মহামূর্খ কালিদাসই কবিবর হয়ে আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে লিখেছিলেন মেঘদূতম !

6853

আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে অন্য কাউকে নিয়ে লেখা নৈব নৈব চ | বলতেই হবে মহাকবি কালিদাসের কথা | ফরমান এসেছিল আগেই | তাই আজ ভারতের শেক্সপিয়ারকে স্মরণ | কারণ এই দিনেই নাকি তিনি শুরু করেছিলেন মেঘদূতম রচনা |

এটা কিন্তু বাঙালিরা ভাবতে বেশি ভালবাসে | তাদের রোম্যান্টিসিজম পরিপুষ্ট হয় | কালিদাসের জন্মকাল নিয়েই সংশয় | তো কবে তিনি মেঘদূতম রচনা শুরু করেছিলেন

ছোটবেলায় আমরা সবাই শুনেছি মূর্খ কালিদাসের কথা | তারপর সে কী করে দেবী সরস্বতীর আশীর্বাদে বিক্রমাদিত্যের রাজসভায় হয়ে উঠলেন অন্যতম রত্ন | কী করে রাজকন্যার বরমাল্য এসে পড়ে তাঁর গলে | বড় হয়ে পড়লাম হায় রে কবে কেটে গেছে কালিদাসের কাল‚ পণ্ডিতেরা বিবাদ করে লয়ে তারিখ সাল

কালিদাসকে বলা হয় সরস্বতীর আশিসধন্য | অথচ তাঁর নামে দেখুন দেবী কালিকার উপস্থিতি | সেইসঙ্গে প্রবলভাবে বঙ্গজ স্পর্শ | যদিও প্রামাণ্য তথ্য বলছে তিনি কলিঙ্গ সম্পর্কিত হলেও হতে পারেন | বঙ্গ সংযোগ প্রতিভাত হয়নি | আর যে স্থান অবিচ্ছেদ্য ভাবে জড়িয়ে আছে তাঁর সঙ্গে‚ তা হল প্রাচীন উজ্জয়িনী |

সেইসঙ্গে গবেষকদের আর এক সংযোজন হল কাশ্মীর | ঊনবিংশ শতাব্দীর কাশ্মীরি পণ্ডিত লক্ষ্মী ধর কাল্লা তো কালিদাসকে কাশ্মীরের ভূমিপুত্র ছাড়া অন্য কিছু মানতেই নারাজ | তাঁর দাবি হল‚ জন্মভূমি কাশ্মীর থেকে ক্রমশ দক্ষিণে অগ্রসর হয়েছিলেন কবিবর |

কুমারসম্ভব কাব্যে যে বিবিধ বর্ণনা আছে‚ যেমন জাফরান‚ দেবদারু গাছ‚ কস্তুরী মৃগ‚ এসব সহজলভ্য ছিল ভূস্বর্গেই | কলিঙ্গ বা উজ্জয়িনীতে নয় | কল্লার মতে‚ কালিদাসের অভিজ্ঞান শকুন্তলম-ও কাশ্মীরের শৈব দর্শন দ্বারা প্রভাবিত |

স্থানের পরে এ বার তাঁর কাল | নৃপতি বিক্রমাদিত্যর রাজসভা না হলে কী করে নবরত্ন হবে ?এখন এই বিক্রমাদিত্য কে ? প্রথমেই চলে আসে গুপ্ত বংশের দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের কথা | তিনি এই উপাধির আড়ালে উজ্জ্বলতম শাসক | শাসন করেছিলেন ৩৮০-৪১৫ খ্রিস্টাব্দ |

আর এক বিক্রমাদিত্য ছিলেন যশোধর্মণ | মালব্যের রাজা | গুপ্ত বংশের একটি শাখা এখানে বিকশিত হয়েছিল ষষ্ঠ খ্রিষ্টাব্দে | তবে অধিকাংশ গবেষক মনে করেন দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সভাসদই ছিলেন কবি কালিদাস | যাঁর খ্যাতি দীপ্যমান ছিল পরবর্তীকালে কুমারগুপ্ত ও স্কন্ধগুপ্তের শাসন অবধি | অর্থাৎ ভারতীয় ইতিহাসে স্বর্ণযুগ বলে পরিচিত গুপ্তযুগ সমুজ্জ্বল ছিল কালিদাসের দীপ্তিতে |

কালিদাসের নামোল্লেখ পাওয়া যায় এমন প্রাচীনতম নিদর্শন হল মান্দাসৌরের সূর্যমন্দির | আবার কর্ণাটকে হরিষেণের আইহোল প্রশস্তিতে রয়েছে কালিদাস ও ভারবির প্রসঙ্গ |

আবার অনেক ভারত বিশেষজ্ঞ ভারতীয় পণ্ডিত বলেন কালিদাস কোনও নির্দিষ্ট একজন কবি ছিলেন না | পরবর্তীকালে এটা হয়ে উঠেছিল একটি পদের নাম | সেই পদাসীন বহু কবি মিল্লিতভাবে সৃষ্টি করে গেছেন চির শাশ্বত সংস্কৃত সাহিত্য |

একা হোক‚ আর একাধিকই হোক‚ কালিদাসের সৃষ্টিতে এমন উপাদান ছিল যা কালোত্তীর্ণ হয়েছে | তাঁর বিরচিত তিনটি নাটক এখনও অবধি জানা যায় |

মালবিকাগ্নিমিত্রম‚ যেখানে রাজা অগ্নিমিত্র পাগল হয়েছিলেন দাসী মালবিকার প্রণয়ে | পরে জানা যায় মালবিকাও এক রাজতনয়া | এরপর বিখ্যাত দুষ্মন্ত-শকুন্তলা পর্ব নিয়ে অভিজ্ঞানশকুন্তলম | রাজা পুরুরবা ও অপ্সরা ঊর্বশীর প্রণয়কে উপজীব্য করে বিক্রমোর্বশীয়ম | বারবার তাঁর লেখার কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠেছে হিন্দু পুরাণ |

কালিদাস রচিত মহাকাব্য হল কুমারসম্ভব ও রঘুবংশম |  প্রথমটি হল কুমার বা কার্তিকেয় বা সুব্রহ্মণ্যম-এর জন্ম নিয়ে |  তার আগে বর্ণিত  হয়েছে পার্বতীর জন্ম-যৌবন ও শিবের সঙ্গে তাঁর প্রণয়-পরিণয় |  রঘুবংশম লেখা হয়েছে প্রাচীন ভারতের বিখ্যাত রঘু বংশের রাজাদের নিয়ে | সেইসঙ্গে এক ও অদ্বিতীয় মেঘদূতম |  বিরহী যক্ষ যেখানে মেঘের মাধ্যমে বার্তা পাঠাতে চান প্রেয়সীর কাছে |  এছাড়াও আরও কিছু কাব্য আছে যাঁর রচয়িতা মহাকবি কালিদাস | বেশিরভাগই রচিত মন্দাক্রান্তা ছন্দে |

তত্ত্বকথার পরে এ বার আসি প্রচলিত লোককথায় | যেখানে বলা হয়‚ মূর্খ কালিদাস ছিলেন এক সামান্য ব্যক্তি | এতই বোকা‚ গাছের যে ডালে বসেছিলেন সেই শাখাটিই কাটছিলেন | মস্করা করার লক্ষ্যে তাঁকে পাঠানো হয় উজ্জয়িনীর রাজসভায় | রাজকন্যা বিদ্যাবতী ( বা বিদ্যাধরী )-র স্বয়ম্বর সভায় | কন্যার শর্ত ছিল যে তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে তার গলায় বরমাল্য পরাবেন |

দেশবিদেশের রাজন্যরা ব্যর্থ হয়েছিলেন | কালিদাসের পালা যখন এল তখন তাঁর দিকে একটি আঙুল তুলেছিলেন রাজকুমারি | উত্তরে দুটি আঙুল তোলেন কালিদাস | অভিভূত বিদ্যাবতী তাঁকেই স্বামী মনোনীত করেন | কারণ তাঁর প্রশ্নের উত্তর ছিল দুই | আর কালিদাস ভেবেছিলেন রাজকুমারী তাঁর এক চোখ কানা করে দেবেন বলছেন | তাই জবাব দিয়েছিলেন তিনি রাজকুমারির দুই চোখ গেলে দেবেন |

বিয়ের পর স্বামীর মূর্খামি ধরা পড়ে যাওয়ায় মর্মাহত হয়ে পড়েন রাজকুমারি | তিনি তাঁর সঙ্গে প্রায় সম্পর্ক ছিন্ন করেন | মনের দুঃখে আত্মঘাতী হতে বনে যান কালিদাস | সেখানেই দর্শন দিয়ে তাঁকে আশীর্বাদ করেন দেবী সরস্বতী | বলেন‚ তিনি তাঁর জিহ্বায় অধিষ্ঠান করবেন | এরপরই মূর্খ কালিদাস হয়ে ওঠেন মহাকবি | বিদ্যাবতী তাঁকে স্বামীরূপে বরণ করে নেন যোগ্য সমাদরে | আবার প্রচলিত এই গল্পকথাই বলে‚ স্বর্ণলঙ্কা বা প্রাচীন সিলনে গিয়েছিলেন কালিদাস | রাজা কুমারদাসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন বলে | সেখানে তাঁকে হত্যা করেছিলেন কয়েকজন ঈর্ষাপরায়ণ ষড়যন্ত্রী |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.