৮০০ বছর আগে সেঁকা ইঁদুরের সঙ্গে ঝলসানো কাছিম ছিল ভারতের অভিজাত ভোজ

4965

দই বড়া‚ ধোসা আর সেঁকা ইঁদুরমধ্যযুগে দ্বাদশ শতাব্দীতে ভারতবাসীর খাবার ছিল বিস্ময়ের উৎস | তার উল্লেখ পাওয়া যায় সংস্কৃত পুঁথি মানসোল্লাস-এ | এই বইকে ধরা হয় ভারতের অন্যতম প্রাচীন রসনা পুস্তক বা রন্ধন গ্রন্থ হিসেবে | এই গ্রন্থ থেকে জানা যায় মধ্যযুগীয় ভারতের রসনা | আর খাবার যে জীবনযাত্রার অন্যতম মাপকাঠি‚ সেকথা তো বলা-ই বাহুল্য |

বিভিন্ন যুগের ভারতীয় খাদ্যরীতি নিয়ে গবেষণা করেছেন কলিন টেলর সেন | এই ফুড হিস্টোরিয়ান বা খাদ্য ঐতিহাসিক তাঁর বই  ফিস্টস অ্যান্ড ফাস্টস ; দ্য হিস্ট্রি অফ ফুড ইন ইন্ডিয়া -য় বলেছেন প্রাচীন যুগে ভারতে ভোজন ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ | ভারতীয়রা ছিলেন খাদ্যরসিক বা ভোজনবিলাসী | সংস্কৃত ভাষার অনেক রচনায় বিস্তারিত বর্ণনা আছে রন্ধন এবং তার উপকরণের | কোন ঋতুতে কোন খাবার কতটা খেতে হবে‚ দেওয়া আছে | বলা আছে‚ কোন উপকরণ দিয়ে কোনটা কীভাবে রাঁধতে হবে |

আবার ফিরে যাই সুদূর অতীতে | মানসোল্লাস হল প্রাচীনতম নন মেডিক্যাল টেক্সট বুক অন ইন্ডিয়ান ফুড | অর্থাৎ ভারতীয় খাবারের উপর চিকিৎসাশাস্ত্রের বাইরে প্রাচীনতম বই | রচনা করেছিলেন রাজা তৃতীয় ভুলকমল্লা সোমেশ্বর | দাক্ষিণাত্যের পশ্চিমা চালুক্য বংশের এই রাজা শাসন করেছিলেন ১১২৭ থেকে ১১৩৮ খ্রিস্টাব্দ | কর্নাটকের প্রাচীন জনপদ কল্যাণী বা বাসবকল্যানী ছিল তাঁর রাজধানী | 

প্রায় সম্পূর্ণ কাব্যিক ছন্দে রচিত মানসোল্লাস বইয়ে ১০০ টি পরিচ্ছেদ আছে | একে শুধুই রান্না বা ভোজন বিষয়ক বই বললে ভুল হবে | একজন সুযোগ্য রাজার গুণাবলী‚ প্রশাসনের বিধি‚ অর্থনীতি‚ খাবার‚ সঙ্গীত‚ বিনোদন ও ক্রীড়া—আলোচিত হয়েছে এই সব বিষয় | একে বলাই যায় বিশ্বকোষ | যেখানে শেখানো হয়েছে কীভাবে বশ করতে হবে বন্য হাতিকে‚ রাজ্যের আদর্শ করব্যবস্থা কেমন হবে  থেকে শুরু করে সুন্দরীদের প্রসাধনী টিপস | 

আরও একটি প্রাচীন গ্রন্থ ভর্তুর উপভোগকরণ | এর কুড়ি নম্বর পরিচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে বিভিন্ন খাবার | অপটুদের জন্য দেওয়া হয়েছে বেশ কিছু রেসিপি | রয়েছে দোসাকা বা ধোসা‚ পোলিকা বা পুরাণ পোলি বড়িকা বা আজকের দই বড়া | আর যা আছে শুনলে চোখ কপালে উঠবে | ডেলিকেসি হিসেবে বলা হয়েছে সেঁকা ইঁদুর আর ঝলসানো কাছিমের কথা | দ্বাদশ শতাব্দীর খাদ্যাভ্যাসের কিছু ঝলক এগুলোই |

ভোজন করতে হবে ঋতু অনুযায়ী | বলছে প্রামাণ্য গ্রন্থ মানসোল্লাস | যেমন‚ বসন্তে খেতে হবে ঝাল | গ্রীষ্মে শুধুই শীতল ও মিষ্টি খাবার | বর্ষায় নোনতা এবং শীতে ভারী মশলাদার খাবার | এতো গেল প্রাধান্যের কথা | দৈনিক আহারে ছটি প্রধান স্বাদের কম্বিনেশন থাকা উচিত | সেই ষড় স্বাদ হল মিষ্টি‚ টক‚ নোনতা‚ তিতো‚ ঝাল এবং কষাটে | সেইসঙ্গে বলা আছে কোন খাবার দিয়ে কোনটা খেতে হবে | যেমন বলা হয়েছে মাংসের সঙ্গে খেতে হবে টক | আবার টকজাতীয় খাবার বেশি হলে তার সঙ্গে থাকতেই হবে নোনতা | তখন দাক্ষিণাত্যে খাবারে বহুল ব্যবহৃত জনপ্রিয় মশলা ছিল হিং | জলে ভিজিয়ে রাখা হিং রান্নায় না হলে মুখে রুচতই না সে খাবার |

পাশাপাশি আছে সে যুগে ব্যবহৃত খাদ্যশস্য‚ ডাল‚ আনাজপাতি ও ফলমূলের বিস্তারিত বর্ণনা | ঐতিহাসিক টেলর মানসোল্লাসকে উদ্ধৃত করে বলেছেন দ্বাদশ শতাব্দীতে খাওয়া হতো এমন ৪০ রকমের ফলের নাম আছে‚ যার সমগোত্রীয় এমন ফল তিনি ইংল্যন্ডে পাননি |  এমনকী সেখানে আছে একটা স্যালাডের রেসিপিও | কাঁচা আম‚ কাঁচকলা ‚ উচ্ছে আর কাঁঠালের স্যালাড | তার মধ্যে দিতে হবে তিল আর কালো সর্ষে‚ সাজানোর জন্য |

মজার কথা‚ মধ্যযুগের পুরিকাই হল আজকের পাপড়ি | যা তখনও খাওয়া হতো চাটনি দিয়ে | আজকের দই বড়ার আদি সংস্করণ হিসেবে ছিল অড়হর ডালের ডাম্পলিং | যা টক দইয়ে চুবিয়ে খাওয়া হতো | এছাড়াও আজকের ধোসা ছিল দোসিকা‚ পূরণ পোলি ছিল পোলিকা এবং পরোটা ছিল মণ্ডক নামে | মুখরোচক হিসেবে খাওয়া হতো কড়াইশুটির চপ আর ডালবড়া |

যাঁরা ভাবছেন প্রাচীন এই পুঁথিতে বাঙালিদের জন্য কিছু নেই‚ ভুল করছেন | রয়েছে পঁয়ত্রিশ রকম মাছের কথা | তাদের নাম‚ আকার আয়তন‚ বসবাসের ক্ষেত্র‚ তাদের বঁড়শিতে গাঁথার আদর্শ টোপ থেকে শুরু করে কীভাবে কেরাকম খণ্ড করতে হবে‚ মায় তাদের রান্নার আলাদা পদ্ধতি | যত্ন করে বলা হয়েছে ঝলসানো কাছিম এবং ভাজা রুই মাছের কথা | সঙ্গে টিপস‚ কাঁকড়া রান্নার আদর্শ বাসনপত্র হতে হবে তামার | হতাশ হতে হবে না মাংস ভক্ষকদেরও | রয়েছে কাবাব তৈরির বিস্তারিত পদ্ধতি | বিশেষ ডিশ বলতে ঝলসানো ইঁদুর | সঙ্গে ভেড়ার রক্তে তৈরি কালো পুডিং | 

শেষপাতে মিষ্টিমুখ | এখনেই চমক | অনেকে গবেষকই মনে করেন‚ ভারতবাসীকে ছানার মিষ্টি শিখিয়েছে পর্তুগিজরা | তার আগে মিষ্টি হতো ক্ষীর থেকে | অথচ টেলরের দাবি‚ প্রাচীন সংস্কৃত পুঁথিতে আছে ছানার সঙ্গে এলাচ আর চিনি মিশিয়ে তাকে বিম্বফলের মতো আকারে বানিয়ে ভাজতে | এটাই রসগোল্লার প্রাচীন সংস্করণ ? তর্কের মধুরেণ সমাপয়েৎ হওয়ার নয় | পাশাপাশি আছে ফল আর দুধের ছাঁচ মিশিয়ে বানানো পানাকা | এটাই আজকের স্মুদির প্রাচীন রূপ | আর যেটা ছাড়া যেকোনও অভিজাত ভোজ অসম্পূর্ণ‚ সেই সুরার বিবরণও আছে রূপ রস নিয়েই | আঙুর‚ আখ‚ তাল‚ নারকেল‚ খেজুরের মতো ফলের নির্যাস দিয়ে তৈরি হতো মদীরা‚ আজকের ওয়াইন | 

সৌভাগ্যক্রমে কালের বিবর্তনের সঙ্গে বহু আক্রমণ সহ্য করেও হারিয়ে যায়নি এই প্রাচীন গ্রন্থ | সংরক্ষিত আছে বিকানীর আর্কাইভে এবং পুণের ভান্ডারকর রিসার্চ ইনস্টিটিউটে |  

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.