সৌরভ মুখোপাধ্যায়
শূন্য-দশকে উঠে-আসা কথাকারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম। জন্ম ১৯৭৩, আশৈশব নিবাস হাওড়ার গ্রামে, পেশায় ইংরাজি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক। গত দেড় দশক নিয়মিতভাবে সমস্ত অগ্রণী বাংলা পত্রিকায় গল্প-উপন্যাস লিখেছেন। পাঠক-প্রশংসিত উপন্যাস ‘ধুলোখেলা’, ‘সংক্রান্তি’ ও ‘প্রথম প্রবাহ’ এবং অনেক জনপ্রিয় ছোটগল্প তাঁকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। লিখতে ভালবাসেন ছোটদের জন্যেও, ‘মেঘ-ছেঁড়া রোদ’ তাঁর এক স্মরণীয় কিশোর-উপন্যাস। সাহিত্য ছাড়াও সঙ্গীত ও চলচ্চিত্রে অনুরাগ প্রবল। ঘোর আলস্যবিলাসী ও আড্ডাপ্রিয়।

প্রথমেই বরং গুটিকয় গল্প বলি। গল্প হলেও সত্যি।

Banglalive

        ১।  এক গ্রামীণ বিদ্যায়তনে নির্বাচনের দায়িত্ব নিয়ে গেছি। বৈদ্যুতিন ভোটযন্ত্রাদির বর্তনী-সংযোগ বুঝিয়ে দিতে এসেছে নির্বাচন-আয়োগের পাঠানো ছোকরা ‘যন্ত্রবিদ’। মিস্তিরি আসলে। বছর-তেইশের ফিটফাট যুবক, বাড়ি বিহার, বেশ কিছুদিন হল কাজ নিয়ে এসেছে যন্ত্র-নির্মাণকারী সংস্থার পশ্চিমবঙ্গীয় শাখায়।  কিন্তু একী! যা-কিছুই জিগ্যেস করি, একবর্ণ বোঝে না। বাংলা ভাষা জানা নেই। জানা নেই বলে সংকোচ? উঁহু! বরং তীব্র উন্নাসিকতা। বিরক্ত কণ্ঠে প্রিসাইডিং অফিসারকে বলছে, “কেয়া বাংলা মেঁ বক্‌ রহে হো? হিন্দি মেঁ কহো না!” অগত্যা জিগ্যেস করতেই হয়, ভাঙা হিন্দিতেই, বেঙ্গলে কাজ করতে এসে বাংলা জেনে নেওয়াটা সে জরুরি মনে করে না কেন! উত্তরে সেই বিহারি তরুণ, পশ্চিমবাংলা রাজ্যের এক বাংলা-মাধ্যম স্কুলে দাঁড়িয়ে পরম তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলে ওঠে, “কোই জরুরত নেহি। হিন্দি যো হ্যায় না, উও রাষ্ট্রভাষা হ্যায়। এক হিন্দি জাননে সে হি কাম চলেগা, অর কুছ শিখনা জরুরি নহী হ্যায়।”      

        ২।  মোবাইল-সংস্থা থেকে মধুক্ষরা ললনাকণ্ঠে ফোন আসে, “গুড মর্নিং স্যর, মে আই স্পিক টু…?” মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে, বাংলায় বলতে অনুরোধ করি। ও-প্রান্ত একটু থমকে যায়, “প্লিজ হোল্ড ওয়ান সেকেন্ড, স্যর”, অনতিপরেই এক খসখসে পুরুষকণ্ঠ কিউ ধরে নেয়, কিন্তু না, বাংলাতে নয়, “স্যর, আপ ইংলিশ নহী সমঝতে?” আমি, ইংরাজি সাহিত্যের আড়াই দশকের পাপী ছাত্র তথা শিক্ষক, অম্লানবদনে বলি, “ইংরাজি তো নয়ই, আমি হিন্দিও বুঝি না দাদা। গ্রামের চাষিভুষি লোক। বাংলা জানেন এমন কোনও লোক আপনাদের ডেস্কে বসেন না?” গলাখাঁকারি-সহ জবাব আসে, “নহী স্যর, ইঁহা সির্ফ ইংলিশ অউর হিন্দি… নো বেঙ্গলি-স্পিকিং পার্সন, স্যর… সরি…!” তড়িঘড়ি আমার প্রাচীন বক্তব্যটি পেশ করতে থাকি, বাঙালীভাষী একটি রাজ্যে ব্যবসা করতে এসে কীভাবে বাংলা ভাষা ছাড়াই… ইত্যাদি। “ও শিওর স্যর, জরুর… জরুর…” বলতে বলতেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন ও-প্রান্ত।

        ৩।  সোশ্যাল মিডিয়ায় এক পরিচিত মুখ পোস্ট দিয়ে জানিয়েছেন কদিন আগে, অতি-নামী ও ততোধিক-দামী এক ইংরাজি-মাধ্যম বিদ্যালয়ে পাঠরত তাঁর বাচ্চাটি ক্লাসে বাংলা বলে ফেলায় তাকে অর্থদণ্ড করেছে কর্তৃপক্ষ, দু’শো টাকা। ট্রাফিক-আইন লঙ্ঘনকারী বা বিন্‌-টিকিটের ট্রেনযাত্রীর সমান জরিমানা হল শিশুর— হ্যাঁ, মাতৃভাষা বলার ‘অপরাধে’! এবং সেই ফেসবুক-পোস্টের মন্তব্য-বিভাগে অনেকেই জানালেন, তাঁরাও ভুক্তভোগী, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। শারীরিক ও মানসিক শাস্তিরও নিদান দেয় অনেক ইংরাজি-মৌলবাদী স্কুল। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, কয়েকজন— তাঁরা সকলেই বাঙালী— বললেন যে, একটা ‘সিস্টেমে’র মধ্যে বাচ্চাকে নিয়ে গেলে তো সে-সিস্টেমের ‘কন্ডিশন’গুলিকেও মানতেই হবে, এই শাস্তিগুলিও সিস্টেমের অন্তর্গত, এর সুদূরপ্রসারী ফল হিসেবেই তো মিলবে সেই মোক্ষ, ‘ফ্লুয়েন্ট স্পিকিং উইথ প্রপার অ্যাকসেন্ট’ যার নাম!           

আরও পড়ুন:  অবিশ্বাস্য ! ৪২ পেরিয়েও কৈশোরের সৌন্দর্য ! কী করে‚ জানালেন সুন্দরী

         একুশে ফেব্রুয়ারি, মাতৃভাষা-দিবস! ভাষার কথা ভাবতে বসে এই তিনটি ঘটনা পরপর মনে ভেসে উঠল। একটু উলটে কল্পনা করুন দেখি। কোনও বাঙালি যুবক বিহারে গিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে কিন্তু মাতৃভাষা ছাড়া অন্য ভাষা শিখতে রাজি নয়! বাঙালি প্রতিষ্ঠান কর্ণাটকে বাণিজ্য করতে গিয়ে গ্রাহককে জানাচ্ছে যে, নাহ্‌, কন্নড় ভাষায় কথোপকথন করা সম্ভব নয়! কিংবা, মহারাষ্ট্রে বাংলা-স্কুল চালু হল, সেখানে মারাঠি বললেই ফাইন!

         হাস্যকর, না? কোথায় ‘ইন্টারন্যাশনাল লিঙ্গুয়াফ্রাঙ্কা’ ইংরাজি, কোথায় ‘রাষ্ট্রভাষা’ (?) হিন্দি— আর কোথায় তুচ্ছ আঞ্চলিক ভাষা বাংলা! পুরো অবাস্তব!  

         কিন্তু নিজের ভূমিতে বিভাষার হাতে নিজের মাতৃভাষার হেনস্থা— এ যে কঠোর বাস্তব! তা দেখেও কি হাসি পাওয়ার কথা বাঙালির?

         হ্যাঁ, এই সেই ভাষা, বাংলা। যে-ভাষাটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে নিজেদের জীবন ত্যাগ করে দিয়েছিলেন পূর্ব-বাংলার বরকত-সালামরা, যে-ভাষার অবমাননার বিরুদ্ধে বাঙালির কণ্ঠ গর্জে উঠেছিল, রক্ত ঝরেছিল কাছাড়-শিলচরে। স্বৈরাচারীর বন্দুকের মুখে বুক চিতিয়ে বিপন্ন স্বভাষার পাশে দাঁড়িয়েছিল বাঙালি, তৈরি করেছিল বিরল ইতিবৃত্ত।

        আজ সেই পুব-বাংলার দেশটিতে, শোনা যায়, ঐতিহাসিক একুশে ফেব্রুয়ারি নিছক এক আনুষ্ঠানিকতার তারিখ হয়ে দাঁড়াচ্ছে ক্রমশ। আরবী শব্দভাণ্ডার জাঁকিয়ে বসে বাংলাকে কোণঠাসা করছে দিনে দিনে, ধর্মীয় গোঁড়ামি আস্তে আস্তে ভাষা-তালিবানির দাঁতনখ বের করছে। বিদ্যালয়ের বাংলা পাঠ্যবইয়ে চলছে সেন্সরের কাঁচি।  

        আর, এপারের পশ্চিমবাংলা নামক রাজ্যটিতেও— বন্দুকের নলে নয়, বেয়নেটে নয়, নিঃশব্দ ধীর কিন্তু অমোঘ প্রক্রিয়ায় বন্ধ হয়ে আসছে মাতৃভাষার শ্বাস। ভাষার জন্যে শহিদ হওয়ার লোক নেই আর, ভাষা আজ নিজেই শহিদ!

        একদিকে হিন্দি তার লোমশ আগ্রাসী থাবায় টুঁটি টিপছে বাংলার। ইতোমধ্যেই এমন অজস্র পকেট তৈরি হয়েছে মহানগর তথা গোটা রাজ্য জুড়ে, যেখানে বাংলা ভাষায় কথোপকথন প্রত্যাখ্যাত, ‘হিন্দি মেঁ বোলো নহী তো ফুট্‌ যাও বে’ এই গুঠকা-বিলাসী নন-চ্যালেন্স সেই সব মুক্তাঞ্চলে কলার তুলে দাঁড়িয়ে। অন্যদিকে, স্লো-পয়জনের মতো নব্য প্রজন্মকে গ্রাস করে নিচ্ছে ‘ইংরাজিয়ানা’, বাবা-মায়েদের সগর্ব প্রশ্রয়ে সেই সাহেব-সাজার আত্মঘাতী রঙ্গ অস্বীকার করছে মাতৃভাষার গৌরবময় উত্তরাধিকারকে। সেই ট্যাঁশ-দুনিয়ায় মাতৃভাষা-অজ্ঞতাই হয়ে ওঠে কৃতিত্ব— ‘বাংলাটা ঠিক আসে না’ যে-মূঢ় দম্ভের ক্যাচলাইন!

         বাংলা ভাষার সাহিত্য-গান-চলচ্চিত্র অচিরেই শুধু ‘প্রাচীন’ ভোক্তাদের মধ্যে সীমিত হয়ে পড়বে, তারপর আস্তে আস্তে মরে যাবে, এই ভবিষ্যতের ছায়াই কি স্পষ্ট হচ্ছে দিগন্তে? আজ বঙ্গসন্তানদের এক বৃহৎ অংশ প্রবাসী, তাঁদের সন্ততিদের কাছে বাংলা ভাষা অজ্ঞাতপ্রায়। নিজভূমেও, মাতৃভাষার হরফ না-চেনা বাঙালি-শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে রোজ। তাদের জন্যে রোমান হরফে সহজ-পাঠ আর আবোল-তাবোল ছাপিয়ে বেচতে শুরু করেছেন বাঙালি প্রকাশক— ‘বাংরেজি’ শব্দটা শ্লেষ-রসিকতার স্তর থেকে ঘাঘু ব্যবসায়িক বাস্তবে নেমে এল— আমাদের চোখের সামনে।    

আরও পড়ুন:  মা ষষ্ঠীর সঙ্গে ঘটা করে জামাই-আদরের সম্পর্ক কী?

          খুব পরিপাটি কিছু কৈফিয়ত হাওয়ায় ওড়ে। এক, ইংরাজি ছাড়া আজ দুনিয়া অচল, তাই বাধ্যত ইংলিশ মিডিয়াম, আর সেখানে গিয়েই অগত্যা ঐ ‘মাতৃভাষা-বর্জনে’র শর্ত-শিকলে বাঁধা পড়া! দুই, সর্বভারতীয় সমস্ত ক্ষেত্রেই তো হিন্দির আধিপত্য, তাই প্রথম ভাষা ইংরাজির পরে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে হিন্দি ছাড়া আর উপায় কী? তিন নম্বর ভাষা হিসেবে বাংলা? বড্ড চাপ হয়ে যাবে না কচি মাথায়?   

         একদল আবার রীতিমতো আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। দাঁত খিঁচিয়ে বলেন, বাংলা জেনে ভাত জুটবে তার নিশ্চয়তা আছে? রাজ্যে কাজ আছে? ছেলেমেয়েরা এখানে জীবিকা পাবে? মস্ত মুলুকের বা মস্ত-তর দুনিয়ার কোন্‌ প্রান্তে গিয়ে তাঁবু গাড়তে হয় বেচারিদের— তার ঠিক কী, মাতৃভাষা ধুয়ে কি জল খাবে বাছারা?

         কিন্তু এর উত্তরে যখন সবিনয়ে জানতে চাওয়া হবে, সবই ঠিক— তবে ইংরাজি বা হিন্দি ‘জানতে’ হলে মাতৃভাষা ‘ভুলতে’ হবে কেন, সমগ্র শিক্ষা-মাধ্যমটিকেই নির্দয়ভাবে বৈভাষিক করে তোলার কী বাধ্যতা, ‘বাংলা বললে জরিমানা’ এমন ন্যক্কারজনক পরিস্থিতির মধ্যে শিশুটিকে ফেলতে হবে কেন, যোগ্য মেধাগুলিকে শৈশবেই মাতৃভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিলে জাতির বা সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ কী— সে কথার আর এক-বাঁও দো-বাঁও কিচ্ছুটি মেলে না। বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি দিয়ে দাঁত মাজেন বলে দাবি করেন— অথচ নিজের বাচ্চাটিকে সযত্নে বসিয়ে দিয়ে এসেছেন বাংলা-বিবর্জিত স্কুলে, এমন লোকজনে ছেয়ে গেছে বাজার। স্বয়ং ইংরাজিতে দক্ষ, এমনকী ইংরাজি ভাষার শিক্ষকতার পেশায় নিযুক্ত ব্যক্তিও কেন তাঁর শিশুটিকে মাতৃভাষা-মাধ্যমে শিক্ষিত করতে আগ্রহী নন— বাড়িতে ব্যক্তিগত উদ্যোগ-যত্নে বিভাষাটি কি তিনি শেখাতে পারতেন না সন্তানকে? অতীতে সহস্র শিক্ষার্থী কি বাংলা-মাধ্যমে পড়াশোনা করেই ইংরাজিতে যথেষ্ট গভীর ভাষাজ্ঞান ও প্রয়োগকুশলতা অর্জন করেননি?

          আজও, মুষ্টিমেয় কয়েকটি পেশার শাখা (যেখানে ঝাঁ-চকচকে বচনবাগীশ হওয়া ভিন্ন গতি নেই) ছাড়া অন্যত্র, অধিকাংশ জীবিকাতেই শুধু ভাষা-গঠনটি ঠিকঠাক জানলেই কাজ হয়। ‘বিষয়-শিক্ষা’ বা ‘তথ্যাভিজ্ঞতা’ আজও ভাষা-নিরপেক্ষ, যে-ভাষাতেই পড়া হোক, স্বাচ্ছন্দ্য থাকলেই শিখন সার্থক হতে বাধ্য, বিজ্ঞানীরা বলেন। সুতরাং, বিষয়-পাঠের মাধ্যম হিসেবে বিভাষার চেয়ে স্বভাষা ন্যূন হতেই পারে না। কিন্তু এর বিপ্রতীপ মিথ্যাটিকেই মতলববাজেরা শিঙা ফুঁকে চাউর করেছে :  ইংরাজিতে পড়লে তবেই নাকি ভাল শেখা যায়, এমনকী ইতিহাস-ভূগোল-বিজ্ঞানও! আর, ‘ফ্লুয়েন্সি’ বা ‘অ্যাক্সেন্ট’ বা ‘ফোনেটিকস’ ইত্যাদি গৌণ প্রায়োগিক দক্ষতাকেই ইংরাজি ভাষা-শিক্ষার মূল গুরুত্বের কেন্দ্রে এনে ফেলে, তুমুল গোয়েবলসীয় প্রচারে সেই বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে শিক্ষা-বেনিয়া’রা। সেই চতুর বিজ্ঞাপনে ভুলে ‘বুদ্ধিমান’ বাঙালি ঝুরিকেই গুঁড়ি জ্ঞান করেছে, ‘ইংরাজি-শিক্ষা’র অজুহাত দেখিয়ে ফাঁপা ‘ইংরাজিয়ানা’কে বুকে জড়িয়েছে।  নিজের শেকড় ছিঁড়ে ফেলেছে অবহেলায়!

         এ নিয়ে কথা বলতে গেলেই কিছু বাঁধা বুলি শোনা যায়। …বাংলা-স্কুলে ইংরাজি ভালো পড়ানো হয় না যে! এখন আর ভালো মাস্টারমশাই কোথা? সব তো পার্টি-ধরে বা ঘুষ দিয়ে চাকরি-পাওয়া অপদার্থ! পরিবেশ-পরিকাঠামোও শোচনীয়, নিম্নমানের শিক্ষার্থী সব! আর, ওই-যে প্রাথমিকে ইংরাজি তুলে দিল সেবার বাম সরকার, ওই থেকেই তো ইংলিশ মিডিয়ামে চলে যাওয়ার ঢল নামল! নাহলে তো…    

আরও পড়ুন:  মৃতের শহর চেরনোবিল

         আচ্ছা! সত্যিই কি তবে এমনটা না-হলে আজকের বাঙালি পড়াত তার বাচ্চাদের বাংলা-মাধ্যম স্কুলেই? ধরুন যদি ‘পরিকাঠামো’ ঠিকঠাক থাকত, যদি ‘যত্ন নিয়ে’ই ‘যোগ্য’ শিক্ষকরা ইংরাজি শেখাতেন সরকারি স্কুলে, যদি প্রাথমিকে ইংরাজি তুলে-দেওয়ার ‘পাপ’টিও না করা হত সেই আটের দশকে? আর ছেলেমেয়েদের ট্যাঁকে গুঁজে ট্যাঁশ-ইশকুলে ছুটতেন না বাপ-মায়েরা?  

         তবে আজ থেকে ঠিক পঞ্চাশ বছর আগে, ১৯৬৮-র এক সমাসন্ন একুশে ফেব্রুয়ারির মুখে গিয়ে দাঁড়াই আসুন। তখন কিন্তু রমরম করছে সরকারি বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলির সুনাম। তখন কিন্তু শিক্ষকদের পার্টিবাজ ঘুষদাতা অপদার্থ বলে বদনাম ছিল না, ইংরাজি তুলে-দেওয়া ইত্যাদি কেলেঙ্কারি তখনও অকল্পিত। কিন্তু, কী আশ্চর্য, সেই জমানাতেও ‘সুনন্দর জার্নাল’ ধারাবাহিকে বিশ্রুত অধ্যাপক ও লেখক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় এসব কী লিখছেন?

         “আমরা ইংরেজকে বিদায় করে আজ তিনগুণ বেগে তাকে ভালোবাসতে আরম্ভ করেছি।… কিন্তু মাতৃভাষার মাধ্যম যে উচ্চতম শিক্ষার বাহন হতে পারে না, উঁচুদরের পণ্ডিতী বই বাংলায় লিখলেই যে জাত যাবে, বাংলা মাধ্যম স্কুলে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখানো যে নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্তরই নিরুপায় প্রয়োজনে— উচ্চবিত্তের পক্ষে সেটা ডিগনিটির বাইরে— এইসব ভাবনাকে (আমি) কোনোমতেই উদরস্থ করতে পারছি না।… ইন্ডিয়ানস অ্যান্ড ডগস প্রহিবিটেড লেখা থাকলে এককালে আমাদের রক্ত তেতে উঠত, এখন আর ওঠে না। আমরা অনেক উদার সহিষ্ণু হয়ে গেছি।”

        ‘কমনম্যান’ সুনন্দ খেদ জানাচ্ছেন, দুনিয়ার অন্য কোনও জাতি— ইংরেজ ফরাসী আইরিশ জর্মান কেউই, বৈদেশিক ভাষা-শিল্প-কৃষ্টিতে যতই মুগ্ধ হোক, নিজের ভাষা-ঐতিহ্য বিসর্জন দিয়ে তার পিছনে ঘোটেনি। একমাত্র ব্যতিক্রম আমরা, বাঙালিরা।

        আধা-শতাব্দী আগের এইসব পর্যবেক্ষণই প্রমাণ করে, সরকারি বিদ্যালয়ে ইংরাজি তুলে-দেওয়া বা পরিকাঠামোগত ডামাডোল নিয়ে যে অজুহাতগুলি আজকের বাঙালি দেয়— ইংলিশ-মিডিয়ামের স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়ার সপক্ষে— তা অনেকাংশে ‘ডেভিল্‌স এক্সকিউজ’ ছাড়া কিছু নয়। তার রক্তে এই প্রবণতা বরাবরই ছিল, বিশ্বব্যাপী ভোগবাদ আর মেকি আধুনিকতার সুড়সুড়ি পেয়ে সেটাই ফুলেফেঁপে উঠেছে। বাঙালি এক চির-আত্মঘাতী জাত, বিলিতি বকলস গলায় ঝোলানোর ব্যাকুলতা তার হঠাৎ করে গজায়নি, এ তার খানদানি ব্যামো।

         প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি আসলে আমাদের এইটুকু মনে করিয়ে দিয়ে যায়, কয়েকজন নিতান্ত ব্যতিক্রমী মানুষ ভাষাকে ভালবেসে শহিদ হয়েছিলেন বটে, কিন্তু আমরা তাঁদের বলিদানের যোগ্য হতে পারিনি কোনোদিন।                          

3 COMMENTS

  1. Once asked the examiner in my M.Com course that why I got poor marks in a theory paper which was a perfect one. He stopped me and asked which language I had used .I replied Bengali. He told that he did not checked it as it was in Bengali. Year 3003 . C.U

  2. একসময় আমি ইংরাজিতে খুব কাঁচা ছিলাম। তখন আমি অনেক ইংরেজি বই এর অনুবাদ খুঁজতাম। সেই সময় অনেকে আমাকে বলেছেন, যে “ইংলিশ শেখো, বাংলা জেনে কি হবে?, বঙ্গ সাহিত্যের কোনো মূল্য নেই, বাংলা জেনে তুমি বড় হতে পারবে না ” ইত্যাদি ইত্যাদি।
    এখন আমি িংইংলিশ এ অত্যন্ত পারদর্শী, কিন্তুু আমার সেই অনুবাদ পড়ার টান টা রয়েই গিয়েছে। আসলে মাতৃভাষার টান টা পুরো আলাদা, তার সাথে অন্য কিছুরই তুলনা করা যায় না। আর সবাই যখন নিজেদের ভাষা কে শ্রেষ্ঠ মনে করেন, আমরাই বা ছাড়বো কেনো?