ত্রিভুজে একটি সাদা অর্ধচন্দ্রের প্রতীক রয়েছে, যা এখানকার রাজ পরিবারের প্রতীক। তবে ১৯৬২ সালের আগে এই প্রতীকটি ছিল মানবমুখের। নীচের ত্রিভুজে রয়েছে সাদা সূর্যের প্রতীক, যা এখানকার রানা রাজত্বের স্মৃতিচিহ্ন। 
 
সৌদি আরবের পতাকাটিও বেশ চমকপ্রদ। মহম্মদের প্রিয় রঙ ছিল সবুজ। মরু অঞ্চলের প্রায় সবকটি দেশেরই জাতীয় পতাকায় সবুজ রঙের ব্যবহার লক্ষ্যণীয়। সৌদি আরবের এই সবুজ রঙের পতাকার মাঝখানে ‘সাহাদা’ অর্থাৎ ইসলাম ধর্মের বিশ্বাসের বাণী লেখা। এতে লেখা আছে ‘ কোথাও আল্লাহ ছাড়া কোনো ঈশ্বর নেই। এবং মহম্মদই আল্লাহ’র একমাত্র অবতার’। এই লেখাটি বিশেষত্বের মধ্যে পড়ে না। যেটি বিশেষত্ব তা হল, লেখাটি পতাকার উভয় পিঠেই একইরকমভাবে পড়তে হয়। 
 
শ্রীলঙ্কার জাতীয় পতাকাটিও বেশ অন্যরকম। এই পতাকার মাঝে সোনালী রঙের একটি সিংহ আছে, যার একটি হাতে তরোয়াল। আশ্চর্যের বিষয় হল শ্রীলঙ্কায় কিন্তু সিংহ কোনোকালেই পাওয়া যেত না, আজও যায় না। 
 
আফ্রিকার মোজাম্বিক রাষ্ট্রটির পতাকাই একমাত্র জাতীয় পতাকা যেখানে আধুনিক মরণাস্ত্রের প্রতীক জ্বলজ্বল করছে। একে ৪৭ বন্দুকটিকে এখানে ব্যবহার করা হয়েছে প্রতিরক্ষার প্রতীক হিসেবে।
 
এছাড়া আফগানিস্তান ও কম্বোডিয়ার পতাকা দুটিতেই দেখা যায় মানুষের তৈরি বিল্ডিংএর প্রতীক। কম্বোডিয়ার পতাকায় বিখ্যাত অ্যাংকর ভাটের মন্দিরটির সাদা প্রতীকটি যেমন শোভা পায় তেমনই আফগানিস্তানের পতাকায় আছে একটি মসজিদের প্রতীক।
 
 
এছাড়া আফগানিস্তানের জাতীয় পতাকা এতবার পরিবর্তন করা হয়েছে যে সেটাও একটা সর্বকালীন রেকর্ড। কমপক্ষে কুড়িবার পরিবর্তন করা হয়েছে। 
 
 
 
 
দুটি দেশের জাতীয় পতাকা হুবহু একই রকমের এটা সম্ভবত চট করে দেখা যায় না। তবু ব্যতিক্রমী হয়ে আছে ইন্দোনেশিয়া এবং মোনাকো এই দুটি দেশের জাতীয় পতাকা দুটি। লাল এবং সাদা এই দুই রঙের পতাকাদুটি দিব্যি দুটি দেশ ব্যবহার করে আসছে সর্বত্র। 
 
 
 
 
সেই দিক দিয়ে লিবিয়ার পতাকাটিও বেশ অভিনব। পুরো পতাকাটি সবুজ রঙের। একদম সাদামাটা। কোনো প্রতীক নেই। অন্য কোনো রঙ নেই। সহজ একেবারে। ইসলামিক দেশ বলে সবুজ রঙটি ব্যবহৃত হয়েছে। 
 
একেবারে পুরো বর্গাকার পতাকা হল দুটি দেশের। ইয়োরোপের অন্তর্গত পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম রাষ্ট্র ভ্যাটিক্যান সিটির এবং সুইৎজারল্যান্ডের। ভ্যাটিক্যান সিটি রোমান ক্যাথলিকদের প্রধান ধর্মযাজক পোপের দ্বারা নিযুক্ত কমিশনকৃত শাসনকার্য পরিচালিত হলেও পতাকার বয়স কিন্তু পঞ্চম দশক থেকে নয়। ১৯২৯ সালের ৮ জুন বর্তমান বর্গাকার পতাকাটি প্রবর্তিত হয়। সেন্ট পিটার এখানকার প্রথম পোপ এবং পতাকার সাদা অংশে সেন্ট পিটারের দুটি চাবির ক্রশ প্রতীক হিসেবে আছে। একটি সোনালী চাবি, অপরটি রূপোলি চাবি। চাবি দুটির উপরে একটি মুকুট বা টিয়ারা, যা পোপের মাথায় শোভা পায়। মুকুটটি তিনটি স্তরের, যা কিনা আইন, প্রশাসন এবং বিচার বিভাগের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত।
 
 
এদিকে সুইৎজারল্যান্ডের পতাকাটি বর্গাকার লাল বর্ণের। মাঝে সাদা ক্রশ। ১৮৮৯ সালে পতাকাটিকে জাতীয় পতাকা হিসেবে স্বীকৃতি দেয় সুইৎজারল্যান্ড সরকার। 
 
অতএব পতাকার পাতায় পাতায় কত যে ইতিহাস আর গল্পগাঁথা আছে তা বলার নয়। দেশের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে পতাকার গৌরবকে সকলেই মর্যাদা দিয়ে থাকেন। আমাদের দেশও তাঁর ব্যতিক্রম নয়। স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে জাতীয় পতাকার ইতিহাসের পাতায় তাই এই ফিরে দেখা….!!

Advertisements
Previous articleঅথ বিশ্বকাপস্য গুঁতোঃ
Next articleঅসামান্য এই শিল্পীর বাঁধা খেলাঘর সবই ছিল বেদনার বালুচরে…
পীতম সেনগুপ্ত
প্রাক্তন সাংবাদিক। বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় কর্মরত। ষোলো বছর বয়স থেকে কলকাতার নামী পত্রপত্রিকায় লেখালেখির হাতেখড়ি। ছোটোদের জন্য রচিত বেশ কিছু বই আছে। যেমন 'বিশ্বপরিচয় এশিয়া', 'ইয়োরোপ', 'আফ্রিকা' সিরিজ ছাড়া 'দেশবিদেশের পতাকা', 'কলকাতায় মনীষীদের বাড়ি', 'ঐতিহাসিক অভিযান', 'শুভ উৎসব' ইত্যাদি। এছাড়া বর্তমানে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নানা গবেষণার কাজে নিবেদিত। ইতিমধ্যেই এই বিষয়ে দুটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। 'রবীন্দ্র-জীবনে শিক্ষাগুরু' এবং 'রবীন্দ্র-গানের স্বরলিপিকার'। পড়াশোনা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.