রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
জন্ম ১৯৫৬ সালের ১লা সেপ্টেম্বর । প্রযুক্তিবিদ।শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের স্নাতক।সি ই এস্ সি –তে দীর্ঘ ৩৪ বছর কাজ করেছেন । আঠেরো বছর ধরে গল্প লিখছেন । হাসির গল্প লেখায় পারদর্শী । প্রথমে “সঞ্জয়”,” হর্ষবর্ধন” ও এখন স্বনামে লিখছেন । আনন্দবাজার,আনন্দমেলা,এবেলায় বহু গল্প ছাপা হয়েছে । এ ছাড়া উত্তরবঙ্গ সংবাদ,তথ্যকেন্দ্র,প্রতিদিন ইত্যাদি আরও অনেক পত্রিকাতেও গল্প/রম্যরচনা লিখেছেন।শুকতারা , নবকল্লোলে লিখেছেন ছড়া ।আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রে ওঁর লেখা নাটকও অভিনীত হয়েছে।

কবি বলেছেন – প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে । ভাগ্যিস রবীন্দ্রনাথ চাকরী করেননি । তাহলে নির্ঘাত লেখা হত – প্রেমের ফাঁদ পাতা অফিসে । আজকালকার অফিসগুলো যেন এক একটা বৃন্দাবন । জোড়ায় জোড়ায় রাধাকৃষ্ণরা সব শোভা বর্ধন করছে সেখানে । ফলে এখানে লেজার,জার্নাল , প্রজেক্ট রিপোর্ট ,বিল্‌ ,পাওয়ার পয়েন্ট,মিটিং- এর সাথে সাথে প্রেম ,বিরহ, অভিসার ,অভিমান, রাগ, অনুরাগেরও সার্থক সহাবস্থান । টিফিনের ঘন্টা বেজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে প্রেমের বাঁশি বেজে ওঠে । আজকালকার প্রেমের বাঁশি অর্থাৎ এস্‌-এম্‌-এস্‌ । কুক্‌ কুক্‌ করে শব্দ হতেই সোমলতার মোবাইলের স্ক্রিনে লেখা ভেসে আসে – যমুনাতে চলে এস । অপেক্ষা করছি্ । ইতি তোমার বীরেন সোনা । উৎসুক পাঠক –  অফিসকে বৃন্দাবন বলেছি বলে মনে করবেন না যমুনা কোন নদী । এ হল “যমুনা কাফে” । শহরের রাধাকৃষ্ণদের লীলাভূমি । লায়লা-মজনুদের বিচরণ ক্ষেত্র । রোমিও-জুলিয়েটের নিভৃত

Banglalive

আশ্রয় ।  বীরেনবাবু মধ্যবয়সী বিবাহিত । কিন্তু তাতে কী ? তিনি হলেন রমনীমোহন শ্যাম । সবাই জানে রেকর্ড সেকশনের তন্বী-শ্যামা-শিখরদশনা সোমলতার সঙ্গে তার দুরন্ত প্রেম । পক্ববিম্বাধরোষ্ঠী অবধি এগোতে পারেননি এখনও । তবে চেষ্টায় আছেন ।

     এস্‌-এম্‌এস্‌ পেয়েই সব কিছু ভুলে রাধারুপী সোমলতা ছুটল যমুনায় । যমুনার জল কাল রাধিকার চুল কাল । তাই যমুনা কাফের কেবিনও কাল অর্থাৎ অন্ধকারময় । টুনি বাল্বের আলো-আঁধারি । ইচ্ছে করেই এমনটি করে রাখা হয়েছে লীলাখেলার সুবিধার জন্য । এই অন্ধকার রীতিমত কড়ি দিয়ে কিনতে হয় । আজেবাজে লোকের এখানে প্রবেশ নিষেধ ।  সোমলতা গিয়ে হাজির হয় যমুনা কাফের নির্দিষ্ট করা নির্জন কেবিনে । কিন্তু এ কী !এ তো বীরেন বটব্যাল নয় এ তো অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট ধীরেন ধারা । বোঝা গেছে – বীরেনবাবুর মোবাইল থেকে ধীরেনবাবু সোমলতার উদ্দেশ্যে এস্‌-এম্‌-এস্‌ বান ছুঁড়েছেন । একা বীরেনবাবুই ক্ষীর খাবেন তা তো হতে পারে না । সোমলতার ভালই হল । পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা ।  বীরেনটা কেমন যেন বুড়োটে মেরে গেছে আজকাল । তার ওপর কঞ্জুশ । একটার বেশি দুটো ফিস্‌-ফ্রাই খেলেই মুখটা কেমন বাংলার পাঁচের মত হয়ে যায়  ।  তার চাইতে ধীরেন ঢের ভাল । স্মার্ট হ্যান্ডসাম । দিলদরিয়া । আর তা ছাড়া বীরেনবাবুর চাইতে বেটার ক্যান্ডিডেট ধীরেনবাবু । কারণ এখনও তিনি অবিবাহিত । মানে যাকে বলে “eligible bachelor”।  তবে কিনা ধীরেনের পেছনে ইট পেতেছিল ইন্সপেকশন ডিপার্টমেন্টের মদালসা । তাই সোমলতা এতদিন পাত্তা পায়নি । এখন মনে হচ্ছে মদালসা –জ্বর ছেড়ে গিয়েছে । কিংবা এও হতে পারে মদালসা তো আছেই । সোমলতা হল উপরি পাওনা । আসলের সুদ । বড় মিষ্টি । গাছেরও খাব তলারও কুড়োব ।  মদালসার মধ্যে ধীরেন যে কী দেখেছে কে জানে ? ঐ তো শিড়িঙ্গের মত চেহারা । ছোট করে ছাঁটা চুল – ছেলেদের মত । কন্ঠার হাড় ঠেলে বেরোচ্ছে । টিফিনে খায় দু-কুচি শশা । কী ? না ডায়েট করছে । সোমলতার মত এত সুন্দর কেশদাম আছে ওর ? ও তো খোঁপাই বাঁধতে পারে না । আর সোমলতার –

আরও পড়ুন:  চৈত্রের চরিত্র সেল

                             সুকুঞ্চিত কেশে রাই বাঁধিয়া কবরী

                             কুন্তলে বকুলমালা গুঞ্জরে ভ্রমরী ।

আর এই ভ্রমরীর টানেই তো ধীরেন,বীরেন সব হেদিয়ে মরে ।

     বীরেনের জায়গায় ধীরেনবাবুকে দেখে সোমলতা কপট রাগের ভঙ্গীতে বলে উঠল – আপনি না বড্ড ইয়ে । বললেই পারতেন আপনি ডাকছেন ? বীরেনের মোবাইল থেকে মেসেজ পাঠানোর কী হয়েছে ? আপনি ডাকলে কি আমি আসতুম না ? এখন বীরেন যদি ওর মেসেজ চেক্‌ করে গন্ধে গন্ধে এখানে চলে আসে ? তাহলে তো পুরো মজাটাই মাঠে মারা যাবে ।

-বলেছ তো ঠিক । তাহলে চল তাজমহল রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসি ।

যমুনার কাছে তাজমহল হওয়াই তো স্বাভাবিক । এ যে একেবারে শ্রীরাধা থেকে মমতাজমহল । বৈষ্ণব পদাবলী থেকে মুঘলে আজম । কিন্তু সোমলতা সায় দেয় না ।

-ও বাবা ! ওটা তো সুশান্তর অফিসের কাছে । যদি ওর সঙ্গে দেখা হয়ে যায় ? শুনেছি ওঁর লেডি সেক্রেটারিটা বড্ড গায়ে-পড়া । মাঝে মাঝে তাজমহল রেস্টুরেন্টে কফি খাওয়ার বাই ওঠে । আর সুশান্তও ওর অনুরোধ ঠেলতে পারে না ।

সুশান্ত সোমলতার ফিক্সড ডিপোসিট । আয়ান ঘোষও বলা যেতে পারে । গত বছর  এক গোধূলি লগ্নে সুশান্ত সোমলতার ভাত-কাপড়ের ভার নিয়েছে । নিয়েছে তো নিয়েছে । ভাত-কাপড় ছাড়াও তো চিকেন কবিরাজী,পিতজা, বার্গার ইত্যাদি রয়েছে পৃথিবীতে । এগুলোর ভার কে নেবে । সব কি স্বামী নামক মুরগীটির ওপর চাপানো উচিৎ ? না না সেটা বড্ড অমানবিক হবে ।

     সুধী পাঠক এখন বুঝতে পারছেন – কেন বলেছিলাম অফিসগুলো সব বৃন্দাবন ? তা বলে মনে করবেন না যে অফিসে কোন ডিসিপ্লিন নেই । এ ব্যাপারে বড় সাহেব ভীষণ কড়া । টিফিনের আওয়ার শেষ হলে তিনি রাউন্ডে বের হন । ঘুরে ঘুরে দেখেন সবাই জায়গায় আছে কিনা । তবে দুষ্টু লোকে অনেক মন্দ কথা বলে । তিনি নাকি উইকার সেক্সকে একটু বেশি প্রাধান্য দেন ।  লেডি সেক্রেটারিদের তাঁর ঘরে ডাক পড়লে একটু বেশি সময় ব্যয় করেন তিনি । তবে সবই রটনা । এর কোন ভিত্তি নেই । আসলে জেলাসি ছাড়া আর কিছু নয় ।

আরও পড়ুন:  সাগর আই লাভ ইউ (পর্ব ২৩)

     আসলে প্রেমও তো একধরনের চাকরী । নিয়মনীতি মেনে ডিউটি করতে হয় ।তফাৎ শুধু এই – যে এখানে বেতন নেই বেত আছে । অর্থাৎ শুধুই ভরতুকি ।

     তবে আমদের দেশে অনেক নীতিবাগীশ সরকার আছেন যারা অফিসে প্রেম করাকে গর্হিত কাজ মনে করেন । যেমন দমন ও দিউ তে অফিসে প্রেম রোখার জন্য রীতিমত সার্কুলার দিয়ে ফতোয়া জারি করা হয়েছিল । সেই সার্কুলার অনুযায়ী রাখীপূর্ণিমার দিন অফিসের সমস্ত মহিলা কর্মীদের তাদের সহকর্মী পুরুষদের হাতে রাখী পরিয়ে দিতে হবে । এতে নাকি নারী-পুরুষের প্রেম আটকানো যাবে । এমন মজার কথা শুনেছেন কখনও ? অবশ্য এই নির্দেশ-নামার বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ হওয়াতে   ব্যাপারটা আর বাস্তবায়িত হতে পারেনি ।

     আবার উল্টোটাও আছে । এক সময় দক্ষিণ কোরিয়ায় স্কুল ,কলেজ এবং অফিসে প্রেম নিষিদ্ধ ছিল । সেই জন্য বিয়ের সংখ্যাও বহুলাংশে কমে গিয়েছিল । ফলে এখন সেখানে জন্মহার এতোই কমে গিয়েছে যে এই প্রথা রদ তো হয়েইছে তার ওপর সরকার এখন নিয়মিত ম্যাচ-মেকিং পার্টি ,ডেটিং পার্টির আয়োজন করে । শুধু তাই নয় এখানে এখন গজিয়ে উঠেছে প্রচুর ডেটিং সার্ভিস সংস্থা । সুতরাং বুঝতে পারছেন তো – অফিসে প্রেম করার উপযোগীতা ? বলতে পারেন আফিস হচ্ছে ultimate place । যে সমস্ত আতা-ক্যালানে স্কুল বা কলেজ লাইফে ভাল ছেলে সেজে প্রেম করার সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি তাঁদের জন্য অফিসই হল শেষ ভরসা । অন্তিম  আশ্রয় ।

     অফিসে প্রেমের এত যে প্রাদুর্ভাব –তার কতগুলি কারণ হতে পারে ।  প্রথমত কাজের একঘেয়েমি কাটানোর এ হল মোক্ষম দাওয়াই । অনেককে দেখেছি ঝড় ,জল ,বৃষ্টি যাই হোক না কেন অফিসে যাওয়া চাইই চাই । এবং তা যে কাজের প্রতি আকর্ষণে নয় তা বলাই বাহুল্য । খোঁজ নিলে দেখা যাবে নিশ্চয়ই অফিসে কোন বিধুমুখীর প্রেমে পড়েছেন তিনি ।

আরও পড়ুন:  প্লাস প্রেম আর ফ্লাইং কিস  

     দ্বিতীয়ত পরকীয়া করার আদর্শ জায়গা হল অফিস । কারণ এখানে বউয়ের চোখ-রাঙানি নেই । অফিসের পরে দিব্যি কাজের দোহাই দিয়ে দয়িতের সঙ্গে ঢাকুরিয়া লেক, শিবপুরের বাগান কিংবা গড়ের মাঠে ঘুরে বেড়িয়ে মনটাকে চাঙা করা যায় । এতে ডবল সুবিধা । প্রেম কে প্রেম হল । আবার দেরী করে বাড়ি ফিরলে tiredness- এর অছিলায় বাড়ির কোন ঝামেলায় জড়াতে হবে না ।

আমাদের সমাজে পরকীয়াকে সবাই ভাল চোখে দেখে না । এতে একটা নিষিদ্ধ নিষিদ্ধ গন্ধ আছে । আর নিষিদ্ধ আচার বা বস্তুর প্রতি আকর্ষণ তো চিরাচরিত । সেই কারণেই হয়ত অফিসে যত প্রেম হয় তার একটা বড় অংশই পরকীয়া ।

     যাকগে , যে কথা বলছিলাম – এদিকে ধীরেনবাবুর সাথে সোমলতার মাখামাখি বেশ বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে গিয়েছে । তাই বীরেনবাবু আজকাল মনমরা ।  এর অবশ্য আরেকটা কারণ আছে । সোমলতার কাছে কল্কে না পেয়ে মদালসাকে তিনি একটা প্রেমের এস্‌-এম্‌-এস্‌ পাঠিয়েছিলেন । তাতে  তিনি মদালসাকে সম্বোধন করেছিলেন “ডার্লিং” বলে । ব্যস্‌ আর যায় কোথা ? মদালসা রেগেমেগে বড়সাহেবকে ঐ মেসেজ্‌ দেখিয়ে নালিশ ঠুকে দিয়েছে । ফলে যা হবার তাই হয়েছে । বড়সাহেব বীরেনবাবুকে ডেকে কড়কে দিয়েছেন । শুধু তাই নয় – মদালসা বীরেনবাবুকে হুঁশিয়ারি দিয়েছে – বেশি বাড়াবাড়ি করলে ক্ষমা বউদি অর্থাৎ বীরেন বাবুর স্ত্রীকে সব কিছু জানিয়ে দেবে ।

বীরেনবাবু এখন মুখ চুন করে ঘুরে বেড়ান । তার একুল-ওকুল সবই গেছে । সোমলতা চুটিয়ে পরকীয়া চালিয়া যাচ্ছে  ধীরেনবাবুর সঙ্গে । আর last but not the least , মদালসা চাকরী ছেড়ে

 দিয়েছে । কারণ আগামী ফাল্গুনে তার আইবুড়ো নাম ঘুচে যাচ্ছে । পাত্র আমাদের বড়সাহেব ।  

 

9 COMMENTS

  1. অপূর্ব আহা বহুদিন বাদে এমন একখানা পড়লাম। সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় , রমাপদ চৌধুরী, তারাপদ রায় পড়ার অনুভুতি। আরও পেলে বেশ হত

  2. আহা কি ভাল লাগল এমন লেখা বহুদিন বাদে পড়লাম

  3. চমৎকার…দেখে ভালো লাগলো যে বাংলায় রম্যরচনার ধারা এখনো শুকিয়ে যায়নি।

  4. লেখক তার গল্পের নাম “প্রেমের-ফাঁদ পাতা অফিসে”-এর প্রতি সজাগ দৃষ্টি রেখে সুবিচার করেছেন। সোনায় সোহাগার মতন চরিত্রের নামগুলির নির্বাচন, ঠিক যেমনটি মহাভারতের নামগুলি নির্বাচিত হয়ে আছে। নব-কেষ্টদের প্রেমের বাঁশি SMS-এর নামকরণ-ও যথার্থ মনে হয়েছে আমার। প্রেমের Fixed Deposit Scheme-এর উদাহরণে আয়ান ঘোষকেও টেনে এনেছেন। “পক্কবিম্বাধরোষ্ঠী” শব্দের প্রয়োগে প্রেমিক মনে সুঁড়সুড়িও দিয়েছেন এবং যবনিকায় সতর্কতার সাথে এই বার্তাও জানিয়ে রেখেছেন, প্রেমের চাকুরীতে বেতন নাই কিন্তু বেত অবশ্যই আছে। এত ছোট পরিসরে এতসবের উপস্থাপনা সত্যিই কৃতিত্তের দাবীদার এই লেখক। ওনার পরবর্তী লেখার অপেক্ষায়য় রইলাম।

  5. swami bhat kaporer daiyotto niyechhen , kintu chicken kobiraji pitza, burger er daiyytto ke nebe — ei kathata darun legechhe. mone hochchilo Sanjib cHattopadhyayer lekha porchhi. Apni khub valo thakun r anek likhun ei prarthona kori.