তির ধনুক নিয়েই ব্রিটিশ বারুদের মুখে প্রাণপণ লড়েছিল নিষ্পাপ মুখগুলো

534

নিষ্পাপ মুখগুলোয় ফুটে উঠেছিল প্রতিরোধস্পৃহা | সম্বল বলতে তির ধনুক আর অদম্য সাহস | তাই নিয়েই বহিরাগত ব্রিটিশ ও দেশীয় জমিদারদের বারুদের সামনে দাঁড়াল অরণ্যের সন্তানরা | আজকের বাংলা ও ঝাড়খণ্ডের অরণ্যচারীরা সেদিনই বুঝেছিল আসলে সবাই শোষক | কেউ সাত সাগর পেরিয়ে আসা শ্বেতাঙ্গরা | কেউ নিজের দেশেরই | দু পক্ষই রাজা হয়ে কাঙালের সর্বস্ব চুরি করতে চায় | তবু অরণ্যের ভূমিপুত্রদের সেই সংগ্রামের ভবিতব্য বলতে ইতিহাস বইয়ের এক কোণে‚ ‘ সাঁওতাল বিদ্রোহ’ বলে |

১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের পলাশী যুদ্ধের পরে বাংলার মাটি ব্রিটিশদের মুনাফা চাষের জমি হয়ে দেখা দেয় | ধান ও অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের বদলে শুরু হল পাট‚ আফিম আর নীলের মতো অর্থকরী ফসলের চাষ | এর ফলে ব্রিটিশ কোষাগার স্ফীত হল | কিন্তু দরিদ্রের উদর আরও সঙ্কুচিত হল | এর পরে ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিশ নিয়ে এলেন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত | ডালহৌসির সত্ত্ববিলোপ নীতি পাল্টে এখানে বলা হল‚ জমিদারের কর্তৃত্ব বা অধিকার বজায় থাকবে | কিন্তু তাকে নির্দিষ্ট হারে খাজনার যোগান দিয়ে যেতে হবে | খাজনা কমলেই ব্রিটিশ শক্তি গ্রাস করবে জমিদারি শাসন | এর ফলে প্রজাদের উপর শুরু হল অমানুষিক অত্যাচার |

রাজস্ব ক্রমবর্ধমান রাখতে ব্রিটিশরা উদ্যোগী হল নতুন নতুন জমিদারি স্থাপনে | বাংলা বিহার উড়িষ্যা ও ঝাড়খণ্ডের বিস্তীর্ণ জমি নিলামে উঠল | যা ছিল সাঁওতালদের অধিকারে‚ তা চলে গেল শহুরে বাবুদের জিম্মায় | অনেক ধনী ব্যবসায়ীই নিলামে জমি কিনে জমিদারি পত্তন করলেন | যে সাঁওতালরা মালিক ছিলেন জমির এবং সর্বোপরি নিজের মর্জির‚ তাঁরাই হয়ে গেলেন ভূস্বামীর ভাগচাষি | ভেঙে পড়ল কয়েক যুগ ধরে চলে আসা উপজাতিদের সামাজিক পরিকাঠামো |

নতুন ব্যবস্থায় সাঁওতালরা বাধ্য হল মুদ্রা ব্যবহার করতে | এর আগে অবধি তাদের রীতি ছিল বিনিময় প্রথা | কিন্তু জমিদারি খাজনা দিতে গিয়ে তো টাকাপয়সা ছাড়া চলবে না | তাই বাধ্য হয়ে চড়া সুদে ধার করতে হল | ঋণশোধ করতে গিয়ে নিজেদের টাকা-আনা-পাই-পয়সা শূন্য হয়ে গেল | 

বছর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হল | শোষণ থেকে মুক্তিলাভে সশস্ত্র বিদ্রোহের পথে গেলেন সাঁওতালরা | ১৮৫৫ সালে দেখা দিল হুল বিদ্রোহ | সাঁওতালি ভাষায় হুল মানে বিদ্রোহ | নেতৃত্বে ছিলেন মুর্মু বংশের চার ভাই | সিধু‚ কানহু‚ চাঁদ‚ ভৈরব ও তাঁদের দুই বোন ফুলো আর ঝানো | সাঁওতাল পুরোহিত ছিল তাঁদের বংশ | আজকের ঝাড়খণ্ডের সাহেবগঞ্জ জেলার বোগনাদিহ গ্রামের পরিবারটিকে মান্যগণ্য করত আদিবাসী সমাজ |

১৮৫৫-র ৭ জুলাই বোগনাদিহ-র মাঠে জমায়েত হল অসংখ্য সাঁওতাল | নিজেদের স্বাধীন ঘোষণা করে তাঁর শপথ নিল‚ সিধু মুর্মু ও কানহু মুর্মুর নেতৃত্বে তারা শেষ দম অবধি লড়বে ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে | সিধু-কানহুকে গ্রেফতার করতে পুলিশ পাঠাল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি | বিদ্রোহী সাঁওতালদের হাতে প্রাণ দিতে হল সেই পুলিশকর্মীদের |

ক্রমে ভয়াল আকার ধারণ করল দু পক্ষের যুদ্ধ | ঝাড়খণ্ডের রাজমহল পাহাড় থেকে বিহারের ভাগলপুর হয়ে বাংলার বীরভূম অবধি বড় এলাকা অধিকার করল সাঁওতাল বাহিনী | দু পক্ষেই প্রাণহানি হল | সাঁওতাল পরগনার পাকুড় শহরে দুর্গে আশ্রয় নিল প্রাণভয়ে ভীত ইংরেজরা |

কিন্তু দ্রুত বিদ্রোহের গতি রোধ করল ব্রিটিশরা | তাদের অত্যাধুনিক অস্ত্রের মুখে দাঁড়াতে পারল না সাঁওতাল তিরধনুক | অন্তত পনেরো হাজার থেকে কুড়ি হাজার সাঁওতাল বিদ্রোহীকে হত্যা করে ব্রিটিশবাহিনী | তাঁদের মধ্যে ছিলেন সিধু ও কানহু দুই ভাই | ১৮৫৬ সালেই বিদ্রোহ প্রায় স্তিমিত | তারপরেও কিছু কিছু জায়গায় ধিকিধিকি জ্বলছিল আগুনের আঁচ |

এই বিদ্রোহ থেকে যথেষ্ট শিক্ষা পায় ব্রিটিশরা | লাগু হয় দ্য সাঁওতাল পরগনা টেন্যান্সি অ্যাক্ট | এর ফলে ঔপনেবেশিক শোষণ থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি পেল নিরীহ আদিবাসীরা | সাধারণ পুলিশের বদলে তাদের সমস্যা বিচার করবে স্থানীয় গ্রামের মোড়লরাই | তাও সিদ্ধান্ত নিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি | 

প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভূমিপুত্রদের সেই যুদ্ধ আজও জারি | শুধু বিভিন্ন সময়ে পরিচিত হয়েছে বিভিন্ন নামে |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.