নবাবের সুরেলা রুপোর শয্যায় সচল হতো নগ্ন নারীমূর্তিরা

রুপোর জিনিস তৈরি করতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন ক্রিস্তোফল | ফরাসি এই রৌপ্যকারের কাছে ১৮৮২ সালে এল এক অদ্ভুত অর্ডার | নির্মাণ করতে হবে ফরমায়েশি শয্যা | অন্য খাটের মতোই তা হবে কাঠের | তবে ঘন কালো হতে হবে কাঠের রং | তার উপর খাট জুড়ে থাকবে রুপোর কারুকার্য | এত অবধি ঠিক ছিল | এমন জিনিস অনেক তৈরি করেছেন ক্রিস্তোফল | রুপোর যেকোনও নক্সা ফুটিয়ে তুলতে তাঁর তুলনা নেই | কিন্তু এই শয্যায় এমন কিছু করতে হবে‚ যা এর আগে রুপোশিল্পী করেননি |

শয্যার চারকোণায় থাকবে মূর্তি | ব্রোঞ্জের নগ্ন নারীমূর্তি | কিন্তু দেখতে হবে অবিকল রক্তমাংসের নগ্ন নারী | অর্থাৎ তাদের গায়ের বর্ণ হবে মানুষের ত্বকের রঙের | প্রত্যেক মূর্তির মাথায় থাকবে একরাশ সোনালি চুল | তাঁদের চোখের পাতা পড়বে | চোখের মণি ঘুরবে | হাতও নড়াচড়া করবে | সেখানে ধরা থাকবে পাখা এবং ঘোড়ার লেজ | মাঝে মাঝে থেকে থেকে তারা হাত নেড়ে বাতাস করবে |  নিজেদের এবং শয্যায় থাকা মানুষদের  |

অদ্ভুত এই অর্ডার এসেছিল এজেন্ট মারফৎ | কে অর্ডার দিয়েছে এমন শয্যা‚ তা সম্পূর্ণ গোপন থাকল | কৌতূহল দমন করেই প্যারিসের স্টুডিয়োতে কাজ শুরু করলেন ক্রিস্তোফল | তাঁর তো পারিশ্রমিক পেলেই হল | চার বছর ধরে তৈরি হল সেই শয্যা | ঘন রোজউডের উপর পড়ল ২৬০ কেজি রুপোর প্রলেপ | চার নগ্ন নারীমূর্তি দেখতে প্রায় একরকম হলেও থাকল সূক্ষ্ম পার্থক্য | যা ধরা পড়বে শিল্পীর বিশেষজ্ঞ ও অভ্যস্ত চোখেই | এই নারীমূর্তিরা ছিল চার দেশের নারীর প্রতীক | ফ্রান্স‚ ইতালি‚ স্পেন এবং গ্রিস‚ এই চার দেশের নারীদের ভেবে তৈরি হয় চার মূর্তি | একটি বিশেষ বোতামে চাপ দিলেই তারা একসঙ্গে হাত নেড়ে বাতাস করতে শুরু করবে | সে সময় নেপথ্যে বাজবে গোঁরের ফাউস্ট অপেরার ইন্টারল্যুড | আধ ঘণ্টা ধরে ভেসে আসবে সেই সুর |

কার জন্য নির্মিত হয়েছিল এই নগ্ননারীশোভিত শয্যা ? সে উত্তর জানা গেল ১৯৭৫ সালে | পাকিস্তানের বহওয়ালপুরে পাওয়া গেল ওই রজত-শয্যা | সিন্ধুনদের তীরে বহওয়ালপুর ছিল দেশীয় রাজার সুবিশাল এস্টেট | যখন এই শয্যার অর্ডার  দেওয়া হয়েছিল‚ তখন এই এস্টেট ছিল অবিভক্ত ভারতের অংশ | সেখান থেকে ওই রুপোর খাটের অর্ডার দেওয়া হয়েছিল এক ভারতীয় রাজকুমারের জন্য | 

বহওয়ালপুরের শাসক তখন ছিল আব্বাসি পরিবার | এই নেটিভ রাজবংশ নিজেদের হারুণ অল রশিদের বংশধর বলে দাবি করত | প্রথম খ্রিস্টীয় শতাব্দীতে রচিত আরব্য রজনীতে  হারুন অল রশিদের উল্লেখ বহুবার আছে | সেই আব্বাসি পরিবারের ২০ বছর বয়সী নবাব পঞ্চম মহম্মদ বহওয়াল খান আব্বাসি এই রুপোর বিশেষ শয্যার অর্ডার দিয়েছিলেন ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে |

তখন তো কাকপক্ষীও টের পায়নি | বিশদ তথ্য জানা গেল বিংশ শতাব্দীতে | ১৯৬৬ সালে প্রয়াত হন আব্বাসি বংশের বহওয়ালপুরের শেষ নবাব | তৎকালীন পাকিস্তান প্রধান জুলফিকার আলি ভুট্টো উদ্যোগী হন আব্বাসি পরিবারের সম্পত্তি সরকারি খাতে আনতে | সাদিক গড়ের প্রাসাদে এই রুপোর শয্যা পাওয়া গিয়েছিল  ফ্রেঞ্চ বেডরুম-এ | অর্থাৎ সেই শয়নকক্ষে সবকিছুরই ফ্রেঞ্চ থিমের |  

কিন্তু অন্য রাজন্য পরিবারের মতো এখানেও নবাবদের উত্তরসুরিদের নিজেদের মধ্যে বিবাদ বাধে সম্পত্তি নিয়ে | তৈরি হয় জটিল পরিস্থিতি | এই ডামাডোলের মধ্যেই ১৯৯০ সালে সাদিক গড়ের প্রাসাদ থেকে উধাও হয়ে যায় রুপোর খাট | পুনরায় সেটিকে দেখা যায় ফ্রান্সে‚ এক ধনাঢ্যর ব্যক্তিগত সংগ্রহে | কী করে কত হত ঘুরে ওখানে গেল জানা যায় না | তবে দেখা গেল দেশের জিনিস আবার ফিরে গেছে দেশে | 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.