জলদ গুপ্ত
জলদ গুপ্ত লেখেন না, ভাবেন। নিজেকে মনে করেন মুদির দোকানের মালিক। কোথায় কোন মশলা আছে শুধু সেটুকুই উনি জানেন, খদ্দেরের চাহিদা অনুযায়ী কাগজে মুড়ে দিয়ে দেন...ব্যস। সিধুজ্যাঠার মত অনেক কিছু করার ক্ষমতা থাকলেও অন্যদের অসুবিধা হবে বলে কিছুই করেন নি। কবিতা, নাটক লিখতে পছন্দ করেন আর পাগলের মত পছন্দ করেন সঙ্গীত। পাহাড়ি জঙ্গলের টিলায় বসে হেঁড়ে গলায় গান আর দিনে ১৫ কাপ চায়ের জন্য সব কিছু করতে প্রস্তুত। আদিখ্যেতাকে ঘেন্না করেন, তর্ক করতে ভালোবাসেন। এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন যেখানে কোন লেখক থাকবে না।

‘নির্বাচন’ শব্দটি বেশ রোম্যান্টিক। মন সম্পর্কিত পছন্দ অপছন্দের নিরিখে সংশ্লিষ্ট পছন্দটিকে প্রতিষ্ঠিত করার নাম নির্বাচন। অতীতে কিন্তু নির্বাচন বলে তেমন কিছু ছিল না। তখন রাজা, ওস্তাদ বা দলনেতার পছন্দই ছিল শেষ কথা। তাঁর অঙ্গুলিহেলনেই নির্দিষ্ট নির্বাচন প্রক্রিয়াটি সুসম্পন্ন হতো। সাধারণ মানুষ রাজার পছন্দকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তার জয়ধ্বনি করতে করতে বাড়ি চলে যেতেন। এভাবেই মন্ত্রী, উজির, সেনাপতি, সিপাহশালার বা গ্রামের জমিদারেরা নির্বাচিত হতেন। রাজতন্ত্রের সংবিধানে সেটাই ছিল আইন। কিন্তু এই ব্যবস্থারও ব্যতিক্রম ছিল। রাজতন্ত্রের কঠোর রাজানির্ভর সিস্টেমের মধ্যেই গণতন্ত্রের আবছা ছায়া পড়ত। জমা পড়ত মনোনয়ন। সাধারন মানুষের সামনে এবং তাদের প্রত্যক্ষ যোগদানের মাধ্যমেই নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতো, এতে কেউ জিততেন আবার কেউ হারতেন। ক্ষোভ, বিক্ষোভ বা ক্ষমতার দম্ভ তখনও প্রকাশিত হতো কিন্তু সেটা ছিল হেরে যাওয়ার লজ্জা, আত্মসম্মান হারাবার ভয়। একটু পিছন ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাব, রামায়ণ, মহাভারত বা পুরাণে এমনই অজস্র নির্বাচনের ছড়াছড়ি। একটা জোরালো উদাহরণ মনে পড়ছে। এই ঘটনাটিকে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের অন্যতম বড় কারণ হিসেবেও ধরা হয়।    

Banglalive

দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভা। পাঞ্চাল রাজ দ্রুপদ তাঁর কন্যার জন্য পাত্র ঠিক করবেন, অর্থাৎ বাকি জীবনটা তাঁর মেয়ে কার সঙ্গে থাকবে ? কে হবে তাঁর পতি সেটা এই সভা থেকেই ঠিক হবে। সেই সময় অনেক রাজাই তার কন্যার বিবাহের জন্য স্বয়ংবর সভার আয়োজন করতেন। সাধারণ মানুষের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই সভার মধ্যে একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হতো। পাঞ্চাল রাজের সেই সভাতেও সেরকমই একটা পরিবেশ। ওই সময়ের বেশিরভাগ বিখ্যাত রাজারা সভায় উপস্থিত, অর্থাৎ আগামী দিনে দ্রৌপদীর ভার নিতে তারা প্রস্তুত। দ্রুপদরাজের কন্যা সেসময় বেশ মহার্ঘ। অনেক সম্পদশালী রাজাই তাকে বউ হিসেবে পাওয়ার জন্য হেলায় রাজ্যপাট ছাড়তেও প্রস্তুত। পঞ্চপাণ্ডবও বেশ রিস্ক নিয়েই সাধারণ ব্রাহ্মনের ছদ্মবেশে এসেছেন শুধুমাত্র দ্রৌপদীর অমোঘ টানে। বেশ একটা টানটান লড়াই। ছোটবড় মিলিয়ে প্রায় হাজারখানেক রাজা, ব্যবসায়ী, ব্রাহ্মন বা ক্ষত্রিয় সেজেগুজে এসেছেন, মনোনয়ন জমা দিয়েছেন, এবং তাদের মনোনয়ন নির্বিঘ্নে গৃহীতও হয়েছে। অর্থাৎ এই নির্বাচনে মনোনয়ন জমা দেওয়ারও একটা মিনিমাম যোগ্যতা ছিল। সেই যোগ্যতা মানের নিরিখেই ঠিক হয়েছে কারা কারা দ্রৌপদীর বর-এর পদপ্রার্থী হতে পারবেন। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে আসার পথে তাদের কেউ আটকায়নি, মারধোর করেনি, জঙ্গলের মধ্যে থেকে গোপনে তির চালিয়ে রথের ঘোড়াগুলোকে মেরে দেয় নি, বা বাহুবলে ঘাড় ধরে নিজের রাজ্যে ফেরতও পাঠায়নি। এমনকী সেই সময়ের দোর্দণ্ডপ্রতাপ রাজা দুর্যোধনও কাউকে স্বয়ংবর সভায় আসতে বাধা দেননি। বহুদিন থেকেই দ্রৌপদীকে তিনি পছন্দ করতেন। এই পছন্দ করা নিয়ে বেশ কিছু ছোটবড় ঘটনাও ঘটে গেছে। তিনি মনে প্রাণে চেয়েছিলেন যে, অহংকারী দ্রৌপদী তার ঘরনি হোক। এই লক্ষ্যপুরণের জন্য তিনি অনেক কিছু ত্যাগ করতেও প্রস্তুত ছিলেন। ওই সময় তাঁর যা ক্ষমতা ছিল তাতে তিনি অন্য সব রাজাদের একটা হাঁকুনি বা গোটা পাঁচেক চড়েই বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে স্বয়ংবর সভা বিরোধীশূন্য করে ফেলতে পারতেন কিন্তু  তিনি তা করেননি, রাজধর্মের সম্মান রাখতে গিয়েই তিনি সেটা করতে পারেন নি |

আরও পড়ুন:  ঘোঁতন, রামধনুরং এবং অটিজম

সাধারন অসাধারণ রাজাদের মধ্যে থেকে কাঙ্খিত জামাইকে বাছবার জন্য পাঞ্চালরাজকে শেষমুহূর্তে একটা প্রতিযোগিতার বাতাবরণ তৈরি করতে হয় বটে, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতাও ছিল সর্বজনীন। তথাকথিত ক্ষত্রিয় বা ব্রাহ্মন না হওয়ার জন্য কর্ণের ওই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ না করতে পারাটাও সেই সময়ের প্রেক্ষিতে আইন মোতাবেক ঘটনাই বলা যায়। প্রতিযোগিতার রেজাল্ট, নিজের পছন্দ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মিশেলে জনগনের সামনেই দ্রৌপদীরূপী জনগণেশ তার পছন্দকে নিশ্চিন্তে নির্বাচন করেন। নির্বাচনের রায় বেরনোর পর সামান্য কিছু গণ্ডগোল হলেও সেগুলো সবই সে সময়ের প্রেক্ষিতে বিচ্ছিন্ন ঘটনা।

রামায়ণ, মহাভারত বা পুরাণ খুঁজলে এমন উদাহরণ অনেক পাওয়া যাবে যেখানে রাজতন্ত্রের রমরমার মধ্যেই নীরবে গণতন্ত্রের সুদৃঢ় প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। রামায়ণে সীতার অগ্নিপরীক্ষা এ প্রসঙ্গে খুবই উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা। সমাজের উচ্চবিত্তের জঘন্য রাজনীতি এবং রাম-এর সিদ্ধান্তহীনতার সমস্যা থাকলেও এই গল্পের মধ্যেও আমরা গণতন্ত্রেরই ছায়া দেখতে পাই। বিভীষণের রাবণ বিরোধিতা এবং রাজ্যত্যাগও আসলে গণতন্ত্রের পরোক্ষ ছবি যা কিনা সাধারণ মানুষের চাওয়া পাওয়াকেই প্রতিষ্ঠিত করে। রাজ্যপাটের নিশ্চিত সুখ ছেড়ে মহাবলী দাদাকে সিংহাসনচ্যুত করার ভাবনা ভাবাটা ওই সময়ে খুবই কঠিন কাজ ছিল। রাবণ বিরোধিতায় সাধারণ রাজ্যবাসীর অংশগ্রহণ না থাকলে বিভীষণ কখনোই ওই সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। মহাভারতের অন্তিম পর্বে পঞ্চপান্ডবের সবছেড়ে স্বর্গযাত্রার মধ্যেও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো।    

খুঁজলে এমন উদাহরণ অনেক পাওয়া যাবে যেখানে রাজা তার সিদ্ধান্তের জন্য নির্দ্বিধায় জনগণের দ্বারস্থ হয়েছেন। জনগণের মনোনয়নের নিরিখে রাজা খুব সহজভাবেই তার সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছেন, হয়েছে নির্বাচন। আবার অনেক সময় জনগনের চাপে রাজা তার অপছন্দের সিদ্ধান্ততেও সিলমোহর দিতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু রাজতন্ত্রে এ সবই ছিল কিছু ব্যতিক্রমী উদাহরণ, যা কিনা আসল নিয়মটাকেই প্রতিষ্ঠিত করে। আসলে, রাজতন্ত্রে রাজাদের স্বেচ্ছাচার, হঠকারিতা, অত্যাচারের ইতিহাস বেশ মজবুত। দীর্ঘদিন ধরে সাধারন মানুষ এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে, অনেক প্রাণ বিসর্জন দিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। যে গণতন্ত্রের প্রাথমিক উদ্দেশ্যই হল রাজ্যপাটে সাধারনের স্বাভাবিক অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করা। কোথাও যদি সেই প্রাথমিক উদ্দেশ্যটুকুই  সঠিকভাবে পালিত না হয় তাহলে গণতন্ত্রের মাধ্যমিক বা স্নাতকস্তরের কথা তো ভাবাই যায় না।

আরও পড়ুন:  মৃতের শহর চেরনোবিল

এই তথাকথিত ভাবতে না পারাটাই বোধহয় আজকের স্বাভাবিক ভাবনা হয়ে উঠছে। দলবদ্ধভাবে গণতন্ত্রকে পরিকল্পনামাফিক হত্যা করা হচ্ছে, তাই সেটা আর কতটা গণতন্ত্র থাকছে সে বিষয়ে ঘোর সন্দেহ উপস্থিত। রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোকে ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে এই প্রক্রিয়া চালিয়ে সাধারণ মানুষকে একটু একটু করে প্রতিবন্ধী করে ফেলা যায়। নির্দিষ্ট দলের পক্ষে বা বিপক্ষে এই রাজনৈতিক প্রক্রিয়া আসলে রাজতন্ত্রেরই নামান্তর। এখানেও রাজা বা রানির নির্দেশে চেয়ার বদলায়। মন্ত্রীর জায়গায় আবার তার পরিবারের কেউ বা তার আদরের কেউ চেয়ারে বসে। এই ব্যবস্থা বা আজকের গণতান্ত্রিক কাঠামো কি তাহলে রাজতন্ত্রেরই পরিবর্তিত রূপ ? কিন্তু একটি সরল সত্য বোধহয় সব স্তরের মানুষ এবং সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলোরই মাথায় রাখা দরকার যে, গণতন্ত্রের জন্যই শাসন ব্যবস্থায় সাধারণের উপস্থিতিটা প্রাসঙ্গিক, নাহলে সবারই স্থান হবে ইতিহাসের পাতায় অথবা রাজার আঙ্গুলের ডগায়। মনে রাখা উচিত গণতন্ত্র কখনই রাজতন্ত্রের পরিশোধিত কৌশলী রূপ নয় যা কিনা পিছনের দরজা দিয়ে বাহুবলীকেই প্রতিষ্ঠিত করে !

NO COMMENTS