ব্রিটিশ উৎকোচে গোপন গুহা ফাঁস বিশ্বাসঘাতকের ‚ পাহাড়িয়া বীরের নির্বাসিত মৃত্যু পূর্ববঙ্গে

1786

উনিশ শতাব্দীর শুরুতে উত্তর পূর্ব ভারত ছিল যথেষ্ট অশান্ত | অ্যাংলো বার্মিজ যুদ্ধের পরিসমাপ্তি হল ইয়ান্দাবো চুক্তি দিয়ে | ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দে সই হওয়া সেই চুক্তির ফলে ইংরেজরা পরাধীন ভারতের এই অংশেও অধিকার কায়েম করল | আজকের অসমের শিলচর থেকে দক্ষিণে বাংলাদেশের সিলেট | বা উত্তরে সিকিম অবধি | গভর্নর জেনারেলের এজেন্ট হয়ে কর্তব্যরত ছিলেন ডেভিড স্কট | তিনি শাসন করতে গিয়ে বুঝলেন যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত না হলে এই দুর্গম এলাকা বশে রাখা দুঃসাধ্য |

স্কট স্থির করলেন গুয়াহাটি থেকে সিলেট অবধি একটা রাস্তা বানাবেন | সেই রাস্তা মেঘালয়ের ভিতর দিয়ে যাবে | স্কট সাক্ষাৎ করতে চাইলেন মেঘালয়ের খাসি শাসক ইউ তিরোত সিং-এর সঙ্গে | বলে রাখা ভাল‚ ইউ বা U খাসি ভাষায় পুরুষ লিঙ্গের প্রতীক | তিনি ছিলেন নোংখলো প্রদেশের নির্বাচিত শাসক | শিলং থেকে ৬৩ কিমি দূরে পশ্চিম খাসি পাহাড়ে আজও আছে এই এলাকা | ব্রিটিশরা এই জায়গা বেছেছিল কারণ তবেই সিলেটে সবথেকে দ্রুত পৌঁছোনো যাবে | তবেই বাংলা ও ভারতের অন্যান্য অংশের সঙ্গে যোগাযোগ মসৃণ হতো | 

তিরোত সিং ছিলেন প্রজাবৎসল ও দূরদর্শী | তিনি ভেবেছিলেন এই সড়কের ফলে অসমের সঙ্গে তাঁর প্রজাদের ব্যবসার সুযোগ বাড়বে | এই একই আশা নিয়ে তিরোত সিং ও অন্য খাসি শাসকরা ১৮২৭ খ্রিস্টাব্দে সাক্ষাৎ করলেন ডেভিড স্কটের সঙ্গে‚ বসল দরবার | স্থানীয় শাসকরা সহমত হওয়ায় শুরু হল সড়ক নির্মাণ | গুয়াহাটির কাছে রানি থেকে নোংখলো হয়ে সিলেটের সুর্মা উপত্যকা অবধি | কাজ শুরুর আগেই নোংখলো ছেয়ে গেল বাংলোয় | থাকতেন যাঁরা কাজের তদারকি করতেন | দেড় বছর ধরে চলল কাজ | ব্রিটিশদের সঙ্গে স্থানীয়দের সম্পর্ক তখন সুমধুর |

মোহভঙ্গ হল এক বাঙালি পিওনের কথায় | সে ১৮২৯ সালে সেই পিওন সতর্ক করলেন স্থানীয় খাসিদের | বললেন‚ ইংরেজদের মতিগতি সুবিধের নয় | তারা সড়ক বানাচ্ছে নিজেদের স্বার্থে | এরপর তারা ওই সড়কের জন্য ব্যবহারকারীদের উপর কর চাপাবে | পূরণ করে নেবে নির্মাণ ব্যয় | এ বিষয়ে লিখে গিয়েছেন স্যর এডওয়ার্ড গেইট | তাঁর ‘ দ্য হিস্ট্রি অফ অ্যাসাম’ বইয়ে | 

ইংরেজদের আসল চেহারা বুঝতে পারলেন তিরোত সিং | আরও একবার দরবার হল| খাসি প্রধান নির্দেশ দিলেন ইংরজেরা এবার নোংখলো ছেড়ে পাততাড়ি গুটিয়ে নিক | সড়ক তো হয়ে গিয়েছে | কিন্তু সে কথা কেউ শুনলই না !যেমন ছিল‚ রয়ে গেল সেরকমই | বিপদ বুঝে রাজা আক্রমণ শানালেন | লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ অফিসাররা | দুজন নিহত হলেন | একটুর জন্য বেঁচে গেলেন স্কট স্বয়ং | কারণ তিনি রওনা দিয়েছিলেন সোহরা ( চেরাপুঞ্জী)-র দিকে | 

খাসি বিদ্রোহের খবর যেতেই মেঘালয়ে পৌঁছে গেল ইংরেজ সেনা‚ সিলেট আর কামরূপ থেকে | নির্মম ভাবে দমন করা হল বিদ্রোহ | তিরোত সিং-এর নেতৃত্বে খাসিরা গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল | কিন্তু অরণ্য তাদের আড়াল দিলেও হাতের অস্ত্র তো সেই পুরনোই | তির ধনুক আর তলোয়ার নিয়ে কি ব্রিটিশ বারুদের মুখোমুখি হওয়া যায় ? প্রখর যুদ্ধনীতির কাছেও হার মানতে বাধ্য হয়েছিল খাসিদের গেরিলা রণকৌশল | 

তবুও চার বছর ধরে চলেছিল ব্রিটিশদের সঙ্গে খাসিদের যুদ্ধ | কিন্তু রণে ভঙ্গ দিচ্ছিলেন একে একে রণনেতারা | তিরোত সিং নিজেও আহত হয়েছিলেন | আশ্রয় নিয়েহ্চিলেন দুর্ভেদ্য গুহায় | মেঘালয়ে যারা গিয়েছেন তার দেখেইছেন মেঘের দেশে লুকোনোর গুহার অভাব নেই | 

আর কোনও দেশেই অভাব নেই বিশ্বাসঘাতকের | এক বিশ্বাসঘাতক ব্রিটিশ ঘুষের কাছে আনুগত্য খুইয়ে বলে দিল কোথায় লুকিয়ে আছেন তিরোত সিং | ধরা পড়ার পরে নাম-কা-ওয়াস্তে বিচার হল | তারপর তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল ঢাকায় | সেখানেই বন্দিদশায় মৃত্যুবরণ করেছিলেন এই বীর খাসি সেনানী |

তবে রাজা হওয়ায় তিরোত সিং বঞ্চিত হননি ব্রিটিশ অনুকম্পা থেকে | তিনি বন্দি হলেও মর্যাদা পেয়েছিলেন একজন দেশীয় রাজার মতোই | ঢাকায় ছিলেন গৃহবন্দি হয়ে | অনুমতি ছিল পাল্কিতে এদিক ওদিক যাওয়ার | তবে তা ঢাকা শহরের মধ্যেই | গৃহবন্দি অবস্থাতেই পেটের সংক্রমণে ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দের ১৭ জুলাই প্রয়াত হন তিনি | এই দিনটি মেঘালয়ে পালিত হয় ‘ তিরোত সিং দিবস’ হিসেবে | মেঘালয় সরকারের সব প্রতিষ্ঠানে সেদিন ছুটি থাকে | সে রাজ্যে শিল্পকলা ও সাহিত্যে দেওয়া হয় তিরোত সিং পুরস্কারও | 

আর সেই সড়কের কী হল ? স্কটের তৈরি সেই রুট এখনও আছে | তবে জায়গায় জায়গায় বেহাল | উৎসাহী ট্রেকারদের পা পড়ে | সড়কের ১৬ কিমি অংশের নামকরণ করা হয়েছে ডেভিড স্কটের স্মৃতিতে | খাসি পাহাড়ের বাকি অংশের মতো এই সড়কের দৃশ্যও নয়নাভিরাম | দেখতে দেখতে একবার হলেও মনে করবেন সেই পাহাড়ি মুখগুলো | যাঁরা সফল না হলেও পাহাড়কে ভালবেসে জীবন দিতে দ্বিধা করেননি |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.