শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়
জন্ম ১৯৭১ সালের ৫ ডিসেম্বর|রসায়ণ অনার্স নিয়ে বিএসসি পাস করেন, বিএড ও এমবিএ-র পর কর্মজীবন শুরু একটি ফার্মাসিউটিকল সংস্থায়|বর্তমানে একাধিক বাণিজ্যিক ও অবাণিজ্যিক পত্র-পত্রিকায় গল্প, কবিতা, ছড়া, প্রবন্ধ, ছোটদের সাহিত্য, ফিচার ইত্যাদি রচনায় নিয়মিত| ঙ্গ সংস্কৃতি পুরস্কার ২০১২, ঋতবাক ‘এসো গল্প লিখি’ পুরস্কার ২০১৬-১৭, শর্মিলা ঘোষ সাহিত্য পুরস্কার ২০১৬ (ছোটগল্প) ও ঊষা ভট্টাচার্য স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার (নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন প্রদত্ত)।

এই কোঅর্ডিনেশনের কাজটা ফিল্‌ম তথা টিভি সিরিয়াল তৈরিতে অপরিহার্য যদিও দর্শক হিসাবে তার অস্তিত্ব আলাদা করে আমাদের চোখে পড়ে না। প্রোডাকশন ম্যানেজারের ডান বাম দুটো হাতকেই শক্ত করে প্রোডাকশন কোঅর্ডিনেটররা। একটি প্রযোজনা নির্দিষ্ট খরচ ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ হবে কিনা, তা অনেকটাই নির্ভর করে প্রোডাকশন কোঅর্ডিনেশনের দক্ষতার ওপর। একটি প্রজেক্টকে দেখভাল ও নিয়ন্ত্রণ করা, বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ, অফিস ম্যানেজমেন্ট, সময়সূচী স্থির করা, জনসংযোগ রক্ষা, শুটিং-এর জায়গা বা লোকেশনে ব্যবস্থা করা, শিল্পী ও অন্যান্য কর্মী নিয়োগ থেকে যাবতীয় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যোগান ও ব্যবস্থাপনা প্রোডাকশন ম্যানেজমেন্টের আওতায় পড়ে।

তবে স্টুডিও পাড়ায় কোঅর্ডিনেটর বলতে চট করে যাদের বোঝায় তাদের কাজ মূলত অভিনয় শিল্পী যোগান দেওয়া। তাদের আর একটি পরিচয় ‘মডেল কোঅর্ডিনেটর’। শিল্পী বলতে চলচ্চিত্র বা টিভি ধারাবাহিকের অভিনেতা-অভিনেত্রী বা বিজ্ঞাপনের মডেল সবই হতে পারে। সারা ভারতবর্ষের ফিল্‌ম ও টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রি অভিনেতা-অভিনেত্রী ও মডেল সংগ্রহের জন্য কোঅর্ডিনেটরদের ওপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল।

Banglalive

কলকাতার বুকে অনেক বড়ো কোঅর্ডিনেটিং এজেন্সি আছে যাদের মধ্যস্থতায় ভালো কাজ ও ভদ্রস্থ পারিশ্রমিক পাওয়া যায়। তাদের মাধ্যমে সুযোগ পেয়ে পরবর্তীকালে কেউ কেউ প্রতিষ্ঠাও পেয়ে যায়। এছাড়াও কিছু এজেন্সি আছে যাদের অধীনে বা ব্যানারে একাধিক ছোটখাটো বা সাব-কোঅর্ডিনেটর কাজ করে। এদের সম্মিলিত শিল্পী যোগাড়ের ক্ষমতা তাক লাগানোর মতো। বড়ো বড়ো প্রজেক্টগুলো অধিকাংশ দেখেছি এই জাতীয় কোঅর্ডনেটিং সংস্থাকে দিয়ে মানব সম্পদের ব্যবস্থা করে। একটি প্রজেক্টের জন্য একাধিক কোঅর্ডিনেটরও বরাত পেতে পারে। তাদের প্রাথমিক দায়িত্ব অডিশনের জন্য ক্যান্ডিডেট যোগাড় করা, যাদের মধ্যে থেকে পছন্দসই প্রার্থীকে কাজের জন্য বেছে নেওয়া হবে। আর পরবর্তী কাজ হল বাছাই করা প্রার্থীদের শুটিং লোকেশন কল টাইল ইত্যাদি জানিয়ে দেওয়া এবং শুটিং চলাকালীন নিজের ক্যান্ডিডেটদের সুবিধা অসুবিধা দেখা ও পাহারা দেওয়া। তবে সব সময় যে অডিশনের দরকার হয় তা নয়। রাস্তায় বা আর কোথাও বড়ো জটলার দরকার হলে অত বাদ-বিচার করার সময় বা দরকার কোনওটাই থাকে না।

Banglalive

এবার আসি আসল গল্পে। বলা বাহুল্য কোঅর্ডিনেটরের মাধ্যমে তারকা নিয়োগ হয় না। বরং তাদের সময় সুবিধা অনুযায়ী বাকিদের শিডিউল স্থির হয়। কিন্তু তারকা, মহাতারকা, সুপারনোভা ছাড়াও মেজ সেজ ন থেকে ছোটোখাটো হেঁজিপেঁজি ভূমিকার জন্যও তো অভিনয় শিল্পীর প্রয়োজন হয়। কোঅর্ডিনেটরদের মাহাত্ম সেখানেই শুরু।

Banglalive

মুখ কালো করে কথা শুনছিলেন এক ভদ্রমহিলা। তার ওপর এত অভদ্র ভাষায় হম্বিতম্বি করছিল একটি ছোকরা যে কহতব্য নয়। “খুব চালাকি শিখে গেছেন না? যান ফুটুন”। মহিলার অপরাধ অ্যাসিটেন্ট ডিরেক্টরকে নিজের ফোন নম্বর দিয়ে ফেলা। তাঁকে ডেকেছে ওই ছোকরা যে এজেন্সির কর্মী সেই কোম্পানির সঙ্গে সংযুক্ত একজন ছোট কোঅর্ডিনেটর। শিল্পী যদি নিজে যোগাযোগ করে নেয়, বিশেষ করে বড়ো কোনও সুযোগ পেয়ে যায়, তাহলে পরবর্তীকালে এজেন্সির কমিশন ফাঁকি যাবে। কতটা ফাঁকি? যেমন ধরুন একটি ছোটখাটো চরিত্রাভিনয়ের জন্য (জুনিয়ার আর্টিস্টকে চরিত্রাভিনেতা মনে করা হয় না) যদি প্রোডাকশন হাউস দৈনিক ২৫০০ টাকা বরাদ্দ করে থাকে, তাহলে ফড়ে উপ-ফড়ে স্যরি, কোঅর্ডিনেটর সাব-কোঅর্ডিনেটর এই পথ ঘুরে সেই শিল্পীর হাতে ভোর পাঁচটা থেকে রাত্রি নটা পর্যন্ত হাজিরা তথা পরিশ্রমের পারিশ্রমিক পৌঁছবে দৈনিক ৩০০ টাকা করে। তাও আবার যদি পরপর তিনদিন কাজ থাকে, তাহলে সার্ভিস চার্জের নাম করে আরও একশো টাকা কেটে নেওয়া হতে পারে। যারা সরাসরি প্রোডাকশন হাউসের কাছে কাজ পায়, তারা প্রায়শ কাজের শেষে হাতে গরম টাকা পেয়ে যায়। কিন্তু কোঅর্ডিনেটরের কাছে টাকা পাওয়া খুব সহজ হয় না। বোঝাই যায়, পারিশ্রমিক লাভের সময় বড়ো-মেজো-ছোট কোঅর্ডিনেটর অনুযায়ী বাড়তে থাকে, আর পরিমাণটা খেয়াল খুশি অনুপাতে কমতে থাকে। অবশ্য পারিশ্রমিক বললে ভুল হয় কারণ তাতে যাতায়াতের ধকল খরচই পোষায় না, কিন্তু বিকল্প হিসাবে সম্মানি কথাটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একেবারে বেমানান।

Banglalive

যে ঘটনাটা বললাম সেটা ২০০৬-০৭ সালের। তারপর দশ বছরে বাজার দরের দশগুণ বৃদ্ধি হলেও ২০১৫-তেও সেই উপ-সমন্বয়কের কাছে দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকার বেশি বাড়েনি। তবে একটা ব্যাপারে প্রশংসা করতেই হয়। এই সমন্বয়ক বেশ সাম্যবাদী। আশেপাশে পায়চারি করা যে জুনিয়ার শিল্পীর প্রোডাকশন নির্ধারিত দর ৫০০-৬০০ তাকেও ৩০০, আর কঠিন অডিশন উতরে পুরোদস্তুর চরিত্রাভিনয় করার জন্য যে শিল্পীর অফিশিয়াল দর ২৫০০ হাজার, তাকেও ৩০০ ধরিয়ে দিতেন অবলীলায় কোনও বৈষম্য না করে।

আরও পড়ুন:  বেলাশেষের আলো

কেউ কেউ আবার নিজেদের কায়দা করে ‘কাস্টিং ডিরেক্টর’ বলে, ঠিক যেমন ‘মেডিকেল রিপ্রেজ়েন্টেটিভ’-এর নতুন নতুন নামকরণ ‘বিজ়নেস ডেভেলপমেন্ট এক্সিকিউটিভ’ অথবা ‘টেরিটোরি ম্যানেজার’। কেউ কেউ হয়তো সত্যিই ফ্রন্ট লাইন ম্যানেজারি বা পরিচালনার কাজ করে ছোটখাটো টীমের দায়িত্ব থাকে। কিন্তু যারা নেই তারাও অনেক সময় সেই পরিচয়টাই দিতে পছন্দ করে। এই নতুন নামকরণের আড়াল দেখে মনে হয়, কোঅর্ডিনেটররাও কি নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য লজ্জিত? জানি না কোনও পর্দায় কাস্টিং দেখানোর সময় এইসব যোগানদারদের সবার নাম খুদে অক্ষরেও থাকে কিনা।

তবে রূপোলি পর্দার জগতে আর একটি বদনাম যা সুপরিচিত, সেই কাস্ট ক্রাউচিং-এর পাল্লায় সচরাচর পড়তে হয় না এই ধরণের মধ্যসত্তভোগীদের মারফত আসা শিল্পীদের। তেমন কাজের জন্য আলাদা ফড়ে আছে। তারা আবার বিভিন্ন ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দিয়ে পসার সাজায়। নির্দিষ্ট ইমেইল অ্যাড্রেসে নিজেদের ছবি, বায়োডেটা পাঠানো যায় বা সরাসরি ফোনেও কথা বলা যায়। কোনও মহিলা বা অল্পবয়সী মেয়ের ছবি পছন্দ হলে ফোনে শুরু হয় দ্বিতীয় পর্ব। নাম-ধাম, মাপজোক ইত্যাদি নিয়ে সামান্য হেজানোর পর পরবর্তী প্রশ্ন হয়, প্রার্থী কতটা বোল্ড হতে আগ্রহী বা রাজি। একেক জনের একেক রকম চাহিদা। কেউ জানতে চায় ক্যামেরার সামনে কতটা উন্মোচন সম্ভব। কোথাও আবার বোল্ডনেস শুধু পর্দায় দেখালে চলবে না, বিজ্ঞাপনদাতা কাস্টিং ডিরেক্টর বা ডিরেক্টর বা প্রোডিউসারের সঙ্গে বোল্ড রিলেশনে যেতে পারবে কিনা তার ওপরে পরীক্ষায় সাফল্য নির্ভর করছে। অডিশনের মাধ্যমে কোনও প্রার্থীর যোগ্যতা যাচাই হবে পরে, আগে সাহসিকতা পরীক্ষায় পাস করতে হবে। তৃতীয় এক শ্রেণীর ফড়ে কোম্পানি আবার ভালো মানুষের মতো অডিশনে ডেকে পরে ফোন করে বা অন্যভাবে ফাইনাল ইন্টারভিউ হিসাবে বোল্ডনেস কনফার্মেটরি টেস্ট নিতে চায়। ও, চতুর্থ শ্রেণীর কথা ভুলেই গেছি। তারা কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে টাকা চায়। তার সঙ্গে বোল্ডনেস ফাউ পেলে মন্দ হয় না। ছেলেদের মনে হয় না এভাবে সাহসিকতার পরিচয় চাওয়া হয়, যদিও দিতে হলে তাদের খুব খারাপ লাগার কথা নয় যদি না পরীক্ষক পুরুষ হয়। তবে রকমসকম দেখে পরীক্ষা নেওয়ার আগ্রহ তৈরি হলে আশ্চর্য কিছু নয়।

আরও পড়ুন:  কেতজেল পাখি (পর্ব ১৬)

আন্তর্জালকে বিজ্ঞাপন দেওয়া সব কোম্পানি অবশ্যই এমন নয়। অনেকের চয়ন প্রক্রিয়া মানে বাংলায় যাকে সিলেক্‌শন টেস্ট রীতিমতো কড়া হয়। তবে এই স্বাপদ সঙ্কুলতার মধ্যে আসল নকল ছদ্মবেশী টের পাওয়া দুষ্কর।

ও হ্যাঁ। সেই ভদ্রমহিলার গল্প তো মাঝ পথেই ছেড়ে চলে এসেছি। তাঁকে দিয়ে সারা দিনের কাজ উদ্ধার করানোর পর সেই ছোকরা নিজে তো বিস্তর হাঁকডাক করল। তারপরেও শান্তি হল না, খবর গেল সেই ফড়ের কাছে যে মহিলাকে কল দিয়েছিল। ইনি সেই সাম্যবাদী সমন্বয়ক, যাঁর হাত দিয়ে জল গলাও সহজ নয়। তিনি সচরাচর মিনমিন করেন। তবে সেদিন কেঁচোও ফণা তুলেছিল। বললেন, “আমরা শত খানেক কল করে ক্যান্ডিডেট যোগাড় করব, সবার দায়িত্ব নেব, সবরকম ঝক্কি পোয়াব, আমাদের তো পয়সা চাই। আমাদের মাধ্যমে কাজ করলে আর যাই হোক, এরা কেউ কোনও মেয়ের সঙ্গে বেচাল করবে না। না হলে চলো, তেমন রাস্তাও আছে, গেস্টহাউসে গিয়ে সময় কাটাতে হবে। চার ডবল পেমেন্ট, আর ফুর্তির টাকা আলাদা। কে কী রকম সেটা বুঝেই আমরা কাজ দিই।”

সবাই সব জানে। ওপেন সীক্রেট। কিন্তু কোঅর্ডিনেটর ব্যবস্থা নিয়ে কোনও চলচ্চিত্র হয় না; কারণ সবকটি প্রযোজনাই এদের ওপর প্রচণ্ডভাবে নির্ভরশীল। পরিচালকরা জুনিয়ার আর্টিস্ট বা ছোটোখাটো চরিত্র শিল্পীর সঙ্গে সরাসরি কথা পর্যন্ত বলেন না। যাকে একটু আগে ক্যামেরার সামনে আনার সময় স্যর স্যর বা ম্যাডাম ম্যাডাম করে খাতির করা হচ্ছিল, প্যাক-আপ হয়ে যাওয়ার পর তাকে চিনতেও পারে না পরিচালনা বিভাগ থেকে প্রযোজনা বিভাগের কেউই। কিন্তু সমন্বয়কদের সৌজন্যে শিল্পীর অভাব হয় না, শুটিং ফ্লোরেও নয়, গেস্ট হাউসেও নয়।

1 COMMENT

  1. নির্মম সত্য। অবদমন, শোষণ এই গুলো বিনোদন জগতে যে কতো ভাবে ছড়িয়ে আছে তার কিছুটা জানা গেল। এই ধরনের আরো ফিচার এর অপেক্ষায় রইলাম

এমন আরো নিবন্ধ