ব্রিটিশ উৎকোচে গোপন গুহা ফাঁস বিশ্বাসঘাতকের ‚ পাহাড়িয়া বীরের নির্বাসিত মৃত্যু পূর্ববঙ্গে

ব্রিটিশ উৎকোচে গোপন গুহা ফাঁস বিশ্বাসঘাতকের ‚ পাহাড়িয়া বীরের নির্বাসিত মৃত্যু পূর্ববঙ্গে

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

উনিশ শতাব্দীর শুরুতে উত্তর পূর্ব ভারত ছিল যথেষ্ট অশান্ত | অ্যাংলো বার্মিজ যুদ্ধের পরিসমাপ্তি হল ইয়ান্দাবো চুক্তি দিয়ে | ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দে সই হওয়া সেই চুক্তির ফলে ইংরেজরা পরাধীন ভারতের এই অংশেও অধিকার কায়েম করল | আজকের অসমের শিলচর থেকে দক্ষিণে বাংলাদেশের সিলেট | বা উত্তরে সিকিম অবধি | গভর্নর জেনারেলের এজেন্ট হয়ে কর্তব্যরত ছিলেন ডেভিড স্কট | তিনি শাসন করতে গিয়ে বুঝলেন যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত না হলে এই দুর্গম এলাকা বশে রাখা দুঃসাধ্য |

স্কট স্থির করলেন গুয়াহাটি থেকে সিলেট অবধি একটা রাস্তা বানাবেন | সেই রাস্তা মেঘালয়ের ভিতর দিয়ে যাবে | স্কট সাক্ষাৎ করতে চাইলেন মেঘালয়ের খাসি শাসক ইউ তিরোত সিং-এর সঙ্গে | বলে রাখা ভাল‚ ইউ বা U খাসি ভাষায় পুরুষ লিঙ্গের প্রতীক | তিনি ছিলেন নোংখলো প্রদেশের নির্বাচিত শাসক | শিলং থেকে ৬৩ কিমি দূরে পশ্চিম খাসি পাহাড়ে আজও আছে এই এলাকা | ব্রিটিশরা এই জায়গা বেছেছিল কারণ তবেই সিলেটে সবথেকে দ্রুত পৌঁছোনো যাবে | তবেই বাংলা ও ভারতের অন্যান্য অংশের সঙ্গে যোগাযোগ মসৃণ হতো | 

তিরোত সিং ছিলেন প্রজাবৎসল ও দূরদর্শী | তিনি ভেবেছিলেন এই সড়কের ফলে অসমের সঙ্গে তাঁর প্রজাদের ব্যবসার সুযোগ বাড়বে | এই একই আশা নিয়ে তিরোত সিং ও অন্য খাসি শাসকরা ১৮২৭ খ্রিস্টাব্দে সাক্ষাৎ করলেন ডেভিড স্কটের সঙ্গে‚ বসল দরবার | স্থানীয় শাসকরা সহমত হওয়ায় শুরু হল সড়ক নির্মাণ | গুয়াহাটির কাছে রানি থেকে নোংখলো হয়ে সিলেটের সুর্মা উপত্যকা অবধি | কাজ শুরুর আগেই নোংখলো ছেয়ে গেল বাংলোয় | থাকতেন যাঁরা কাজের তদারকি করতেন | দেড় বছর ধরে চলল কাজ | ব্রিটিশদের সঙ্গে স্থানীয়দের সম্পর্ক তখন সুমধুর |

মোহভঙ্গ হল এক বাঙালি পিওনের কথায় | সে ১৮২৯ সালে সেই পিওন সতর্ক করলেন স্থানীয় খাসিদের | বললেন‚ ইংরেজদের মতিগতি সুবিধের নয় | তারা সড়ক বানাচ্ছে নিজেদের স্বার্থে | এরপর তারা ওই সড়কের জন্য ব্যবহারকারীদের উপর কর চাপাবে | পূরণ করে নেবে নির্মাণ ব্যয় | এ বিষয়ে লিখে গিয়েছেন স্যর এডওয়ার্ড গেইট | তাঁর ‘ দ্য হিস্ট্রি অফ অ্যাসাম’ বইয়ে | 

ইংরেজদের আসল চেহারা বুঝতে পারলেন তিরোত সিং | আরও একবার দরবার হল| খাসি প্রধান নির্দেশ দিলেন ইংরজেরা এবার নোংখলো ছেড়ে পাততাড়ি গুটিয়ে নিক | সড়ক তো হয়ে গিয়েছে | কিন্তু সে কথা কেউ শুনলই না !যেমন ছিল‚ রয়ে গেল সেরকমই | বিপদ বুঝে রাজা আক্রমণ শানালেন | লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ অফিসাররা | দুজন নিহত হলেন | একটুর জন্য বেঁচে গেলেন স্কট স্বয়ং | কারণ তিনি রওনা দিয়েছিলেন সোহরা ( চেরাপুঞ্জী)-র দিকে | 

খাসি বিদ্রোহের খবর যেতেই মেঘালয়ে পৌঁছে গেল ইংরেজ সেনা‚ সিলেট আর কামরূপ থেকে | নির্মম ভাবে দমন করা হল বিদ্রোহ | তিরোত সিং-এর নেতৃত্বে খাসিরা গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল | কিন্তু অরণ্য তাদের আড়াল দিলেও হাতের অস্ত্র তো সেই পুরনোই | তির ধনুক আর তলোয়ার নিয়ে কি ব্রিটিশ বারুদের মুখোমুখি হওয়া যায় ? প্রখর যুদ্ধনীতির কাছেও হার মানতে বাধ্য হয়েছিল খাসিদের গেরিলা রণকৌশল | 

তবুও চার বছর ধরে চলেছিল ব্রিটিশদের সঙ্গে খাসিদের যুদ্ধ | কিন্তু রণে ভঙ্গ দিচ্ছিলেন একে একে রণনেতারা | তিরোত সিং নিজেও আহত হয়েছিলেন | আশ্রয় নিয়েহ্চিলেন দুর্ভেদ্য গুহায় | মেঘালয়ে যারা গিয়েছেন তার দেখেইছেন মেঘের দেশে লুকোনোর গুহার অভাব নেই | 

আর কোনও দেশেই অভাব নেই বিশ্বাসঘাতকের | এক বিশ্বাসঘাতক ব্রিটিশ ঘুষের কাছে আনুগত্য খুইয়ে বলে দিল কোথায় লুকিয়ে আছেন তিরোত সিং | ধরা পড়ার পরে নাম-কা-ওয়াস্তে বিচার হল | তারপর তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল ঢাকায় | সেখানেই বন্দিদশায় মৃত্যুবরণ করেছিলেন এই বীর খাসি সেনানী |

তবে রাজা হওয়ায় তিরোত সিং বঞ্চিত হননি ব্রিটিশ অনুকম্পা থেকে | তিনি বন্দি হলেও মর্যাদা পেয়েছিলেন একজন দেশীয় রাজার মতোই | ঢাকায় ছিলেন গৃহবন্দি হয়ে | অনুমতি ছিল পাল্কিতে এদিক ওদিক যাওয়ার | তবে তা ঢাকা শহরের মধ্যেই | গৃহবন্দি অবস্থাতেই পেটের সংক্রমণে ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দের ১৭ জুলাই প্রয়াত হন তিনি | এই দিনটি মেঘালয়ে পালিত হয় ‘ তিরোত সিং দিবস’ হিসেবে | মেঘালয় সরকারের সব প্রতিষ্ঠানে সেদিন ছুটি থাকে | সে রাজ্যে শিল্পকলা ও সাহিত্যে দেওয়া হয় তিরোত সিং পুরস্কারও | 

আর সেই সড়কের কী হল ? স্কটের তৈরি সেই রুট এখনও আছে | তবে জায়গায় জায়গায় বেহাল | উৎসাহী ট্রেকারদের পা পড়ে | সড়কের ১৬ কিমি অংশের নামকরণ করা হয়েছে ডেভিড স্কটের স্মৃতিতে | খাসি পাহাড়ের বাকি অংশের মতো এই সড়কের দৃশ্যও নয়নাভিরাম | দেখতে দেখতে একবার হলেও মনে করবেন সেই পাহাড়ি মুখগুলো | যাঁরা সফল না হলেও পাহাড়কে ভালবেসে জীবন দিতে দ্বিধা করেননি |

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

Leave a Reply

Handpulled_Rikshaw_of_Kolkata

আমি যে রিসকাওয়ালা

ব্যস্তসমস্ত রাস্তার মধ্যে দিয়ে কাটিয়ে কাটিয়ে হেলেদুলে যেতে আমার ভালই লাগে। ছাপড়া আর মুঙ্গের জেলার বহু ভূমিহীন কৃষকের রিকশায় আমার ছোটবেলা কেটেছে। যে ছোট বেলায় আনন্দ মিশে আছে, যে ছোট-বড় বেলায় ওদের কষ্ট মিশে আছে, যে বড় বেলায় ওদের অনুপস্থিতির যন্ত্রণা মিশে আছে। থাকবেও চির দিন।