ইন্টারভিউ

ইন্টারভিউ

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

‘হোয়াট ইজ দ্য ওয়েট অফ দ্য মুন?’ একটা ঠোক্কর লেগে যাওয়া মুখের প্রদীপ মুখোপাধ্যায়। আর স্যুট-বুট পরা হু-হোয়াট-হোয়্যার-হোয়েন কর্পোরেট হিংস্রতার মধ্যে এক বিপন্ন মানুষ। জন অরণ্য।

ইন্টারভিউ। পাঁচ অক্ষরের এই শব্দটার মধ্যে লেপ্টে থাকে কত আশা-আকাঙ্খা-অভিমান। একশ মাইল দৌড়ে আসার পরে এক শেষ রেফারির বাঁশি। পতাকাটা সবুজ হলে সব পেয়েছির দেশ, আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে। আর পতাকা যদি লাল হয়, তা হলে আবার সেই শূন্য থেকে শুরু। এই রেফারির কাছে পৌঁছতে গেলেও যে দৌড়ে আসতে হয় একশ মাইল পথ, সেই কথা আর কেউ মনে রাখে না।

লিখিত পরীক্ষাটা যেন অনেকটা চুপি চুপি ফিসফাস। নিজের অপারগতার কথা সেখানে জানে শুধু একটা ব্যর্থ কলম আর হাহাকার করা কয়েকটা সাদা পাতা। যে উত্তরটা গত আড়াই তিন ঘণ্টাতেও মাথাতে আসেনি, পরীক্ষা শেষের ঘণ্টা পড়ে যাওয়ার পর ‘স্টপ রাইটিং স্টপ রাইটিং’ মাখা একটা গা গুলিয়ে যাওয়া অনুরণনের মধ্যে ওই আপাত ব্যর্থ পেনটাই বমি করে দিতে চায় উত্তরের একটা আস্ত মহাকাব্য। ইনভিজিলেটর খাতা টেনে নেওয়ার সময় মনে হয়, শেষ হয়ে হইল না শেষ। তবে খাতা জমা পড়ে যাওয়ার পরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওই এপিসোডটায় দাড়ি টেনে দেওয়া যায়। সেই অপরাধী খাতার দেহের ময়না তদন্ত করেন অজানা অচেনা কোনও ডাক্তার। সাদা পাতায় শুধু ভুল উত্তরের অপরাধগুলো লিপিবদ্ধ থাকে, অপরাধীকে তো সেখানে দেখতে পাওয়া যায় না। ইন্টারভিউয়ের ব্যপারটা আলাদা। অপরাধী ও বিচারক অবস্থান করেন একই জায়গায়। তবে বিচারক লাক্সারি ক্রুজে আর অপরাধী একটা পালতোলা নৌকায়, উত্তাল ঢেউয়ের সাথে। একপক্ষের কাছে ইন্টারভিউটা ডিউটি সেরে বাড়ি ফেরার তাড়া। আর অন্য পক্ষের কাছে প্যালপিটেশন, বুক দুরদুর।

ইন্টারভিউ দেওয়ার সময় প্রত্যেকেরই কিছু শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন হয়। কারও হাতের তালু ঘামে, কারও পায়ের চেটো ঘামে। কেউ কেউ প্রবল ভাবে খামচাতে থাকেন আঙুল। পাড়ায় পুজোপ্যান্ডেলে বাচিকশিল্পীর সুনাম কুড়ালেও ইন্টারভিউ প্যানেলের সামনে বসামাত্রই তোতলাতে শুরু করেন কেউ কেউ। বুক ধুকপুক তো কম বেশি বেড়ে যায় সবারই। ইন্টারভিউ ভীতি দূর করানোর জন্য বাজারে বেশ কিছু বই আছে। তাতে বলা হয়, ইন্টারভিউয়ের ঘরের দরজা খুলেই স্মিত হেসে গুড মর্নিং বা আফটারনুন বলতে, প্রশ্নকর্তার চোখে চোখ রেখে উত্তর দিতে, কোনও উত্তর না জানলে তর্কে না গিয়ে সবিনয়ে জানিয়ে দিতে—সরি, আমার জানা নেই। বলা হয়, তুমুল অস্বস্তিকর কোনও প্রশ্ন বা পরিস্থিতির সামনে পড়লেও মুখের প্রশান্তি যেন সবসময় বজায় থাকে। পাঠ্যবই গুলে খেলে প্রশ্ন কমন আসে। কিন্তু ইন্টারভিউয়ের বই গুলে খেলেও পরিস্থিতি কমন আসা মুশকিল। তাই তো প্যানেলের প্রশ্নবানের মুখে জর্জরিত হলে তার ছাপ মুখেও পড়ে। পড়তে বাধ্য।

অল্প কথায় বলতে গেলে, টেবিলের অন্যপ্রান্তে বসে আছেন তাঁরা, নিদেনপক্ষে পার্টিকুলার প্রশ্নটা করছেন যিনি, ইন্টারভিউ হল তাঁকে খুশি করার পরীক্ষা। মনের কোনও আলট্রাসাউন্ড হয় না। তাই প্রশ্নকর্তার মনের গহনটা ইন্টারভিউটা নেওয়ার সময় ডাল লেকের জল না বর্ষার তিস্তা —বোঝার সত্যিই কোনও উপায় নেই। একমাত্র টেকনিকাল প্রশ্ন ছাড়া যে কোনও প্রশ্নই সমান ভাবে ইয়র্কার বলের মতো। ইন্টারভিউতে কয়েকটা চেনা প্রশ্নের কথা বলা যাক। পাঁচ বছর পর তুমি নিজেকে কোথায় দেখতে চাও—এই প্রশ্নটা আজকাল প্রতিটা ইন্টারভিউতেই করা হয়। খুবই ঘোড়েল একটি প্রশ্ন। আমার সরলমতি এক বন্ধু উত্তর দিয়েছিল, ‘স্যার কলকাতায়, বাড়ি ছেড়ে যাব না স্যার। বাড়িতে বুড়ো মা বাবা আছেন।’ বন্ধুটার কাছে শুনেছিলাম, প্রশ্নকর্তা নাকি এই উত্তরটা শোনার পরে সেই মুহূর্তেই ইন্টারভিউটা থামিয়ে দিয়ে ওকে বেরিয়ে যেতে বলেছিলেন। এই প্রশ্নের উত্তরের কত বিপদ দেখুন! কেউ যদি বলে, ‘পাঁচ বছর পরে এই কোম্পানিতে আরও বড় পজিশনে নিজেকে দেখতে চাই’, তা হলে সে শুনতে পারে—তার মানে তুমি বলতে চাও তুমি এমনই কাজ করবে যে বাইরে থেকে কোনও বেটার সুযোগ পাবে না? কিন্তু যদি বলা হয় ‘পাঁচ বছর পর নিজেকে অবশ্যই অন্য আরও বড় সংস্থায় আরও বড় পজিশনে দেখার কথা ভাবি’, তা হলে আপনি পত্রপাঠ বিদায় হয়ে যাবেন। এর একটা উদ্ধত উত্তর শুনেছিলাম—পাঁচ বছর পর আপনার চেয়ারে নিজেকে দেখতে চাই স্যার। প্রশ্নকর্তা বলেছিলেন, ‘এই চেয়ারটা সতেরো বছর ভাল পারফরমেন্সের নেট রেজাল্ট ভাই। তুমি পাঁচ বছরেই অ্যাচিভ করবে? এটা কনফিডেন্স নয়। ওভার কনফিডেন্স।‘ বলা বাহুল্য, ওর ভাগ্যে শিকে ছেঁড়েনি।

আরও একটি গোলকধাঁধাঁ মাখা প্রশ্ন—তোমায় আমরা নেব কেন বল? যতই ‘এক চান্সে ইন্টারভিউ’ গোছের বই পড়া থাক, গ্রুমিং ক্লাস করা থাক, এর উত্তরে প্রশ্নকর্তাকে খুশি করা যায় না। যারা পড়াশোনা শেষ করে চাকরির জগতে পা রাখতে চলেছেন, তাদের কাছে মোদ্দা কথায় এই প্রশ্নের জবাব হল এই, ‘অনেক জায়গাতে দিচ্ছি, তাই এখানেও দিয়ে গেলাম। লেগে গেলে লেগে গেল।’ কিন্তু এ কথা তো ইন্টারভিউ প্যানেলের সামনে প্রকাশ্যে বলা যায় না। ওই কোম্পানির নামে সুখ্যাতি করতে হয়। বলতে হয়, ‘আমার ক্যারিয়ারটা এমন সোনার সুযোগ পেলে বর্তে যাবে।’ বুঝিয়ে দিতে হয়, এই মুহূর্তে আপনারাই আমার জীবনের প্রাণভোমরা, আমার ক্যারিয়ারের সোনা রুপোর জিয়নকাঠি। এই দুনিয়ায় তেল দিতে ভালবাসেন এমন মানুষের সঙ্গে তেল খেতে ভালবাসেন এমন মানুষও আছেন। কিন্তু মুশকিলটা হল, প্যানেলে এমন একজন না একজন ঠিকই থাকেন, যিনি বুঝে যান, একেবারে ফাঁকা আওয়াজ। তখন এমন মন্তব্য আসতেই পারে, ‘বেশ, আমাদের কোম্পানির উপরে এতই যখন প্রেম তা হলে চলে আসুন। কিন্তু আপনার যোগ্যতা যা, তার অর্ধেক বেতন পাবেন।’ এর উত্তরে ‘হ্যাঁ’ বলা যায় না। আবার ‘কেন স্যার’ বললেও বিপদ। শুনতে হবে, ‘ও! তা হলে বলুন শুধু টাকার জন্যই আপনি এই সংস্থায় চাকরি করতে চান। ভাল কেরিয়ার-টেরিয়ার বাজে কথা। ঠিক কি না?’

ইন্টারভিউ এমন একটি জায়গা যেখানে অনেকের মাঝখানে থেকেও আমাদের মধ্যে অনেকেই নিজেই নিজের হৃদস্পন্দন শুনতে পাই। বুকের মধ্যে ডিজে মিউজিকের বিট বাজে। বাজে করুণ সুরে। কয়েকটি ব্যাপার চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে খুব চলে। সেগুলো হল, বডি ল্যাঙ্গোয়েজটা ঠিক রাখতে হবে। সোজা হয়ে বসতে হবে। ঘরে ঢুকেই সবার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করতে হবে।  হাত মেলানোর সময় নিজের হাতের তালু যেন ঘামে ভিজে না থাকে, হাত যেন কিছুতেই না কাঁপে। যাই জিজ্ঞেস করা হোক না কেন, চোখে চোখ রেখে উত্তর দিতে হবে। এগুলোর প্রতিটার জন্যই নাকি নম্বর বরাদ্দ থাকে। আর চোখে চোখ রাখা অর্থাৎ আই কনট্যাক্টের ব্যাপারটা নাকি সবচেয়ে ভাইটাল। আমার এক বন্ধুর কথা বলি। দিবাকর। কলেজের বন্ধু। আবার একই পাড়ারও। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর দুজনেই এক সঙ্গে ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়িয়েছিলাম প্রায় বছর খানেক। সরকারি চাকরির প্রস্তুতির মুরোদ এবং ধৈর্য দুটোর একটাও ছিল না। অগত্যা বেসরকারি চাকরির জন্যই প্রাণপাত করছিলাম। প্রাণপাত বলতে রেলস্টেশন আর পাড়ার রাস্তার মোড় থেকে কেনা ইন্টারভিউয়ের অ-আ-ক-খ, হাই ফাই ইন্টারভিউ, বডি ল্যাঙ্গোয়েজের সহজপাঠ, ইন্টারভিউয়ে বাজিমাত—এ ধরনের কিছু বই কিনে পড়ছিলাম আর কি। বইগুলোর দাড়ি কমা সেমিকোলন অবধি মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। গোটাদশেক ইন্টারভিউয়ের পরে একটা মোবাইল কোম্পানির কল সেন্টারে আমার চাকরি হয়ে যায়। বকবক করে পোস্টপেড কানেকশান বেচার কাজ। কিন্তু ছোটদের ন্যাপি বিক্রির সেলসম্যান, বড়দের হ্যাপি রাখা তেলের এজেন্ট, জুতোর পালিশ, বক্ষ মালিশের সাপ্লায়ার, ক্যুরিয়র কোম্পানির ডেলিভারি বয়, এটিএম গার্ড—বছরদেড়েকে সত্তর-পঁচাত্তরটা কোম্পানিতে ইন্টারভিউ দিয়েও দিবাকর কিছু সুবিধা করে উঠতে পারেনি। বলত, ‘কিছু একটার অভাব আছে ভাই।’ জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কিসের অভাব?’ বলেছিল, ‘জানা নেই। এক্স ফ্যাক্টর। ওই জন্যই হচ্ছে না। এত ভাল বডি ল্যাঙ্গোয়েজ মেইনটেইন করি, তাও হল না।’

তবে দিবাকরের ভাগ্যের শিকে ছেঁড়ার নেপথ্যেও সেই বডি ল্যাঙ্গোয়েজই। আরও ভাল করে বলতে গেলে বডি ল্যাঙ্গোয়েজের আই কনট্যাক্টে। একটা শেয়ার ব্রোকার কোম্পানির এজেন্ট নেওয়ার জন্য ইন্টারভিউ চলছিল। দিবাকরের জীবনের শেষ ইন্টারভিউ। মোটা দাগে বলা যায় দালালির চাকরি। দিবাকরের থেকে পরে জেনেছি, ওর সামনেই বসে ছিলেন ওই কোম্পানির এইচআর দফতরের এক যুবতী। ‘বছর তেইশ চব্বিশ হবে, হেব্বি দেখতে, দেখে চোখ ফেরানো যায় না মাইরি’, প্রথম দিকে দিবাকর বলেছিল এমনটাই। পাঁচ জনের ইন্টারভিউ প্যানেলের মধ্যে শুধু ওই যুবতীই প্রশ্ন করছিলেন আর দিবাকর উত্তর দিচ্ছিল। একটার পর একটা প্রশ্ন। চোখা চোখা। প্রশ্নবানে ঘাবড়ে গিয়েই হোক বা এইচআর-এর রূপ দেখে চোখে ধাঁধাঁ লেগে গিয়েই হোক, দিবাকর নাকি শুরু থেকেই চোখের পাতা ফেলতে পারেনি। ও অবশ্য সাফাই দেয়, ‘আই কনট্যাক্টের সময় চোখের পাতা ফেলিলে নম্বর কাটা যাইতে পারে’, একটা বইতে নাকি এমনটা লেখা ছিল। শেষের দিকে আর না পেরে ও এক চোখ বোজে।

সেদিন বিকেলে দিবাকর একটি এসএমএস পায়। ‘আমায় দেখে চোখ মারলে ! দুষ্টু ! ইতি তোমার এইচ আর। মুয়া মুয়া।’

সেই ‘হেব্বি দেখতে’ এইচআর-এর মহিলা আজ দিবাকরের বেটার হাফ।

দিবাকর অবশ্য বলে, ‘হাফ না ভাই, ওই ফুল।’ বিয়ের পর অবশ্য চাকরির চেষ্টা ছেড়ে দিয়েছে আমার বন্ধু। বৌয়ের পয়সাতেই সংসার চলে। আর দিবাকর বলে, ‘শেয়ারের দালাল আর হওয়া হল না রে আমার। তবে সেরা শেয়ারটা পেয়ে গিয়েছি !’

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

Leave a Reply

Handpulled_Rikshaw_of_Kolkata

আমি যে রিসকাওয়ালা

ব্যস্তসমস্ত রাস্তার মধ্যে দিয়ে কাটিয়ে কাটিয়ে হেলেদুলে যেতে আমার ভালই লাগে। ছাপড়া আর মুঙ্গের জেলার বহু ভূমিহীন কৃষকের রিকশায় আমার ছোটবেলা কেটেছে। যে ছোট বেলায় আনন্দ মিশে আছে, যে ছোট-বড় বেলায় ওদের কষ্ট মিশে আছে, যে বড় বেলায় ওদের অনুপস্থিতির যন্ত্রণা মিশে আছে। থাকবেও চির দিন।