জীবনভর চরম দারিদ্র্য সহ্য করে বাংলাভাষাকে সমৃদ্ধ করে গেছেন এই সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত

তীব্র কালবৈশাখী ঝড়ে চারদিক লণ্ডভণ্ড | উড়ে গিয়েছে ঘরের চালা | ঘরে বসে হাহাকার করছেন বৃদ্ধ | তাঁর নিজের জন্য নয় | প্রাণাধিক প্রিয় বইগুলোর জন্য | অতি সাধারণ জীবনে ওই বইগুলোই ছিল তাঁর সব | ইহজীবন উৎসর্গ করেছিলেন একটি বই রচনায় | বঙ্গীয় শব্দকোষ | তিনি হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় | কথিত‚ ঝড়ে চারদিক তোলপাড় হচ্ছে‚ বৃদ্ধ হরিচরণ একাগ্রচিত্তে লিখে চলেছেন | এই দৃশ্যও বিরল ছিল না |

জীবনভর এত দারিদ্র্য সহ্য করেছিলেন বলেই বোধহয় বাংলা ভাষাকে এত সমৃদ্ধ করে যেতে পেরেছেন এই সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত | নিবারণচন্দ্র-জগৎমোহিনীর অভাবী সংসারে হরিচরণ এসেছিলেন ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দের ভরা আষাঢ়ে, ইংরেজি ক্যালেন্ডারে ২৩ জুন | জন্ম বর্ষার শুরুতে‚ কিন্তু জীবনে কোনওদিন পাননি ধন-ঐশ্বর্যের ছিটেফোঁটাও |  

শৈশব কেটেছে উত্তর ২৪ পরগনার যশাইকাটীতে | সেখানেই প্রাথমিক পাঠের পরে কলকাতার জেনারেল অ্যাসেমব্লিজ ইনস্টিটিউশন এবং মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন | পড়ার ইচ্ছে এবং মেধা থাকলে কী হবে‚ সমার্থ্যই নেই | কোথা থেকে যোগাড় হবে স্কুলের বেতন ! 

স্কুলের সভাপতির কাছে দরখাস্ত দিলে মকুব হতে পারে তা | কারণ কলকাতার কিছু বাবু পরিবার তখন কয়েকজন দুঃস্থ মেধাবী ছাত্রদের পড়ার খরচ বইতেন | কিন্তু এমনি এমনি তো সে অনুগ্রহ মিলবে না | দরকার সুপারিশ | স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সুপারিশ পেয়েছিলেন হরিচরণ | বহাল থেকেছিল স্কুলের পড়া |  

সূর্যের আলো তো পাওয়া গেল | কিন্তু তাঁর পরম উষ্ণতা ? তা থেকেও বঞ্চিত হননি হরিচরণ | রবীন্দ্রনাথের বিশেষ প্রিয় ছিলেন তিনি | পণ্ডিত হরিচরণকে অত্যন্ত সম্মান করতেন কবিগুরু | 

জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন যদুনাথ চট্টোপাধ্যায় | তিনি পাতিসরের সেরেস্তায় একটা কাজ জুটিয়ে দিয়েছিলেন হরিচরণকে | সেখান থেকে সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতকে পাদপ্রদীপের আলোয় তুলে এনেছিলেন কবিগুরু | 

শান্তিনিকেতনে সংস্কৃত পড়ানোর গুরুভার অর্পণ করেছিলেন | আর করেছিলেন একটি অনুরোধ | বাংলা ভাষায় একটি ভাল অভিধান রচনার | যাতে ব্যবহারিক শব্দভাণ্ডারের দৈন্যতা দূর হয় | গুরুদেবের অনুরোধ হরিচরণের কাছে শিরোধার্য আদেশ |

দিনরাত এক করে লিখতে লাগলেন অভিধান | কিন্তু আশ্রমে প্রবল আর্থিক অনটনে কাজ প্রায় বন্ধ হয় হয় | শেষে কবিগুরুর অনুরোধে কাশিমবাজারের মহারাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী বিশেষ বৃত্তির বন্দোবস্ত করলেন | টানা বারো বছর সে বৃত্তি পেয়েছিলেন হরিচরণ | প্রথমে প্রতি মাসে ৫০‚ পরে ৬০ টাকা করে বৃত্তি | তখনকার দিনে নেহাৎ কম নয় | 

এরপর জীবনের বাকি দিনগুলো অতিবাহিত করেছিলেন শান্তিনিকেতনেই | দীর্ঘ দু দশক ধরে লিখেছিলেন বঙ্গীয় শব্দকোষের পাণ্ডুলিপি | কিন্তু পাণ্ডুলিপিকে তো দিনের আলোর মুখ দেখতে হবে | সেটাই হচ্ছিল না‚ অর্থাভাবে | 

শান্তিনিকেতনে কোষাগার বেহাল | মুদ্রণের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়‚ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ-এর মতো প্রতিষ্ঠান | অবশেষে এক দশক পরে পাওয়া গেল প্রকাশক | বিশ্বকোষ-এর নগেন্দ্রনাথ বসু | জীবনের সঞ্চয় উজাড় করে রবীন্দ্রনাথের স্বপ্ন সফল করলেন পণ্ডিত হরিচরণ | তেরো বছর ধরে একে একে মোট ১০৫ টি খণ্ডে প্রকাশিত হল বঙ্গীয় শব্দকোষ | ঠাকুর পরিবার ছাড়াও অর্থ সাহায্য করেছিলেন কলকাতার বহু ধনী ব্যক্তি | দেশ জুড়ে হরিচরণকে নিয়ে ধন্য ধন্য পড়ে গেল | 

এত খ্যাতি | কিন্তু তার আঁচ পড়ল না পণ্ডিত হরিচরণের নিতান্ত সাধারণ জীবনে | মিতাহারী এই সংস্কৃতজ্ঞ ছিলেন খুব নিয়মনিষ্ঠ | প্রাতঃভ্রমণ-স্বল্প আহার-সান্ধ্য আহ্নিক-গীতাপাঠ এবং নিজের পড়াশোনা | এই কক্ষপথেই আবর্তিত তাঁর জীবন | জীবনের শেষপর্বে হারিয়েছিলেন দৃষ্টিশক্তি | খড়ের চালায় লঠনের আলোয় কাজ করার মাশুল | কিন্তু হরিচরণ একে মাশুল বলতেন না | বলতেন উৎসর্গ | তিনি দৃষ্টি উৎসর্গ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মাতৃভাষাকে | দৃষ্টিহীন অবস্থাতেও বসতেন গীতাপাঠে | করতেনও | ক্ষুরধার স্মৃতিশক্তি থেকে | 

জীবনভর শব্দ আর অর্থ খুঁজে যাওয়া ব্রাহ্মণ ১৯৫৯ চলে গেলেন নিঃশব্দলোকে‚ ৯২ বছর বয়সে | তাঁর প্রয়াণের পরে দু খণ্ডে বঙ্গীয় সব্দকোষ প্রকাশিত হয় সাহিত্য অ্যাকাডেমি থেকে | 

(কৃতজ্ঞতা স্বীকার : ‘শ্রী হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়’, সুশীল রায় )

Advertisements

3 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.