শাস্ত্রীকাহন

বেশ কিছু বছর ধরে দেখছি, টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে রীতিমত রাজ করে চলেছেন জ্যোতিষীরা। দিনের যে কোনও সময় টিভির রিমোট ঘোরালে দেখতে পাবেন, টানা দশটা চ্যানেলে একই সঙ্গে অনুষ্ঠান করে যাচ্ছেন দশজন জ্যোতিষ। কিছু কাল এই সব চ্যানেল দেখে আর খবরের কাগজের জ্যোতিষীদের বিজ্ঞাপন উল্টে পাল্টে যেটা বুঝেছি তা হল—এটি এমন এক শাস্ত্র যেখানে দ্বিতীয় তৃতীয় বা তার পরে রেজাল্ট করেন যারা, তাঁদের কোনও স্থান নেই। এমন একজন জ্যোতিষকেও দেখলাম না, যাঁর নামের পাশে ‘গোল্ড মেডেলিস্ট’ লেখা নেই। অর্থাৎ শুধু ফার্স্ট বয়রাই করে খেতে পারেন।  

অন্যের বস হতে গেলে এলেম লাগে। তবে কখন যে টুক করে আপনি অন্যের বশ হয়ে যাবেন সেটা জানতেও পারবেন না। এখনকার বাজারে জ্যোতিষ কনসাল্টেশনে যে জিনিসটা সবচেয়ে বেশি হিট যাচ্ছে তা হল বশীকরন। তবে এই বশীকরণ এক্সপার্টদের নিজেদের মুখের কথায় নিজেদেরই আস্থা নেই। তাই ‘লিখিত কনট্রাক্টে ১০০ পার্সেন্ট গ্যারান্টি’ দিয়ে তাঁরা ‘কাজ’ করার কথা বলে থাকেন। সবারই আবার নির্দিষ্ট টাইমফ্রেম আছে। তিন মিনিট, পাঁচ মিনিট এমন আর কি। যিনি যত কম সময়ে বশ মানাতে পারবেন, তাঁর তত দাম। ক’দিন পরেই বিভিন্ন কোম্পানিতে অ্যাপ্রাইজালের টাইম চলে আসবে। অ্যাপ্রাইজালের আগের দিন বসকে মোহিনী বশীকরন করে মাইনেটা বাড়ানো যায় কি না একবার ভেবে দেখবেন তো! এখন অবশ্য লাইকের বড়দা সুপারলাইকের মত বশীকরনেরও এক সিনিয়র এসে গিয়েছেন বাজারে। তার নাম তীব্র বশীকরন।

দু’পাতা শাস্ত্র খুলে দেখতে না দেখতেই আমাদের জ্যোতিষবাবুরা বাহাদুর শাস্ত্রী হয়ে যান। মহিলাদের অবশ্য হ্যাপা কম। নামের পরে একটা মা জুড়ে দিলেই কাজ মিটে যায়। শাস্ত্রী টাইটেলটার বাজার চড়া। নামের সামনে একটা আচার্য্য লাগাতে পারলে নামটা আরও ভারি হয়। তবে শুধু শাস্ত্রীতে রক্ষা নেই। ওই শাস্ত্রীর আদি, অনাদি না আসল সেটাও উল্লেখ করতে হবে। নামের পরে ব্র্যাকেটে লেখা থাকবে ‘গোল্ড মেডেলিস্ট’। এটা মাস্ট। আর কম করে তিনটে মোবাইল নাম্বার থাকা দরকার। মোবাইল নম্বরের সঙ্গে জ্যোতিষবাবুর পসারের সমানুপাতিক সম্পর্ক। পাবলিক অন্তত তাই বোঝে।

স্কুল কলেজের বিজ্ঞাপনে যেমন বোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে অ্যাফিলিয়শনের কথা উল্লেখ করা থাকে, একই রকম ভাবে প্রতিটি জ্যোতিষবাবুই কোনও না কোনও শ্মশানের সঙ্গে তাঁদের অ্যাফিলিয়শনের কথাটা বলে দেন। প্রতি অমাবস্যায় তাঁরা সেখানে স্পেশাল তন্ত্রক্রিয়া আর তীব্র বশীকরন করে থাকেন। প্রত্যেক জ্যোতিষীকেই সিদ্ধ হতে হয় বুলিতে ও বিজ্ঞাপনে। ‘তারাপীঠসিদ্ধ’ আর ‘কামাক্ষ্যাসিদ্ধ’ কথাদুটো লিখতে পারলে তাঁদের শেয়ারদর বাড়ে।    

চিকিৎসাশাস্ত্রের কাছে উত্তর না থাকলেও এই বাজারে জ্যোতিষশাস্ত্রের কাছে উত্তর আছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্পেশালাইজেশন আছে। যিনি ছানি অপারেশন করেন, তার কাছে তলপেটে ব্যথার কথা বলে লাভ হয় না। কিন্তু আমাদের শাস্ত্রীরা এসব স্পেশালাইজেশনের ব্যাপারকে বুড়ো আঙুল দেখান। তাঁরা প্রত্যেকে মাল্টিস্পেশালিটি ক্লিনিক আর সুপারস্পেশালিটি আরোগ্য নিকেতন। যিনি ‘জীবনশক্তিদায়ী, রিষ্টফাঁড়া ও অকাল মৃত্যুরোধক’ মহামৃত্যুঞ্জয় কবচ দিচ্ছেন, তিনিই আবার দিচ্ছেন পেট পরিস্কার রাখার জন্য মহানির্গমন কবচ। নামটি ভারি অর্থবহ। এ তো সবে শুরু। পরীক্ষায় পাশ করার জন্য আছে সরস্বতী কবচ, ঝণমুক্তি, হঠাৎ প্রাপ্তি, বেকারত্ব ঘোচানো আর লস করা ব্যবসার আঁখিজল মোছানোর জন্য ধনলক্ষী সৌভাগ্যবৃদ্ধি কবচ, মনের মত পাত্র পাত্রীর সঙ্গে বিয়ে আর বিয়ের পরে গ্যারান্টেড শান্তির জন্য আছে ত্রিভুবনেশ্বরী শ্রীশ্রী প্রজাপতি কবচ। তিনিই আবার তাড়াতাড়ি ডিভোর্স মেটানোর জন্য দিচ্ছেন মহামুক্তি কবচ। ভাড়াটে ওঠানো কিংবা প্রমোটিংয়ের কাজে ঝামেলা কাটানোর জন্যেও কবচ আছে। এক স্বঘোষিত ‘পিঠসিদ্ধ শ্রেষ্ঠ জ্যোতিষী’কে দেখলাম তাঁর হাই প্রোফাইল বিজ্ঞাপনে বুক বাজিয়ে বলছেন—দুরারোগ্য জটিল ব্যাধি থেকে মুক্তির জন্য ডাক্তারের কাছে যাওয়ার দরকার নেই। তাঁর থেকে নাগা সন্ন্যাসীদের মন্ত্রপুত যন্ত্রম নিলেই হবে। পাশে শোভা পাচ্ছে এক নৃত্যরত উলঙ্গ নাগা সন্ন্যাসীর ছবি। আরেক জন বলছেন, ‘ভয় কি রে পাগল। আত্মহত্যার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত আমি যে আছি।’ তিনি আবার নিজেকে ‘টপ সেলিব্রিটি কাপালিক তান্ত্রিক’ বলে দাবি করেন। অমাবস্যার রাতে চামুন্ডার যজ্ঞ করা এই শাস্ত্রীর ফ্ল্যাগশিপ হল ‘মায়া মৃগাঙ্গ কিন্নর কামাক্ষ্যা মায়াজালে বশীভূত পাগল করা বশীকরণ ও যাদুটোনা’। এর মানে আমি বুঝিনি। বিজ্ঞাপনের ভাষা পড়েই বশ হয়েছি। তিনি বাড়িতে ভূতের উপদ্রবের দাওয়াই দেন। বান মারেন। সতীনের ‘বিষ নজর’ থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। আবার মেয়েকে শ্বশুর বাড়িতে কষ্টের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য দুর্গাতেজী কবচম বলে একটি বস্তু ভক্তের কল্যাণে প্রদান করেন। বংশনাশ থেকে রক্ষা করার জন্য যে জাপানী মাদুলি হয় সেটাও জানা গেল। এক জন আবার বশীকরণে না পোষালে মুঠিকরণ বলে একটি পদ্ধতির সাহায্য নেন। সেটা যে কি অধমের জানা নেই। তিনি বলেন ‘ঈশ্বর আল্লার কৃপায় কোনও মানুষের রক্তের অশ্রু ঝরতে দেব না’। ১৪টি বিদ্যায় পারদর্শী এই বাবা সগর্বে বলেন, তাঁর কাজকে যিনি আটকাতে পারবেন তাকে ২৩ লক্ষ টাকা পুরস্কার। গিন্নির বারবার বাপের বাড়ি যাওয়া আটকানোর জন্য তিনি আবার সোমত্ত বরদের ‘আকর্ষণ মাদুলি’ বলে একটি দাওয়াই দিয়ে থাকেন।

এ তো গেল বিজ্ঞাপনের কথা। টিভিতে যে জ্যোতিষীরা বসেন, তাঁদের বেশিরভাগই ফ্যাশন আইকন। ডিজাইনার পোশাক পরেন। অনেককে ফুল বডি ওয়াক্সিং করে আর রক্তরঙা উত্তরীয় পরে খালি গায়েই ক্যামেরার সামনে বসে পড়তে দেখা যায়। পাশে ‘১৫ দিনেই টিভি স্টার’ কোর্স করা লাস্যময়ী ঘোষিকা। শাস্ত্রীদের কেউ কেউ হঠাৎ চৈতন্য হয়ে গানও গান। জয় তারা কিংবা জয় মাতাদি বলতে বলতে নামমাত্র দক্ষিণায় আর্ত ভক্তের সেবা করার কথা প্রচার করেন যখন, গলার পাঁচ ভরি সোনার হারটা ঝকমকায়। দিন কয়েক এমন অনুষ্ঠান দেখলে মনের কোটরে ধারনা হবে, বাড়ির বাথরুমটা কোন দিকে তার উপরেই নিশ্চিতভাবে নির্ভর করে আছে আপনার কর্মফল। এক অন্ধ ভক্তকে ফোনে বলতে শুনেছিলাম, ‘বাবা আমনার কথামতো বাদরুমটা ভেঙে দিয়ে নৈঋত কোণে করার পরেই মেয়েটার ভাল বিয়ে হয়ে গেল। জামাইয়ের দুটো মোটরবাইক।’ স্বয়ং নাসা যেটা বলতে পারেনি আজও, শাস্ত্রীমশাইরা বলে দেন। চার ইঞ্চির একটা ফাইবারের মূর্তি কি ভাবে যাবতীয় নেগেটিভ রে শুষে নিয়ে চরম ফাঁকিবাজ ছেলেকেও মাধ্যমিকে লেটার পাওয়াতে পারে এটা সত্যিই এক গবেষণার বিষয়। ব্লিচিং পাউডারে কাল সর্প যায় জানতাম। কিন্তু ভাগ্যে কালসর্প থাকলে রত্নের যত্ন লাগে। এমনি রত্নে হবে না। অমুক শাস্ত্রী কিংবা তমুক মা শোধন করলেই সেই পাথর কথা বলে উঠবে। জয়েন্টে ডাক্তারিতে তির মারতে গেলে পড়াশোনা পরে। আগে টেবিলে মেটাল কচ্ছপ থাকা চাই। আপনার বাড়ির উত্তর পূর্বে মোড়ের পাশে যে বাড়িটা আছে, যে বাড়ির লোকজনদের আপনি হয়তো চেনেনও না, সেখান থেকেই যে কেউ বান মেরে আপনার প্রমোশন আটকে দিতে পারে এটাও বুঝতে হয় শাস্ত্রীবচন থেকে। তিনি হয়ত বান মারছেন। আপনি অ্যান্টিবান কবচম দিয়ে সেই বান আটকাচ্ছেন। তিনি আবার কালাযাদু সিদ্ধ দুর্বাশা যন্ত্রম দিয়ে নেগেটিভ রেতে স্নান করাচ্ছেন আপনাকে। আর আপনার মহাসুখম মহাযন্ত্রম সেই নেগেটিভ রে-কে পজিটিভে কনভার্ট করে আপনাকে দিব্য রাখছে। নানা রে-র মধ্যে যে এই নিত্য হারেরেরে চলে, এই অনুষ্ঠানগুলো না দেখলে জানতেও পারতাম না কোনও দিন।

ডাক্তারবাবুদের কাছে গেলে সমস্যার কথা বলতে হয়। নানা পরীক্ষা করাতে হয়। রিপোর্ট দেখে তাঁরা নিদান দেন। অন্য দিকে জ্যোতিষবাবুরা বলছেন, বিধান পাওয়ার জন্যে মুখে সেলোটেপ সেঁটে আসুন। জন্ম সময় বলবেন না। ঠিকুজি কুষ্টি দেখাবেন না। নিজের সমস্যা নিজের মুখে একদম নয়। অর্থাৎ, আপনি বোবা হয়ে থাকবেন আর সব বলবেন উনি। ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানোর সঙ্গে গণনার ধরনও বদলাচ্ছে। কথা কম, কাজ বেশি। দিন কয়েক আগে টিভিতে এক জ্যোতিষীকে দেখলাম, বিচার করার জন্য শুধু নামের প্রথম অক্ষরটি তাঁর দরকার। এর পরে হয়তো মোবাইল নাম্বার দেখেই বিচার হবে। কিংবা ক্রেডিট কার্ডের শেষ চারটি ডিজিট। শাস্ত্রীমশাইয়ের সামনে রাখা থাকবে একটা ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানার। সিম কার্ড বিক্রির কিয়স্কগুলিতে যেমন রাখা থাকে আর কি। স্ক্যানারের আলোর সামনে আপনি আঙুল ছোঁয়াবেন মৃদু, আর ঝিনচ্যাক বায়োমেট্রিক জাদুতে খলবল করে উঠবে আপনার গ্রহদোষ-মাঙ্গলিক-ভৌমদোষ। এর পরে সেই অমোঘ প্রশ্ন, ‘আপনার যোগ্যতা অনুযায়ী আপনার উন্নতি হয়নি। ঠিক কি না?’

হলফ করে বলতে পারি, স্বয়ং ওয়ারেন বাফেটও এই প্রশ্নের উত্তরে মাথাটি নাড়বেন। উপরে নীচে।

Advertisements

3 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.