চার বছরের একরত্তি মেয়ে | হাসিমুখে সকালে স্কুলে গিয়েছিল | ফিরল একদম অন্য রকম হয়ে | দুটো প্যান্ট ছাপিয়ে জামায় রক্তের ছিটে | ভয়ানক ব্যথা তলপেট জুড়ে | সে জানে, তার সঙ্গে ভয়ংকর কিছু একটা হয়েছে | সে জানে না, আসলে তার সঙ্গে কী হয়েছে!

Banglalive

ঘটনাটা খবরের কাগজ, নিউজ চ্যানেল, সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে সবাই জেনেছেন দু’দিন পরে | দু’দিন পরে কলকাতার নামকরা একটি স্কুলের আভিজাত্যের মুখোশ খুলে বেরিয়ে এসেছে ভয়ানক অমানবিক চেহারা | দু’দিন ধরে ফুলের মত মেয়েটি, তার মা-বাবা-ঠাকুরদা ভীষণ কষ্ট পেয়েছে | অভিভাবক হয়ে মেয়ের শারীরিক নির্যাতন, মানসিক যন্ত্রণা দেখার কষ্ট | ইচ্ছে করে শারীরিক পরীক্ষা দেরিতে করে প্রমান লোপাটের চেষ্টা দেখে কষ্ট | স্কুল অধ্যক্ষার দোষ চাপা দেওয়ার প্রচেষ্টা দেখে কষ্ট— এসবই আপনাদের জানা, দেখা | ২০১৪-র সেপ্টেম্বরে প্রথম এরকম একটি ঘটনা ঘটেছিল একই স্কুলে | সেবার যা হোক করে পুরোটা ধামা চাপা দিয়ে ‘কেস সাল্টে’ নিয়েছিলেন স্কুল কর্তৃপক্ষ | এবার জল অনেকটাই গড়িয়েছে | প্রতিবাদে পথে নেমেছেন অভিভাবকেরা | আর কেনই বা নামবেন না তাঁরা? লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে নামী স্কুলে ভর্তির পর চার বছরের কোনো শিশু যদি যৌনাঙ্গে গভীর ক্ষত নিয়ে বাড়ি ফেরে, রেয়াত করা উচিত মা-বাবাদের?

নারী-শরীর ভোগ যদিও আজকের ঘটনা নয় | বহু যুগ থেকে ঘটে আসছে | সম্ভবত সেদিন থেকে, যেদিন শয়তানের ইশারায় পৃথিবীর প্রথম পুরুষ আদম আর প্রথম নারী ইভ নিষিদ্ধ ফল খেয়ে কামনায় জ্বলে উঠেছিল | শয়তানের কারসাজিতে তারা প্রথম জেনেছিল, একজন পুরুষ চাইলে কিভাবে নারীকে সম্ভোগ করতে পারে | সেদিনের সেই সম্ভোগে হয়তো ভালবাসার প্রলেপ ছিল না | ভোগের আরতিতেও ঐকান্তিক চাওয়া ছিল না | বরং সেই মিলন ছিল প্রথম নারী শরীর আবিষ্কার | একজন নারীকে পরতে পরতে খুলে কীভাবে ভোগ করা যায়, সেই আবিষ্কারে মত্ত হয়েছিল প্রথম পুরুষ | এই ঘটনার একটাই ইতিবাচক দিক, ইভ পূর্ণবয়স্ক ছিল | এবং এই শরীরী খোঁজে সেও সমান আগ্রহী ছিল | আদম তাকে জোর করেনি | দখল করেনি | ছিঁড়ে টুকরো করেনি | বরং প্রথম কুমারিত্ব হারিয়ে ইভ তৃপ্ত হয়েছিল | আদমকে নিজের শরীরের গহন-গভীরে ধারণ করে যেন পূর্ণ হয়েছিল | সেদিন থেকেই আদম আর ইভের বংশধরেরা জেনেছিল, নারী ভোগ্য | ভালো লাগায়, মন্দ লাগায়, যেকোনো অনুভুতিতে ‘দিল বহেলানে কে লিয়ে’ এর থেকে ভালো উপাদান আর কিচ্ছু নেই |

আরও পড়ুন:  বোতল-ছিপির কারবারি থেকে ধনকুবের ব্যবসায়ী‚ তাঁর বিত্তে সাজল কলকাতা‚ তৈরি হল মেডিক্যাল কলেজ

দিন এগিয়েছে | আদমদের চাওয়ার ধরণ বদলেছে | মহাভারতের যুগে এই চাওয়ার ন্যক্কার নিদর্শন দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ | ওই যুগের পুরুষ দেখালো, জোর করে নারী-শরীর ভোগ-দখলের মধ্যে এক ধরনের পুরুষত্ব আছে | স্বেচ্ছায় দানের থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার মধ্যে মাদকতা অনেক বেশি | আর সেদিন থেকেই যেন নারী বড্ড বেশি বে-আব্রু |

দিন যত এগিয়েছে, রেখে-ঢেকে ভোগের ব্যাপারটাই সভ্য মানুষের দুনিয়া থেকে আস্তে আস্তে মুছতে বসেছে | এর জন্য কে দোষী? সে আলোচনা পরে | তার আগে কামনার চেহারাটা একবার দেখে নিতে হবে তো? কলকাতার নামী স্কুলের ঘটনা দিল্লি, নয়ডা, বিহার, মধ্যপ্রদেশে হরবখত হচ্ছে | যেগুলো খবরের কাগজে ঠাঁই পাচ্ছে, লোকে তাই নিয়ে ক’দিন বাজার গরম করছে | কিছুদিন পরেই তপ্ত দুধ জুড়িয়ে ওপরে সময়ের পুরু সর পড়ে ঢেকে দিচ্ছে সবটা | যার গেল সে বুঝবে | তাদের মাথাতেও আসে না, তাদের ঘরেও মেয়ে আছে | সেই মেয়ের সঙ্গে এই ঘটনা ঘটলে মেনে নিতে পারবে তো তারা? আর, একবার মেয়েদের গায়ে (শিশু হোক বা সম্পূর্না) কালির ছিটে লাগলে পুরুষের তো পোয়া পনেরো | ঘরে স্ত্রী নামক ফিক্সড একাউন্ট তো আছেই | এরকম দাগী কয়েকটা খুচরো একাউন্ট বাইরে থাকলে জমিদারী মেজাজ ঠেকায় কে? কবি-সাহিত্যিকদের তো আবার নারী-সঙ্গ না থাকলে কাব্যি আসে না!

এভাবেই একদিকে নারী স্বাধীনতা নিয়ে হাজার একটা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে | জেন্ডার-ইকুয়ালিটি নিয়ে গলা ফাটাচ্ছে জেন জেড | পিরিয়ড নিয়ে ট্যাবু ভাঙ্গতে প্রথম সারির বিশ্ব-বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা ন্যাপকিনে লাল কালি ঢেলে প্রকাশ্যে বোর্ডে আটকাচ্ছে | সেই নারী-ই রাতে তিনজন পুরুষ যাত্রীর সঙ্গে অটো শেয়ার করলে ধর্ষিত হচ্ছে | কিরণ খেরের মতো শিক্ষিত, সাংসদ পুরুষদের ধিক্কার জানানোর বদলে ধর্ষিতাকে ধমকাচ্ছেন, ‘আপনি কেন পুরুষ সহযাত্রীর সঙ্গে অটো শেয়ার করেছেন?’ বাহ্ রে সমাজ! বাহ্ রে নারী স্বাধীনতা! একজন মেয়ের যন্ত্রণা যদি আরেকজন মেয়ে না বোঝে তাহলে তো একজন শিক্ষক চার বছরের শিশুকে নীল ছবি দেখিয়ে সহজেই নিজের দু’টি পুরুষ্টু আঙ্গুল অনায়াসে ঢুকিয়ে দিতেই পারে!   

একুশ শতকেও নারী যে শুধুই যোনিগন্ধা তার আরেকটি জ্যান্ত উদাহরণ, কোনো মেয়ে ডিভোর্স করে স্বাধীনভাবে থাকতে চাইলে সমাজের চোখে সেটা বড্ড অপরাধ | একটা পুরুষ singlehood উপভোগ করতেই পারে | তা বলে এই অধিকারেও ভাগ বসবে মেয়েরা? কেন? ওদের জন্য তো বিছানা আছে | ভগবান তো ভোগ করার জন্যই মেয়েদের বানিয়েছেন | রবি ঠাকুর যতই পদ্যে ‘মেয়েদের আপন ভাগ্য জয় করিবার, কেন নাহি দিবে অধিকার’ আওড়ান, ওসব কেতাবি কথা কেতাবেই মানায় | স্বামীর সঙ্গে বনিবনা হয়নি? নাই বা হলো | আমরা সমাজে এত পুরুষ রয়েছি কী করতে? আমাদের থেকে কাউকে বাছো! তুমিও খুশ, আমিও | যে মেয়ে এই থিওরি মানলো, বহুত  আচ্ছা | যে মানলো না, গোল তাকে নিয়েই | বাতাসে কথা ছুড়ে বোঝানোর সে কি আপ্রাণ চেষ্টা, ‘কুসুম, তোমার কি শরীর নাই?’

আরও পড়ুন:  নির্বাসন 

এই ঘটনার নিরিখে এক single মাদারের কথা বড্ড মনে পড়ছে | বেচারি যে অফিসেই যায়, ওই একটি বিষয় নিয়ে আতান্তরে পড়ে | লেড়কি হাসি তো ফাসি | কারোর সঙ্গে গপ্পো করলে, চোখের দিকে তাকালে একটা চান্স নেওয়া যেতেই পারে | বিশেষ কারো সঙ্গে কথা বলে? তার মানে, খাতা খুলেছে | সবার সঙ্গে হাসছে, কথা বলছে? তাহলে তো পাক্কা খেলুড়ে | মেয়ে মহলেও জনপ্রিয়? লেসবি নয়তো? প্রেম না করলে, কেন করে না? শরীর জাগে না বুঝি? করলে আরেক জ্বালা | দেখেছ, কার ঘর যেন ভাঙ্গতে বসেছে! কারো ইশারায় পাত্তা না দিলে মন্তব্য, ‘ইশ রে! সতীপনা দেখাচ্ছে! বাইরে কার সঙ্গে মা… আসছে দেখগে যা! শুধু এখানেই যত্ত ইয়ে…!!’ মেয়েটি মাঝে মধ্যেই গালে হাত রেখে ভাবতে বসে, সে নিজে সাইকো? না আশেপাশের সহকর্মীরা? সমাজে থাকতে গেলে বন্ধু হিসেবে নয়, রক্ষক হিসেবে পুরুষকে সঙ্গে রাখতেই হবে? সে নিজের ইচ্ছেমত ঘুরতে পারবে না? বেরাতে পারবে না? মিশতে পারবে না? বন্ধু বাছতে পারবে না? আরো মজার ব্যাপার, সেই মেয়েই যখন শাঁখা-সিঁদুরে এও-স্ত্রী, তার তখন কোথাও, কোনো বাধা নেই | পুরুষ সহকর্মী হয় তার দাদা, নয় বিশুদ্ধ বন্ধু!

এবার আসুন কারণ আলোচনা করা যাক | বিশিষ্ট মনোবিদ পারমিতা মিত্র ভৌমিক জানাচ্ছেন, নারী মানেই যোনি-স্বর্বস্ব এমন ভাবনার অনেক কারণ আছে | আমাদের দেশে সেক্স-এডুকেশন নেই | যৌনতা নিয়ে বিস্তর রাখ-ঢাক | স্কুলে এসব পড়ানো হয় না | একটা বয়সের পর নিষিদ্ধ জিনিসের উপর আগ্রহ বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক | এদিকে যৌনতা নিয়ে ভুল ধারণা আমাদের ছেলে-মেয়েদের আরো ভুল পথে টানছে | আমাদের দেশে কো-এড স্কুল কম | তাই ছেলে-মেয়ের মাঝখানে এখনো অদৃশ্য গন্ডি রয়েই গেছে | যেখানে idioplus কমপ্লেক্স-এর জন্য বড় হলে মেয়েরা জন্মদাতা বাবার থেকে দুরে থাকে আর ছেলেরা মায়ের পাশ থেকে সরে আলাদা ঘরে শোয়, সেখানে একটু বড় হলে নারী-পুরুষ-এর মধ্যে শারীরিক আকর্ষণ তো জন্মাবেই | নীল ছবির দুনিয়াও এক্ষেত্রে একটা বড় ভুমিকা পালন করে | ছবিতে দেখানো কিছু কাল্পনিক দৃশ্যকে সত্যি ভেবে বাস্তবায়িত করতে গিয়ে অঘটন ঘটছে আরো | ভার্চুয়াল দুনিয়ার চাপে সব কিছুই হাতের মুঠোয় | সম্পর্কগুলো-ও | দু’দিনের আলাপে প্রেম | তারপরেই শরীর | শরীর পুরনো হলেই প্রেমে কাঁচি | আবার নতুন প্রেম | আবার নতুন শরীর | তেমনি চাহিদা বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে | একটা নারীতে কবে কোন পুরুষের মন ভরেছে? যাদের ভরেছে তাঁদের সংখ্যা হাতে গোনা | সব মিলিয়ে নারী আর যৌনতা আজ একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ | আর জিডি বিড়লা স্কুলে যা হল তার পিছনে সম্ভবত হাত রয়েছে pidofilia-র | এই আচরণগত অসঙ্গতি থাকলে শিশুদের দেখলে যৌনলিপ্সা জাগে | রোগটি ধরা পড়লে ওষুধ দিয়ে যৌন খিদে কমানো হয় |  

আরও পড়ুন:  মানুষের অস্তিত্ব আর ১০০ বছর

তা বলে চার বছরের শিশুও রেহাই পাবে না? সে তো সেক্স শব্দটাই শোনেনি, জানে না, বোঝে না | উপভোগ করা দুরস্ত | এমনটা ঘটলে তাদের পুরো মেয়েবেলাটাই যে নষ্ট | আর কি পুরুষকে বিশ্বাস করতে পারবে তারা? স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে? স্বামী-সন্তান নিয়ে ঘর করতে পারবে?

জানা নেই | তবে আর একটা ঘটনা বলে শেষ করি | সম্প্রতি, পার্ক স্ট্রীটের কাছ থেকে একটি মেয়ে বাসে উঠেছিল | পরনে শর্ট শার্ট, জিনস, কোট | হাতে দুটো ব্যাগ | বছর ৩২-এর মেয়েটির শার্টের বোতাম খোলা | পেটের কাছ দিয়ে | হাওয়ায় জামা অবাধ্য হলেই পেট, নাভির উঁকিঝুঁকি | আশপাশের মহিলারা লজ্জায়-ঘেন্নায় লাল | আবরণহীন সেই উম্মুক্ত শরীরের সামান্য অংশ দেখেই যথারীতি কিছু পুরুষের স্খলন শুরু | ভরা বাসে ওই মেয়ের গায়ে তো হাত দেওয়ার উপায় নেই | অবদমিত সেই খিদে মেটাতে তারাই আশ্রয় খোঁজে চার বছরের মেয়ের অক্ষত যোনিতে | এদের থেকে নিরাপদ শিকার আর কে হতে পারে?              

NO COMMENTS