২৫০০ বছর আগে তামার গুঁড়ো বা তাম্রচূর্ণে লেপে থাকত বন্দরের আনাচকানাচ, তার থেকেই নামকরণ

আড়াই হাজার বছর পরেও তামা উৎপাদন করে চলেছে সিংভূমের খনিগুলি | সেই তামা নিষ্কাশন করে হিন্দুস্তান কপার লিমিটেড | কিন্তু হারিয়ে গেছে সেই‚ বন্দর যেখান দিয়ে এই তামা কোনও এক সময়ে রফতানি হতো | যার থেকে বন্দরের নামই হয়ে গিয়েছিল তাম্রলিপ্ত | ভারতের পূর্ব উপকূলের এই বন্দর অত গুরুত্বই পায়নি ইতিহাসে‚ যত পেয়েছে পশ্চিম উপকূলের বিখ্যাত বন্দ্র লোথাল‚ ভারুচ বা মুজিরিজ | 

এত তামা জাহাজভর্তি হয়ে পাড়ি দিত এই বন্দর থেকে‚ তামার গুঁড়ো বা তাম্রচূর্ণে লেপে থাকত বন্দরের আনাচে কানাচে | তার থেকেই তাম্রলিপ্ত বা তাম্রলিপ্তি | রূপনারায়ণের তীরে এই বন্দর থেকে নোঙর তুলে জাহাজ যেত আজকের মায়ান্মার ‚ এমনকী চিন অবধি | নাবিক‚ ব্যবসায়ী ও ধর্ম প্রচারকদের কাছে পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার ছিল এই তাম্রলিপ্ত বন্দর | নীল‚ রেশম এবং অবশ্যই তামা ভর্তি জাহাজ যেত সিংহল‚ আফ্রিকাতেও | 

সাহিত্য ও ঐতিহাসিক অন্য সূত্র অনুযায়ী‚ তাম্রলিপ্ত বন্দরের স্বর্ণযুগ ছিল খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় অব্দ থেকে অষ্টম খ্রিস্টাব্দ অবধি | কলিঙ্গ সাম্রাজ্যের অন্যতম বন্দর ছিল তাম্রলিপ্ত | শোনা যায়‚ এই সমৃদ্ধ বন্দর অধিকার করতেই কলিঙ্গ আক্রমণ করেছিলেন সম্রাট অশোক | মৌর্য শাসনে বিশেষ গুরুত্ব পেত এই বন্দর | তাম্রলিপ্ত থেকে পাটলিপুত্র যাতায়াতের জন্য ছিল উন্নত সড়ক | এই বন্দরের জন্যই গড়ে উঠেছিল শিশুপালগড়ের মতো সমৃদ্ধ জনপদ |

ভারত থেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় বৌদ্ধ ধর্ম প্রসারে তাম্রলিপ্ত বন্দরের বড় ভূমিকা ছিল | জাতকের কাহিনীতে বহুবার উল্লেখিত হয়েছে এর নাম | এখান থেকে জাহাজ সুবর্ণভূমি যেত | যা আজকের থাইল্যান্ড | বণিক ছাড়াও জাহাজে থাকতেন বৌদ্ধধর্মের প্রচারকরা | এই বন্দর থেকেই রওনা দিয়েছিলেন সম্রাট অশোকের কন্যা সঙ্ঘমিত্রা ও পুত্র মহেন্দ্র | বোধিবৃক্ষের চারা নিয়ে গিয়েছিলেন সিংহলের উদ্দেশে | বৌদ্ধধর্ম তথা সিংহলের প্রামাণ্য গ্রন্থ মহাবংশে আছে সেই যাত্রার বর্ণনা | পাটলিপুত্র থেকে তাম্রলিপ্ত আসতে সময় লেগেছিল সাত দিন | তারপর আরও সাত দিন তাম্রলিপ্ত থেকে সিংহল |

তাম্রলিপ্ত এতই গুরুত্বপূর্ণ ছিল‚ এর উল্লেখ ছাড়া ভাবাই যেত না তৎকালীন কোনও ভ্রমণ বৃত্তান্ত | রোমান পর্যটক ও দার্শনিক প্লিনী‚ দ্বিতীয় শতাব্দীতে তাঁর বইয়ে এই বন্দরের কথা বলেছেন | ফা হিয়েন‚ হিউয়েনসাং‚ ইৎসিং তাঁদের লেখায় এই বন্দরের বিবিধ বিবরণ দিয়েছেন | ব্যস্ত এই বন্দর ছিল বৌদ্ধধর্ম ও বৌদ্ধশাস্ত্র অধ্যয়নের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র | পঞ্চম শতাব্দীতে ফা হিয়েন এসেছিলেন এই বন্দরে | লিখেছেন‚ সে সময় এখানে ছিল ২৪ টি বৌদ্ধ মঠে ছিলেন ২৪ জন সন্ন্যাসী |  

সপ্তম শতাব্দী থেকে এই বন্দরের পতনকাল শুরু | তার কারণ স্পষ্টভাবে জানা না গেলেও মনে করা হয় রূপনারায়ণ নদীর গতিপথ ও গতিমুখ পরিবর্তন অন্যতম কারণ | পাশাপাশি‚ উপকূল অঞ্চলের জনপদও কম সমৃদ্ধশালী হয়ে পড়েছিল দিন দিন | তাই সব মিলিয়ে ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে কমতে থাকে তাম্রলিপ্ত বন্দরের জৌলুস | 

তারপর ধীরে ধীরে তা হারিয়ে যায় কালের গ্রাসে | ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে গৌরদাস বসাক এখানে খননকার্য চালিয়ে লেখেন এশিয়াটিক সোসাইটির পত্রিকায়‚ ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে | এরপর ১৯২০‚ ১৯৫০ ও ১৯৭০-এর দশকে এখানে খননকার্য চালায় এশিয়াটিক সোসাইটি | অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে পাওয়া যায় গ্রেকো রোমান মুদ্রা | এ নিয়ে আর সন্দেহের অবকাশ থাকে না যে এক সময় এই বন্দর দিয়ে বাণিজ্য চলত সুদূর ইউরোপ অবধি | কিন্তু খননকার্যে যা পাওয়া গেছে তা থেকে ইতিহাস খুব বেশি প্রতীয়মান হয় না | বরং তাম্রলিপ্ত ভাস্বর হয়ে আছে সমৃদ্ধ সাহিত্যে |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.