অর্থ‚ সুন্দরী স্ত্রী ও ছলে বলে রক্ষিতা ‚লোলুপ সাহেবকে ভরিয়ে দিয়েছিল কলকাতা

সেদিন গভর্নর হাউসে এক অন্যরকম সন্ধ্যা। নাচ চলছে। বলের আয়োজন। এসেছেন ষোল যুবক। প্রত্যেকেই শ্বেতাঙ্গ। প্রত্যেকেই উচ্চবংশীয়। প্রত্যেকেরই বুক ঢিপঢিপ করছে। আর প্রত্যেকেই পড়েছেন মটরশুটি রঙের ট্রাউজার এবং শার্ট। মাঝে মাঝে সিল্কের পট্টি দেওয়া। সেই পট্টির রঙ গোলাপি। আবার জায়গায় জায়গায় চুমকি বসানো । নায়িকার পোশাকেও একই রঙ। একের পর এক যুবক এগিয়ে যাচ্ছেন নায়িকার দিকে। তাঁদের সঙ্গে নাচ করছেন নায়িকা।

এক সময় নাচ শেষ হল। নায়িকা বেরিয়ে গেলেন বল রুম থেকে। পাল্কিতে উঠলেন। পাল্কির দু পাশে মার্চ করে এগিয়ে গেলেন ষোলজন যুবক। নায়িকাকে ছেড়ে এলেন বাড়ি পর্যন্ত। এটা ছিল পুরনো কলকাতার এক বিদেশিনীর স্বয়ম্বর সভা। সালটা ১৭৭৫-৭৬ হবে। আর সেই লাস্যময়ীর তরুণীর নাম মিস এলিজাবেথ জেন
স্যান্ডারসন। এই স্বয়ম্বরের কিছুদিন পরই মিস স্যান্ডারসন আংটি বদল করেন রিচার্ড বারওয়েলের সঙ্গে।

বারওয়েল আর স্যান্ডারসনের বিয়ের কথা চাউর হতেই তো গোটা কলকাতা তাজ্জব। স্যান্ডারসন কীভাবে বারওয়েলের মত দুশ্চরিত্রকে বিয়ে করলেন ? সকলেরই একটাই প্রশ্ন। কারণ তার আগেই তো বারওয়েল একটি কাণ্ড ঘটিয়ে বসেছেন। শুধু কাণ্ড ঘটাননি, তার মাশুলও গুনতে হয়েছে তাঁকে— লেফটেন্যান্ট জেনারেল জন ক্লেভারিং ছিলেন সুপ্রিম কাউন্সিলের সদস্য। মানে তখনকার বিচারসভার একজন বিচারপতি। ব্রিটিশ সেনায় ছিলেন, তাই তাঁর বেশ দাপট ছিল। বন্দুকের নল ছাড়া তিনি নাকি কথা বলতেন না। তাঁর দুটি বিয়ে। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীকে নিয়ে যখন তিনি কলকাতায় এলেন, তখন তাঁর প্রথম পক্ষের মেয়েরা বড় বড়ই। ক্লেভারিংয়ের বড় মেয়ে ছিলেন অত্যন্ত রূপসী। তাঁর দিকে হাত বাড়ালেন দুজন, ফিলিপ ফ্রান্সিস এবং রিচার্ড বারওয়েল। দুজনেই কাউন্সিল সদস্য, দুজনেই ডাকসাইটে প্রশাসক, এবং দুজনেই একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। ফ্রান্সিসকে সহ্য করতে পারলেও বারওয়েলের এই হাত বাড়ানোর বিষয়টি মোটেই পছন্দ করলেন না ক্লেভারিং। কারণ বারওয়েলকে তিনি দুচক্ষে দেখতে পারতেন না।

সরাসরি ক্লেভারিং ডুয়েলে ডাকলেন বারওয়েলকে। বারওয়েল সম্মুখসমরে গেলেন। কিন্তু ক্লেভারিংয়ের একটি গুলিতেই তিনি ঘায়েল হয়ে ক্ষমাও চাইলেন। যাই হোক, সেই বারওয়েল কিনা বিয়ে করলেন স্যান্ডারসনকে! তাজ্জব গোটা কলকাতা। গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল—এ বিয়ে টিকবে তো! বিয়েটা অবশ্য টিকে গেল। সুখে সংসার
করতে থাকলেন দু’জন। কিন্তু অদৃষ্ট বড়ই নিষ্ঠুর। এলিজাবেথের জ্বরে ভুগে মৃত্যু হল বিয়ের বছর তিনেকের মধ্যেই।

বারওয়েল ছিলেন সেকালের অন্যতম ধনী ব্যক্তি। কাউন্সিল সদস্য হওয়ার পাশাপাশি ছিল তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবসাও। সেই ব্যবসা থেকে প্রচুর টাকা আয় করতেন তিনি । আর সে টাকা দিয়ে জুয়া খেলে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মস্ত বড় এক জুয়াড়ি। প্রচুর অর্থ তিনি সঞ্চয় করেছিলেন। অনেকেই বলেন, রাইটার্স বিল্ডিং তৈরি করতে তিনিই নাকি টাকা ঢেলেছিলেন। এরকম একজন ধনী ব্যক্তির স্ত্রীয়ের অন্ত্যেষ্টি যে জাঁকজমকপূর্ণভাবে হবে, এ তো স্বাভাবিকই। পার্ক স্ট্রিটের গোরস্থানে অনেক খরচ করে একটি গম্বুজ তৈরি করে দিলেন বারওয়েল। সেই গম্বুজ আজও আছে। তবে তিন সন্তানের জনক বারওয়েল কিন্তু স্ত্রীর শোক বুকে নিয়ে সারাটা জীবন থাকলেন না। তিনি ফিরে এলেন তাঁর পুরনো জীবনে।

চাঁদপাল ঘাটে জাহাজ এসে থামল। সবার আগে এগিয়ে গেলেন বারওয়েল সাহেব। জাহাজের নাবিককে তিনি বুকে টেনে নিলেন। পরের জাহাজে এলেন নাবিকের স্ত্রী। বাস্তবের মহানগরে পা রাখলেন রূপকথার পরী। এই নাবিক এবং তাঁর স্ত্রীকে আপন করে নিলেন বারওয়েল। যেন কতদিনের চেনা!

বারওয়েলের বাড়িতেই আশ্রয় নিলেন দম্পতি। তবে কলকাতা পছন্দ হল না নাবিকজায়ার। সত্যিই তো ইংল্যান্ডের ঝাঁ চকচকে সাজানো গোছানো শহর ছেড়ে কার পছন্দ হয় গন্ড গ্রাম থেকে নগর হয়ে ওঠা কলকাতা ! তবু সব অবসাদ ভুলিয়ে দিতে লাগলেন বারওয়েল। মাঝে মধ্যেই তিনি এসে গল্প করে যেতেন দম্পতির সঙ্গে। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই নাবিকের একটি মোটা মাইনের চাকরির ব্যবস্থা করে দিলেন বারওয়েল। বেতন প্রায় সাত হাজার। কিন্তু চাকরির শর্ত অনুযায়ী, ওই যুবককে যেতে হল কলকাতার বাইরে। তবে স্ত্রীকে নিয়ে যেতে পারলেন না তিনি। বারওয়েলের তত্ত্বাবধানে রেখেই তিনি নতুন চাকরিতে যোগ দিলেন। আর এই সুযোগটাকেই কাজে লাগালেন বারওয়েল। নাবিকের স্ত্রীকে তিনি আপন করে নিলেন। দেহ-মনে ভালবাসার মায়াজালে বেঁধে ফেললেন রূপসীকে।

কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে বিষয়টি গেল ঘুরে। বারওয়েল নিজেই বদলি হয়ে গেলেন মুর্শিদাবাদে। বদলি ঠেকাতে অনেক চেষ্টা করেও সুবিধা করতে পারলেন না। আর নাটকীয়ভাবে ওই যুবক বদলি হয়ে ফিরে এলেন
কলকাতায়। যুবক তো খুশিতে ডগমগ। তিনি কলকাতায় ফিরলেন ভালবাসার মানুষটির কাছে। কিন্তু যুবক
লক্ষ করলেন তাঁর স্ত্রী বদলে গিয়েছেন।

কোথাও যেন কেটে গিয়েছে ছন্দ। তাঁরা যখন কলকাতায় আসেন, তখন দুজনের বন্ধন ছিল লোকের ঈর্ষার কারণ। অথচ যুবতীর সঙ্গে সেই বন্ধনের উত্তাপ খুঁজে পেলেন না যুবক। কিছুদিনের মধ্যে রহস্যের মোড়কটা খুলে গেল। যুবক বুঝতে পারলেন তাঁর স্ত্রী আর তাঁর নেই। সমস্যাটির সমাধানও করে ফেললেন। তরুণীকে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, আর দেরি নয়, তাঁদের দেশে ফিরে যেতে হবে। স্বামীর কথায় আপত্তি করলেন না স্ত্রী। দেশে ফেরার যখন উদ্যোগ একদম চরমে তখনই কলকাতায় বদলি নিয়ে ফিরলেন বারওয়েল। যুবতী বেঁকে বসলেন। ডিভোর্স চাইলেন তাঁর স্বামীর কাছে। পরিবর্তে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথাও জানালেন। ভালবাসার মানুষটিই যখন অস্বীকার করছেন তাঁর ভালবাসা, তাই যুবকও আপত্তি করলেন না। ক্ষতিপূরণ নিয়ে ডিভোর্সে রাজি হয়ে গেলেন।

হেস্টিংস আর রবার্ট স্যান্ডরসনের উপস্থিতিতে দলিল তৈরি হল। ঠিক হল, ডিভোর্সের জন্য ৩০০ পাউন্ড, আর তাঁদের দুই সন্তানের জন্য ৫ হাজার পাউন্ড পাবেন যুবক। নাবিকের চাকরিতেই ফিরে গেলেন যুবক। জাহাজে উঠে বসলেন। জাহাজ চলল চিনের উদ্দেশে। কিন্তু চিনে পৌঁছতেই তিনি খবর পেলেন, বারওয়েল সাহেব তাঁকে জরুরি তলব করেছেন। অনেক আশা নিয়ে যুবক ফিরলেন কলকাতায়। বারওয়েলের সঙ্গে দেখা হল তাঁর।
বারওয়েল তাঁকে জানালেন, যুবতীকে তিনি বিলেতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। চুক্তির অর্থ দাবি করলেন যুবক। বারওয়েল একটি চিঠি ধরিয়ে দিয়ে তাঁকে জানিয়ে দিলেন, লন্ডনে গিয়ে চিঠি দেখালেই তাঁর আত্মীয়ের থেকে সেই টাকা পেয়ে পাবেন। বেশ আশা নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন যুবক।

চাঁদপাল ঘাটে জাহাজে যে-ই না উঠতে যাবেন, ওমনি ছুটতে ছুটতে বারওয়েল এসে হাজির। একটি কাগজ বাড়িয়ে দিলেন। বললেন, টাকা দ্রুত যাতে তিনি পান, সে জন্য তাঁর সই লাগবে। আপত্তি করলেন না যুবক। তিনি সই করে দিলেন সে কাগজে। লন্ডনে পৌঁছে যুবক বুঝতে পারলেন, বারওয়েল আসলে কী খেলাটা খেলেছে। তাঁর স্ত্রী তো দেশে ফেরেননি, তার ওপর যে চুক্তি হয়েছিল তাঁদের মধ্যে, চাঁদপাল ঘাটে বারওয়েলের সেই কাগজে সই করে নিজেই চুক্তি খারিজ করে দিয়েছেন যুবক। হাত কামড়ানো ছাড়া তখন আর কী উপায়!

১৭৮০ সালে বারওয়েল ইংল্যান্ডে ফিরে যান। প্রবল ধনসম্পত্তির মালিক এর ঠিক পাঁচ বছর
পরে আরেকটি বিয়ে করেন। কন্যার নাম ক্যাথরিন কফিন। বারওয়েলের তখন পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স। আর ক্যাথরিনের ষোল। তবে জীবনকে আর বেশিদিন উপলব্ধি করা হয়নি এই ধন কুবেরের। ১৮০৪ সালে মৃত্যু হয় তাঁর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here