আম জনতার ফল

মুর্শিদাবাদ নবাবের দেশ। যদিও সেই নবাব নেই, সেই নবাবিও নেই। বিলুপ্ত হয়ে গেছে কবেই। চিহ্ন যা পড়ে আছে, খুবই নগণ্য। ভাঙাচোরা ঘরবাড়ি, খানাখন্দ ভরা রাস্তা, জীর্ণ মসজিদ, ধূসর কবরখানা। সেসব দেখতেই এখানে দেশবিদেশ থেকে পর্যটকরা ছুটে আসেন। সেটা অবশ্য শীতকালে। কিন্তু তারা যখন ফিরে চলে যান, নবাবি মুর্শিদাবাদের প্রকৃত রূপ ফুটে ওঠে এখানকার আমবাগানে বাগানে। শীত যাব যাব করছে ঠিক এই সময়ে আমের গাছে গাছে মউল আসতে শুরু করে। একটা-দু’টো কোকিলের ডাক শোনা যায়। বসন্তবাতাসে মউলের গন্ধ আর কোকিলের কুহুধ্বনি মন মাতাল করে তোলে। তারপর বসন্ত পুরো মাত্রায় চলে এলে তো আর কথায় নেই। আম গাছের শাখাপ্রশাখায় ফুটে থাকা মউল গুটি-রূপ ধারণ করতে শুরু করে। 

ফলের রাজা আম। নাম শুনলেই শুধু জিভে জল নয়, মগজেও রসেলি রসের সঞ্চার হয়। আম ভালবাসে না এমন মানুষ আমি অন্তত চোখে দেখিনি। মির্জা গালিবের আম-প্রীতি তো সর্বজন বিদিত। 

পাশাপাশি দু’টি জেলা। আমাদের মুর্শিদাবাদ আর মালদহ। সেই সঙ্গে পদ্মার ওপারে বাংলাদেশের চাঁপাই-নবাবগঞ্জকেও ধরা যায়। মালদহ ‘ফজলি’ আমের জন্য বিখ্যাত হলেও আমাদের মুর্শিদাবাদ আর চাঁপাই-নবাবগঞ্জ বিখ্যাত রকমারি আমের জন্য। এই রবরবা সেই নবাবি আমল থেকে চলে আসছে।

আমের গাছ মূলত তিন প্রকার। গুটি আমের গাছ, যেগুলি আঁঠি থেকেই জন্মায়। কলম আমের গাছ, এক গাছের সঙ্গে অন্য গাছের ডালের জোড়া লাগিয়ে যেগুলি তৈরি করা হয়। আর আম্রপালি আমের গাছ, বিশেষ আধুনিক পদ্ধতিতে তৈরি আকারে ছোট অথচ ঝাকড়া আমের গাছ, এই গাছে আমের ফলন বেশি হয়। এই তিন প্রকারের আমগাছ হলেও আমের নামের শেষ নেই। যেমন- ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, খিরসাপাত, মল্লিকা, মিছ্রিদানা, নিলাম্বরী, কালীভোগ, কাঁচমিষ্টি, আলফানসো, বারোমাসি, গোলাপখাস, ত্রিফলা, হাড়িভাঙ্গা, ছাতাপড়া, গুঠলি, লখনা, কলাবতী, আশ্বিনা, ক্ষীরমন, সেন্দুরা, মধুচুষকী, রাণীপসন্দ, হিমসাগর, বাতাসা, বোম্বাই, সুরমাফজলি, সুন্দরী, বৈশাখী, রসকিজাহান, কালুয়া, কালিভোগ, বাদশাভোগ, বনখাসা, চন্দনকোসা, দুধকুমারী, ছাতাপড়া, চোষা, জিলাপি, দিলসাদ, চ্যাটার্জি, বেগমবাহার, রাজাভুলানী, চকচকা, পেয়ারাফুলী, সেন্দুরাফজলী, গুলাবজামুন, আলমশাহী, দাদাভোগ, মিঠুয়া, ইমামপছন্দ, জনার্দনপছন্দ, কৃষ্ণভোগ, ইলশেপেটী, কলমবাজি, খানবিলাস, জাফরান, মধুমালতী, নাজুকবদন, বেলখাস, হুসনেআরা, শাদতুল্লা, আজিজপছন্দ, জামাইপসন্দ, লক্ষণভোগ, ভাদুরিয়া, কালুয়া, মোহন ভোগ, হাঁড়িভাঙ্গা, চিনিবাসা, দুধকুমার, মন্ডা, লাড্ডু, সীতাভোগ, রাখালভোগ, ছুঁচামুখী, টিয়াকাটি ইত্যাদি ইত্যাদি। যদিও সব আমের স্বাদ এক নয়। একটা আমের সঙ্গে আরেকটা আমের স্বাদের যেমন ভিন্নতা আছে তেমনি চেহারা আকারেও ফারাক আছে। আমের এত রকম নামের সেটাও একটা কারণ। আর আমের এমন সব নাম শুনলেই বোঝা যায় আম নিয়ে মানুষের উন্মাদনা কোন পর্যায়ে ছিল বা আছে যে স্বাদ, চেহারা, আকার দেখে মিষ্টির নাম থেকে ব্যক্তির নাম, রাজা-রানীর নাম, পাখির নাম, জায়গার নাম, এমন কী মাছ বা প্রাণীর নামেও আমের নামকরণ করা হয়েছে।

আমার ঠাকুরদা হাবিবুল্লা পন্ডিত সরকারি ভাবে শ্রেষ্ঠ চাষীর শিরোপা পেয়েছিলেন সেই সাতের দশকে। তাঁর হাতে ফলানো অন্যান্য ফসলের সঙ্গে তাঁর বাগানের আম চাষ ছিল অন্যতম। তাঁর বাগানের আমের এলাকায় বেশ সুনাম ছিল। আজও আছে।

আমার ঠাকুরদা সেই চারের দশকে রকমারি আমের চাষ শুরু করেছিলেন। তার আগেও আমাদের আম বাগান ছিল। কিন্তু তা ছিল গুটি আমের বাগান। আমরা আমাদের ছোটবেলায় আমাদের আমবাগানে সেরকম কিছু গুটি আমের গাছ দেখেছি। যেমন, একটা গাছের নাম ছিল ‘চোকামোটা’। ওই গাছের আমের চোকা গন্ডারের মতো মোটা ছিল। দাঁতে ছেঁড়া তো দূরের কথা, ছুরি দিয়েও কাটা যেত না। আর একটা গাছের নাম ছিল ‘জিলাপি’। জিলাপির মতো কড়া মিষ্টি স্বাদের আম ফলত। আর একটার নাম ‘দো-আঁশলা’। দেখতে ঠিক ল্যাংড়া আমের মতো। অথচ এত টক যে মুখে দেওয়া যেত না। নামী দামী গাছের ভিড়ে এরকম বেশ কিছু আমগাছ (‘বউভোলানী’, ‘মনোহরা’, ‘কোহিনুর’, ‘বাতাসা’, ‘মিছ্রিভোগ’ ) ঠাকুরদা ইচ্ছে করে রেখে দিয়েছিলেন বাগানে। জিজ্ঞেস করলে বলতেন, ‘ভালর সঙ্গে মন্দ না থাকলে ভালটা যে ভাল তা বুঝবি কী করে?’ শুধু তাই নয়, আম খেতে আমাদের বাগানে যাঁরা অতিথি আসতেন, ঠাকুরদা তাঁদের খাওয়ানো শুরু করতেন ওই সব গুটি আম দিয়ে। বাগানের সবচেয়ে ঝাঁকড়া গাছটার তলায় থাকত কুঁড়েঘর। যার ভেতরে মাচা, বাইরে মাচা। অতিথিদের নিয়ে ঠাকুরদা বসতেন বাইরের মাচায়। চামচ-প্লেটের ব্যবহার থাকত না। শুধু ঠাকুরদার হাতে থাকত একটা ধারাল ছুরি। সঙ্গে ঝাবরা চাচা কিংবা নেষের চাচা। তাঁদের হাতে আম পাড়ার আঁকশি। ঠাকুরদা হুকুম করতেন, ‘যা তো নেষের একটা ‘বিড়া’ আম পেড়ে নিয়ে আয়।’ আমের মধ্যে এই আমটাই সবার আগে পাকে। বৈশাখের মাঝামাঝি। আমাদের বাড়ির কাজের ছেলে রব্বানভাই থাকত ঠাকুরদার ন্যাওটা হয়ে। নেষের চাচা আম পেড়ে নিয়ে এলে রব্বানভাই বালতি ভর্তি জলে সেই আম ধুয়ে ধরিয়ে দিত ঠাকুরদার হাতে। ঠাকুরদার হাতে ধরা ছুরিটা বোঁটা থেকে ঘুরে ঘুরে কী অদ্ভুত কৌশলে পুরো আমটাকে নিকিয়ে ফেলতেন, অতিথিরা তো বটেই- আমরাও যারা বারবার দেখতাম সেই দৃশ্য তারাও অবাক না হয়ে পারতাম না। ঠাকুরদা ওই ভাবে ‘বিড়া’র পর এক এক করে বাগানের আর সব অখ্যাত বিখ্যাত আম, যেমন- ‘সেদুঁরা’, ‘বোম্বাই’, ‘খিরসাপাত’, ‘কিষাণভোগ’, ‘বাদশাভোগ’, ‘গোলাপখাস’, ‘ল্যাংড়া’, ‘হিমসাগর’, ‘রাণী’, ‘ভবানী’, ‘সাদুল্লা’, ‘মোহনভোগ’, ‘গোপালভোগ’, ‘কাঞ্চনকষা’, ‘বেল’, ‘কোহিতুর’ … … … সবশেষে ‘চম্পা’ আম কেটে খাওয়াতেন অতিথিদের। এই ‘চম্পা’ আম আমাদের বাগানের সবচেয়ে বিখ্যাত আম। অতিথিরা যখন বিদায় নিতেন, ঠাকুরদা তাঁদের হাতে একটা করে ছোট আম ভর্তি ঝুড়ি ধরিয়ে দিতেন। আমাদের বাঁশঝাড়ের বাঁশ কেটে ঝুড়ি তৈরি করতেন আমাদের বাড়ির ঘরামি জয়নাল চাচা। ঝাবরা আর নেষের চাচা ভ্যাটপিটুলির পাতা সাজিয়ে আম ভর্তি করতেন সেই ঝুড়িতে। 

‘ল্যাংড়া’ আমের রাজা হলে ‘কোহিতুর’ হল আমের রাণী। খুব আদুরে। হাতে ছোঁয়া যায় না। আঁকশিতে তুলো বিছিয়ে গাছ থেকে পেড়ে নয়, আদর করে নামিয়ে আনতে হয়। তারপর তুলো বিছানো ঢাকিতে বাড়ি নিয়ে আসা হয়। আর যতক্ষণ না খাওয়ার উপযুক্ত হয়ে ওঠে, তুলার বিছানায় শুইয়ে রাখতে হয়। হাতে ছুলেই তার দফারফা। তাই সেই আম খেতে হলে আমাদের বাড়ি আসা ছাড়া গতি ছিল না।     

আগে আমের সিজন বলতে আমরা পেতাম পাক্কা ছ’মাস। বৈশাখে শেষাশেষি শুরু হত ‘বিড়া’ আম দিয়ে। আশ্বিনে শেষ হত ‘আশ্বিনা’ আম দিয়ে। না, একটু ভুল বলা হল। চৈত্র থেকেই শুরু হয়ে যেত আমাদের আম-পার্বণ। যখন শাখা-প্রশাখায় মউল থেকে দানা দানা গুটি ধরতে শুরু করত, ঠাকুরদার নির্দেশে ঝাঁকড়া আমগাছ তলার কুঁড়েঘরটা সারিয়ে ফেলতেন ঘরামি জয়নাল চাচা। সঙ্গে বাগান সংলগ্ন আমাদের বাঁশড়ার বাঁশ কেটে মাচা বানিয়ে ফেলতেন। বালিপাড়ার কালু পালের বাড়ি থেকে নতুন মাটির কলসি নিয়ে আসত রব্বানভাই। তাতে থাকত আমাদের মুন্নাওয়ালা জমিতে পোঁতা পাম্পের স্বচ্ছ জল। আর কী চাই? আমরাও বাড়ির কথা ভুলে যেতাম। বাগানই হয়ে উঠত তখন আমাদের ঘরদ্বোর।

তার মধ্যেই আমরা দেখতাম নিজের অজান্তে বাগানের উত্তরপশ্চিম কোণে দাঁড়িয়ে থাকা ‘জর্দালু’ গাছটাকে। যে চৈত্র-বৈশাখের রুক্ষ মাটি থেকে রস টেনে তার শাখা-প্রশাখায় ঝুলে থাকা ফলগুলিকে পুষ্ট করে তুলছে আমাদের জন্য। ওই গাছটাই ফলত কাঁচমিষ্টি আম। স্বভাবতই ওই গাছটির ওপর আমাদের নজর থাকত আম-পার্বণের প্রথম দিন থেকেই।

তখন নিয়ম ছিল গাছের আম না পাকলে হাত দেওয়া যাবে না। কিন্তু গাছ থেকে খসে পড়া আম যে পাবে তারই। তার বাগানের মালিক না হলেও চলবে। সে ওই আম নিয়ে যা খুশি করতে পারে। তাই চৈত্রের শেষ থেকেই প্রায় সব বাড়িতেই শুরু হয়ে যেত দুপুরে ভাতের সঙ্গে আম-ডাল। যা ছিল এক অতি লোভনীয় পদ। তা বাদেও নুন মাখিয়ে কাঁচা আম খাওয়াটা ছিল আমাদের মতো ছোটদের কাছে নেশার মতো। আর পোড়া আমের শরবত তো এক উপাদেয় পানীয়। তারপর আম পাকতে শুরু করলে সকালের খাবার আম-ছাতু কিংবা আম-রুটি। দুপুরে ভাতের সঙ্গে আমের চাটনি, আবার শুধুই আম। রাতে রুটির সঙ্গেও আম। কাঁসার খোরা ভর্তি দুধের সঙ্গে আম-রুটি মাখিয়ে খাওয়াটা ছিল আমাদের পরিবারের রেওয়াজ।

আমের সময়ে বিশেষ করে চৈত্র-বৈশাখে শিলাপাত কিংবা কালবৈশাখী মতো দুর্যোগ বাঁধাধরা। কখনও বেশি, কখনও কম। এর ওপরেই নির্ভর করে আমের ভবিষ্যৎ। যদিও এমন দুর্যোগে পড়া আম নষ্ট হতো না। ওই আম কুড়িয়েই বাড়িতে বাড়িতে আমচুর-আচার তৈরি হতো। যা সারাবছর আমের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখত আমাদের রসুই ঘরে।

আবার প্রাকৃতিক কারণে যে বছর একেবারের আম ফলত না, সে বছর আমাদের অবস্থা হতো কাঙালেরও অধম। আর বাগানের অবস্থা হতো ঠিক শ্মশানের মতো। সবুজ সবুজে আমগাছ অথচ আমরা কেমন কালো কালো অন্ধকার দেখি। কোকিল ডাকে হয়ত, কিন্তু আমরা বধির হয়ে থাকি- কোকিলের সেই মধুর ডাক শুনতে পাই না। বসন্তবাতাস বইলেও তা আমাদের গায়ে লাগে না। তবু আমরা ঘুরে বেড়াতাম ওই আম বাগানেই। ঠিক যেভাবে দেশবিদেশের পর্যটকরা খানাখন্দে ভরা রাস্তা হেঁটে ভাঙাচোরা বাড়ি, জীর্ণ মসজিদ, ধূসর কবরখানা দেখে বেড়ায় মুর্শিদাবাদ বেড়াতে এসে! আর নবাবী আমলের ইতিহাসকে স্মরণ করে! আমরাও স্মরণ করতাম আগের বছর কী তার আগের বছর আমের সময় আমরা আম নিয়ে কী কী করেছিলাম!             

ঠাকুরদা বেঁচে নেই। রব্বানভাই বেঁচে থাকলেও ঝাবরা চাচা, নেষের চাচা, জয়নাল চাচা কবেই মারা গেছেন। কিন্তু আমাদের বাগানটা আজও আছে। গাছগুলিও আছে। প্রতি বছর নিয়ম করে সেসব গাছের শাখা-প্রশাখায় মউল আসে। গুটি ধরে। কিন্তু তার আগেই আমরা ঠিকা দরে আম বিক্রি করে দিই আম-কারবারীদের কাছে। এখন আর বাগানে আমাদেরকে কুঁড়েঘর মেরামতি কিংবা মাচা বানাতে হয় না। ওসব আম কারবারীরাই করে নেয়। আর আমরা এখন আধুনিক সুখ-ভোগের জন্য ওই বাগান থেকে বহু দূরে- শহরে চলে এসেছি। এখন আর আমরা দাঁতে ছিড়ে কিংবা ছুরিতে কেটে আম খাই না, টিভি দেখতে দেখতে বহুজাতিক কোম্পানির বোতল বন্দি ‘মাজা’ খাই।  তারপর ঢেকুর তুলে বলি, ‘আঃ রাসেলি!’ কে জানে ওই ‘মাজা’য় আমাদের বাগানের আমের কিংবা প্রতিবেশী আর কারও বাগানের আমের সত্যিকারের রস মেশানো আছে কি না! যদি থাকে তাহলে আমাদের মতো ভাগ্যবান কে আছে আর এই আধুনিক জগৎ-সংসারে!

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.