এর পরও বলবেন, ধর্ষণের জন্য এই পোশাকগুলোই দায়ী ?

215

পোশাক নয়, যে কোনও ধর্ষণের ঘটনার জন্য দায়ী ধর্ষকের বিকৃত মানসিকতা । আমাদের সমাজের একটা বড় অংশ এখনও এই বাস্তবটা মেনে নিতে চান না । এখনও যে কোনও ধর্ষণের ঘটনায় ধর্ষিতার পোশাককেই দায়ী করা হয়ে থাকে। পৃথিবীর বেশিরভাগ রক্ষণশীল মানুষের দাবি বা বিশ্বাস হল, ধর্ষিতার পোশাকই ধর্ষককে প্ররোচিত করেছে এই ‘জঘন্য’ কাজের জন্য । তবে এই ধরনের বিশ্বাস বা ধারণা যে শুধু ভারত বা তার প্রতিবেশী এশীয় দেশগুলিতে বসবাসকারী মানুষের মধ্যেই রয়েছে, তা কিন্তু নয় । মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকার একাধিক দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের মনেই এই ধারণা বদ্ধমূল । আর তারই প্রমাণ পশ্চিম ইউরোপে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস-এ অনুষ্ঠিত একটি প্রদর্শনীতে । কারণ, এই প্রদর্শনীটির সঙ্গে আর পাঁচটা প্রদর্শনীর একটু ফারাক রয়েছে । প্রদর্শিত হয়েছে এমন ১৮টি পোশাক, যেগুলি আক্রান্তরা ধর্ষণের দিন পরেছিলেন ।

এই প্রদর্শনীতে জায়গা করে নেওয়া ওই ১৮টি পোশাক এখানে আসা সমস্ত দর্শককে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, কোনও প্ররোচনাই এই সব পোশাকে ছিল না। বরং বিকৃত যৌন লালসাই এই সব ধর্ষণের ঘটনার জন্য দায়ী। ব্রাসেল্স-এর এই প্রদর্শনীর জিন্স, পনি টপ, টি-শার্ট, শিশুর পরনে ফ্রক— সব কটি পোশাকই যেন নীরবে একটাই প্রশ্ন করছে, ‘এর পরও বলবেন, ধর্ষণের জন্য এই পোশাকগুলোই দায়ী ?’ প্রদর্শনীর নাম দেওয়া হয়েছে, ‘হোয়াট ওয়্যার ইউ ওয়্যারিং’ (What were you wearing)। খুব সহজ একটা প্রশ্ন, তুমি কী পরেছিলে ?

Rape survivors’ clothes exhibition 

ভারত, বাংলাদেশ-সহ পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে এখনও একজন ধর্ষিতাকে নানা আপত্তিকর, অসম্মানজনক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। যেমন, ধর্ষণের সময় আপনি ওখানে কী করছিলেন, অভিযুক্তকে আপনি কতদিন ধরে চেনেন, ওই দিন সেখানে আপনি একা কী করছিলেন, সে দিন কী পরেছিলেন, বাধা দেওয়ার কোনও চেষ্টা (আদৌ) করেছিলেন কি না… ইত্যাদি । ২০১৮ সালে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির আবুধাবির একটি ঘটনা এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা যেতে পারে । সেখানে এক মহিলা তাঁর অফিসের এক কর্তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের করেন । এই ঘটনায় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে তো কোনও ব্যবস্থা নেওয়াই হয়নি, উল্টে অভিযুক্ত কর্তা ব্যক্তির মানহানি এবং মিথ্যা অভিযোগের পাল্টা মামলার রায়ে আক্রান্ত মহিলাকেই দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। রাষ্ট্রপুঞ্জ এই রায়ের বিরোধিতা করলেও, শেষমেশ কোনও ফল হয়নি। প্রাণ হারাতে হয় ওই নিগৃহীতাকেই।

শুধু আবুধাবির এই ঘটনাই নয়, এমন আরও হাজার হাজার ধর্ষণের ঘটনায় আক্রান্তের পোশাক বা তার স্বভাব-চরিত্রের দিকেই আঙুল তোলা হয় । ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ‘জঘন্য’ অপরাধ করেও রেহাই পেয়ে যায় আসল অপরাধীরা । ফলে তাদের অপরাধ প্রবণতা আরও বেড়ে যায় ।

পৃথিবী জুড়ে বাড়তে থাকা নারী নির্যাতন, ধর্ষণের ঘটনার জন্য মূলত দায়ী  সমাজের এই মানসিকতা, যা পরোক্ষে প্রশ্রয় যোগাচ্ছে এই অপরাধীদের। আর এই বিষয়টিকেই সযত্নে তুলে ধরা হয়েছে ব্রাসেলস-এর এই প্রদর্শনীতে। প্রদর্শনীটি শুরু হয়েছে ৮ জানুয়ারি, ২০১৯ থেকে। চলবে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত। এই প্রদর্শনীর নাম, তার বিষয়বস্তু ও উপস্থাপনার অভিনবত্ব ইতিমধ্যেই সাড়া ফেলে দিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। বিশ্বের একাধিক বিশিষ্ট সংবাদ মাধ্যমেও এ বিষয়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। সমাজের বদ্ধমূল ভ্রান্ত ধারণার উপর এই প্রদর্শনীর প্রভাব আদৌ পড়বে কিনা, তা বলা শক্ত। তবে ধর্ষণের মতো ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা নিয়ে যাঁরা এখনও বেঁচে আছেন, এই প্রদর্শনী অন্তত তাঁদের পাশে দাঁড়াতে একশো ভাগ সফল হয়েছে ।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.