মৃত্যু উপত্যকায় রহস্য রোমাঞ্চকর চলমান পাথর

পৃথিবীর জানা অজানার ভান্ডারে রয়ে গেছে এমন কিছু অদ্ভুত রহস্য যা আমাদের মনকে কৌতুহলী করে তোলে | ডেথ ভ্যালির রেসট্র্যাক প্লায়ার চলমান পাথরের রহস্যও তেমনই চাঞ্চল্যকর | পৃথিবীর উষ্ণতম অঞ্চল হিসেবে আমেরিকার ডেথ ভ্যালির নাম অনেকেরই জানা | এর প্রচন্ড উষ্ণতার কাছে হার মেনেছে সাহারা বা কালাহারির মত মরু অঞ্চলগুলিও | ১৯১৩ সালে এর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছিল ৫৬.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস | তবে এখানকার গড় তাপমাত্রা থাকে প্রায় ৮৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস | সারা বছরে মাত্র পাঁচ সেন্টিমিটার বৃষ্টি হয় এই অঞ্চলে | এত কম বৃষ্টিপাতের কারণে ও এত বেশি উষ্ণতার দাবদাহে এখানে জীবনের লেশমাত্র বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়নি |

ডেথ ভ্যালির দৈর্ঘ্য প্রায় ২২৫ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ৮ থেকে ২৪ কিলোমিটারের মধ্যে | ১৯৪৮ সালে একদল অভিযাত্রী ডেথ ভ্যালিতে একটি দুঃসাহসী অভিযানে গিয়েছিলেন | কয়েকটি নোনা জলের মাঝে তাঁর খুঁজে পান এমন একটি জলশূন্য হ্রদ যার দৈর্ঘ্য সাড়ে ৪ কিলোমিটার ও প্রস্থ ২ কিলোমিটার | সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১‚১৩০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত এই অঞ্চলটি | এই বিশেষ হ্রদটিতেই লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত রহস্য | এই শুকনো হ্রদ অঞ্চলটির বুকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বহু বিশালাকার পাথর | পাথরগুলি নিজে নিজেই নিজেদের স্থান পরিবর্তন করে | স্থান পরিবর্তন করার জন্য পাথরগুলি পিছনে মাটিতে ফেলে আসে ঘর্ষণের দাগ |

জনহীন প্রাণহীন ডেথ ভ্যালির অতিকায় পাথরগুলি নিজেরই সরে আসার চিহ্ন রেখে যায় বলেই এই রহস্যময় অঞ্চলের নাম দেওয়া হয় রেসট্র্যাক প্লায়া | রেসের গাড়ি যেমন তীব্র গতিতে ছুটে গিয়ে পিছনে ফেলে যায় চলার দাগ‚ তেমনই এই পাথরগুলিও স্থান পরিবর্তন করতে গিয়ে দাগ ফেলে আসে | এ যেন এক ঐন্দ্রজালিকের মোহমায়ার ইন্দ্রজাল ! কেউ কোত্থাও নেই অথচ তাও অতিকায় পাথর যেন কোনও ঐন্দ্রজালিক বা কোনও অদৃশ্য শক্তির জোরে সরে যাচ্ছে নিজের অবস্থান থেকে | এ কেমন রহস্য ?

বহুদিন পর্যন্ত এই রহস্যের সমাধান অধরাই ছিল | ১৯৫৫ সালে এম. স্ট্যানলি নামে এক বিশেষজ্ঞ পাথরগুলির সরে যাওয়ার বৈজ্ঞানিক কারণ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন নিজের আবিষ্কৃত তত্ত্ব দিয়ে | তিনি জানান কোনও কোনও সময়ে বৃষ্টির জল পাহাড় থেকে নেমে এসে জমা হয় রেসট্র্যাক প্লায়ার বুকে | তখন জলহীন এই হ্রদটি সামান্য জলে ভরে যায় যদিও বা সে জলের গভীরতা খুব বেশি হলেও ৭ থেকে ৮ সেন্টিমিটারের থেকে বেশি হয় না | রাতে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নেমে গেলে এই অল্প জল জমে গিয়ে পরিণত হয় বরফের আস্তরণে | তারপরে যখন তাপমাত্রা বাড়তে থাকে তখন বরফ গলে যেতে থাকে | রুক্ষ শুষ্ক মাটিও ভিজে নরম হয়ে যায় | বরফের ভাঙা পাতগুলি তখন বিরাট আকারের পাথরগুলিকে ঠেলতে থাকে | ক্রমশ বরফ আর হাওয়ার ধাক্কায় সরে যায় পাথর | স্ট্যানলির এই তত্ত্ব আইস-শিট মতবাদ নামে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে |

১৯৭৬ সালে আবারও রেসট্র্যাক প্লায়ার চলমান পাথরগুলির রহস্য নিয়ে অনুসন্ধান করতে উৎসুক হন ডুইট ক্যারে ও রবার্ট শার্প | তাঁরা আইস-শিট তত্ত্বের বিরোধিতা করে বলেন যে অতিরিক্ত গতিবেগের হাওয়ার ঠেলাতেই সরে যেতে থাকে পাথরগুলি | কারণ বরফের পাতের ঠেলায় যদি পাথর সরত তাহলে তাদের ফেলে আসা চিহ্ন আলাদা আলাদা রকমের হত | রেসট্র্যাক প্লায়ার পাথরগুলির সরণের চিহ্নগুলির মধ্যে অদ্ভুত একরকমের মিল পাওয়া গেছিল | কিন্তু এই মতবাদটিতে কারণের স্পষ্টতা পাওয়া যায় না |

দুই বিজ্ঞানীর উদ্ভাবিত তত্ত্ব নিয়ে যখন দ্বন্দ্ব চলছে তখন সাধারণ  মানুষও চলমান পাথর সম্পর্কে নিজেদের মত করে কারণ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন | কেউ কেউ বলেন রেসট্র্যাক প্লায়া অঞ্চলে অবস্থিত এক বিশেষ চৌম্বকক্ষেত্রের জন্যই পাথরগুলি সরে যায় | কিন্তু এ মতও পূর্ণ সমর্থনযোগ্য হয় না কারণ পাথরগুলিতে লৌহজাতীয় কোনও যৌগের উপস্থিতি বিশেষ দেখা যায়নি |

শেষ দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাতে ২০০৭ থেকে বিজ্ঞানী লরেন্স ও ২০১১ থেকে বিজ্ঞানী রিচার্ড নরিস ও তাঁর ভাই জেমস নরিস যৌথভাবে চলমান পাথরের রহস্য উদ্ঘাটনের কাজে লেগে পড়েন | উষ্ণতা, বায়ুর চাপ, আর্দ্রতা ইত্যাদি আবহাওয়াগত উপাদানের পরিবর্তন লক্ষ্য রাখার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা হয় | পাথরগুলির স্থান পরিবর্তনের সঠিক মাপ রাখতে তাদের গায়ে বসানো হয় জিপিএস ট্র্যাকার |

প্রায় দু’বছরের পরীক্ষা পর্যবেক্ষণের পর উদ্ঘাটিত হয় আসল রহস্য | ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে দেখা যায় রেসট্র্যাক প্লায়ার একটি অংশের উপরে বরফের পাতলা একটি স্তর জমা হয়েছে | ক্রমশ উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বরফ গলে যায় | তৈরি হয় বরফের পাত | সেই পাতগুলিই হাওয়ার ধাক্কায় নড়াচড়া করতে করতে পাথরগুলিকেও ধাক্কা দিতে থাকে | প্রথমে পাথরগুলির সরণ বোঝা না গেলেও ভালো ভাবে দেখে তাঁরাঅ বুঝতে পারেন যে পাথরগুলি নড়চড়া করছে | অর্থাৎ স্ট্যানলির আইস-শিট তত্ত্বই এক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হয় | দেখা যায় ২০১৩ সালের গ্রীষ্মকালে  একটি বড় পাথর যেখানে ছিল তার থেকে ২২৮ মিটার দূরে রয়েছে ২০১৪-র গ্রীষ্মে |

‘ এ ব্রিফ মোমেন্ট অফ টাইম ‘ নামের এক গবেষণা পত্রে স্ট্যানলির তত্ত্বের যাবতীয় প্রমাণ সহকারে তার সত্যতার কথা প্রকাশ করেন এই তিনজনের গবেষকদলটি | তবে তাঁরা এও বলেন যে এই কারণ ছাড়া পাথরগুলির সরণের জন্য অন্যকোনও কারণও দায়ী থাকতে পারে | স্ট্যানলির তত্ত্বের সত্যতা যাচাই করতে অতিক্রম করে যায় ৬৩ বছর | কিন্তু শেষ পর্যন্ত সরণশীল পাথরের সরণরহস্য দুনিয়ার সামনে আসে | এইভাবেই প্রকৃতির মহিমা ও বৈচিত্র্য মানুষকে কখনও কখনও অবাক করে দেয় |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.