আঁশবঁটি দিয়ে স্বামী হত্যা করলেও ‘পাপিষ্ঠা’ কিশোরী ঠাঁই পেল কালীঘাটের পটচিত্রে

1282

ব্রিটিশ আমলের বাংলায় স্বাধীনতা আন্দোলন বা বিপ্লবীদের কাজ ছাড়া রোমহর্ষক ঘটনা ঘটত যে না‚ তা কিন্তু নয় | এমন সব অপরাধ সংগঠিত হতো‚ যা আজকের দিনে হলে বহুদিন মিডিয়া নিজের খোরাক পেয়ে যেত | সাইবার ক্ষেত্র ছাড়া সবরকমের অপরাধ তখনও হতো‚ এখনও হয় | 

উনবিংশ শতাব্দীর এক রোমহর্ষক কেচ্ছা-কেলেঙ্কারি এলোকেশী হত্যাকাণ্ড ১৮৭৩ সালে হয়েছিল | যা একসঙ্গে কাঁপিয়ে দিয়েছিল সাধারণ মানুষ থেকে শুরু অরে দারোগার দফতর‚ এমনকী ব্রিটিশ প্রশাসনকেও | খুন করা হয়েছিল ১৬ বছরের এক কিশোরীকে | এতটাই ভয়ঙ্কর ছিল এর প্রভাব‚ ১৫০ বছর পরেও তার বিবরণ জায়গা পেয়েছিল কালীঘাটের পটচিত্রে | বিশ্বের বড় বড় জাদুঘরে সেই পট রাখা আছে |

এলোকেশী হত্যাকাণ্ডের আর এক নাম মুখে মুখে হয়ে গিয়েছিল তারকেশ্বর কেলেঙ্কারি | যা আসলে ছিল বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক | ত্রিকোণ সেই সম্পর্কের পরিণতি ছিল ভয়াবহ | অভিযুক্ত নবীনচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সরকারি ছাপাখানার কর্মী | তাঁর স্ত্রী‚ ষোল বছরের কিশোরী এলোকেশী থাকতেন নিজের মামাবাড়িতে‚ বাবা ও বিমাতার সঙ্গে | আজকের কলকাতা থেকে ৭০ কিমি দূরে কুরমুল গ্রামে ছিল তাঁর মামাবাড়ি |

কুরমুলের পাশের গ্রাম ছিল তারকেশ্বর | সেখানে তারকনাথ মন্দিরের এক পুজারীর কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এলোকেশীকে | কারণ বিয়ের অনেকদিন পরেও সে ছিল সন্তানহীনা | তারকনাথ মন্দিরের পুজারী সিদ্ধহস্ত ছিলেন বন্ধ্যাকে সন্তান দেওয়ার ক্ষেত্রে | 

তাঁর কাছে উর্বরতার কী মহৌষধ ছিল‚ জানা যায় না | অন্ধকারে রয়ে গেছে এলোকেশীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও | কিন্তু যা রটে‚ তা হল‚ পুজারীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক হয় এলোকেশীর | জানতে পেরে আঁশবঁটি দিয়ে স্ত্রীর গলা কুপিয়ে খুন করেছিল নবীনচন্দ্র | পুলিশের রেকর্ডে সে দিনটা ছিল ১৮৭৩-এর ২৭ মে |

অবৈধ সম্পর্ক ও খুন‚ দুটিই ব্রিটিশরা কড়া হাতে শাস্তি দিতে চেয়েছিল | কাঠগড়ায় উঠেছিলেন স্বামী ও পুজারী‚ দুজনেই | কিন্তু বিশেষত যখন মন্দিরের পুজারী অভিযুক্ত‚ বিধর্মী সাহেবদের এতে নাক গলানো মোটেও ভাল চোখে দেখেনি গোঁড়া সমাজ | নবীনচন্দ্রের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় | পুজারী গরাদ থেকে বেরিয়ে আসেন তিন বছর পরেই | ওই পুজারী এরপর মন্দিরের প্রধান পুজারী হয়ে যান | ১৮৯৪ সাল অবধি আমৃত্যু তিনি এই পদে ছিলেন | 

বিচার ব্যবস্থায় স্থানীয় ভাবাবেগকে গুরুত্ব দিয়েছিল ব্রিটিশরা | তাদের দেশের যুক্তি এখানে খাটাতে যায়নি | স্থানীয় সমাজপতিদের মন পেতে বরং ব্রিটিশ বলেছিল‚ স্বামীর বিশ্বাসভঙ্গ করা স্ত্রীর অনুচিত | স্ত্রী তো আর স্বাধীন নয় | সম্পূর্ণ স্বামীর অধীন সম্পত্তি সে | এখানে ব্রিটিশরা নিজেদের প্রতিপন্ন করতে চেয়েছিল হিন্দু ধর্মের রক্ষক হিসেবে | একই ছবি সমাজ ও জনমানসেও | সেখানেও এলোকেশীর জন্য সহানুভূতি নেই | শ্বশুরবাড়িতে না থেকে বাবা মায়ের কাছে থাকায় প্রথমেই সে বেহায়া প্রতিপন্ন হল | সমাজও বলল‚ স্বামীর অনুপস্থিতিতে সে নিজেকে বেচেছে | তাতে নাকি ইন্ধন ছিল তার বিমাতার | এলোকেশী কলঙ্কিনী হলে কী হবে‚ বাজারে বিকোতে লাগল তার নামের শাড়ি‚ বঁটি আর পানের বাটা | পাওয়া যেত ব্যথাহারক মলম | যা নাকি কারাগারে বসে ঘানি পিষে বানিয়েছে দণ্ডিত পুজারী |

রঙ্গ ব্যঙ্গ বা খিস্তি খেমটার নাটক থেকে শুরু করে কালীঘাটের পটে এলোকেশীর কেচ্ছা একদম হটকেক হয়ে গেল | সেখানে তাকে আঁকা হল যেন কারও রক্ষিতা | তার জামাকাপড় বা অঙ্গভঙ্গি মোটেও ভদ্রবাড়ির মেয়ের মতো করে আঁকা হল না | মন্দিরের পুজারীকে দেখানো হল খলনায়ক | পাপিষ্ঠা স্ত্রীকে খুন করে নবীনচন্দ্র নায়ক | আর ভেঙে পড়া সমাজের অবক্ষয়ের জন্য দায়ী নবাগত ব্রিটিশ শাসন ! সারা পৃথিবীতে বড় বড় জাদুঘর ও নামী ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে এলোকেশীর আখ্যান সম্বলিত কালীঘাটের পট | 

লন্ডনের ভিক্টোরিয়া ও অ্যালবার্ট মিউজিয়ম ‚ আমেরিকার ব্রুকলিন ও ক্লিভল্যান্ড মিউজিয়ম ‚ জারানির হাইডেলবার্গের ভোলকারকুন্ডেলবার্গ মিউজিয়ম‚ কানাডার রয়াল অন্টারিও মিউজিয়ম এবং নতুন দিল্লির ন্যাশনাল গ্যালারি অফ মডার্ন আর্ট | সব জায়গার সংগ্রহে আছে কালীঘাটের এলোকেশী-পটচিত্র | সর্বত্র পাপিষ্ঠা হিসেবে দেখানো হয়েছে এই অসহায় কিশোরীকে | 

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.