প্লাস প্রেম আর ফ্লাইং কিস  

সিঁড়ি ভাঙ্গা অঙ্কের দিন শেষ হয়ে গেছে। সিলেবাসে নতুন আর এক গনিত। “পাটি”র পাশে পাটি পেড়ে এসে বসেছে বীজগনিত। মাছের ল্যাজা আর মুড়ো ফ্যাক্টর হয়ে উঠে এসেছে অঙ্কের পাতায়। অঙ্কের বাঁদরও বেজায় ভোগাচ্ছে। উঠছে আর পড়ছে। বিজ্ঞানও ভেঙে দুভাগ। যেন চমকের পরে চমক।

সিলেবাসের চমক ধীরে ধীরে জীবনেও এসে লাগে। বয়স লাগে গলায়। ঠোঁটের ওপর গোঁফের রেখা। দৃষ্টিতে হাল্কা দূষণ। মনে খুচরো পাপবোধের কুচুরমুচুর। ভেতরে এন্ডোক্রিনের কলকাঠি। বন্ধুদের গোপন বৈঠক। সেখানে লিলি মিলি পলিদের নিত্য নতুন টাটকা সব খবর।

জীবনে এই হল তুমি – আমি মার্কা প্রেমের খুঁটিপুজোর সময়। মন জমি প্রস্তত। এবার শুধু বীজ পুঁতলেই চলবে। জীবনের এই রোমাণ্টিক ধাপে ইস্কুল নিতান্তই বেমানান এক পরিবেশ। প্রেমিকের চারপাশে অসহযোগ। অনেকটা ব্রিটিশ যুগে স্বদেশী করার মতই তার দূরবস্থা। 

বছর ত্রিশ আগের এক ঘটনা মনে পড়ছে। স্থান গ্রাম্য এক কো-এড ইস্কুল। নাইনের স্বপন তখন সদ্য ভালোবেসে ফেলেছে সীমাকে। একতরফা ভালোবাসা। স্বপনের হার্টে ধুকপুক। সীমা কিন্তু ঘোর অন্ধকারে। ভেবেচিন্তে স্বপন দেখলে এ চাপ যেন আর নেওয়া যায় না। তুলতে হবে, যেভাবে হোক সীমার কানে তুলতে হবে কথাটা। তার পর যা থাকে কপালে।

কিন্তু তুলবে কে? হু উইল বেল দি ক্যাট? বন্ধুরা পরামর্শ দিলে, দেওয়ালে লিখে দে স্বপন। নতুন চুনকাম করা ইস্কুলের দেওয়াল, প্লাস দিয়ে বড় বড় অক্ষরে লিখে দে, বেশ খুলবে। আইডিয়াটা বেশ মনে ধরল স্বপনের। তবে নিজের হাতে লেখা? – ওরেব্বাবা, সেকথা ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিল স্বপনের। অগত্যা উপায় বলতে বিশু। সেসময়ে ইস্কুলের নামকরা কাঠকয়লা শিল্পী ছিল সে। চমৎকার হাতের লেখা। আর তেমনি ডাকাবুকো। অনেক কচি নায়ক-নায়িকাকে প্লাস দিয়ে ইস্কুলের দেওয়ালে তুলেছে সে। তবে স্বভাবে বিশু ছিল বড্ড পেশাদার। একটা হাফ পাউন্ড স্লাইস ব্রেড আর এক প্লেট ঘুগনি ছাড়া লেখার কাজ হাতে নিত না সে। স্বপন বিশুকেই ধরল তবে একটু দরাদরি করতেও ছাড়ল না। বলল, “শুধু ঘুগনিটাই থাক না ভাই, আবার পাউরুটি কেন? পেশাদারের মতই গুছিয়ে উত্তর দিল বিশু। বলল, “শুধু ঘুগনিতে কী আর হ্য় বল? আমার রিস্কটা একবার ভেবে দেখ। কতরকম কায়দায় এক একটা অক্ষর লিখতে হয় বলত? হাতের লেখা মিলিয়ে সুপ্রিয় স্যার যদি একবার ধরে তাহলে আর রক্ষে রাখবে? টি সি তো বাঁধা। পাউরুটি স্যাক্রিফাইস করতে পারব না ভাই। তবে হ্যাঁ, কথা দিচ্ছি, একটা স্পেশ্যাল কায়দায় লিখব তোদের নাম। প্লাস না লিখে দুটো নামের মাঝে তীর বেঁধা বড়সড় একটা হার্ট এঁকে দেব। দেখবি কেমন জমবে!

শুরুতেই অসহযোগ। পকেট পাংচার। তবু পেশাদার ধরে লাভই হল স্বপনের। হয়ত বিশুর লেখার গুনেই গলে গেল সীমা। ভাগ্যটাও সাথ দিল। ইস্কুলে তিনটে স্বপন, চারটে সীমা। কাজেই দেওয়াল লিপির লেখককে ধরতে শার্লক স্যারেরা আর ইনভেস্টিগেশনের পথে গেলেন না।

প্লাস দিয়ে দেওয়ালে নাম তোলার অর্থ হল খবরটা হাওয়ায় ভাসিয়ে দেওয়া। এটা ছিল সেকালের ইস্কুলের ভালোবাসার প্রথম ধাপ। এরপর কচি প্রেমিক নজরে রাখত তার মনের মানুষটিকে। মুচকি হাসি, চোখাচোখির মত খুটিনাটিগুলো মনোমত হলে তবেই সে এগিয়ে যেত দ্বিতীয় ধাপের দিকে। চিঠি লেখা দিয়ে শুরু হত এই ধাপের কাজকম্ম।

প্রেমের চিঠি – সেও ছিল এক সূক্ষ্ম শিল্প কর্ম। কিন্ত ক’জনই বা সে আর্ট জানত? আমাদের এলাকার টুকলিবাজ ছেলে হারু তখন নামকরা প্রেমপত্র লেখক হয়েছিল। টুকলি করে করে হাত এতটাই পাকিয়েছিল যে ছোট তিন ইঞ্চি বাই তিন ইঞ্চি কাগজে সে প্রায় হাজার শব্দ ধরাতে পারত। তাকে দিয়ে চিঠি লেখানোর একটা আলাদা সুবিধে ছিল। সুবিধেটা এই যে সে চিঠি ধরা পড়লেও স্যরেরা তার পাঠোদ্ধার করতে পারতেন না। আতস কাচের নীচে রেখে সে চিঠি নাকি পড়তে হত। তাই আনকোরা প্রেমিকরা তাদের প্রেমপত্র লেখার জন্য ভিড় করত হারুর কাছে। হারু ছিল আর এক পেশাদার। চিঠিপ্রতি তার ফি ছিল আট আনা। সেকালের হিসেবে বেশ মহার্ঘ। 

মিষ্টি চিঠিতে টুকটাক ডেকরেশন। তার পর তাকে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া। কিণ্তু সে তো আর এক দুরূহ কাজ। এ নবাব বাদশার চিঠি নয়। পত্রবাহক কবুতরও নেই। তাই চিঠি পকেটে নিয়ে ভবঘুরের মত ঘুরে বেড়াত প্রেমিক। কখন সুযোগ আসে তারই অপেক্ষা। চারদিকে জ্যান্ত সি সি টি ভি’র মত মাস্টারমশাই। অবশেষে কোনো একদিন সুযোগ যখন শিকে ছিঁড়ত তখন দেখা যেত যে সে চিঠি আর চিঠি নেই। পকেটের মাল পত্রের চাপে  আর হাতের পেশাইয়ে পড়ে সে তখন কাগজের এক দলাইমলাই। ইস্কুলে সেরকম ন্যাতানো চিঠি ধরা পড়লে কাপড়ের তলায় রেখে তাকে ইস্ত্রি করে আনতেন আমাদের ইস্কুলের নন টিচিং স্টাফ অধীরদা। তারপর ইস্ত্রি খাওয়া কড়কড়ে প্রেমের চিঠি হাতে গবেষনায়  বসতেন  শার্লক স্যারেরা। হারুর চিঠির পাঠোদ্ধারের কৌশল স্যারেদের জানা ছিল না। তবে বড়সড় অক্ষরের চিঠির লেখকরা ছিল বেশ দুর্ভাগা। তাদের ভাগ্যে জুটত চড়-চাপাটি। টি সি লেখার কাজে করনিকের জড়তা ছিল না।

সেবার এক অদ্ভুত চিঠি ধরা পড়ল আমাদের ইস্কুলে। ছোট্ট চিঠি। “আমি তোমার প্রেম – বৃক্ষে বাঁধা এক ছাগল। মাঝে মাঝে ভালোবেসে যে পাতা তুমি ফেল তাই চিবোই আর ব্যা ব্যা করি।

হু ইজ দ্যাট গোট?” হেডস্যার গর্জে উঠলেন। অনেক অনুসন্ধান চলল। কিন্ত ছাগলের সন্ধান পাওয়া গেল না। আমরা জানতাম এ চিঠি অজয়ের লেখা। মধুমিতা আর অজয় ভালোবেসে পরস্পরকে ছোট ছোট নামে ডাকত। অজয় ডাকত মধু, আর মধু ডাকত অজা। বন্ধুমহলের সে কথা স্যারেদের কানে আর উঠল না। তাই অজার ব্যা ব্যা করার গল্প তাদের অজানাই থেকে গেল।

চিঠির ব্যাপারে বেশ ডাকাবুকো ছিল আমাদের ক্লাসের দুই মাতব্বর – হাবু আর রাধারমণ। পড়াশোনায় দুজনেরই ট্র্যাক রেকর্ড বেজায় খারাপ। দুজনেই থেবড়ে নাইনে বসে আছে তিন বছর ধরে। বাংলার বেহাল দশা। বাংলায় ভালো নম্বর পাই বলে তাদের চিঠির প্রুফ সংশোধনের দায়িত্ব মাঝে মধ্যে এসে পড়ত আমার ওপর।                

চারদিকে মার্জিন দেওয়া ফুলস্কেপ কাগজে চিঠি লিখত হাবু। একেবারে উত্তর পত্রের মত। ওপরে ওঁ গণেশায় নমঃ। প্রথম বার ভুল করে “শ্রী চরণেষু সোনালী” লিখে ফেলেছিল। তারপর থেকে “সুইট সোনালী” লিখত। আইডিয়াটা নাকি এলাকার নামকরা মিষ্টির দোকান “সোনালী সুইটস” থেকে ধার করা। চিঠির শেষে পুনশ্চ দিয়ে হাবু লিখত “তোমার জন্য ফ্লাইং কিস।”  তার নীচে তীরবিদ্ধ বড়সড় হার্ট। রক্তক্ষরণের ছবি। হাতের লেখাটা মন্দ ছিল না। তবে ভাষার ব্যবহার ছিল বেশ গোলমেলে। “সরস্বতী পুজোর দিন শাড়িতে তোমাকে বিউটি লাগছিল” – এই বাক্যে ভুলটা ঠিক যে কোথায় তা তাকে বোঝাতে বেশ বেগ পেতে হত।

রাধারমণের প্রথম দিকের চিঠি ছিল বেশ কাব্যময়। প্রতি চিঠিতে স্বরচিত বা ধার করা অন্ততঃ গোটা চার অণু বা পরমাণু কবিতা লিখত সে – আকাশ জুড়ে নীলের বাসা/তোমার হাসি দেখতে খাসা। কিংবা, মিষ্টি সুরে কোকিল গায়/ মন তোমাকে দেখতে চায়। রাধা গদ্যে ফিরল বিশেষ এক ঘটনার পরে। তৃতীয় বার নাইনে দেহ রাখার পরে মিতালি রাধাকে “গাধা” বলেছিল। তারপর বেশ কিছুদিন চিঠিপত্র বন্ধ। প্রেম যায় যায় অবস্থা। অবশেষে রক্ত দিয়ে চিঠি লিখল রাধা। রক্ত নিজের নয়। হাজির রেওয়াজি খাসির রক্ত। সেই চিঠি পড়ে মিতালি ডেটল পাঠাল গিফট হিসেবে। থেমে গেল মনকষাকষি।

এই দুই মাতব্বরের ভালবাসা নিয়ে স্যারেরা অবশ্য সেভাবে মাথা ঘামাতেন না। কারণ এদের প্রেমিকারা ক্লাসের নিরিখে ছিলেন এদের দিদি স্থানীয়া। সরস্বতী পুজোর মত দিনে তাই এরা দিব্যি দোর দিয়ে গল্প করত “দিদি” দের সাথে। কিন্ত “বোন”দের সাথে সেরকম গল্পের সুযোগ অনেকেই পেত না। সেই সব অভাগার আপশোশের কথা মা সরস্বতী নিশ্চয়ই টের পেতেন। 

সে সব দিন আর নেই, নেই সেইসব আপশোষের ফোঁস ফোঁস। কালের ম্যাজিকে বদলে গেছে অনেক কিছুই। প্লাস-প্রেম মাইনাস হয়ে গেছে ইস্কুলের জীবন থেকে। ইস্কুলের দেওয়ালে পরিচ্ছন্নতা। কাঠকয়লা শিল্পীরাও উধাও। লিলিপুট-লিপি-শিল্পীরা নেই, নেই পত্রবাহক, নেই সেই লক্ষ ভাঁজে ভাঁজ হওয়া চিঠি। প্রেম তবু আজও মিষ্টিই আছে। মোবাইল জামানায় প্রেমিক-প্রেমিকা আরো কাছাকাছি। ভ্যানিশ হয়েছে তুমি-আমি – সবাই এখন “তুই”। মিনিটে  মিনিটে প্রেমের আপডেট আসছে মোবাইলে। ফ্লাইং কিস নয়, ভেসে আসছে টকটকে লিপস্টিক দেওয়া টাটকা ঠোঁটের ছবি। শার্লক স্যারেরা আজো আছেন। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ে তাঁরা আজো টের পান প্রেমরোগীদের অস্তিত্ব। তবে প্রেমের ভূত তাড়াতে সেভাবে আর তেড়েফুঁড়ে ওঠেন না। প্রেমিকের মোবাইল বাজেয়াপ্ত করেও পাসওয়ার্ডের অভাবে কেমন যেন ভ্যাবলা হয়ে যান। শিক্ষার অধিকার আইন এসেছে। টি সি গেছে জাদুঘরে। এ কালের কচিকাঁচাদের প্রেমে তাই সেই ভয়ানক অসহযোগ আর নেই।  

Advertisements

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.