আনন্দশরৎ

আনন্দশরৎ

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

শরৎ বললে ঠিক যে ছবিটা আমার চোখে ভেসে ওঠে সেটা আমার প্রায় বড় হয়ে ওঠার ঠিক আগের একটুকরো সকাল| পাশের বাড়ির কাকিমার ছাদের ওপর মাদুরে আধশোয়া হয়ে শুয়ে আছি| মাথার ওপর যতদূর চোখ যাচ্ছে শুধু নীল, গাঢ় সুনীল আকাশ, রঙটা ঠিক আমার জলরঙের বাক্সে রাখা কোবাল্ট ব্লু| ওই নীল আসমানে তুলো ফাটা মেঘেদের দিক দিগন্ত জুড়ে বাণিজ্য বিস্তারের প্রমোদ তরণী| শুধু নির্ভার, নিশ্চিন্ত, ছায়ার মতো হালকা অথচ তরতরে গতিতে ভেসে যাওয়া আর এদিকে আমার দু’হাতের মধ্যে প্রিয় পত্রিকার আনকোরা নতুন, ঢাউস পুজোসংখ্যা| এ মলাট থেকে ও মলাটে মোড়া আনন্দশরৎ| প্রচ্ছদে মা দুগ্গা ও পরিবারের সকলে সদলবলে পাড়ি দিয়েছেন মর্ত্যে| সঙ্গে নন্দী ভৃঙ্গী ও অন্যান্য অনুষঙ্গের সাথেই উঁকি দিচ্ছেন ক্রাচ কাঁধে কাকাবাবু ও সন্তু, গোয়েন্দা গোগলের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে টিনটিন, সব্বার মাথা ছাড়িয়ে মগজাস্ত্রে শান দিতে দিতে ছ’ফুট দুই প্রদোষ মিত্তির ও শ্রীমান তপেশ, পঞ্চ পান্ডবের সেই বিচ্ছু পাঁচ পাঁচটি ছেলে মেয়ে, মায় ছোট্ট কুকুর কুট্টুস আর পঞ্চুও বাদ যায়নি, ল্যাজ নাড়তে নাড়তে হাসিখুশি মুখে সবার পেছনে তারাও| অমন অনবদ্য ইলাস্ট্রেশন আর কাশফুলের ছবি দেখতে দেখতেই আসল পুজো মনের মধ্যে ঢাক বাজাত, ঢাকে কাঠি পড়ার প্রায় মাসখানেক আগে থেকেই| ছাদের ওপর উপুড় হয়ে সেই পূজা বার্ষিকীর একটা একটা করে পাতা উল্টানো আর নতুন পাতার গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে কখন মিঠেখুশি ঘুম লেগে আসতো চোখের পাতায়, ফুরফুরে স্বপ্নে অস্তিত্ব জুড়ে তখন শুধুই শরৎ আর বুকের ওপর পুজো সংখ্যার আনন্দ সাম্পান|

আসলে সেই বড় হওয়াটা ছিল প্রত্যেকটা ঋতুকে প্রায় সাবান মাখার মতোই গায়ে মেখে বড় হওয়া| নাহলে জানবই বা কি করে যে শরৎ মানেই ছাপার অক্ষরে যাকে পেঁজা তুলোর আকাশ বলা হয়, ভূগোল বইতে যাকে কিউমুলোনিম্বাস বলে ডাকে আসলে সেগুলো তো ওসব কিছু নয়, ঝকঝকে নীল আকাশে ওরা আমাদের মনের ভিতরকার লক্ষ রকম চরিত্র| কেউ সিংহ যার মুখের ভিতরেই লুকোনো রয়েছে মগনলাল মেঘরাজের চোখ এড়ানো সেই দুষ্প্রাপ্য গণেশ, কেউ বা টগবগিয়ে তেপান্তর পেরিয়ে ছুটে চলা সেই সাদা ধবধবে ঘোড়া, শৈলেন মিত্রের গল্পের সেই আজারবাইজান উপজাতিদের রাজপুত্তুর যে ঘোড়ায় চেপে মৃত্যু ঘন্টা বাজাতে যায়, আবার কোন কোন মেঘকে মনে হত অবিকল সাদা দাড়ির রবীন ঠাকুর| সেই যে সঞ্চয়িতায় কেমন চমত্কার লিখেছেন যিনি – “আশ্বিনের মাঝামঝি উঠিল বাজনা বাজি…”| এই সব সাত পাঁচ ভাবনার গল্পলোকের কল্পমানুষগুলোকে নিয়ে আনন্দবার্ষিকীর সেই সোনার শরৎ বড় আপনার ছিল| বর্ষাকালের সেপিয়া রংচটা সব ধূসর ধূসর মনকেমন ব্যথার মেঘ অঘ্রানের শুরুতে সরে যেতেই, কেল্লা ফতে| রোদের রংটাও কেমন একটু একটু করে বদলে যেতে দেখেছি আমরা…বোধহয় শেষ প্রজন্ম, যারা রোদ কে আদর করে ডেকেছিলাম ‘সোনা রোদ’| গুড়ের পাক দিতে দিতে যেমন সোনালী রং ধরে গুড়ের আগায়, বচ্ছরকার মধু জমে জমে যেমন সোনার বরণ ধরে ঠিক পৌষের মুখে ঠিক ত্যামন শরৎ মানে বেলা পেরলেই উপচানো সাদাটে রোদ ঘর ছাড়িয়ে, পাড়া ছাড়িয়ে কেমন করে জানি সোনালী তামাটে দীপ্তিতে ভরিয়ে তুলত চারপাশ| আদ্যিকালের চির চেনা নোনা ধরা বাড়ি, জং ধরা জানলার শিক, রং চটা দেওয়াল আর পলেস্তারা খসা মন কেমন এর দুঃখী দুঃখী বাড়িগুলোও কেমন ভিতরে ভিতরে গোপন একটা খুশিতে গুড়গুড়িয়ে উঠত| আসলে শরৎ এর বাড়ি ফেরার খবরটা আর গোপন থাকত না, ছড়িয়ে পড়ত চতুর্দিক| মা আসছে যে|

খুব জ্বর হত বর্ষা শেষের সেই রোগাভোগা দিনগুলোতে| আমাদের অন্ধকার স্যাঁত স্যাঁতে ঘরের উপরদিকে একটাই আকাশ-দেখা জানলা ছিল, যেটা দিয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে জ্বরকপালে, চার চৌকো কালার টিভির মতো ঝলমলে আকাশ দেখা, একটু একটু করে বদলে যাওয়া আকাশের রং দেখা, নারকোল গাছের মাথাগুলোর ঝলমলে পাতাগুলোর বাহারি পোশাক দেখার চেয়ে এন্তার এন্টারটেনমেন্ট আর কিছু ছিল না| জ্বর ছাড়লে ঘর ধোয়ামোছা হত আর বাকি দরজা জানলা খুলে দেওয়া হত, আর যেই না দেওয়া, অমনি সকালের সেই এক বালতি রোদ যেন আলাপ জমাতে ছুট্টে আসতো জানলা দিয়ে এক লম্বা আলোপথ তৈরি করে| তার গায়ে ধুলোর ফুলকি আর সুক্ষ সুক্ষ রেশমি সুতোর মতো আলোর আল্পনা| সোনার শরৎ যে এসে গিয়েছে, সে খবর প্রথমবার দিত সেই|

আরো একজন ছিল| সাবিত্রী সদন লেখা প্রায় আবছা হয়ে যাওয়া শ্বেত পাথরের নেমপ্লেট দেওয়া বাড়িটার অযত্নে, আগাছায় ভরা জংলা বাগানের কোনায় একটা প্রমাণ মাপের শিউলি গাছ| সে যে ঠিক কি খুশি হয়ে ফুল ফোটাত, সে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না| ভিজে নরম মাটির বুকের ওপর ছড়িয়ে দিত সে ফুলের চাদর| নরম, সদ্য ফোটা এক মুঠো শিউলির সেই গন্ধ, সকালটাকে আরো অনেকটা বেশি সাদা আর কমলা রঙে রাঙিয়ে যেত| শরতের মুঠো মুঠো চিঠি যদি কেউ লেখে ভালোবেসে, তা বোধহয় অবিকল শিউলি ফুলের মতই দেখতে হবে| যেদিন ভোরের দিকে বৃষ্টি আসতো আকাশ জুড়ে, মেঘ ছেঁড়া ঘুমেই প্রথম চোখ যেত বাগানে| ইশ, সব ফুল বোধহয় ঝরে গেল এতক্ষণে| গায়ের চাদরটা ফেলে এক দৌড়ে যখন বাগানের দিকের জানলার শিক ধরে দাঁড়িয়েছি, ততক্ষণে হয়ত স্নান টান সেরে এক পশলা রোদ্দুর ধরেছে ইমন কল্যান আর ও বাড়ির, এ বাড়ির রেডিওতে গান ধরেছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, “কোনো এক গাঁয়ের বধুর কথা…” সেই গ্রাম তো সেভাবে কোনদিন দেখিনি, গাঁয়ের বধুই বা দেখব কোথা থেকে, শহরতলিতে বেড়ে ওঠা খাপছাড়া মন কিন্তু স্পষ্ট দেখতে পেত সেই স্থির শরৎ এর সবুজ স্ফটিক জলে শাপলা ফোটা স্মৃতির মতো একটি গ্রাম| ছায়া সুনিবিড়, শান্তির নীড় একটি জনপদ| চোখের সামনে গাছের গোড়ায়, বৃষ্টির জলমাখা সব শিউলি ঝরে টলমল করত টুকরো টুকরো রাংতা মোড়া শরৎকালের মতো, ওদের আদর করে তুলে এনে কেমন কাঁচের রেকাবিতে সাজিয়ে রাখতাম আর মাঝে মাঝেই মনে হত, সুন্দর কথাটার যদি রুপসম্মত কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া যায়, তা বোধহয় এই, এইটুকু|

সাবিত্রী সদন লেখা বাড়িটা ভেঙে গ্রিনউড আবাসন হয়ে গেছে অনেকদিন| হারিয়ে গিয়েছে সেই শিউলি গাছটা| হারিয়ে গিয়েছে সেই জংলা বাগানে পাখিদের ইশকুল ইশকুল খেলা| শরতের সকাল দুপুরের ঘোর লাগা সোনালী বেলাগুলো নিশ্চিন্হ হয়ে গিয়েছে পুরোপুরি| এখন অনেক সুখী পরিবার ১০ বাই ১০ ফুটের নিরাপত্তায় বাসা বেঁধেছে সেখানে| সকাল সকাল ছোট ছোট গাড়িতে করে তাদের কচিকাঁচারা ইংরাজি ইশকুলে যায়, সারাদিন পর বাসায় শুতে আসে আবাসনের কেজো মানুষজন| শরৎ কখন আসে, কখন যায়, কে জানে| তার খবর কেউ রাখে না| সংবাদপত্রে ছবি-করিয়ে উত্সাহী চিত্র সাংবাদিক দেশ গ্রামের দিকে টিকে গিয়ে ক্যামেরা বন্দী করে তুলে নিয়ে আসেন এক গুচ্ছ কাশফুল বা শিশির ঝরা শিউলি ফুল দুএক মুঠো, সকালের ব্যস্ত ব্রেকফাস্ট এর সাথে ধর্ষণের খবরের সমান্তরালে সে সব ছুটকো ছাটকা শরৎ চিন্হের সুলুকসন্ধানে কার কী বা আসে যায়? শুধু বলিরেখা সম্বল কয়েকটা পুরনো মুখ, ঘোলাটে চোখে, ঝিম ধরা দুপুরে বসে থাকেন আবাসনের একলা বারান্দায়| তাঁদের সব কাজ ফুরিয়েছে এখন| মনে বিসর্জনের ঢাক বাজছে অষ্টপ্রহর, ফেলে আসা পুরনো শরতের দিন মুঠোর মধ্যে ভরে, তাদের আন্তরিক অপেক্ষা, প্রবাসে থাকা সন্তান কি আসবে না এবারেও? ছুটি না পাওয়ার দোহাই দেবে আবার? আবাসনের মাঠে প্যান্ডেল এর বাঁশ পড়বে, তারস্বরে মাইক বাজানো হবে দাপটের সাথে, নীরব নির্জন মানুষগুলো আরও অনেকটা বেশি একলা হয়ে যাবেন| একলা ঘরের তাক থেকে পেড়ে পঞ্জিকার পাতা উল্টোবে শিরা ওঠা কাঁপা কাঁপা হাত, এ বছর দেবী ঘোটকে আসছেন না নৌকোয়| পুজো মানেই কি মিলনের প্রতীক্ষা না বিচ্ছেদের ভয়?

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

2 Responses

  1. “শুধু নীল, গাঢ় সুনীল আকাশ, রঙটা ঠিক আমার জলরঙের বাক্সে রাখা কোবাল্ট ব্লু”…আকাশের এই ডেফিনেশনটা দারুন…আর পুরো লেখাটাও অসম্ভব ভালোলাগল…

  2. সাবিত্রী সদন লেখা বাড়িটা ভেঙে গ্রিনউড আবাসন হয়ে গেছে অনেকদিন| হারিয়ে গিয়েছে সেই শিউলি গাছটা| হারিয়ে গিয়েছে সেই জংলা বাগানে পাখিদের ইশকুল ইশকুল খেলা”……আমন সুন্দর লেখা বেশ অনেকদিন পর পরলাম মনেহল “আমি তুমি সে এমন অনেকের স্মৃতি লেখা হয়ে আছে এতে কেউ লিখে বোঝাতে পারেনি।।মনে হল আমাদের শকলের শৈশব ভেসে উঠলো এক মুহূর্তের জন্য”।

Leave a Reply

Handpulled_Rikshaw_of_Kolkata

আমি যে রিসকাওয়ালা

ব্যস্তসমস্ত রাস্তার মধ্যে দিয়ে কাটিয়ে কাটিয়ে হেলেদুলে যেতে আমার ভালই লাগে। ছাপড়া আর মুঙ্গের জেলার বহু ভূমিহীন কৃষকের রিকশায় আমার ছোটবেলা কেটেছে। যে ছোট বেলায় আনন্দ মিশে আছে, যে ছোট-বড় বেলায় ওদের কষ্ট মিশে আছে, যে বড় বেলায় ওদের অনুপস্থিতির যন্ত্রণা মিশে আছে। থাকবেও চির দিন।