আয়নাভরা দিন,রূপসায়রের জল

আয়নাভরা দিন,রূপসায়রের জল

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

একটা সময় বাঙালির মনখারাপ করতো,আজকাল আর করে না । আজকাল কলকাতা শহরে মন খারাপ করে বসে থাকার মতো আর একটিও জায়গা নেই । শাপলাপুকুর নেই,শুকনো পাতায় ছাওয়া ছায়া ছায়া কামরাঙ্গা গাছের জঙ্গল নেই,আমগাছের ডাল ধরে ছাদের ওপর ঝুলে থাকা দাঁড়কাকের কা-কা নেই, চিলেকোঠা নেই, চৌধুরিকাকুদের বাড়ির বিরাট উদাসীন লাল সিমেন্টের রক নেই । তখন আমাদের মনখারাপের কত অবসর ছিল,কত জায়গা ছিল । মনখারাপ হলেই এগুলোর মধ্যে যে কোনো এক জায়গায় বসে পড়া যেত এক সময় । সেই বৈদ্যবাটির মফস্বলে মামারবাড়ির বিরাট বিরাট শিকগাঁথা জানলাগুলো আর নেই যার পিছনে বসে বসে,হেলে পড়া বেলা বারোটা একটার শীতের সকালের রোদ দেখা যায় ।তখন দেখা যেত । নরম ডিমের কুসুমের মতো হলুদ সকাল থেকে নতুন গুড়ের মতো লালচে সোনালী রোদের রং বদলানো দেখা যেত । হুহু করা উত্তুরে ব্যাথার মতো শনশন খুশিয়াল হাওয়া কাঁঠাল গাছের পিছনের পুকুরের গা ছুয়েঁ ছুয়েঁ ঠান্ডা ঠান্ডা জলছাপ দুঃখ নিয়ে আসতো আর জানলার শিকের পিছনে বসে থাকা কিশোরের মনখারাপ হত খুব ।  স্নানের আগে নারকোল তেলের কৌটোর সরু মুখ থেকে জমে যাওয়া তেল একটু একটু করে চামচে করে রোদের গরমে গলিয়ে নেওয়ার মতো সেইসব মনখারাপেরা,এ শহরে দেখা দেয়না আর  ।

তখন খিদে পেতো খুব । সারাদিন ভুখা বিড়ালের মতো মনের আনাচেকানাচে খিদে আর খিদে । কী খাই,কী খাই । সেই কোন সকালে দুটো রুটি আর কুমড়োর তরকারি । পেটে থাকে ? মা অফিসে চলে যাওয়ার পর মিটকেসে হাত দেওয়া মানা ।অবিশ্যি থাকার মধ্যেও তো তেমন কিছু নেই যা খাওয়া যায় । রান্নাঘরের তাকে হাত বাড়ালে ডালডার খালি কৌটোতে রেশনের মেরি বিস্কুট ।মাসের শেষে তো সেও নেই ।একটু গুঁড়ো দুধ,এক চামচ ।আহা,একটু চানাচুর পেলে বর্তে যাই ।ওবাড়ির জেঠিমা তেঁতুলের আচার দিয়েছে,ছাদের বয়ামে চকচক করছে দুপুরের রোদে । জিভে জল । বাগানের কুল গাছে উঁকি ঝুঁকি দিয়ে ঢিল টিল মেরে গোটা দশেক পাড়া হতো । রান্নাঘর থেকে একটু নুন নিয়ে,টাকনা করে,মুখটাকে যারপরনাই কুঁচকিয়ে একটা একটা করে লাল টোপাকুল । আহা,যেন অমৃত ।পাড়ার দোকানের ভোম্বলদা সারি সারি কাঁচের বয়ামের পিছনে চশমাটাকে নাকের ডগায় ঝুলিয়ে সুজি ওজন করছে দাঁড়িপাল্লায় । এই,কী চাই তোর ? তখন থেকে দাঁড়িয়ে আছে! দেখেও যে খিদে মেটে, সে তো আর ভোম্বলদা জানে না । সেই ভুখা কিশোর তখন জুলজুল করে তাকিয়ে সামনের বয়ামগুলোর দিকে । গোল গোল ক্রিমকেক, প্রজাপতি বিস্কুট, তিলকাঠি, সাবুর খাজা, শোনপাপড়ি আরো কত কী । মা বলেছে শুধু পঞ্চাশ গ্রাম সর্ষের তেল আর আড়াইশো আলু নিয়ে রান্নাঘরে রেখে দিবি ।ভোম্বলের দোকানে তিনমাসের টাকা বাকি পড়ে আছে । তখন বাঙালির খিদে পেতো খুব,এখন আর পায়না !

আজকাল আর কেউ নিরাপত্তাহীন বোধ করে না !সবার মানিব্যাগে মান্থলি থাকে,দুটো-তিনটে কার্ড,খুচরো টাকাপয়সাও কিছু । ব্যাংকে লকার । সবার বাড়িতে বাড়িতে ফ্রিজ, ফ্রিজে জমানো হপ্তাভোরের মতো চিকেন । কোনো অভাব নেই । দেওয়ালে ঝোলানো এলসিডি টিভির পাশে ফ্রেমে বাঁধা হাসিখুশি তিনটে মুখ,ছোট পরিবার সকলেই,সুখী পরিবার সকলেই । বাড়িতে অসুস্থ জেঠামশাই নেই কারো,ঘঙ ঘঙ কাশির আওয়াজ করা অশীতিপর দাদু নেই, মুখে মেচেতার দাগ পড়া অবিবাহিত পিসি নেই, নিদেনপক্ষে দেশ থেকে আসা মা বাপ্ মরা ছেলেটাও নেই,যে, দুবেলা দু মুঠো খেয়ে সমস্ত বাড়ির ফাইফরমাশ খেতে দিতো । দুপুরের পাতের পাশে বসে থাকা রোগা বেড়াল নেই,বাড়তি ভাত আর মাছের কাঁটা খাওয়ার পাড়ার নেড়ি ভুলো কুকুর নেই । অর্থাৎ নিরাপত্তার কোনো অভাব নেই ।

তখন মনে পড়ে ছোটবেলার সব ঘটনা,অঘটনের মধ্যে একটা কোনো কিছু ভালো লাগা মানেই তার সমান্তরাল একটা খারাপ লাগা,একটা চিনচিনে কষ্টবোধ মনের মধ্যে দিব্যি বেড়ালের মতন কুন্ডলি পাকিয়ে বসে সুখটাকে চোখ পাকিয়ে পাকিয়ে পাহারা দিতো । সোয়াস্তি ছিলো না মনে । কেবলি মনে হতো,এত সুখ বুঝি কপালে আছে,এত আনন্দ বুঝি থাকতে হয় ? জাহাজে কাজ করা ছোটমামা নেপাল থেকে একটা কাঠের কুকরি নিয়ে এসেছিলো,গায়ে কাজ করা,একদম আসলের মতো । আমার জন্যে ! সেজপিসি নিজের হাতে বুনে বুনে নীলে সাদায় দিব্য একটা সোয়েটার বানিয়ে দিয়েছিলো,আমার জন্যে!! কী বিস্ময়,কী বিস্ময় । শুধু আমার জন্যে এমন একটা কিছু,এও সম্ভব ? চোদ্দ বছরের জন্মদিনে সেবার প্রথমবার দুটো বন্ধুকে বাড়িতে খেতে বলা হয়েছিল,লুচি আর পাঁঠার মাংস । সে যে কী বিস্ময়,কী সুখ, আজকের সব পেয়েছির প্রজন্ম বুঝবে না । আসলে অনেকখানি না পেয়ে পেয়ে বড় হওয়ার মফস্বলে ছেলেমেয়েরা দুঃখটাকে ভারী ভালোবাসতো,মাছের ঝোল খাওয়ার পর দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা কালোজিরের মতন এক কুচি সেই দুঃখবোধ থেকেই লেখা হতো দিস্তে দিস্তে ।বিকেলের ছাদের আলসেতে হেলান দিয়ে বন্ধুকে শোনানো হতো সেসব । প্রথম গোপনচারণ সেসব,বাবার হাতে পড়লে তো আর রক্ষে নেই ।টিউশনির টাকা দেওয়া হয়না,ছেলে কবিতা লিখছে! রিডিকিউলাস! গরিবের ঘোড়া রোগ । সে সমস্ত কবিতা ফাঁকতালে কী  করে,কী করে জানি জায়গা খুঁজে নিতো কলেজের পত্রিকায়,গঞ্জের কবিতাসমগ্রে । প্রথম আত্মপ্রকাশ । প্রথম নিজের নাম ছাপার অক্ষরে দেখার শিরশিরে অনুভব । বাবা বাড়িতে টাকা পাঠায়নি এক মাস, চিঠিপত্তরও তো কই আসছেনা । মায়ের টিউশনি বাড়ি বলে দিয়েছে সামনের মাস থেকে আর পড়াতে হবেনা,ওরা কলকাতায় চলে যাচ্ছে বাড়ি বেচে । ইলেক্ট্রিকের বিল কেটে দিয়েছে পরশুদিন । সন্ধ্যেবেলা মোমের আলোই ভরসা । ঝিঁঝি ডাকা সন্ধের কাঁঠাল গাছের উঠোনের মাথায় তবুও একরত্তি চাঁদ । ঠান্ডা,শীতল,আশাবরী চাঁদের লক্ষীমন্ত আলো ।ছাতিমের গন্ধে হাওয়ারা ফিসফিসিয়ে কথা বলছে যেন,যেন নিয়তির অনিবার্য ষড়যন্ত্র । সার্কাসের মাঠ থেকে ভেসে আসছে কীর্তন দলের কাঁপা কাঁপা কণ্ঠের প্লুতস্বর ।শচীমা কাঁদছেন,নিমাই রে । খোলের আওয়াজ খুঙ খুঙ করে শচীমার বেদনায় দোহার দিচ্ছে । চারদিকে কত চাপ চাপ অন্ধকার তবুও সাইকেল ঠেলে ফেরার সময় সেই কিশোর দাঁড়িয়ে পড়তো গঙ্গার ধারের বড়বাবা গোরক্ষনাথের খানের মন্দিরের সামনে ।অনেক নিরাপত্তাহীনতার অন্ধকার সন্ধের মধ্যেও জোনাক-জ্বলা বড়বাবার খানের সেই একরত্তি বাল্ব জ্বলা মন্দির যেন অকূলপাথারের মধ্যে একমাত্র বাতিঘরের মতো আলোকবর্তিকা । গঞ্জের বইতে লেখা বেরিয়েছে ।গঞ্জের বইতে ছাপার অক্ষরে তার নাম । এবার একটা কিছু হবে । হবেই ।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

One Response

Leave a Reply

Handpulled_Rikshaw_of_Kolkata

আমি যে রিসকাওয়ালা

ব্যস্তসমস্ত রাস্তার মধ্যে দিয়ে কাটিয়ে কাটিয়ে হেলেদুলে যেতে আমার ভালই লাগে। ছাপড়া আর মুঙ্গের জেলার বহু ভূমিহীন কৃষকের রিকশায় আমার ছোটবেলা কেটেছে। যে ছোট বেলায় আনন্দ মিশে আছে, যে ছোট-বড় বেলায় ওদের কষ্ট মিশে আছে, যে বড় বেলায় ওদের অনুপস্থিতির যন্ত্রণা মিশে আছে। থাকবেও চির দিন।